শনিবার, মার্চ ২৩

গল্প: মোতিয়া

রাজ্যশ্রী ঘোষ

সরু মেঠো পথটা বহু পুরনো। সে পথ ডাইনে বামুন পাড়া বাঁয়ে কৈবত্য পাড়া ফেলে একে একে ঘোষ পাড়া, বোস পাড়া, কুমোর পাড়া, বোষ্টম পাড়া হয়ে গ্রামের প্রান্তে মরা নদীটার কোলে এসে মিশেছে। নদীর অন্য পারে মাঝি পাড়া। এই নদী তার সরু সুতোর মত ক্ষীণ রেখায় মাঝি পাড়াকে আলাদা করেছে গ্রামের বাকি অংশের থেকে। মাঝি পাড়ার পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে দিগন্তবিস্তৃত কৃষিক্ষেত্র আর তারও পরে জলাজমি।

এখন অবশ্য সরকারি উদ্যোগে একদা মানুষের অগম্য সেই জলাজমিরও কিয়দংশের বুক চিরে বেরিয়ে গিয়েছে পাকা রাস্তা, যার পারিভাষিক নাম ‘বাইপাস্‌’। ঘন সবুজের মধ্যে বৃহৎ কালকেউটের মত চিকন পিঠ নিয়ে সে পড়ে থাকে আর তার উপর দিয়ে সশব্দে চলে যায় বর-কনের গাড়ি, পিকনিকের বাস, মালবাহী লরি, পুলিশের জিপ…

অধুনা-স্থবির নদীটাকে দেখে কেউ তার বয়সকালের গরিমা আন্দাজ-মাত্র করতে পারে না। কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে তারই উচ্ছল তরঙ্গ ভেঙে অতীতে একদিন স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের নৌকা পাড়ি দিয়েছিল নীলাচলের পথে আর বামুন-চাঁড়াল নির্বিশেষে সারা গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়েছিল নদীর দু কূল উপচে গোরাচাঁদ সন্দর্শনে। তারপর কতদিন ধরে এ নদী যুবতী বৈষ্ণবীর মত… কপালে রসকলি, হাতে একতারা, পায়ে মল… কীর্তনিয়া সুরে মুখরিত করে রেখেছিল গোটা গ্রামকে। সে সব কতদিনের কথা।

শীতে বা গ্রীষ্মে এ নদী এখন ঠা ঠা। কেউ পাত্তাটিও দেয় না। কেবল বর্ষায় তার কপালে জোটে মাঝি-পাড়ার শাপ-শাপান্ত। কারণ বর্ষা তার শরীরে এখন আর সেই গভীরতা তৈরি করে না যা মানুষকে গতি দিতে পারে, বরং বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখের মত হাঁটু পরিমান ঘোলা জল আর আঠালো কাদা মাঝি-পাড়ার দ্রুতচারী মানুষদের গতি রোধ করে।

অনেক কাল হল, মাঝি-পাড়ার পুরুষরা আর খেয়া বায় না। নদীর বহতা-ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পুরনো জীবিকাও লোপ পেয়েছে। পুরুষেরা এখন খেত-খামারে কাজ করে, সবজি ব্যবসা করে, কেউ বা মাছ বেচে পাড়া ঘুরে ঘুরে, কেউ কেউ অফিস-কাছারিও যায়। মেয়েরা ঘর সামলে ঠোঙা বানায়, ধূপ-কাঠি গড়ে… নয় তো দলবেঁধে ভোরের ট্রেনে শহরে যায় দশ বাড়ি ঝি খাটতে। মোটের ওপর সবাই ব্যস্ত। সবাই গতিশীল।

 

মাঝি পাড়ার মোতির মা আজ খর খর পা চালাচ্ছিল। ভোরের দিকে চোখটা একটু লেগে যাওয়ায় আজ তার সাড়ে সব্বোনাশ হয়ে গেছে। দলের সবাই এতক্ষণে কখন ইস্টিশানে। মালতীর মা বার বার ‘মিস্‌ কল’ দিচ্ছে মোবাইলে। পাঁচটা কুড়ির ট্রেনটা আজ সে পেলে হয়।

