শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

মাঝি

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

পুব পাড়ে দাঁড়িয়ে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে যদি তাকাও, তাহলে দেখতে পাবে বাড়িটি। বাঁশঝাড়ের পেছনে খড়ের ছাউনি মাটির দু-চালা। বাড়ির সামনে একটি ঝাঁকড়া কুলগাছ। সরকাঠির বেড়া দেওয়া এক চিলতে উঠোন। ভেতরে কলতলা। হাওয়ার ঝাপটায় শুকনো বাঁশপাতা ছুরির মতো ঘুরতে ঘুরতে উঠোনে গা এলিয়ে দেয়। প্রতিদিন ঝাঁট পড়ে। কলতলা লাগোয়া রান্নাশাল। গোয়াল। দু’টো বাছুর বাঁধা থাকে। রান্নাশালের চালে সাদা ধোঁয়া ওঠে। কোনওদিন শুনতে পাবে রেডিওর চড়া সুরে ভাটিয়ালি গান।

পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। এই ফাল্গুনে দামোদর শুখা, ধু ধু বালি। শুধু সরু একটি স্রোত এঁকেবেঁকে কোমর দুলিয়ে ওই দূরে বাজিতপুরে ঢোকার মুখেই আড়াল হয়েছে। নদীর পাড়ে গোরু-মোষের গাড়ি দাঁড় করানো। সরষের বোঝা তোলা হচ্ছে। কোথাও বা মুনিশজন আলু তুলতে লেগেছে।

ছামু মিঞা বেড়ার ভেতর ঢুকে উঠোনে পা রাখতেই বউ কুলসুরা ঝাঁঝিয়ে উঠল, সকাল থেকি কুথায় বেরনো হয়েছিল শুনি? খাবার সুময় হলিই হাজির হল! এসো ভাত রেঁধে রেখে দিইছি!

ছামু মিঞা মুখে কোনও কথা বলল না। জানে আগুনের ওপর ঘি ঢাললেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠবে। তাই কলতলায় হাতে মুখে পানি দিয়ে সুর সুর করে ঘরের দাওয়ার ওপর ফুঁ দিয়ে বসল। ছামু মিঞাকে কোনও জবাব দিতে না দেখে কুলসুরার পিত্তি আরও ক্ষরে গেল।

– গ্যাঁট হয়ি বসে আছে দেখো!বলি কথাটা কি কানে যায়নি। কাদা ভরা আছে?

কাঁধ থেকে গামছা তুলে মুখ মুছতে মুছতে ছামু বলে, এত ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে চিল্লাস কেনে! কী বলতে চাইছিস বলদিনি?

– কি বলতে চাইছি বুঝো না? সারাদিন ফকিরের মতো টো টো করি ঘুরি বেড়াচ্ছ, নৌকার কাজটা যদি না করবে, তাইলে অন্য কাজ ধান্দা দেখো। যাদের খেত নাই, তারা কি বসি বসি হাওয়া খাচ্ছে? মাঠ পানে এখন কত কাজ! আলু তুলো, সরষে কাটো। ঘরে টাকাও আসবে, খাবার আলুও হবে। তা না! মুনিশ খাটলে উনার সম্মান চলি যাবে!

– ছোটলোকের বেটি, তুই কী বুঝবি বলদিনি! ম্যালা বকিস না কানের কাছে। শেষমেশ লোকের মুনিশ খাটব!

– হা দেখ-অ। বাপ তুলি কথা বল না বলি দিচ্ছি! আমার বাপ ছোটলোক? বাপ-ভাইরা পাশে না থাকলি ভেবিয়ে মরতি হত তোমায়।

ঘরের খাবার আলু এমনিতেই কিনতে হয় না ছামু মিঞাকে। ছোট ছেলেটা কুড়িয়ে আনে। বড়টা মামার বাড়িতে থাকে। মামারা ইস্কুলে ভর্তি করেছে, টিউশন দিয়েছে। ছোট ছেলেটার মাথা মোটা। পড়াশোনা করতে চায় না মোটেই। পাড়ার ছেলেপুলের সাথে সাথ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এখন মাঠময় আলুর ছড়াছড়ি। একচাষ দুইচাষ দিয়ে চাষিরা খেত থেকে আলু তুলে নেবার পরও খুরপি দিয়ে মাটি আঁচড়ালে তাজা আলু বেরিয়ে পড়ে। ছোটটা এইসময় কুড়িয়ে কাড়িয়ে ঘরের কোণায় জড়ো করে। তাতে ওপরে ওপরে ধমকধামক দিলেও কুলসুরা বিবিই বলো আর ছামু মিঞায় বলো খুশি কি হয় না!

