শনিবার, ডিসেম্বর ৭
TheWall
TheWall

পাকিস্তানে বসেও নাম তুলতে পারেন আধারে!

রোহন ইসলাম

অনলাইনে টাকা পাঠিয়ে উগ্র দক্ষিণপন্থায় বিশ্বাসী একটি খবরের সাইটের তিন বছরের গ্রাহক হয়েছিলেন তিনি। এই তিনি, কোনও সাধারণ ব্যক্তি নন। দেশের একজন উচ্চ পদস্থ আমলা। টেলিকম রেগুলেটরি সংস্থার (ট্রাই) বর্তমান মুখিয়া এবং প্রাক্তন আধার কর্তা— রামসেবক শর্মা। গ্রাহক হওয়ার একান্ত ব্যক্তিগত এই তথ্য অবশ্য তিনি নিজে কখনও জনসমক্ষে আনেননি। মাস খানেক আগে ট্যুইটারে তাঁর চ্যালেঞ্জের সূত্রে তথ্যটি সামনে এসেছিল। যদিও একজন সরকারি আমলার কোন দিকে রাজনৈতিক টান, এই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার মধ্যে নিজের কোনও ‘ক্ষতি’দেখেননি রামসেবক।

না, সত্যিই। ক্ষতিটা তাঁর নয়। এই তথ্যের প্রকাশে যদি কারও কোনও ক্ষতি হয়ে থাকে, সে এ দেশের গণতন্ত্রের। কারণ,রামসেবকের এতে আপত্তি না-ই থাকতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অ বন্দ্যোপাধ্যায় এমন ধরনের তথ্য ফাঁসে বিব্রত হবেন না। বা নিজের রাজনৈতিক পছন্দের কথা জানাতে কোনও আম নাগরিকের আপত্তি থাকবে না। অথচ ট্রাই কর্তার ‘ক্ষতি না হওয়ার’ এই দাম্ভিক ঘোষণা একটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে লঘু করে দিয়ে বলতে চায়— এমন তথ্য প্রকাশে কোনও নাগরিকেরই ‘ক্ষতি’ নেই। নিঃসন্দেহে জনমানসে এমন একটি বিপজ্জনক ধারণার বীজ বুনে দেওয়া, এ দেশের গণতন্ত্রের উপরে এক বড় আঘাত।

গত জুলাই মাসে রামসেবক যে রঙ্গটি রচনা করেছিলেন, তার জুড়ি মেলা ভার। নিজের আধার নম্বর প্রকাশ করে (আধার আইন অনুযায়ী যা আদতে দণ্ডনীয় অপরাধ) বোঝাতে চাইলেন, এমন কাজে কোনও ‘ক্ষতি’ নেই। তার পরে কী ঘটল? প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একে একে রামসেবকের একাধিক ফোন নম্বর ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য, জন্মের তারিখ, বাড়ির ঠিকানা, প্যান নম্বর, ভোটার আইডি, জিমেল ও ইয়াহু মেল আইডি, টেলিকম অপারেটর, মোবাইলের মডেল, বিমানযাত্রা সংক্রান্ত তথ্য জনতার দরবারে প্রকাশিত হল। এমনকী, কেউ কেউ আধার নির্ভর ইউপিআই দিয়ে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১ টাকা পাঠিয়ে হুঁশিয়ারিও দিলেন। ওই উগ্র দক্ষিণপন্থী ওয়েবসাইটে গ্রাহক হওয়ার তথ্যও ফাঁস হল। এক নেটিজেন আবার রামসেবকের ব্যক্তিগত সমস্ত তথ্য দিয়ে ভুয়ো আধার কার্ডের প্রতিলিপি বানিয়ে ফেললেন। তা ব্যবহার করে অ্যামাজনের মতো ই-কমার্স ওয়েবসাইটে রামসেবকের নামে প্রোফাইল খোলা থেকে তাঁর বাড়িতে দামি মোবাইল ফোন অর্ডার (অবশ্যই ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’!) দেওয়া—এক চূড়ান্ত তামাশার সাক্ষী থাকল গোটা দেশ।