কল পুঁততে ভিন-গাঁয়ে গিয়ে ওর বর যখন নতুন সংসার পাতল, মেয়ে মোতির বয়স তখন তিন। সেই মেয়ে ট্যাঁকে, ট্রেন ঠেঙিয়ে শহরে বাড়ি বাড়ি কাজ করে সে তার ঘরটুনি দাঁড় করিয়েছে। সেদিনের একরত্তি মেয়ে মোতি এই তো গেল বোশেখে চোদ্দয় পড়ল।

রোজ ভোর থাকতে উঠে দুটো পান্তা খেয়ে মোতির মা কাজে বেরোয়। সে বেরিয়ে গেলে পর মোতি উঠে ঘরের বাসি কাজ সারে, জল-মুড়ি খায়। তারপর একটু বেলা হলে আগান-বাগান ঘুরে জ্বালানি কাঠ কুড়োয়, খাল ছেঁচে মাছ ধরে, কাঠের উনুনটা জ্বেলে মেটে হাঁড়িতে ভাত ফোটায়, জল তোলে, বাজার যায়, রেশন দোকানে লাইন দিয়ে চাল, গম, কেরাচিনি ধরে… মোতির কাজের অন্ত নেই। মোতি ইশকুল যায় না। কারণ মাস্টাররা বলেছে তার বুদ্ধি নাকি অত্যন্ত কম। যা পড়ানো হয় কিছুই সে মাথায় রাখতে পারে না। তার উপর মোতি আবার খোনা বলে সহপাঠী ছেলে-মেয়ে থেকে মাস্টার… যে পায় সেই ওকে খেপিয়ে মারে। এইসব কারণের জন্য মোতি বাড়িতেই থাকে।

ঘরের কাজ ফুরোলে মোতির হাতে অনন্ত সময়। তখন সে খেলতে বেরোয়। পরনে তার বিবর্ণ একখানা ঢাউস ফ্রক, যেটা প্রায়ই কাঁধ থেকে নেমে নেমে যায়। মোতির মায়ের কোনও কাজের বাড়িতে কোনও বড়-সড় কিশোরীর পোশাক হিসেবে বাতিল হলে সেটি মোতির কপালে শিকেয় ছিঁড়েছে। যদিও মোতির রোগা-পটকা, ছোট-খাটো শরীরে এসে পোশাকটি তার পূর্বতন হাঁটু-দৈর্ঘ্যের ফ্রকত্ব পরিহার করে গোড়ালি অবধি ঝুলের একটি আলখাল্লায় রূপান্তরিত হয়েছে।

মোতির খেলার সঙ্গীরা সকলেই বয়সে মোতির চেয়ে অনেক ছোট, তবু ওরা তাকে ভালোবাসে। কারণ খোনা হলেও কাটা ঘুড়ি লুটতে কী গাছের উঁচু ডালে উঠে আমটা, পেয়ারাটা পাড়তে মোতির জুড়ি নেই। কিন্তু এরাও তো পড়তে যায়, ইশকুলে যায়। তখন মোতি আবার একা। ফলে দিনের একটা সিংহভাগ সময় মোতিকে কাটাতে হয় কেবলমাত্র নিজেরই সঙ্গে।

এইসময় আপনমনে রাস্তা চলতে চলতে পুকুরের জলে পাতলা খোলামকুচি ছুঁড়ে সে ব্যাঙাচি করে… বৃষ্টি আসার ঠিক আগে কি থেমে যাওয়ার ঠিক পরে নাকটা একটু উঁচুতে উঠিয়ে বুক ভরে মাটির সোঁদা গন্ধ টেনে নেয়… দুই পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে জামরুল গাছের নিচু ডালে পাখির বাসায় উঁকি মারে…

এসব হয়ে গেলে পর কোনও কোনও দিন ভরদুপুরে সে তাদের রোদের আলপনা দেওয়া নিকোনো উঠোনটায় এসে দাঁড়ায়… কোনওদিন পড়ন্ত বিকেলে দক্ষিণ দহর পাড়ে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে… কখনও বা সন্ধ্যার মুখে নির্জন ঘোড়দৌড়ের মাঠে শুয়ে শুয়ে আকাশে তারা ফোটা দেখে…

তখন তার নাকে আসে ধুলোর গন্ধ… জলের গন্ধ… গাছপালার শরীরের গন্ধ… পাটে বসা সূর্যটার গন্ধ…