বেগমপুরের ঘাট থেকে এইমাত্র ফিরে এল ছামু মিঞা। এই পরিবেশে কুলসুরাকে কথাটা বলার সাহসে কুলোয় না। একটু ভেঙে ফুটে না বললে ছামু মিঞা কী ধরনের লোক বোঝানো মুশকিল।

ছামু মিঞার দাদো দিলজান মিঞা ছিল বেগমপুরের ঘাটের মাঝি। আগে দামোদর এত শুখা ছিল না। পানিতে টইটুম্বুর হয়ে থাকত। বর্ষায় দু’কূল ছাপিয়ে বন্যা আসত। কত ঘর-বাড়ি নদীর পেটে চলে গেছে। ভেসে যেত গোরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, গাছপালা, মানুষজন। দুঃখের নদ! তারপর গ্রামগুলোকে রক্ষা করার জন্য গভর্মেন্ট থেকে বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু হল। আশপাশের গ্রামের মানুষ ঝুড়ি কোদাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাঁধ তো হল, কিন্তু  সেই দুঃখের নদীই রয়ে গেল। এখন পানির দুঃখ। দিনকে দিন নদীটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। আগের মতো সেই স্রোত আর নেই। না আছে তাণ্ডব। গ্রামে গ্রামে হলবল করে ঢুকে পড়েছে ক্যানেল। নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে সেই পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাঠে। এখন দুইবার ধানচাষ হচ্ছে এই এলাকায়।

দিলজান মিঞার ইন্তেকালের পর ঘাট পারাপার করতে থাকে ছামু মিঞার বাপ জামিল মিঞা। নদীর এপার ওপার দুই জেলা। মানুষকে নদী পেরতেই হয়। ঘরে টাকাপয়সা, তরিতরকারির কোনও অভাব ছিল না। ছেলেবেলায় ছামু মিঞার নিজের চোখে দেখা, প্রতি শুক্রবার ওপারে রনডিহার হাট থেকে ফেরার পথে এপারের হাটুরেরা পাওনা মিটিয়েও নৌকার খোলে বেগুনটা, ঢ্যাঁড়শটা ফেলে দিয়ে বলত, খুশি মনে দিলাম হে। খোকার মাকে দিও।

জামিল মিঞা আসমানের পানে চেয়ে দু’হাত ওপরে তুলে বলত, সবই খোদার ইচ্ছা। তেনার রহমতে খাওয়া পরার কোনও অভাব নাই। জানি না কতদিন এই কাজ করতি পারব!

রান্না হয়ে গেলে বাপের জন্য ভাত-তরকারি গামছায় বেঁধে দিত মা। ছোট্ট ছামু গুট গুট করে ঘাটে যেত। যেদিন ছামুর ইস্কুল থাকত, সেদিন মাথায় ঘোমটা টেনে মা ভাত নিয়ে যেত। ছামুর সঙ্গে পথ চলতি মানুষজন মশকরা করত, আরে মিঞার পোলা মিঞা। তুমি বড় হলি কী হবা?

ছামু বলত, আমি আব্বার মতো মাঝি হব। নৌকা চালাব।

ছামুর কথা শুনে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসত। –আরে মাঝি হবা, না গোরু চরাবা? ইস্কুল যাবা না?

