মাঙ্খালি গোসাল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুজন ভট্টাচার্য

    ‘হা হা হা’, বৃদ্ধ হাততালি দিয়ে দুলে দুলে হেসে উঠলেন। হাসির তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর গোটা শরীরে। মুখে যেন শিশুর সারল্য। একখণ্ড সাদা বস্ত্রে কোনওরকমে ঢেকে রেখেছেন শরীরের সামান্য অংশ। দেখলেই বোঝা যায়, অনাহার-অর্ধাহার নিত্য সঙ্গী তাঁর। চামড়া ভেদ করে বুকের অস্থিগুলো যেন জানান দিয়ে যাচ্ছে তাদের অস্তিত্বের কথা। আর দেবে নাই বা কেন? কোথাও দু’দিন বসে থাকার জো আছে নাকি তাঁর? বাঁশের একটা লাঠির ভরসায় তিনি শুধু পথ চলেন। সেই মক্ষর অর্থাৎ বাঁশের দণ্ড নিত্য সঙ্গী বলেই অনেকে তাঁকে বলে মক্ষরীন। আর যেখানেই দেখেন মানুষ, সেখানেই দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে যান, তাদের সঙ্গে আলাপ করেন। রাত নামলে সাময়িক বিরাম। কেউ খেতে দিলে খেলেন, না দিলে নয়। ভিক্ষা করতেও দেখা যায় না তাঁকে। আর ভিক্ষা করেই বা লাভ কী হবে? ভিক্ষার সামগ্রী রাখবেন, এমন একটা ঝুলিও তো নেই তাঁর। সবথেকে বড় কথা, ভিক্ষে চাইবেন কাদের কাছে? ব্রাহ্মণরা তাঁর নাম শুনলেই ক্ষেপে যায়। ক্ষত্রিয় আর বৈশ্যরাও তাই। তিনি তাই ঘুরে বেড়ান নিতান্ত হতদরিদ্রদের মধ্যে, দিনরাত যাদের শুধু পরিশ্রমই করে যেতে হয়।

    আজ দুপুরেই তিনি এসেছেন এই কঙ্কর গ্রামে। কুশী নদীর ধারে এক ছোট্ট গ্রাম, কোশল মহাজনপদের অধীন। রাজধানী অযোধ্যা নগরীতে আছেন রাজা বিরুদ্ধক। বাবা প্রসেনজিতের মতোই ব্রাহ্মণ্যধর্মে তাঁর নিবিড় বিশ্বাস। তাঁর উৎসাহে যজ্ঞের আগুন কখনও নেভে না অযোধ্যাতে। ব্রাহ্মণরাও তাঁর প্রশস্তি গান বিনিময়ে। কেউ কেউ তো এমনও প্রচার করেন, স্বয়ং ইন্দ্র রাজা বিরুদ্ধকের রূপ নিয়ে নেমে এসেছেন পৃথিবীতে, অধর্মাচারীদের হাত থেকে বৈদিক ধর্মকে রক্ষা করবেন বলে। আবার কেউ বলেন, ইন্দ্র নন, মধ্যাহ্ন-সূর্যদেব বিষ্ণুই আবির্ভূত হয়েছেন রাজা বিরুদ্ধকের রূপে। তাই তাঁর এমন ভাস্বর প্রতাপ। শুনে রাজা হাসেন, হয়তো তৃপ্তও হন। সত্যিই তো, উত্তরাপথের এই বিস্তীর্ণ অংশে বৈদিক ধর্মের খুব দুরবস্থা আজ। এমনিতে বৈদিক ধর্মের আচারে শূদ্র কিংবা দাসদের বাদই দাও, এমনকি ক্ষত্রিয় আর বৈশ্যদের মতো উচ্চবর্ণেরও কোনও ভূমিকা নেই, সবটাই ব্রাহ্মণদের অধিকার। শুদ্র আর দাসদের অধিকারও নেই যজ্ঞস্থলে প্রবেশের। মন্ত্রপাঠের তো প্রশ্নই ওঠে না। কোনও এক চণ্ডাল নাকি কী হয় দেখি বলে ওঁম উচ্চারণ করেছিল লোকসম্মুখে। রাজা বিরুদ্ধক তার জিভ কেটে নিয়েছেন। আর কেউই তাই সাহস করে না।