সে আবেশে চোখ বন্ধ করে নেয়।

অমনি সে শুনতে পায়, শিশির পড়ার শব্দ… গাছেদের পাতা পড়ার শব্দ… গুটি কেটে প্রজাপতির বেরিয়ে আসার শব্দ… তারা খসার শব্দ…

সে টের পায়, তার বন্ধ চোখের পাতা, তার সমস্ত শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে চাঁদের আলো… বহু দূর থেকে আসা সাগরে বাতাস তার গাল স্পর্শ করছে… খোলা মাঠে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা তার শরীরে বিঁধছে অজস্র ঘাস-শরীর…

তখন, সে ওইসব গন্ধের সঙ্গে এক হয়ে যায়…

ওইসব শব্দের সঙ্গে এক হয়ে যায়…

ওইসব স্পর্শের সঙ্গে এক হয়ে যায়…

তখন, তার আর আলাদা কোনও অস্তিত্ব থাকে না।

কী এক আনন্দের আবেশে তখন সে হাত দুটো শরীরের দুদিকে ছড়িয়ে, নিজের মেরুদন্ডকে অক্ষ করে ডান থেকে বাঁয়ে বন বন করে ঘুরতে থাকে…

‘আনি মানি জানিনা… কারওকে তো মানি না…

আনি মানি জানিনা…’

ঘুরতে ঘুরতে একসময় তার বোল বন্ধ হয়ে যায়। চোখের পাতা মুদে আসে। বেহুঁশের মত কেবল সে চক্করের পর চক্কর দিয়ে যায়।

কদাচিৎ, তার এই খেলা কারও চোখে পড়ে। তার বন্ধুরা দেখতে পেলে বলে, ‘এই মোতি আমাদেরও খেলতে নে’। কিন্তু মোতি তখন সাড়া দেয় না। পাড়ার কেউ দেখে ফেললে বলে যায়, ‘পাগলির কাণ্ড দেখো’!

 

একদিন, এক জানকার লোকের চোখে পড়ল মোতির এই কাণ্ড।

মোতির চোখ প্রায় বন্ধ, ডান হাত আকাশের দিকে খোলা, বাঁ হাতের তালু উপুড় মাটির দিকে। কাঁধবরাবর হেলে পড়েছে মাথা। ঘুরছে সে ডান থেকে বাঁয়ে আর ঘূর্ণি তুলে উড়ছে তার পরনের ঢাউস ফ্রক, তার চিকন খোলা চুল। যেন কোনও গভীর ধ্যানের ঘোরে চক্কোর দিচ্ছে সে। দিয়েই চলেছে…

কাঁধে ঝোলা, ভিতরে তার বাদ্যযন্ত্রখানা… লোকটা বুঝি দূরের কোনও মেলা, কি গানের আসর থেকে ফিরছিল। মনের মধ্যে তখনও তার আসরের গুঞ্জন,

মুর্শিদ  জানায় যারে
মর্ম  সেই জানিতে পায়
জেনে শুনে রাখে মনে
সে কি কারও কয়…

আশ্চর্য! কচুপাতা, বাঁশপাতায় মোড়া এই গণ্ডগ্রামটাকে চেনে সে হাতের তালুর মত। এখানে এই হাবাগোবা মেয়েটাকে আকাচাকা এমন জিনিস দিয়ে গেল কোন মুর্শিদ! সে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে মোতির ঘোর কাটা অবধি এবং সে প্রশ্ন করে,

-কোথায় শিখলি রে মোতি? কে শেখালে তোকে এইসব?

মোতি হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর উপর দিকে মুখ তুলে ঠোঁট উল্টে ইশারায় বলতে চায়,

-কে জানে!

জানকার লোকটি মোতির মুখভঙ্গি অনুসরণ করে বোবা চোখে উপর দিকে তাকায়। উপরে অনন্ত নীলাকাশ। সেই আকাশের আড়াল থেকে গ্রহ তারকারা অমনি জানকারকে বলে ওঠে,

-আমরা! আমরা ওকে শিখিয়েছি! এই যে আমরা নিজ নিজ অক্ষে আবর্তন করে চলেছি… দিন থেকে রাত… রাত থেকে দিন…

-দেখো! আমাদের অদৃশ্য এক হাত উন্মুক্ত ঊর্ধ্বে। তাই দিয়ে আমরা আনন্দ আনছি। আরেক হাত উন্মুক্ত অধঃতে। সেই হাতে আমরা আনন্দ বিতরণ করছি। সমস্ত চরাচর ভাসছে সে আনন্দে। আমরাই তো ওকে তালিম দিয়েছি এই নাচের!