ইস্কুল যেতে মোটেই ভাল লাগত না ছামুর। বাপ তাকে নৌকায় চাপিয়ে ঘুরাত। নদীর মতিগতি বোঝাত। খোলা আসমানের নীচে ছোট্ট ছামু নৌকায় ভাসতে ভাসতে যে মুক্তির আনন্দ খুঁজে পেয়েছিল, সেই নেশাতেই এখনও ঘর সংসারে মন দিতে পারল না। বাপের মরা মুখটা মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়, চোখগুলো ছলছল করে ওঠে।

তখন এতসব নিয়ম কানুন ছিল না। এখন ঘাট পারাপার করতে গেলে বর্ধমানের অফিসে পারমিশন করিয়ে আনতে হয়। ঘাটগুলো সরকারি খাতায় নথিভুক্ত আছে। সবার ছাড়পত্র নেই। অফিসে ঘাটের ডাক তোলা হয়। দু’বছরের তিনবছরের চুক্তিতে মোটা টাকার ডাক ওঠে। ছামু মিঞার সাধ্যে কুলোয়নি। বাপের নৌকাটা নিয়ে তাও কিছুদিন চালিয়েছিল। কিন্তু যে ঘাটটা ডাক নেয়, সে বাধা দিয়েছিল, ট্যাকা গুলো কি গাছের পাতা? পাগলের মতো কারবার করো কেন মিঞা?

ছামু মিঞার তখন যুবক বয়স। রক্তে তেজ ছিল খুব কিন্তু সরল সত্যটা মানতে বাধ্য হয়। বাপ বেঁচে থাকলে ঘাটটা অন্য কারও হাতে যেত না। এখন প্রতি বছর ডাক নিচ্ছে নবীনগঞ্জের ধলাচাঁদ। কারবার চালাতে চালাতে লাভের টাকায় মোটর বসানো নৌকা কিনেছে। ভটভট্টি নৌকা। দাঁড় ঠেলতেও হয় না। এক-দুদিন নদীর ধারে গাছের তলে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরায় ছামু মিঞা। নদীর পানে চেয়ে দেখে কালো ধোঁয়া ওগরাতে ওগরাতে চোখের নিমেষে ধলাচাঁদের ভটভট্টি নৌকা ওপারে যাত্রী নিয়ে চলে যায়। কোনওদিন ঘাটের কাছে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে। তা দেখে পুরনো যাত্রীরা কেউ কেউ আফসোস করে বলে, কী গো ছামু ভাই, রোদের মধ্যি দাঁড়িন আছো যে? কাজকাম কিছু নাই আজ?

ছামু মিঞা কোনও জবাব দেয় না। যাত্রীদের যাওয়া আসা দেখেও কত সুখ! মন ভালো থাকলে কোনোদিন বলে, অচল মানুষের কোনও দাম নাই গো!

বর্ষায় ভরা নদী। নদী তখন পোয়াতি। গা ভারী। লদপদ করে চলে। এখন ওপারে যাওয়া বলতে বালির ওপর হেঁটে হেঁটে, সাইকেল ঠেলে, বউরা ছেলে কাঁকালে ঘাটে আসে নৌকা ধরতে। খুব চওড়া স্রোত নয়। কিন্তু খাল অনেক! কবে যে নদীর এদিকটায় দহ পড়েছিল, তা ছামু মিঞার মালুম হয় না। বর্ষায় যত পানি সব এখানে পাক ঘোরে। পানিটা ঘুরতে ঘুরতে তলা দিয়ে সেঁধিয়ে গেছে। হেঁটে পেরনো খুব বিপদ! অনেকের প্রাণ গেছে।

সেদিন ঘাটের কাছে বাঁধানো বটের তলে অনেকক্ষণ বসেছিল ছামু। শানের ওপর ঠ্যাং ঝুলিয়ে নদীর পানে চেয়ে। কবে যে বর্ষা আসবে, আর সে বাপের ডিঙি নিয়ে মাছ ধরবে নদীতে তারই হিসেব নিকেশ চলছিল মনে মনে। এই সময়টায় ছামু মিঞা একেবারে অচল। হঠাৎ যাত্রীদের নামিয়ে ধলাচাঁদ কাছে এসে দাঁড়াল। আবার যাত্রী জমলে তবে ওপারে যাবে। নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে ছামু মিঞার দিকে একটা বাড়িয়ে দিল ধলাচাঁদ। বলল, তুমাকে পেরায় দেখিছি ঘাটে এসে বসি থাকো। কাজের ব্যস্ততায় আলাপ করা হয়নি। কী কর ভাই? ঘরে কাজকাম নাই?