এ সব তথ্যের কতটা ‘ফাঁস’ আর কতটাই বা আগে থাকতে জনপরিসরে মজুত ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকবে। কিন্তু এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এই গোটা পর্বে রামসেবকরা সুকৌশলে আধার-এর প্রেক্ষিতে নাগরিকদের ব্যক্তিপরিসরের গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রের অধিকারের সীমানা সংক্রান্ত ব্যাপক-প্রশ্নটিকেই গুরুত্বহীন করে দিতে চান। তার বদলে সেটাকে ‘হার্ম’ হওয়া বা না হওয়ার ছেলেমানুষি ডুয়েলে নামিয়ে আনেন। তাঁর দাবি, ‘ফাঁস’হওয়া তথ্য আগে থেকেই জনপরিসরে ছিল। তাই তাঁর কোনও ক্ষতি হয়নি। ধরে নিচ্ছি, রামসেবকের কাছে ‘ক্ষতি’র অর্থ, শারীরিক বা আর্থিক। সে দিক থেকে ঠিকই, এমন কোনও ক্ষতি রামসেবকের হয়নি। কিন্তু প্রশ্নটা হল, এই সব তথ্য বাইরে থাকবেই বা কেন? শুধু আধার কেন, আজকের এই ডিজিটাল যুগে এই সব তথ্যের জনপরিসরে থাকাটা কি যথেষ্ট ঝুঁকির নয়? এই ‘তথ্যে’র আধার-এর মতো ‘ইউনিক আইডেন্টিফায়ারে’র (যার সঙ্গে একাধিক ‘ডেটাবেস’জুড়ে রয়েছে) সঙ্গে ‘লিঙ্ক’ করে দেওয়াটা সেই ঝুঁকিটাকে তো আরও কয়েকগুণ বাড়িয়েই দেয়!

আপনি হয়তো বলবেন, ‘এত কী লুকনোর আছে বাবা’? আছে। আলবাত আছে। আপনার পড়শি তরুণীটি না-ই চাইতে পারেন, রামসেবকের মতো তাঁর মোবাইল নম্বরটি চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে যাক। একই আপত্তি থাকতে পারে সেই তরুণীটিরও, যাঁর ছবি রামসেবকের হোয়াটস্‌অ্যাপ ডিপি-র সূত্রে ছড়িয়ে গিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। আপনাকে এই আপত্তির অধিকার দিয়েছে স্বয়ং সংবিধান। অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট সুনিশ্চিত (প্রাইভেসি জাজমেন্ট) না করলে সেই অধিকারও কাড়তে বসেছিল কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকার!

আসলে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত এই রাষ্ট্র জনতাকে বোঝাতে চায়, ব্যক্তিগত তথ্যে একমাত্র তারই অধিকার। রাষ্ট্র কেবল নম্বরের ট্যাগ সেঁটে দায় সারবে। এই নাগরিক তথ্যই এখন ‘নিউ অয়েল’। তাই নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এখন রাষ্ট্রের চোখে, পড়ে পাওয়া ‘প্রাকৃতিক সম্পদ’। যার থেকে সে সব রকম ভাবে মুনাফা আদায় করতে উদগ্রীব। তার জেরে ‘এক’ ‘ব্যক্তিগত’ ‘আপনি’ শোষিতই হোন বা বঞ্চিত— রাষ্ট্রের কিচ্ছু যা-ই আসে না। সে তখন এক বানানো‘গ্রেটার গুড’-এর দোহাই পেড়ে ঝাড়খণ্ডের না খেতে পেয়ে মরে যাওয়া বালিকার থেকে চোখ ফেরাবেই। সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’কে কিছু ‘সংখ্যালঘু’র ‘এলিট বিলাসিতা’ বলে মনে করেনি। সে বরং রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছে— উল্টো দিকে একটা মানুষ থাকলেও, তাঁরও অবস্থান রক্ষার দায় এবং দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।

