শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

ট্রাম্পের একছত্র আধিপত্য কি কমবে এই মিডটার্ম ইলেকশনের পর / ২

নভেম্বর মাসের ছয় তারিখে আমেরিকায় মিডটার্ম নির্বাচন।  শোনা যাচ্ছে এই ভোটে নাকি বেশি আসন পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। আর সেটা হলেই কমবে ট্রাম্পের একছত্র আধিপত্য। সত্যিই কি তাই? আমেরিকার  মিডটার্ম নির্বাচন নিয়ে লিখলেন রানা আইচ আজ দ্বিতীয় কিস্তি।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, ৬ নভেম্বর আমেরিকান মধ্যবর্তীকালীন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিন্তু লড়ছেন না। লড়ার কথাও নয়।

এই নির্বাচন শুধুমাত্র আমেরিকান কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ এর ৪৩৫টি আসন এবং উচ্চকক্ষ অর্থাৎ সেনেটের ৩৫টি আসনের জন্য।

আমেরিকান সেনেটে সর্বমোট ১০০ টি আসন – এবং এর প্রতিনিধিরা প্রতি ৬ বছর অন্তর নির্বাচিত হন। অনেকটা ভারতের রাজ্যসভার মতো তফাত একটাই, আমেরিকান সেনেটের নির্বাচনে জনগণ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে।

বর্তমান কংগ্রেসে এই দুটি কক্ষই রিপাবলিকানদের দখলে। এইবারের মিড টার্মে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষরা সবাই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন ৬ নভেম্বরে ‘ব্লু ওয়েভ’ আসন্ন। অধিকাংশ ওপিনিয়ন পোল বলছে এবার হাউস অফ রিপ্রেসেন্টেটিভের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। উলটোদিকে সেনেটের নির্বাচনে কিন্তু এখনও রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনাই প্রবল। তবে সাধারণ মানুষ ২০১৬ র রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অঘটনের পর এই সব ভবিষ্যতবাণীর প্রতি বড়ই সন্দেহপ্রবণ।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের আশান্বিত হওয়ার সত্যিই বেশ কিছু কারণ আছে। একে তো মধ্যবর্তীকালীন নির্বাচনগুলোতে প্রেসিডেন্টের পার্টির বেশ ভালো ব্যবধানে হারার এক ঐতিহাসিক প্রবণতা আছে। তদুপরি স্বয়ং প্রেসিডেন্টের গ্রহণযোগ্যতা ৫০% এর তলায় নেমে এসেছে।

পড়ুন প্রথম কিস্তি : ট্রাম্পের একছত্র আধিপত্য কি কমবে এই মিডটার্ম ইলেকশনের পর / ১

অনেক ওপিনিয়ন পোলেই দেখা যাচ্ছে কম করে ৩৫-৩৮টি রিপাবলিকানদের ধরে রাখা আসনে হাড্ডাহাড্ডি লডাইয়ের প্রবল সম্ভাবনা। এছাড়াও আরও  ২৭ টা আসনে রিপাবলিকানরা একচুল এগিয়ে থাকলেও – সেখানেও তুমুল লড়াই হওয়ার পূর্বাভাস।

এর মধ্যে ট্রাম্পের জন্য গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ৪১টা আসন – যেখানে এবার রিপাবলিকান প্রার্থীরা একবারেই আনকোরা। ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর থেকে নয় নয় করে ২৩ জন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য – অধিকাংশ তাঁরই আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে, স্বেচ্ছা-অবসররের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন হাউস স্পিকার পল রায়ান। এই বছরের এপ্রিল মাসে তিনি সামনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না বলে একতরফা ঘোষণা করে দেন।

১৯৩০ এর পরে এবছরই একসঙ্গে এত নতুন রিপাবলিকান প্রার্থী ভোটপ্রত্যাশী। এদেশের নির্বাচনী ছক অনুযায়ী পুরনো প্রার্থীর বদলে নতুন প্রার্থীকে হারানো কিন্তু বেশি সোজা। বলাই বাহুল্য এই ধরনের পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো মওকা ডেমোক্র্যাটরা পার্টি পুরো লুফে নিয়েছে।