বিড়িতে টান দিয়ে ছামু বলে, পোড়া কপাল ভাই! না আছে নিজের খেত, না আছে..

– কও কী মিঞা! প্যাটটা চলে কীভাবে?

– আমরা পেট চালাবার কে ভাই! চালাবার মালিক আল্লা। বলে ছামু মিঞা ওপর পানে আঙুল তুলে দেখায়।

ধলাচাঁদ এমন উত্তরের আশা করেনি। আজান দিলেই নদীর পাড়ে গামছা পেতে, মাথায় টুপি চাপিয়ে রোজ নামাজ পড়ে সে। কোনোদিন নামাজ কাজ্বা করে না। ছামু মিঞার মুখে দাড়ি না দেখে খুব হতাশ হল। বলল, শুধু আল্লাহ আল্লাহ করলিই আল্লাহ খাইয়ে দিবেনি ভাই। আল্লাহতালা খাটার জন্যি দুটো হাত, দুটো পা দিয়ে ইনসানকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছে। বসে থাকলি কিছুই হবেনি।

ছামু মিঞা বুঝতে পারে না সে কী ভুল বলেছে। তাই আমতা আমতা করে বলে, বাপের ডিঙিটা আছে এখনও। বর্ষায় নদীতে খেপ জাল দিয়ে মাছ ধরি। আমাদের গাঁয়ের দক্ষিণে যে দহ আছে, সেখানেই বাঁধা থাকে। বারোমাস তো পানি নাই ভাই। তাও চেষ্টা করি। আর বউ ঠোঙা বানায়।

শেষের কথাটা ছামু মিঞার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ল। গ্রামের মানুষই জানে না সে কথা। মুসলমানের মেয়ে রোজগার করে সংসার চালায়, শুনলে ঢি ঢি পড়ে যাবে। ছামু মিঞা পুরনো পেপার, আঠা এনে দেয় কুলসুরাকে। অবসর সময়ে ঘরের ভেতর ঠোঙা বানায়। থলেতে ভরে বাজারে দিয়ে আসে ছামু। কয়েকটা দোকানদারের সাথে চুক্তি আছে। ছামু মিঞার কথা শুনে কেমন করুণার চোখে তাকাল ধলাচাঁদ। বলল, বুঝলাম ভাই। কষ্টের সংসার! তা একটা কাম করতি চাও?

হাওয়া ঢোকানো বেলুনের মতো বুকটা ফুলে উঠল ছামুর। নিজেকে একটু সংযত করে বলে, কী কাজ?

– সে তুমি পারবে। নৌকার হাল হকিয়ত তুমার জানা। তাই বললাম। বিড়িতে শেষ টান মেরে জুতোর তলায় পিষে ফেলল ধলাচাঁদ। –সত্যি কথা বলতে কী ভাই আমার ছেলেটা হয়িছে গাধার অধম। হাল ফ্যাশনের ছেলে, মাথায় টেরি কেটে, কানে তার গুঁজে ঘুরি বেড়ায়। ক্লাবে আড্ডা দেয়। বাপের সাথে যে একটু লেগে ভেগে সাহায্য করি, তা না! ঘোষেদের এক চ্যাংড়া ছেলে মাস ছয়েক ছিল। ছোড়া আমার বিয়ে করি আর নৌকায় আসতি চায় না। একলা মানুষ এত বড় নৌকা সামলানো যায়!

– সবই বুঝলাম, কিন্তু আমি তো ভটভট্টি নৌকা চালায়নি কখনও!