মোতির ঝলমলে চোখ দুটো এবার মাটির দিকে নামে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমনিই ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে আঁকড়ি-বিকড়ি কাটছিল। জানকারের চোখ পড়ে যায় সেই মাটিতে। অমনি মাটির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণারা জানকারকে ডেকে ডেকে বলতে থাকে,

-আমরা! আমরা ওকে শিখিয়েছি এই নাচ!

-দেখো, দেখো! আমাদের পারমানবিক কণায় এই গতি! কেন্দ্রক ঘিরে কি বিপুল বেগে তারা নিজ নিজ অক্ষে অবিরাম ঘুরে চলেছে। তাদের অদৃশ্য এক হাত উন্মুক্ত ঊর্ধ্বে… অন্য হাত অধঃতে। এক হাতে তারা আনন্দ আনছে, অন্য হাতে ঢেলে দিচ্ছে উজাড় করে। তরল, কঠিন, বায়ব্য… যা যা দিয়ে এই পৃথিবী তৈরি, তাদের প্রত্যেকের শরীরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে সে আনন্দ! আরে! আমরাই তো ওকে হাতেখড়ি দিয়েছি গো, এই সাধনায়!

জানকার লোক তাজ্জব বনে যায়!

 

এভাবেই মোতি নাচে। বিশালকায় গ্রহ তারকার সঙ্গে… সূক্ষাতিসূক্ষ পারমানবিক কণাদের সঙ্গে মোতি নাচে। ওদের নাচের যে প্রচণ্ড গতি তা সে আয়ত্ত করতে পারে না ঠিকই, তবে তালের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।

 

এমনি সময়ে, মোতি যখন পাঁচটা লোকের মতই এমনি একজন লোক, বিলুর মা তখন হয়তো তাকে ফরমাশ করে- বাসনকটা এট্টু মেজে দে তো মোতি, ঘোষেদের বুড়ি ঠাকুমা হাঁকে- গোয়ালডা নিকিয়ে দিলে দশটা টাকা দোবো, হারান দাদু বলে- লাঠিটা খুঁজে দে না রে মা… ভুলন্ত মন… কোথা রাখতে কোথা রাখি…

মোতি ভারি উৎসাহে এইসব কাজ করে দেয়। পয়সার সে তোয়াক্কা করে না। বরং পরের এইসব ছোটখাটো কাজ করে সে কেমন যেন একটা মজা মজা পায়। এই মজাটাই যেন তার পারিশ্রমিক।

মাঝে মাঝে মোতির অবশ্য ঠিক উল্টো-রকম ভাব হয়। তখন তার কারও কথা শুনতে ইচ্ছে করে না… কোনও কাজ করতে ইচ্ছে করে না… এমনকি, খেলতেও ইচ্ছে করে না। সে তখন থুম মেরে নিজের মনের মধ্যে কোথাও একটা চুপটি করে বসে থাকে। মোতিকে যারা সবথেকে ভালো চেনে… আকাশ, মাটি, বন-বাদাড়… ওকে দেখে তারা ঠিক বুঝে যায়, এইবার শুরু হল বলে।

সেদিনও মোতির ঠিক এমনটাই হল। মা বেরিয়ে যাবার পর দুটো শুকনো মুড়ি খেয়ে সেও বেরিয়েছিল। কিন্তু খেলতে তার ইচ্ছে করল না। মাক্কা আর মাক্কার বোন সদ্য পাড়া কামরাঙা সাধল। কিন্তু মোতির তাও ভাল লাগল না। থুম মেরে তে-সতীনের চরে গিয়ে পড়ে রইল সে চৌপর দিন। শেষে হাতের উপর রোদের তাত আন্দাজে বুঝল এবার তাকে বাড়ি ফিরতে হবে… রান্না বসাতে হবে…। একেবারে ব্যাজার মনে মোতি বাড়ি ফিরল।

উঠোনে পা দিতেই সে দেখে এলাহি কাণ্ড! বসে বসে কাঠের উনুনে ভাত রাঁধছে তার মা! পাশের কলাপাতায় তোলা হয়েছে সদ্য ভাজা চিংড়ি মাছ। তাছাড়া কলাইয়ের সানকি থেকেও উঁকি মারছে আরো কি একটা তরকারি! মোতি আনন্দে লাফিয়ে পড়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। মায়ের আঁচলে কেমন একটা ভিজে ভিজে, ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ। এই গন্ধটা তার বড্ড প্রিয়।