অবশ্য রিপাবলিকানদের আশান্বিত হওয়ারও কিন্তু অনেক কারণ আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অ্যাপ্রুভাল রেটিং এতদিন ৪০% এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিলো। কিন্তু ইদানিং নাফটা চুক্তির পরিবর্তে ইউনাইটেড স্টেটস মেক্সিকো ক্যানাডা এগ্রিমেন্ট নামের পুরোদস্তুর নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে কানাডা ও মেক্সিকোর সম্মতি আদায় করে তিনি প্রায় অসাধ্য সাধন করেছেন।

এই নতুন চুক্তির ফলে আমেরিকান দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য রপ্তানিকারীদের কাছে কানাডার বাজার আরও খুলে যাবে। গাড়ি শিল্পের ক্ষেত্রেও যাতে এই তিন দেশে আরও  বেশি সংখ্যক গাড়ি উৎপাদন হয় তার অনুকূল পটভুমি তৈরি করা হয়েছে। আমেরিকান দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাও বিশেষভাবে উৎসাহব্যঞ্জক। ট্রাম্পের নতুন কর ছাড়ের পর থেকে আর্থিক বৃদ্ধি একলাফে অনেকখানি বেড়ে এপ্রিল-জুন কোয়ার্টারে ৪.১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও তৃতীয় কোয়ার্টারে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৫ শতাংশ। দেশে বেকারের সংখ্যাও একেবারে তলানীতে। এ সবের জন্যই ইদানীং ট্রাম্পের রেটিং কিছুটা হলেও উর্দ্ধমুখী – প্রেসিডেন্টের গ্রহণযোগ্যতা এখন প্রায় ৪২.২% এসে দাঁড়িয়েছে।

এই নির্বাচনে আরেকটা বড় ইস্যু হচ্ছে অভিবাসন। মহামান্য ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছেড়েছেন – এখন বৈধ অভিবাসনের ওপরেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করা শুরু করেছেন। অতি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতকারে তিনি রীতিমতো একটা বোমা ফাটিয়েছেন। বলেছেন আমেরিকার মাটিতে জন্মালেই যে এখানকার নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে – এই যুগপ্রাচীন প্রথাটাই ভুলে ভরা। তিনি চেষ্টা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন এইসব ‘উদ্ভট’ নিয়মকানুন তুলে দেওয়ার। অবশ্য নির্বাচনের আগে কট্টর সমর্থকদের বুথমুখি করার জন্য এরকম নরম গরম কথা অনেক বলতে হয় তা আমরা আগেই দেখেছি। কিন্তু ইনি যে খোদ মহামান্য ট্রাম্প মশাই – কথা দিয়ে কথা রাখেন। আর অভিবাসন নেওয়া মানুষদের ভয়টাও সেখানেই।

এর মধ্যেই মনে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়। যেমন নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই রিপাবলিকানদের চিরশত্রু (আমেরিকার নাম করলাম না কিন্তু) ইরানের ওপর আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা জারী হতে চলেছে। আমার মতে এই নিষেধাজ্ঞা একান্তই অপ্রয়োজনীয়। একটা দেশের সঙ্গে আরেকটা দেশের প্রবল খারাপ সম্পর্ক – এমন হতেই পারে। অনেকটা আমাদের ভারত-পাকিস্তানের মতো। ক্ষমতায় এসেই রাগের চোটে অন্ধ হয়ে কেউ ঠিক করল চিরশত্রুর সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য নৈব নৈব চ।

সমস্যা শুরু হয় যখন সে প্রায় পাড়ার গুণ্ডার মত সারা পৃথিবীকে চোখ রাঙিয়ে বলল খবরদার – এর সঙ্গে যে ব্যবসা করবে তার একদিন কী আমার একদিন। (এই ব্যাপারে অবশ্য ট্রাম্প এবং ওবামার বিশেষ তফাত নেই। বলা চলে বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ)। একবার ভেবেও দেখা হল না যে অন্য দেশ, বিশেষত ভারত ও চিনের ২৭০ কোটি লোক,  তেলের ওপর নির্ভরশীল। এদিকে ঠিক করে দেওয়া হল ওসব নিয়ে ভাবার কোনও কারণ নেই – বন্ধু সৌদি আরবই তেলের যোগান অক্ষুন্ন রাখবে। এই নিষেধাজ্ঞার বাতাবরণে কোনও কারণে এই তেলের যোগান বিঘ্নিত হয় তো এর দায় কে নেবে?  এর ফলে বাজারে তেলের দাম যদি হু হু করে বাড়তে থাকে ভারত ও চিনের মতো দেশ তা মুখ বুজে সহ্য করবে?