– তোমার বাপু ছোট ছেলের মতো কথাবার্তা। আরে ভাই, মানুষ কি ওপর থেকে কাজ শিখে আসে? শিখে নিতে হয়। নদীর মতিগতি তুমার জানা। তুমি পারবে। তবে এতগুলো টাকা ঢেলেছি তিনবছরের চুক্তিতে। কাজে কামায় করলি হবেনি কিন্তু। বেতনের কথা চিন্তা কর না।

– ঠিক আছে, আমি দু’চার দিনের মধ্যিই জানাব।

নৌকার যাত্রী নিয়ে ধলাচাঁদ ওপারে চলে গেলেও ছামু মিঞা অনেকক্ষণ বসে বসে দেখল নৌকাটাকে। নদীর এপাড়ে ধীবর পাড়া। বাকি সব পূর্ববাংলা থেকে উঠে আসা ছিন্নমূল মানুষদের বাস। ধীবরদের টালির, খড়ের, কাশের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট মাটির বাড়ি। আগে সবার প্রধান জীবিকা ছিল মাছ ধরা। এখন ধীবর পুরুষরা কাস্তে নিয়ে পুবে ধান কাটতে যায়। কেউ কেউ রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। বর্ষায় ঘরেই কাটায়। নদীর সঙ্গে বসবাস করতে করতে নদীকে বড়ই আপন করে নিয়েছে এরা। মায়া কাটাতে পারে না। এই ফাল্গুনে চালের ওপর পাকা কুল শুকোতে দিয়েছে ধীবর বউরা। বাঁশতলায় মেচের ওপর বসে একজন বুড়ো জাল বুনছে। নদীর ধার ঘেঁষে ছোট ছোট ডিঙি নৌকাগুলো সারি দিয়ে বাঁধা। নৌকাগুলোর দিকে চেয়ে ছামু মিঞা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ধলাচাঁদের নৌকায় কাজ করতে তার মন সায় দেয় না। জামিল মিঞার ছেলে হয়ে শেষে কিনা পরের নৌকায় কাজ করবে! না না এ বড়ই অপমান। তার থেকে আলু তুলা, সরষে কাটা অনেক ভালো।

বাড়িতে এসে কুলসুরাকে বলেছিল কাজটার কথা। কুলসুরা গদগদ হয়ে বলে, ভেবে দেখছি কী কথা গো! নিশ্চিত কথা বলি আসোনি?

ছামু মিঞা সুযোগ পেয়ে অন্য ফন্দি আঁটতে থাকে। বলে, এত খাটাখাটুনি করি কত বেতন দিবে জান? মাত্র দু’হাজার!

কথাটা বলে কুলসুরাকে একটু দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল ছামু মিঞা। কিন্তু অবস্থা উল্টো, মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল কুলসুরা, মাছ ধরি কত টাকা হয় শুনি? সারাবছর নদীতে মাছ লাফাচ্ছে! কাজটাই তবুও তো একটা ভরসা আছে। তুমার না নাওয়ের মাঝি হবার শখ!

নৌকার মাঝি হবার শখ ছোট থেকেই ছামু মিঞার আছে, কিন্তু সে নিজের নৌকার মাঝি। পরের নৌকার নয়। ভটভট্টি নাওয়ের মাঝি! এমন নাওয়ে লাথি মারি! –ছামু মিঞা বিড়বিড় করতে থাকে। মনের মধ্যে চলতে থাকে নানারকম টানাপোড়েন। দিন তিনেক ঘাটের দিকেই গেল না। দক্ষিণ ধারের দহে নিজের ডিঙির ওপর গামছা পেতে শুয়ে থেকেছে।

আজ বেগমপুরের ঘাট গেছিল ছামু মিঞা। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল বটের তলে। কিন্তু ধলাচাঁদের ভটভট্টি নৌকায় নতুন লোকটি কে? কোনওদিন তো দেখেনি ওকে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই ধলাচাঁদ নেমে পড়ল। কাঁধে ঝুলছে পয়সা রাখার ব্যাগ। প্রত্যেকের কাছে হিসেব করে পাওনা নিয়ে তবে রেহাই দিচ্ছে। ছামু মিঞাকে দেখেও না দেখার ভান করে কাজ করছে। এপারে আগে থেকেই বসেছিল কিছু যাত্রী। আগেরগুলো নেমে যাবার পর ওরা উঠে বসে। আজ হাটবার। কেউ ছাগল নিয়ে যাচ্ছে, কারও বেতের ঝাঁঝায় হাঁস-মুরগি। সব বেচাকেনা হয় হাটে। ছামু মিঞা ধলাচাঁদকে দেখা দেবার জন্যে আরও কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। একসময় নিজেই কথা বলে, কী গো ভাই, কামের লোক পেলে তাহলে।