অথচ ব্যক্তিগত তথ্য বা গোপনীয়তা নিয়ে নাগরিকদের অত ভাবার প্রয়োজন নেই এবং এই তথ্য ফাঁস হলেও কোনও ক্ষতি নেই— এমনটাই প্রতিপন্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছেন রামসেবকরা। ঘটনা হল, ভর্তুকি-দুর্নীতি রুখতে‘আইডিয়া’ হিসেবে আধার চমৎকার। সেই আধার-এর ব্যবহারের পরিধি কতদূর অবধি টানা হবে, তা নিয়ে তর্কও থাকবে বিস্তর। কিন্তু কেউ যদি প্রথম থেকেই দাবি করতে শুরু করেন, আধার সম্পূর্ণ রূপে সুরক্ষিত, আধার-এর নানা মূলগত ও প্রযুক্তিগত ফাঁক নিয়ে বিশেষজ্ঞেরা প্রশ্ন তুললে, আধার কর্তৃপক্ষ জবাব এড়িয়ে কেবলই ‘ডিনায়াল মোডে’চলে যান— তখন নাগরিক হিসেবে সংশয় তৈরি হবেই। নাগরিক অধিকার রক্ষার ভার যাঁদের হাতে, সেই রামসেবকেরাই যখন ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’র প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করেন, সংশয় আরও বাড়ে বইকি আমাদের!

উদ্বেগ কয়েকগুণ বেড়ে যায় যখন দেখি, লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকার নিজেই স্বীকার করে নিয়েছে,২১০টি ওয়েবসাইট কোটি কোটি নাগরিকের আধার সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে ফেলেছে। এখনও পর্যন্ত একশোটিরও বেশি বড় আকারের আধার সংক্রান্ত দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। আমরা দেখেছি, যে কারও আধার তথ্য হাতে মিলতে পারে মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে। ই-কেওয়াইসি ব্যবহার করে গ্রাহকের অজান্তে এবং তাঁর সম্মতি ছাড়াই অজস্র ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। গুজরাতের একটি ঘটনায় ধরা পড়েছে, রেশন ভর্তুকি পেতে ভুয়ো বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে একটি সমান্তরাল বায়োমেট্রিক ডেটাবেসই তৈরি করা ফেলেছিল একটি চক্র। এ দিকে, নথিভুক্তির পর্বে ভুল এন্ট্রির কারণে দেশের ২ কোটি নাগরিকের আধার তথ্য একে অপরের সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। এই ভুক্তভোগীরা আধার-নির্ভর কোনও পরিষেবা পাচ্ছেন না। আর এয়ারটেলের পেমেন্ট ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে আধার নির্ভর ই-কেওয়াইসি আধার কর্তৃপক্ষের বাতিল করার ঘটনা মনে আছে তো?
আধার নিয়ে সাম্প্রতিক কালে সব থেকে বড় বিপদ সামনে এনেছে ‘হাফিংটন পোস্ট’-এর একটি তদন্ত। তদন্তে উঠে এসেছে, একটি ‘সফট্‌ওয়্যার প্যাচ’ (যা বাজারে মাত্র আড়াই হাজার টাকায় মেলে) দিয়ে সহজেই আধার এনরোলমেন্টের সফট্‌ওয়্যারের বহু ‘সিকিউরিটি ফিচার’কে দুর্বল করে দিতে পারে। এই প্যাচ থাকলে আধার নথিভুক্ত এনরোলমেন্ট অপারেটরকে আর বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। ফলে ভুয়ো আধার এনরোলমেন্ট করে সহজেই অবৈধ আধার নম্বর তৈরি করা সম্ভব। এই প্যাচ এনরোলমেন্টের সফট্‌ওয়্যারের আইরিস-রেকগনিশনের ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম। তার ফলে নথিভুক্ত এনরোলমেন্ট অপারেটরের অনুপস্থিতিতে স্রেফ তার চোখের ছবি দিয়েই আধার এনরোলমেন্টের সফট্‌ওয়্যার বাইপাস করা যায়। আরও যে ভয়ঙ্কর কাজটি এই প্যাচ করে সেটি হল, এটি নিমেষে এনরোলমেন্টের সফট্‌ওয়্যারের জিপিএস সিকিউরিটি ফিচারকে অকেজো করে দিতে পারে। ফলে পাকিস্তানে বসেও যে কেউ আধার-এর জন্য নাম নথিভুক্ত করতে পারেন। তদন্তে ধরা পড়েছে, এই প্যাচ বাজারে ২০০৯ সালের পর থেকে সক্রিয়। আধার নথিভুক্তির হার বাড়াতে কেন্দ্র সরকার বেসরকারি সংস্থাগুলিকে দিয়ে এনরোলমেন্ট সেন্টার খুলেছিল। প্রতি এনরোলমেন্ট অনুযায়ী আয় করত সেই কেন্দ্রগুলি। ‘হাফিংটন পোস্ট’-এর অনুমান, আয় বাড়াতেই আধারকে ঘিরে ভুয়ো এনরোলমেন্টের এই চক্র সক্রিয় হয়েছিল। যাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ার প্রধান হাতিয়ার করেছে সরকার, সেই অস্ত্রই এমন আর কত দুর্নীতির জন্ম দেবে, এখন সেটাই দেখার।