     কিন্তু যতই পূর্বদিকে এগোবে, ততই দেখবে ব্রাহ্মণ আর বৈদিক ধর্মের বিরুদ্ধে মানুষ নানা কথা বলে যাচ্ছে প্রকাশ্যেই। সেখানে আছে মগহ জনপদ। তার রাজা হলেন সেনিকা বিম্বিসার। একের পর এক যুদ্ধ করে ছোট্ট মগহের সীমানা ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছেন তিনি। বৈদিক ধর্মে তাঁর মতি নেই। আর থাকবেই বা কেন? তিনি তো উচ্চবর্ণের কেউ নন। তাঁর বাবা ভাট্টিয়া নিজের ক্ষমতায় জনপদের সিংহাসন দখল করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ব্রাহ্মণরা তাঁকে মানতে চায়নি। সেই ক্রোধ সেনিকা বিম্বিসারের মধ্যে এখনও জাগ্রত। তাই বৈদিক ধর্মকে তিনি খুব একটা পাত্তা দেন না। আর সময়টাও হয়েছে তেমনি। বেশালীর রাজকুমার বদ্ধমান সংসার ত্যাগ করে হয়েছিলেন জিন। বৈদিক ধর্মের প্রবল বিরোধী তিনি। কত রাজা আর শ্রেষ্ঠী তাঁর শিষ্য হয়েছেন! আছেন কপিলাবাস্তুর রাজকুমার সিদ্ধাত্থ। অবশ্য এখন তিনি বুদ্ধ, স্বয়ং রাজা বিম্বিসার হাত রাখেন তাঁর পায়ে। তিনিও প্রবল ব্রাহ্মণবিরোধী, যজ্ঞ আর পশুবলির বিরোধী। তাঁদের গায়ে হাত দেবার সাহস নেই কারও। কিংবা প্রয়োজনও হয়ত দেখছে না কেউ। আর তাই কোশলের উপর যাবতীয় দায়িত্ব এসে পড়েছে বৈদিক ধর্মের আর ব্রাহ্মণদের মাহাত্ম্য রক্ষার।

    কঙ্কর গ্রামের দরিদ্র কৃষক আর কারুজীবীরাও জানে এইসব কাহিনী। তারা অবশ্য বুদ্ধ কিংবা মহাবীরের কোনও শিষ্যের সাক্ষাৎ পায়নি। কোশলকে তাঁরা এড়িয়ে চলেন। সবথেকে বড় কথা, ব্রাহ্মণদের কথা বাদ দাও, কোশলের এই পূর্বপ্রান্তে এমন মানুষও আছেন, যারা মহাবীর আর বুদ্ধকেও ব্রাহ্মণদের দলে ফেলেন। যেমন এই বৃদ্ধ। ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে এসেছেন শুনেই গ্রামের মানুষেরা ভিড় করেছিল তাঁর চারদিকে। না, প্রণাম বা দক্ষিণা তিনি নেন না। সবার সঙ্গেই কথা বলেন হেসে হেসে, সাধ্যমতো সবার প্রশ্নের উত্তর দেন। এই তো, এক্ষুনি উড়ুড্ডু প্রশ্ন করেছিল, ‘বামুনরা বলে, ভগবানের ইচ্ছেতেই নাকি সব ব্যাপারে তারা সবার উপরে। এটা কি সত্যি?’ শুনেই বৃদ্ধ হেসে গড়াগড়ি যান আর কি। খানিক পরে বললেন, ‘তোমার সন্তান কয়টি?’

    উড়ুড্ডু উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, চারটি ছেলে।’

    বৃদ্ধ মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন, ‘বেশ বেশ। তা বাবা, তুমি তাদের মধ্যে সবথেকে বেশি ভালোবাসো কাকে? বেশি আদর করো কাকে?’

    উড়ুড্ডু অবাক হয়ে বলল, ‘চারজনাই তো আমারই ছেলে। তাদের মধ্যে আবার ভাগবিচার করতে যাব কেন?’

    আবার শুরু হলো বৃদ্ধের হাসি। উড়ুড্ডু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘ভুল বললাম?’

    ‘আরে ধুর পাগলা’, বৃদ্ধ নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘বাবা হিসাবে তো ঠিক কথাই বলেছ। বাবা কি তার কোনও একজন সন্তানকে আলাদা করে বেশি ভালোবাসতে পারে? তা, তোমার মতো নিতান্ত গোবেচারা মানুষ এটা জানে, আর তোমাদের ভগবান এটা জানেন না?’