–আরে যাও যাও মিঞা। টাকা ছড়ালি লোকের অভাব! কথার কোনো দাম নাই তুমার!

ছামু মিঞা আর তর্ক করে না। বুঝতে পারে না কার কথার দাম নেই। দুইদিন না পেরতেই লোক লাগিয়ে দিল! মনের ভেতরে এক চোরা স্রোত বয়ে যায়। আনন্দের না দুঃখের স্রোত বোঝা যায় না।

দাওয়ার ওপর বসে ছামু মিঞা কী যেন ভাবতে থাকে। একসময় কুলসুরা হেঁশেল থেকে ডাক পাড়ে, কই গো এসো। ভাত বেড়ে দিইছি।

ছামু মিঞা খেতে বসলে কুলসুরা বলে, ছোট খোকা সেই সকাল থেকি আলু কুড়োতে গেছে, এখনও ঘরে এলোনি কেন কে জানে! খেয়ে দেয়ে একবার মাঠ পানে যাও দিনি।

ছামু মিঞা ডহরের মাঠে এল। অনেক চাষী আলু তুলে নিয়েছে এ মাঠে। দু-তিন জায়গায় কাটা-পোরেন খাটিয়ে আলু ওজন করে ট্রাক্টরে লোড করা হচ্ছে। সোজা চলে যাবে হিমঘরে। বেশকিছু ছেলে থলে, ঝুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠে। পাড়ার নিয়ামতের ব্যাটাকে ছামু জিজ্ঞেস করে, আমাদের ছোট খোকাকে দেখলি বাপ? কুথায় বল দিনি?

–উ তো অনেকক্ষণ আগেই নদীর গাবা পানে গেছে।

ছামু মিঞার বুকটা ধড়াস করে উঠল। নদীর গাবা পানে! মানে দহ’র দিকে! লুঙিটা আরও ওপরে তুলে আচ্ছা করে সেঁটে নিল ছামু। গনগনে রোদ। তেজ দারুণ। যেন চোত-বোশেখ মাস পড়ে গেছে। নদীর ধারেই টিলার ওপর ঢ্যাঙা পলাশ গাছটায় যেন আগুন লেগেছে। বসন্তের ফুল। গামছাটা মাথায় চাপিয়ে নিল। একবার আসমানের ওপর পানে চাইলো। একটা চিল উড়ছে রকেটের মত। দহের কাছে আসতেই ছামু মিঞা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ছোট খোকা এক আজব খেল দেখাচ্ছে!

বাঁশের খুঁটি থেকে ডিঙি নৌকাটা খুলে, গোটা তিনেক ছোট ছেলেপুলে জোগাড় করে পানিতে ভাসিয়েছে। ছেলেগুলোকে নৌকায় বসিয়ে ছোট খোকা দাঁড়টাকে তুলে কুঁথিয়ে কুঁথিয়ে ঠেলছে, আর মুখ দিয়ে আওড়াচ্ছে রেডিওতে শোনা গানটা। হেঁইয়ো রে হেঁইয়ো, হেঁইয়ো রে হেঁইয়ো…

ছামু মিঞার মুখে কোনো কথা বেরল না। খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে চেয়ে সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। অবাক হয়ে চেয়ে দেখল, নৌকার চালক ছোট খোকা নয়, বাপ জামিল মিঞা দাঁড় ঠেলে যাত্রী বোঝাই নৌকাটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। না না, বাপ জামিল মিঞা নয়, ছামু মিঞার দাদো দিলজান মিঞা, নাকি তারও কোনও পূর্বপুরুষ!

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.