সত্যি কথা বলতে কি, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমেরিকান প্রশাসনের – সে যার হাতেই ক্ষমতা থাকুক না কেন– বোঝার সময় হয়েছে এইরকম দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জ্বালাপোড়া অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঘোরতর অন্যায়। মুশকিল হচ্ছে আমেরিকান দেশের জনগণ নিজেদের সুখ শান্তি নিয়ে এতই ব্যস্ত যে তাদের এইসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাবার সময় নেই – এবং এই নিয়ে কোনও রকম প্রতিবাদও চোখে পড়েনি।

এদিকে ট্রাম্পের এই খামখেয়ালিপনায় ভুক্তভোগী দেশগুলোয় এখন এক নতুন চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছে। এইসব দেশের অনেক বুদ্ধিজীবিই এখন ডলারের বদলে কিছু নতুন মুদ্রার মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য করার চিন্তা ভাবনা শুরু করেছেন। যা কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিলো।

আরও একটা বিষয় যা নিয়ে অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন তাহল এই করছাড়ের উপাখ্যান। অনেকেই জানেন না এই দেশের অর্থনীতি টিকেই আছে বিপুল দেনার ওপর ভর করে। এই নিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে রিপাবলিকানেরা প্রচুর চেঁচামেচি করেছিলো। এদিকে ক্ষমতায় এসেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রতিশ্রুতি মতো এক বিপুল পরিমাণ করছাড় ঘোষণা করেছেন। এতে আমেরিকান দেনার পরিমাণ ভবিষ্যতে চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে যাওয়ার যে সমূহ সম্ভাবনা তা নিয়েও এদেশের লোকেদের কোনও হোলদোল নেই। সবাই করছাড় নিয়েই উদ্বাহু।  মনে প্রশ্ন আসাটা খুব স্বাভাবিক যে প্রত্যেকে নিজের ভাগের কড়িটি নিয়ে কেটে পড়লে দেশটা চলবে কী ভাবে? এর জন্য অর্থনীতিতে প্রচন্ড পণ্ডিত হওয়ারও দরকার নেই।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই করছাড়ের সিদ্ধান্ত অদুর ভবিষ্যতে আবার ব্যুমেরাং না হয়ে দাঁড়ায়।

এবার একনজরে এই নির্বাচনের ভবিষ্যতবাণীতে চোখ বোলানো যাক।

উচ্চ কক্ষ, সেনেট নির্বাচন সৌজন্য: fivethirtyeight.com

নিম্ন কক্ষ – হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচন সৌজন্য: fivethirtyeight.com

 

ওপরের ছবিদুটো থেকে মোটামুটিভাবে বলা যায় – যদি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হয় তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাগ্য অনেকটা পূর্বতন প্রেসিডেন্ট ওবামার মতই বহুলাংশে নখদন্তহীন হয়ে যাবে।

এরকম পরিস্থিতিতে দেশ চালাতে ট্রাম্পকে প্রতি পদক্ষেপে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। নতুন ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে ডেমোক্র্যাটরাও আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ট্রাম ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের তদন্তের নির্দেশ জারি করতে পারে।

এদিকে সেনেট নির্বাচনী চিত্র থেকে এটাও বেশ বোঝা যাচ্ছে সেরকম কোনও অঘটন না ঘটলে রিপাবলিকানদের ভাগ্যেই সেনেটের শিকে ছিঁড়ছে। এক্ষেত্রে সেনেটের রিপাবলিকান সদস্যরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোনীত প্রশাসনিক প্রার্থীদের অনুমোদন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করবে না।

নিম্ন কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের আস্ফালনে যদি সামনের দু বছরে ট্রাম্প প্রশাসনে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে তা শাপে বর হলেও হতে পারে। সেক্ষেত্রে পরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যাবতীয় দোষ ডেমোক্র্যাটদের ঘাড়ে চাপিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া ট্রাম্পের মতো বুদ্ধিমান লোকের বিন্দুমাত্র অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

লেখক সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত 

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Shares

Comments are closed.