    উড়ুড্ডু ইতস্তত করতে করতে বলল, ‘আজ্ঞে, আমি মুখ্যু মানুষ। সে আমি জানব কী করে?’

    ‘তাহলে দেখো, তোমাদের সেই ভগবান তোমাদের থেকেও মুখ্যু। সে ব্যাটা জানেই না, ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভেদাভেদ করতে নেই।’

    বুড়ো কারিয়া মাথা নাড়াচ্ছিল। আচমকাই বলে উঠল, ‘বাবা, এমনটাও তো হতে পারে, ঐ বামুনগুলাই এমন বলে থাকে। আসলে ভগবান এমনটা বলেন না!’

    বৃদ্ধ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর কারিয়ার হাত ধরে বললেন, ‘যজ্ঞস্থলে ঢুকেছ কোনওদিন?’

    কারিয়া যেন শিউড়ে উঠল। বলল, ‘আজ্ঞে, সে আমাদের ঢুকতে দেবে নাকি? ধারেকাছে গেলেই লাগাবে মার।’

    ‘কিন্তু কী হয়, সেটা জানো তো?’

    ‘আজ্ঞে, ঐ যাগের আগুন জ্বালিয়ে তার মধ্যে ঘি মাখানো পাতা ফেলতে ফেলতে অং বং চং করে।’

    বৃদ্ধ আবার হাসতে হাসতে সামান্য সরে বসলেন। বললেন, ‘তা অমন আগুন তোমরা জ্বালাও না? তার মধ্যে খড়পাতা ঢালো না?’

    কারিয়া বিমূঢ় মুখে উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, শীত নামলে তো আমরাও অমন আগুন জ্বালাই, চারদিকে ঘিরে আগুন পোহাই।’

    বৃদ্ধ কারিয়ার পিঠে হাত রাখলেন, বললেন, ‘সঙ্গে একটু অং বং চং বলে দেখতেই পারতে কী হয়।’

    কারিয়া যেন শিউড়ে উঠল, ‘রাজা শুনতে পেলে আমাদের জিভ কেটে নেবে।’

    ‘আরে, সে তো রাজা কাটবে। ভগবান তো কাটবেন না,’ বৃদ্ধ হাসতে হাসতেই বললেন।

    কারিয়া কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। হঠাৎই উড়ুড্ডুর বউ মোনাকি বলে উঠল, ‘রাজাই তো ভগবান।’

    বৃদ্ধ যেন চমকে উঠলেন। তাকিয়ে রইলেন মোনাকির মুখের দিকে। খানিক পরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সত্যি কথাটা বড় সহজে বুঝে ফেলেছ গো মা। রাজার ক্ষমতাই ভগবানের ক্ষমতা। কাজেই রাজা না থাকলে ভগবানও নেই।’

    কারিয়া হতভম্বের মতো জড়ানো গলায় বলল, ‘ভগবান নেই? এ হতে পারে নাকি?’

    পাত্তা না দিয়ে বৃদ্ধ মোনাকির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ মা, তোমার বাচ্চাগুলা কি খুব দুরন্ত?’

    ‘আর বলবেন না বাবা, সামলাতে সামলাতে অতিষ্ঠ হয়ে যাই।’

    ‘তা, যখন নদীতে জল তুলতে যাও, তখন ওদের ছেড়ে যাও কী বলে?’ বৃদ্ধর গলা যেন ক্রমশঃ গাঢ় হয়ে আসছে।

    ‘ঐ বলি, ঘরের বাইরে বেরোলেই তে-জটা বুড়ি এসে ধরে নিয়ে যাবে।’

    বৃদ্ধের মুখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ‘শোনে?’

    মোনাকি আমতা–আমতা করে বলল, ‘শোনে বাবা। ঐ জন্যই তো ওদের দিনরাত তে-জটা বুড়ির নামে বানিয়ে বানিয়ে নানান গপ্পো শোনাই।’

    বৃদ্ধ হাততালি দিয়ে উঠলেন। বললেন, ‘ও মা, তুমি যে সাক্ষাৎ বামুনঠাকুর গো। তে-জটা বুড়ির গপ্পো শুনিয়ে কেমন ছেলেদের বশ করে রেখেছ। তা বলি, তে-জটা বুড়িকে দেখেছ কোনোদিন?’