আজ সকালে একটুর জন্য মোতির মায়ের ট্রেন ফেল হয়ে গেছে। কাজের বাড়িতে সেই দেরি হয়ে যাবে, মুখ খেতে হবে গিয়ে। তাছাড়া শরীরটাও কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। তাই আজ আর কাজে যেতে মন করেনি তার। ফেরার পথে একেবারে বাজার সেরে বাড়ি ফিরেছে সে।

 

মোতিরা সবে খেয়ে উঠছে, এমন সময় লাঠি ঠুক ঠুক করে তাদের বাড়ি ঢুকল নরুর দিদিমা। মোতির মাকে সে জানালো- ছেলের বাড়ি থেকে রাজি আছে। চাহিদাও এমন কিছু না। শুধু মেয়ের হাতে, কানে, গলায়… ছেলের ঘড়ি, আংটি, সাইকেল… অবিশ্যি ছেলের ডান পা’টা একটু খুঁতো… তা মেয়েও তো বাপু…

এইসব কথাবার্তায় কোনওরকম আগ্রহ খুঁজে না পেয়ে মোতি এক পা এক পা করে কেটে পড়ার তালে ছিল। কিন্তু দেখতে পেয়ে মা তাকে জোর করে ধরে পৈঠেতে বসিয়ে দিল।

-আজ থেকে তোর আদাড়ে বাদাড়ে টই টই বন্ধ মোতি। এত বড় হয়ে এখনও যদি এরমটা করিস, কোন ছেলেটা তোর বে করবে বল দিনি…

শুনে বাজ পড়ে মোতির মাথায়।

‘বে’! …বে মানে তো হারিয়ে যাওয়া!

এই গাঁ থেকে, এই পৈঠেটা থেকে, তে-সতীনের চর থেকে, দোলতলার মাঠটা থেকে… পুট করে একদিন হারিয়ে যাওয়া। যেমন হারিয়ে গেছে রাধু দিদি, গেনি দিদি, পারুল পিসি। অভিমানে বুক ভরে গেল তার। আপন মা তার এমন সব্বোনাশ কি করে করতে পারে গো!

দুই ভুরু যৎপরোনাস্তি কুঁচকে দুম দুম পা ফেলে ঘরে ঢুকে থুম মেরে বসে রইল সে।

নরুর দিদিমা চলে যাওয়ার পর মা ঘরে ঢুকে মোতিকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল। সে বোঝাতে চাইল তার বাপ ছেড়ে যাওয়ার পর কিভাবে কত কষ্ট করে মেয়েকে বড় করেছে সে। এখন বিয়ে দিয়ে মোতির একটা হিল্লে করতে না পারলে তার নিশ্চিন্দি নেই। নইলে সারাটা জীবন কে দেখবে মোতিকে? সে বোঝায়, সব মেয়েকেই একদিন বিয়ে করতে হয়… সংসার করতে হয়… নিজের ঘর ছেড়ে স্বামীর ঘরে যেতে হয়… যুগ যুগ ধরে এটাই নিয়ম।

মোতি মায়ের কথা কিচ্ছু বুঝতে পারল না। কিন্তু তার মনের মধ্যে কেবলই কু ডাকতে লাগল।

 

মাটির সংসারে নিত্যকার সুখ-দুঃখ, শঙ্কা-আনন্দের উপর দিয়ে দেখতে দেখতে আকাশ আলো করে ঝুলন পূর্ণিমা এসে গেল। এই মরশুমে মোতিদের গ্রামে একদম উৎসবের ধুম লেগে যায়। আজ সকাল থেকেই আকাশের সাজো সাজো রব। বেলা একটু গড়াতেই ঝম ঝম নিক্বণে শুরু হয়ে গেল বৃষ্টির নাচ।

উঁচু দাবায় তোলা-উনুনে ভাতের টগবগানি দেখতে দেখতে মোতির মন অস্থির হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু মায়ের কাঁদো কাঁদো মুখটা আবার মনে পড়ল তার। মা তাকে বাইরে বাইরে ঘুরতে বারণ করে যে! কাজেই অস্থিরতা কমাতে তাড়াতাড়ি কাঁচালঙ্কা, তেল, নুন দিয়ে আলুভাতে মেখে গপগপিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমোবে বলে সে ঘরে ঢুকল।

