শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

মূল উদ্দেশ্য হল আমার শব্দ আর দর্শকের নৈঃশব্দের মধ্যে সেতুবন্ধন

শুধু বাচিক শিল্পী তিনি নন। নন শুধু অভিনেতা কিংবা গায়ক। তিনি আন্তর্সাংস্কৃতিক শিল্পী। তাঁর শিল্পে ধরা থাকে গান, কবিতা, ছবি, ভাস্কর্যের নির্যাস। নিজেকে তিনি বলতে চান ‘দাস্তানগোই’ গল্প বলিয়ে। শিল্পী জীবনের পনেরো বছর পূরণ করছেন সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন নব্বই দশকের শক্তিশালী কবি অংশুমান কর

অংশুমান কর

অংশুমান – প্রথমেই অভিনন্দন জানাই। শিল্পী হিসেবে পনেরো বছর কাজ করে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটা বিরাট ব্যাপার। এই সময়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে তুমি কীভাবে দেখছ?

সুজয় – আমি আসলে এক জন আন্তর্সাংস্কৃতিক শিল্পী। ইংরেজিতে যাকে বলে ইন্টারডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট। আজ থেকে পনেরো বছর আগে কলকাতা শহরে যখন কাজ শুরু করেছিলাম তখন কিন্তু বাচিক শিল্পটাই আমার পেশা হবে এমন ভাবনা আমার ছিল না। সে সময়ে আমি শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করতে চেয়েছিলাম। তার ভিত্তিটা ছিল বাচিকশিল্প। কিন্তু তার সঙ্গে অন্য শিল্পও যুক্ত হয়েছে। সেই ভাবেই কাজ করেছি আমি। আমি প্রথাগত ভাবে অভিনয় শিখিওনি। আমি আসলে দেখে শিখেছি। সেটাই আমার প্রশিক্ষণ। বলতে পারো ঠেকেও শিখেছি। আমি তো আবৃত্তি করি না। আমি পাঠ করি। আমি এক জন স্টোরি টেলার। পুরনো ভাষায় যাকে দাস্তানগোই বলা হত।

অংশুমান – এখানে অনেক আবৃত্তিকারের পাঠ শুনেছি। আবার বিদেশের বেশ কিছু কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানেও থেকেছি। কেউ বলতে পারেন এখানে কেউ কেউ নাটকীয়তা, কখনও কখনও অতিনাটকীয়তারও আশ্রয় নেন। তুমি যেভাবে পড়ো তার সঙ্গে কিন্তু এটার একটা প্রত্যক্ষ বিরোধ আছে। তোমার কী মনে হয়  যে এখানে ভুল ভাবে বাংলা কবিতার আবৃত্তি হচ্ছে?

সুজয় – এই প্রসঙ্গে তোমাকে একটা গল্প বলতে হবে। আজ থেকে তিন বছর আগে, নিউ ইয়র্কে বঙ্গসম্মেলনে আমি আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে গিয়েছিলাম। পারিশ্রমিক নিয়ে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলাম। আমার একক কবিতা পাঠের একটি অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানের ঠিক পনেরো মিনিট আগে, আমি আগের তিন মাস ধরে যে কীবোর্ড আর্টিস্টের সঙ্গে অনুশীলন করেছি, তাকে সরিয়ে নেওয়া হল। তাঁকে তখন কবিতা কৃষ্ণমূর্তির একটি অনুষ্ঠানের জন্য দরকার পড়েছিল। আমি রাজি না হলে আমার অনুষ্ঠানটাই বাতিল হয়ে যেত। এটা কতটা সঙ্গত কতটা অসঙ্গত তার মধ্যে আমি আর যেতে চাই না।

কোনও আবহ ছাড়াই অনুষ্ঠান করেছিলাম। দু’ঘণ্টার অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষে অনেক মানুষ এসে আমাকে তাঁদের আবেগের কথা জানিয়েছিলেন। আসলে আমি যেটা করেছিলাম সেটা হল আমার শব্দ এবং দর্শকের নৈঃশব্দের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন। আমার মনে হয় এটা হল বাচিক শিল্পের প্রথম উপপাদ্য।

নাটকীয়তার মধ্যেও তো বিভাজন আছে। আমি রক্তকরবীর একটা অংশ পাঠ করব। একা। এবার মিউজিক থাকলে তো মন্দ হয় না। কিন্তু আমি যখন দেখলাম আমার কোনও মিউজিক নেই আমি নিজেই গানগুলো গাইব। এটাই আসলে তফাত এক জন নিয়মিত আবৃত্তিশিল্প এবং আমার মধ্যে।

অংশুমান – তোমার পারফর্মেন্সের সঙ্গে ভীষণ ভাবে জড়িয়ে আছে শব্দপ্রক্ষেপন, মিউজিক, আলো। কিন্তু তুমি তো আসলে একজন স্টোরিটেলারের মতোই একটা গল্প বা কবিতা পৌঁছে দিতে চাইছো পাঠকের কাছে। কিন্তু কেউ যদি বলে এই আবহ, গান এটা দর্শককে মূল বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, তাহলে কী বলবে?