    মোনাকি অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘দেখব… মানে, সে কি আদৌ আছে?’

    বৃদ্ধ যেন লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন। বললেন, ‘নাই তো। তোমার দরকারে তুমি তার গল্প বানিয়েছ, যাতে ছেলেরা তোমার কথা শোনে, ভয়ে। বামুন ঠাকুররাও অমনি ভগবানের গপ্পো ফেঁদেছে, যাতে তোমরাও তাঁর বশ থাকো।’

    নাথানি সঙ্গে সঙ্গে চড়া সুরে আপত্তি জানাল, ‘ভগমান নেই বললেই হবে? তালে এই যে পৃথিবী, এত মানুষজনা, গাছপালা, জন্তু–জানোয়ার, এসব বানালো কে?’

    বৃদ্ধের মুখটা আবার যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নাথানির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলি বিয়ে থা করেছিলে তো? সন্তানাদি আছে?’

    নাথানি ঘাড় নাড়ল। বৃদ্ধ মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন, ‘বলি হলো কী করে?’

    নাথানি লজ্জা পেয়ে গেল। মুখটা নিচু করে বলল, ‘আজ্ঞা, সব্বার যেমন করে হয়।’

    ‘আহা, বলো না শুনি।’

    ‘আজ্ঞা, ঐ আমার বৌয়ের সঙ্গে …’ নাথানির গলা লজ্জায় বুজে আসে।

    ‘কী আশ্চর্য! এই বললে, ভগবান মানুষ বানিয়েছেন। আবার এখন বলছ, নিজের সন্তান বানানোর জন্য বউ লাগে। কেন? ভগবান তো দিব্যি তোমার কাছে এসে বলতে পারতেন, এই নে, দুটো বাচ্চা দিলাম, পালগে যা।’

    নাথানি আমতা আমতা করে বলল, ‘আজ্ঞা, তা কি হয়? সে আপনি আমার থেকে ভালোই জানেন। জীবদেহের নিয়ম একটা আছে না!’

    বৃদ্ধ  হো হো করে হেসে উঠলেন। নাথানির কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘জীবদেহ কেন, গোটা বিশ্বের একটা নিয়ম আছে। সেই নিয়ম কেউ ভাঙতে পারে না। তোমার সন্তান যদি তুমি আর তোমার বৌ মিলে জন্ম দিয়ে থাকো, তাহলে যে কোনও মানুষের বাচ্চার জন্মই সেইভাবেই হয়েছে। তার জন্য কোনও ভগবানের দরকার পড়েনি।’

    সবাই চুপ। মানুষটা যে এমন কথাই বলেন, সব্বাই জানে। সাধে কি আর রাজা আর ব্রাহ্মণরা দেখতে পারে না! খানিক পরে আবার বললেন, ‘আর যদি ভগবানই আমাদের জন্ম দিয়ে থাকেন, তাহলে আমরা সবাই তাঁর ছেলেমেয়ে। তাহলে আমাদের একেকজনের অবস্থা এত আলাদা আলাদা কেন? কেউ না খেয়ে মরছে, আর কারুর ঘরে খাবার যাচ্ছে ফেলা?’

    থুড়থুড়ি বুড়ি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবারে হঠাৎ বিজ্ঞের মতো কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল, ‘কিছু একটা কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। সব্বার কপাল কি আর এক হতে পারে?’

    বৃদ্ধ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘তা কি আর হতে পারে! হ্যাঁ গো, তোমাদের পিছনে ওটা কী গাছ?’

    নাথানি মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখেই উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, আমগাছ।’

    ‘তাই নাকি! ওর একটা ডাল ভেঙে আনো তো। আর শোনো, ওর পাশেই একটা জামরুল গাছ আছে না। সেটারও একটা ডাল ভেঙে এনো। দুটোই যেন মোটামুটি একই মাপের হয়।’

    কথামতো হাতদুই লম্বা একটা আমগাছের ডাল আর একটা জামরুলের ডাল চলে এল। সবাই উদ্গ্রীব হয়ে দেখছে কী হয়। বৃদ্ধ মাথা তুলে বললেন, ‘দুজন জোয়ান ছেলে এগিয়ে এসো তো।’

    পরম আর কৃত্তিক, দুই বন্ধু এগিয়ে এল। শক্তপোক্ত পাকানো চেহারা। ওদের দেখে বৃদ্ধ যেন খুশিই হলেন। বললেন, ‘বাবারা, তোমরা একেকজন একেকটা করে ডাল নাও। আর মাঝখান বরাবর ভেঙে ফেলো।’

    এই সামান্য কাজ! পরম আর কৃত্তিক মুহূর্তে সেরে ফেলে বলল, ‘এরপর?’