যদিও স্বাভাবিক ভাবেই এত বড় দুর্নীতির কথা সামনে আসার পরেও যথারীতি ‘ডিনায়াল মোডে’ আধার কর্তৃপক্ষ। তাঁদের এই যাবতীয় অভিযোগ খণ্ডনের মাঝে একটা তথ্য আমাদের মনে রাখা দরকার, বছরখানেক আগেই কোনও এক ‘অজ্ঞাত’ কারণে দেশজুড়ে প্রায় ৩৯ হাজার বেসরকারি আধার এনরোলমেন্ট সেন্টারের সঙ্গে চুক্তি রদ করেছিলেন আধার কর্তৃপক্ষ। এবং বর্তমানে দেশে আর কোথাও-ই বেসরকারি সংস্থা আধার নথিভুক্তির কাজ করে না। কেন? দু’বার ভাবা দরকার।
আসলে কেমব্রিজ অ্যানালেটিকার এই যুগে একটি ইউনিক নম্বর দিয়ে রাষ্ট্র আপনার থেকে তার মতো করে সমস্ত তথ্য দাবি করে চলেছে। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে তার কাছে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিয়ে যেতে হচ্ছে। সেই রাষ্ট্র, যার কাছে কিনা নাগরিকের সামনে নিজেকে স্বচ্ছ প্রমাণ করার কোনও দায় নেই। উল্টে তার মতো করে তথ্য গুছিয়ে সে কখনও আধার-এর দ্বারা অর্থ সাশ্রয়ের দাবি করে। কখনও নোটবন্দি ও জিএসটি-র ‘সাফল্য’ নির্মাণ করে। বেপরোয়া (রাজনৈতিক পক্ষপাতে দুষ্ট?) আমলারা সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গোটা ‘প্রাইভেসি ন্যারেটিভ’টাকেই অপহরণ করে নিতে চান। আর আমরা কেবল তথ্য ফাঁসের খেলায় ময়দান গরম করি।

যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই, যে দেশের মানুষের প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগে কোনও আপত্তি নেই, রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে যে দেশের মাত্র ৩৩ শতাংশের (পিউ রিসার্চ সেন্টার সার্ভে ২০১৪) আপত্তি রয়েছে, যে দেশের মানুষের কাছে তথ্যের চুরি যাওয়ার থেকে দু’বেলা পেট ভরা নিয়ে দুশ্চিন্তা বেশি— সে দেশের নাগরিক-মনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পাঠ দেওয়া কোনও সহজ কাজ নয়। তবু আশার কথা, সুপ্রিম কোর্ট এখনও সংখ্যাগুরুর বদলে সাংবিধানিক নৈতিকতার স্বরকে জিইয়ে রাখায় বিশ্বাসী। আর কোথাও না হোক অন্তত তাদের চৌহদ্দিতেই রামসেবকদের বুঝিয়ে দেওয়া যাবে, তথ্যের এই খোলা বাজারে একটি বারো অঙ্কের নম্বরের চেয়ে ঢের বড় আস্ত মানুষটা।

লেখক ফলতা সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

দ্য ওয়ালের ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Comments are closed.