কিন্তু আজ তাকে ঘুমোতে দিলে তো। পুবের জানালা দিয়ে মোতি দেখতে পেল ডোবার জলে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে আর প্রতিটা ফোঁটা তরঙ্গ তুলে এক হয়ে যাচ্ছে ডোবার সঙ্গে। পানকৌড়িরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে সরু সরু ঠ্যাঙে টঙ টঙ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টগর গাছের ডালে বসে কি একটা পাখি খুব ভিজছে। ব্যাঙ ডাকছে। কামিনী আর কদম ফুলের গন্ধে ম ম করছে চারদিক। এইসব দেখে শুনেই সারা দুপুর আর বিকেল তার জানালার ধারে বসে কেটে গেল। এই সব ছেড়ে পরের বাড়ি চলে যেতে হবে তাকে? সে বাড়ি কেমন… কোথায়… কত দূর… তাই বা কে জানে…

 

মাঝি পাড়ার শাঁখের ফুঁয়ে সন্ধ্যা নামল। মোতিও সন্ধে দিতে মাটির প্রদীপটা জ্বালিয়ে ঘরের দরজা খুলে দাবায় এসে দাঁড়াল। আর দাঁড়ানোমাত্র এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়ায় তার হাতের প্রদীপ গেল নিভে। তখন সে দেখল, বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। মেঘগুলোকে ঠেলে ঠুলে সরিয়ে দিয়ে উঁকি মারছে পূর্ণিমা চাঁদ। পৃথিবী যেন সারা গায়ে জ্যোৎস্নার আতর মেখেছে। এমন উৎসবের মরশুমে কি আর ঘরে বসে থাকা যায়? কতসব অদৃশ্য আনন্দরা কেবলই যে তাকে ডাক দিচ্ছে, -মোতি… মোতি… মোতিইইইই…

লম্ফটা জ্বেলে সে দোরগোড়ায় বসিয়ে রাখল। তারপর দোরে ছেকল দিয়ে নিরুদ্দিষ্ট হল আনন্দের রাজত্বে।

বাইরে বেরোতেই মোতির মনে পড়ল, পালপাড়ার ছোট মৌদের বাড়ি আজ কি সুন্দর ঝুলন সাজানো হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মিলে বালি দিয়ে তৈরি করে পাহাড়, দুর্গ, রাস্তা-ঘাট… সেসব সাজানো হয় খেলনা গাড়ি, কত রঙ বেরঙের পুতুলে…

সেই ঝুলন দেখার জন্য মোতির প্রাণটা আন-চান করে উঠল। সে জল কাদা ভেঙে ছুট লাগাল পালপাড়ার দিকে।

ছুটতে ছুটতে মরা নদীর পাড়ে এসে অবাক হল মোতি! নদীর বুকে রেশম শাড়িটির মত জেল্লা দিচ্ছে ভারি বর্ষার জল। আকাশের চাঁদ নেমেছে তার কপালের টিপটি হয়ে। মোতি হাঁ করে সেই রূপ দেখতে লাগল। কোথায় যে যাচ্ছিল তা আর মনে রইল না। দূরে কোথাও কাঁসর-ঘন্টা বাজছে। ভিজে বাতাসে ভাসছে ধূপ-ধুনোর গন্ধ। মোতির ভারি আহ্লাদ হল। সে প্রথমে খানিক ছুটে নিল নদীর পাড় ধরে। তারপর চিরাচরিত ভঙ্গিতে দুই হাত ছড়িয়ে দিল দেহের দুই পারে। নির্জন নদীতীরে কাদা-জলের মধ্যে পায়ে ছপ ছপ শব্দ তুলে মোতি ঘূর্ণি শুরু করল।

 

মোতি নাচছিল দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে। সেই নাচের তালে তালে গাছের পাতারা মাথা নাড়ছিল। আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টির মত ওর সর্বাঙ্গে ঝরে পড়ছিল অজস্র জলকণা। নদীর বুক থেকে ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশারা উঠে ওর আশ পাশে ভিড় জমিয়েছিল।