    বৃদ্ধ হাসিহাসি মুখে বললেন, ‘একটা করে টুকরো রেখে বাকিটা ফেলে দাও। ফেলেছ? এরপর নিজেদের মধ্যে বদলাবদলি করে নাও।’ পরম আর কৃত্তিক হাতের ডাল দুটো বদলে নিল। ‘নাও, এবার আবার সেই মাঝখান বরাবর ভেঙে ফেলো।’

    আবার সেই একই খেলা। ভাঙা হলো, একটা করে টুকরো রেখে অন্যটা ফেলে দেওয়া হলো, আর হাতের টুকরোদুটো নিজেদের হাতে বদলাবদলি হলো। ‘এবার আবার ভাঙো’, বৃদ্ধ হাসিহাসি মুখে বললেন। পাঁচবার এমন ভাঙার পর হাতের টুকরোগুলো এতটাই ছোট হয়ে গেল যে আর ভাঙবার জো নেই। বৃদ্ধ খানিকক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘তোমাদের কারুর কাছে কাস্তে আছে?’ আছে, প্রায় সবার কাছেই আছে। আসলে মাঠেই তো কাজ করছিল সবাই। ‘বাবা, তোমরা কাস্তে দিয়েই মাঝখান ববারর কেটে ফেলো।’

    চারবার কাটার পর হাতের টুকরোগুলো এতটাই ছোট হয়ে গেল যে কাস্তে বসানোও সম্ভব নয়। বৃদ্ধ যেন হতাশ হলেন। বললেন, ‘তাহলে আর কী করা যাবে! হ্যাঁ বাবা পরম, তোমার হাতে একদম প্রথমে যেন কোন গাছের ডাল ছিল?’

    ‘আজ্ঞে আমগাছ।’

    ‘বেশ বেশ। তা এখন কোন গাছের ডাল রয়েছে?’

    পরম বোকার মতো নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ তাড়া দিলেন, ‘কী হলো? বলো!’

    পরম মিনমিন করে জবাব দিল, ‘আজ্ঞে, বুঝতে পারছি না তো। এত ছোট।’

    বৃদ্ধ হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘তাহলে বুঝলে তো, যদি এইভাবেই ভাঙতে ভাঙতে যাও, তাহলে একটা সময়ের পরে দেখবে সবাই এক। তাহলে আলাদা করলো কে? কিসের নিরিখে?’

    সবাই চুপ। চোখের সামনে যেটা ঘটল, সেটা তো সত্যিই ভাবিয়ে তোলার মতো। বৃদ্ধ আবার বললেন, ‘কী হলো? কেউ কিছু বলো?’

    নাথানি বুড়ো হাতজোড় করে বলল, ‘আপনিই বলুন বাবা।’

    বৃদ্ধ আচমকা গম্ভীর হয়ে গেলেন। চোখ বন্ধ হয়ে এল তাঁর। সেইভাবেই বললেন, ‘আমরা চোখের সামনে যা যা দেখি, তার সবকিছুই আদতে একই জিনিস দিয়ে তৈরি। তাকে বলতে পারো পুদ্গল। পুদ্গল এতই ছোট যে চোখে দেখা যায় না। এমন লক্ষ লক্ষ পুদ্গল মিলিয়েই একেকটা বড় বড় জিনিস তৈরি হয়েছে। কত পুদ্গল মিলেছে, আর কিভাবে মিলেছে, তার উপর দাঁড়িয়েই তাদের চেহারা আলাদা হয়ে যায়।’

    উড়ুড্ডু অবাক হয়ে বলল, ‘তার মানে বাবা, বামুনঠাকুর, রাজা আর আমি, আমাদের সবারই পুদ্গল এক?’

    বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, ‘ঠিক বলেছ।’

    ‘তাহলে বাবা, আমরা আলাদা কেন?’

    ‘তোমরা আলাদা থাকতে দিচ্ছ, তাই তাঁরা আলাদা। যদি জোর করে মিলিয়ে নিতে চাও, তাহলেই দেখবে সব্বাই সমান।’

    মান্দাবুড়ি চিৎকার করে উঠল, ‘এইজন্যই বাবা আপনাকে ওরা কেউ সহ্য করতে পারে না। আপনি তো বলেই খালাস, দেবক ঠাকুর আর আমি সমান। সে মানবে কেন? তাহলে তো তাঁর সম্পত্তি আমারও হয়ে যাবে।’

    বৃদ্ধ হো হো করে হেসে উঠলেন। মান্দার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের বোঝানোর জন্য কোনও বুদ্ধ বা জিনের দরকার নেই। তোমরা যদি বুঝতে চাও, নিজেরাই সব বুঝে ফেলবে।’

    নাথানি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা, শুনেছি বুদ্ধ আর জিনও নাকি বামুনদের পছন্দ করেন না?’

    বৃদ্ধ প্রবল জোরে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘পছন্দ করার আর দরকার কী? তাঁরা নিজেরাই তো বামুন হয়ে গিয়েছেন। সব রাজা আর শ্রেষ্ঠীরা তাঁদের সামনে গড়াগড়ি যায়। আসলে দুজনাই তো রাজবংশের সন্তান। সেটা আর মাথা থেকে গেলই না।’

    পওবল মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, ‘আপনিও তো নিশ্চয়ই বামুনঘরের বাচ্চা। তাহলে আপনার মাথায় এসব ঢুকল কী করে?’

    বৃদ্ধ আচমকা নীরব হয়ে গেলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ভিতরে ভিতরে খুব ধাক্কা খেয়েছেন তিনি। পওবল তাই ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘মাপ করবেন বাবা।’

    বৃদ্ধ মাথা তুললেন। ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘আমার বাপ ছিলেন মাঙ্খা, গ্রামে গ্রামে দেবতার গান গেয়ে বেড়ানোই ছিল তাঁর কাজ। সেইজন্যই আমার নামটাও হয়েছে মাঙ্খালি। আমার জন্মের সময় মাকে নিয়ে তিনি ছিলেন শরবন গ্রামে, গঙ্গার উত্তর পাড়ে। প্রসবব্যথা উঠেছে মায়ের। অথচ মাথা গোঁজার মতো একটা চালাও ছিল না তাঁদের। বাবা তাই মাকে নিয়ে উঠলেন কার একটা গোয়ালে। সেখানেই জন্ম আমার। তাই নিজের নামের সঙ্গে গোসাল যোগ করে নিয়েছি আমি। বলো দেখি, গোয়ালে জন্ম হয় যার, সে কি আর বামুন আর রাজাদের গোত্রের হতে পারে?’

    সবাই অবাক। এ তো তাদের নিজেদের ঘরের ঘটনা। এমন কত শিশুই তো চলে আসে, গোয়াল কিংবা গাছের তলায়। এ মানুষ তো তাহলে তাদেরই ঘরের লোক। চান্দাবুড়ি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। হাতজোড় করে বলল, ‘বাবা, তোমার মাকে তো চোখে দেখিনি আমি। তবু তাঁকে নমস্কার জানাই। বড় কপাল করে এসেছিল গো। নইলে এমন ছেলে জোটে কপালে!’

    বৃদ্ধ স্মিতমুখে বললেন, ‘তুমিও তো আমার মা গো।’

    বুড়ির চোখ যেন ঝাপসা হয়ে এল। গোটা শরীর যেন তার থরথর করে কাঁপছে। খানিক পরে ধরা গলায় বলল, ‘আমার বড় ছেলেটা বানের জলে ভেসে গিয়েছিল জন্মের পরে পরেই। তোকেই আমার বড় ছেলে করে নিলাম বাছা।’

    বৃদ্ধ উঠে পড়লেন। দাঁড়ালেন চান্দাবুড়ির সামনে। খানিকক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ বুড়ির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বলে উঠলেন, ‘মা, মাগো।’ বুড়ির দুই চোখে যেন  সেই বন্যার জল ঝাঁপিয়ে এল। দুই হাতে বৃদ্ধের মুখটা ধরে চুমু দিল তাঁর কপালে। কান্নায় ভেসে যেতে যেতে বলল, ‘ভালো থাক বাছা। মায়ের আশীর্বাদ রইল তোর সঙ্গে।’