এমন সময়, দূরে, নদীর ভাঙ্গাচোরা সাঁকো উজিয়ে কালো বিন্দুর মত দেখা দিল এক প্রাণী। প্রাণীটির আবয়ব মানুষের। হাতে ধরা বোতল। পা নেশায় টলটলায়মান।

সে দেখল শুনশান নদীতীরে জিনপরির নাচ! এমন কাণ্ড সে তার জিন্দেগিতে দেখেনি! জলকাদা ঠেলে মন্ত্রমুগ্ধের মত সেদিক পানে ছুটে এল সে। বার বার চোখ কচলে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল দৃশ্যটা সত্যি, না কি মনের ভুল।

নৃত্যরত একটি নারীদেহ… ভিজছে বৃষ্টিতে অথবা জ্যোৎস্নায়। পুকুরের জলে থান ইঁট ফেললে জল যেমন, তেমনই নাচের তালে চলকে চলকে উঠছে তার রহস্যময় মৃদু শরীর।

আগন্তুক প্রাণীটির আকার যদিও একটি পুরুষ মানুষের, তবু, উড়ন্ত প্রজাপতি দেখে বিড়ালের যেমন, তেমনই শিকারি ক্রূরতা ফুটে উঠল তার চোখে।

এমন অলৌকিক সুযোগ মাঠে মারা যেতে দেওয়া যায় নাকি? খসে পড়ল হাতে ধরা বোতল। ছুটে গিয়ে জাপটে ধরল সে জিনপরির শরীর। হাল্কা পালকের মত সেই শরীর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে সে ঢুকল নদীর পারে কচুবনের ভিতর।

কাদায় লেপ্টে গেল অলৌকিক নারীটির মাথাভরা চুল। সে নানারকম ভাবে হাত পা ছুঁড়ে শরীর বেঁকিয়ে ছাড়া পাবার চেষ্টা করতে লাগল প্রাণীটার কবল থেকে। আর তাই দেখে দয়ার বদলে রিরংসা প্রবল হয়ে উঠল তার। রক্ত গরম হয়ে শিরায় শিরায় আগুন ছুটতে লাগল যেন।

মানুষ সে। তবু যেন পশুনখে ছিন্নভিন্ন হতে লাগল জিনপরির পরিচ্ছদ, কোমল পাতার মত ত্বক, তার সারা অঙ্গ।

কোথায় মানুষ? বিষধর সাপের ছোবলে ছোবলে মৃতপ্রায় হয়ে গেল জিনপরি।

 

যেন অনন্ত সময় পার করে অবসন্ন পুরুষটা শেষ পর্যন্ত যখন নিজেকে মুক্ত করল জিনপরি শরীরটি থেকে, সহসা শক্তি পেয়ে ‘আঁ আঁ আঁ…’ শব্দে বিকট এক চিৎকারে ককিয়ে কেঁদে উঠল সেই জিনপরি।

চিৎকারে নেশা ছুটে গেল লোকটার। গলা শুনে চমকে উঠল সে। চাঁদের আলোয় এবার চিনতে একটুও কষ্ট হল না তার। -এ কি! এ তো মাঝি পাড়ার সেই খোনা মেয়েটা!

যদিও বেপাড়ার লোক সে। কিন্তু ছোট গ্রাম তাদের। সবাই সবার মুখ চেনা। তাছাড়া এই বারমুখো মেয়েটা আকছার তাদের উঠোনে আসে তারই ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলা করতে। তাদের পৈঠেতে বসে বাসি রুটি আর গুড় খেয়ে গেছে কতবার। না। এ মেয়ের তো তাকে না চেনার কোনও কারণ নেই।

অনুশোচনা নয়। বিপদ বুঝে এবার একটা ভয়ার্ত নিষ্ঠুরতা দেখা দেয় লোকটার চোখে মুখে। দ্বিরুক্তি না করে বাঘের মত থাবা দিয়ে চেপে ধরে সে মেয়েটার মুখ। তারপর ঠেসে ধরে কাদার ভিতর।

ছটকাতে ছটকাতে মেয়েটা এক সময় স্থির হয়ে যায়। তবু সে দুই থাবায় প্রাণপণ চেপে থাকে তার টুঁটি, যতক্ষণ না সে নিজে ক্লান্ত বোধ করছে।

নদীর ধারে জলে কাদায় নিস্পন্দ পড়ে থাকে মোতির শরীর।

 