    মেয়েরা হাপুস নয়নে কাঁদছে। ছেলেরা চুপ। এমন যে ঘটবে, কে জানত! এদিকে রাত বেড়ে যাচ্ছে। ঘরে তো ফিরতেই হবে। কিন্তু মানুষটার কী ব্যবস্থা হবে? নাথানিবুড়ো তাই বলে উঠল, ‘বাবা আজ থেকে আমাদের গ্রামের ছেলে। তাঁর খাবারের আয়োজন করতে হবে তো।’

    চান্দাবুড়ি লাফ দিয়ে এগিয়ে এল সামনে। বলল, ‘বলি ওর মা কি মরে গেছে নাকি যে তোমাদের উদযোগ করতে হবে? চল বাবা, ঘরে চল। মায়ে–পোয়ে যা পারি চাড্ডি খেয়ে নিই। একটু জিরিয়ে নে। কম ধকল গেল নাকি তোর?’

    বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘তুমি এগোও মা, আমি একটু পরে যাচ্ছি।’

    ‘আবার কী করবি?’ বুড়ি বাধা দিয়ে বলল।

    ‘আমার তো গুরুর মন্ত্র পড়তে হবে।’

    ‘ও বাবা, এই না তুই বললি ভগবান বলে কিছু নেই!’ বুড়ি অবাক হয়ে গেল।

    ‘কে বলল নেই?’ বৃদ্ধ মুচকি হাসেন। ‘এই যে আমার ভগবানরা আমার সামনে সব্বাই দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মঙ্গলের জন্য একা একা কিছু মন্তর পড়তে হয় তো।’

    বুড়ির তবু সন্দেহ যায় না। ‘আমি নয় থাকি। নাহলে তুই ঘর চিনে যাবি কী করে?’

    বৃদ্ধ হা হা করে হেসে উঠলেন। তারপর বুড়ির দুই হাত ধরে বললেন, ‘তোমার পেটে যখন সিঁধিয়ে ছিলাম, তখন সেই ঠিকানা জেনেছিলাম কোত্থেকে? সেইভাবেই পৌঁছে যাব। যাও, ঘরে গিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করো। আমি আসছি।’

    শেষ লোকটাও চলে গেল। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। গতকাল অমাবস্যা ছিল। প্রতিপদের চাঁদ যেন চোখেই পড়ছে না, এতটাই ক্ষীণ। লক্ষ লক্ষ তারা আকাশের বুকে যেন পিদিম জ্বালিয়ে আলপনা এঁকে রেখেছে। বৃদ্ধ উঠে পড়লেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন –

    ‘শুন হে বিশ্বের মনুষ্যপুত্তা

    সত্য শুধু তুমি, তুমিই দিব্য সত্তা।’

    বৃদ্ধ একবার তাকালেন গ্রামের দিকে। না, মায়া কোনও কাজের কথা নয়। যদি চাইতেন, তাহলে অন্যত্রও এমন গুছিয়ে বসতে পারতেন। তিনি তো আর সিদ্ধাত্থ বা বদ্ধমানের মতো রাজকুলোদ্ভব নন যে ভদ্দাসন চাই তাঁর। তিনি পথের মানুষ, পথেই তাঁর আশ্রয়। দুই হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন তিনি। বিড়বিড় করে বললেন, ‘মা গো, মার্জনা কোরো।’

    সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটতে শুরু করলেন কুশি নদীর দিকে। যত তাড়াতাড়ি পারেন কঙ্কর গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যেতে হবে তাঁকে। রাজার চর যদি সন্ধান পায় কোনও ঘরে ঠাই দিয়েছিল তাঁকে, রাজশাস্তি নেমে আসবে নির্ঘাত। না, নিজের জন্য কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায় না।

    নদীর তীরের অন্ধকারে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে তাঁর শরীর। আবার পথের আবহেই নিজেকে মিশিয়ে নিচ্ছেন মাঙ্খালি গোসাল, আজীবক দর্শনের প্রবাদপুরুষ, ব্রাহ্মণরা তো বটেই, যার শাণিত যুক্তিকে ভয় পান স্বয়ং বুদ্ধদেব আর মহাবীর জিন।

    চিত্রকর: মৃণাল শীল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More