রাত ক্রমশ গভীর হয়। বৃষ্টি আসে… বৃষ্টি থামে… আবার আসে। মেঘেদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত চাঁদটাও পুব আকাশে ঘুমে ঢলে পড়ে। তারপর এক সময় খুব আস্তে আস্তে সূর্য মাথাচাড়া দেয়। পৃথিবী রঙিন হতে থাকে। লোকালয়ে জাগরণের মৃদু গুঞ্জন পাওয়া যায়। মরা নদী বৃদ্ধ পিতামহীর মত বুক দিয়ে ঘুমন্ত মোতিকে আগলে বসে থাকে। আরো পরে… এক সময় হাটুরেরা ঝোপের মধ্যে মোতির কাদা, রক্ত মাখা দোমড়ানো মোচড়ানো শরীরটা আবিষ্কার করে। দেখতে দেখতে লোকের ঢল নামে।

আগের দিন বৃষ্টিতে কোথায় যেন রেল লাইন ডুবে গিয়ে বিকেল থেকে ট্রেন বন্ধ ছিল। মোতির মা ফিরতে পারেনি। ডাক্তার বৌদির বাড়িতে শুয়ে শুয়ে কে জানে কিসের চিন্তায় মনটা তার সারা রাত উথাল পাতাল করেছে। এমনটা তো সচরাচর হয় না। আজ ভোরে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতেই সে তাই একদম প্রথম ট্রেনটা ধরে গাঁয়ে ফিরছিল। পথে খবরটা পেয়ে স্তম্ভিত মোতির মা পথেই দাঁড়িয়ে রইল যেন বারুণীর পুতুল।

 

মাঝিপাড়ার খোনা মোতি, ইশকুলের মাস্টাররা যাকে বলত বুদ্ধিহীন, তাকে নিয়ে পৃথিবী মায়ের কিন্তু গর্বের আর অন্ত ছিল না। কারণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড স্পন্দিত হয় যে ছন্দে, যে ছন্দের ধারনা পেতে কত সাধক কত জন্ম পার করে দেন… সেই ছন্দ মোতি ধরতে পারত।

মোতি যখন এই বিপুলা ধরণীর বুকে তার ছোট ছোট দুটি পা ফেলে ঘুরে ঘুরে নাচত, ধরণী মা তখন বঙ্কিম গ্রীবায় সূর্য, চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহ-তারাদের সামনে তার এই সন্তানটির জন্য গর্ব প্রকাশ করত।

কিন্তু গতকাল ঝুলন পূর্ণিমা ছিল তো। পৃথিবী মা প্রেয়সীর মত সুসজ্জিতা হয়ে বিশ্বদেবতার উৎসবে মেতেছিল। অন্য কোনও দিকে মন দেবার বুঝি তার ফুরসতই ছিল না।

কিন্তু আজ, নিজ অক্ষে রোজকার মত আবর্তিত হতে হতে সে যখন বুকের উপর সেই প্রিয় পরিচিত স্পন্দনটা আর কিছুতেই শুনতে পেল না… সে উতলা হয়ে উঠল।

তখন, মেঠো হাওয়া, কাদা-জল, গতকালের জ্যোৎস্না আর আজকের রোদ… তাকে তার প্রিয় সন্তানটির সংবাদ এনে দিল।

শুনে মূক ও বধির হয়ে গেল পৃথিবী।

 

কেবল জ্বলন্ত লাভার মত নির্বাক শোক উদ্গীর্ণ হতে লাগল তার বুক ফেটে।

সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মত কান্নায় তার দেহ প্লাবিত হল।

কান্নার দমকে ঘন ঘন কেঁপে উঠতে লাগল তার সর্বশরীর।

 

পৃথিবীর যাবতীয় ছোট-বড়ো সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন সেদিনের আকস্মিক বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়, ভূমিকম্প, সুনামির খবরে খবরে… কারণ বিশ্লেষণে বিশ্লেষণে… ছয়লাপ হতে লাগল। সেখানে তুচ্ছ একটি গ্রামের অতি তুচ্ছ একটি মেয়ের বিপর্যয়ের কথা ঠাঁই পেল না কোত্থাও।

তবে মোতিদের গাঁয়ের জানকার সেই লোকটা হয়তো বুঝতে পারল, পৃথিবীর এত বড় তাণ্ডবের পিছনে কারণটা আসলে কী।

Shares

Comments are closed.