সুজয় – ভারতবর্ষে ইন্টারডিসিপ্লিনারি আর্ট নিয়ে কাজ করার একমাত্র জায়গা। এটা আমিই কলকাতায় তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সেখানে আমরা একটা জিনিস শেখাই। এই যে আমরা পাশাপাশি গান এবং পাঠ, আলো, নাচ, আবহসঙ্গীত, ফিল্ম, ডিজিটাল, কালচার, পেন্টিং, মাইম–- এমন অনেকগুলো শিল্পের মিশ্রণ ঘটাই সেইগুলো কেন ঘটাই সেটা জানতে হবে। এই যে কেন শব্দটা বললাম এটা কিন্তু একটা বিরাট সেতুবন্ধন। ধরো আমি তোমার লেখা ‘পাড়াগাঁয়ের রূপকথা’ পাঠ করালাম। তার পরেই আমার ইচ্ছে করল রবীন্দ্রনাথের ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার। তাই জনম গেল, শান্তি পেলি না রে মন, মন রে আমার’ গানটা গাইতে। এবার এটা কেন ইচ্ছে করল? এটা কী কোনও এনগেজমেন্ট পয়েন্ট সৃষ্টি করেছে? এই বিষয়টাকে বুঝতে গেলে দু’টো জিনিসের ভীষণ প্রয়োজন। একটা হল রিসার্চ। আর একটা মনন।

আমি এক বার অপর্ণা সেনের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে তিনটে অনুষ্ঠান করেছিলাম। আমি মনে করি রিনাদি যেভাবে গল্পটা বলেন সেভাবে কিন্তু অনেকেই গল্পটা বলতে পারেন না। কারণ রিনাদি সেই প্রথাগত ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন।

অংশুমান – একদম। তোমার যে স্কুলটা তুমি তৈরি করেছো তার সঙ্গে কিন্তু রিনাদির বলার ধরনটা অনেকখানিই মিলে যায়। আমি আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। তুমি প্রায় সব সময়েই লাইভ মিউজিকের সঙ্গে পারফর্ম করো।

সুজয় – ব্রততীদি বা সুতপাদি যখন কবিতা আবৃত্তি করেন, ওদের কাছে অনেক সময় আবহের রেকর্ডেড পিসগুলো থাকে। কারণ এটা রিসোর্স হিসেবে খুব ভালো। অনেক সময়েই শুধু ওটা নিয়ে ট্র্যাভেল করা যায়। এটা আমাকে বেশ টানে। কিন্তু আমি এটা পারিনা। আমার সবটাই লাইভ।

আমার পাশে যদি একটা পিয়ানো বাজে, আমাকে বুঝতে হবে আমার পাশে ওই পিয়ানোর নোটগুলো কীভাবে মিশে যাচ্ছে। একটা উদাহরণ দিই। আমি পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসেনি’ সেই কবিতাটা পড়ছি। এই কবিতাটাকে পাঠ করার আগে আমি প্রায় বার পঞ্চাশেক মুনলাইট সোনাটা শুনেছি। এবার কেন শেষ অবধি ওই মুনলাইট সোনাটাকেই ব্যবহার করলাম? কারণ আমার মনে হয়েছিল আসলে যেন ওটা ওই কবিতাটার গল্পের মধ্যেই আছে।

এবার মুনলাইট সোনাটা পশ্চিমী মার্গ সঙ্গীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পোজিশন। বেঠোফেনের একটি অনবদ্য কাজ। তার সঙ্গে পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার মিশ্রণ করে আমি কি আসলে একটা সাররিয়ালিজম সৃষ্টি করছি? আরও ভালো করে বলতে হয় আমি কোনও মেদুরতার সৃষ্টি করছি?  আসলে কিন্তু কোনওটাই নয়। আসলে একটাই কথা। দু’টোর যে গল্প, মুনলাইট সোনাটার নিহিত গল্প আর পূর্ণেন্দু পত্রীর নিহিত গল্প – এই দু’টোকে কোথাও একটাই ট্র্যাকে নিয়ে আসা। এটাই কিন্তু ইন্টারডিসিপ্লিনারি আর্টস বা আন্তর্সাংস্কৃতিক শিল্পের মূল নির্যাস বা মূল উপপাদ্য।

অংশুমান – তুমি অনেক অনুষ্ঠানে বাংলার পাশাপাশি ইংরাজি কবিতাও পড়ে থাকো। কখনও কখনও অন্য ভাষার কবিতার ইংরাজিতে অনুবাদও। যখন তুমি পশ্চিমবঙ্গে কবিতা পড়ে থাকো, তখন কি তুমি  দর্শকের মধ্যে এই দুই ভাষার কবিতা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তফাত কোনও লক্ষ্য করেছ?

সুজয় – এটা একটা খুব ভালো প্রশ্ন করেছো। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি – ক’দিন আগেই চন্দননগরে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ওখানে যাঁরা বাজাচ্ছিলেন, তাঁদের এক জন আমাকে বলেছিলেন তুমি কিন্তু ইংরাজি কবিতা পড়ো না। কেন, আমি প্রশ্ন করিনি।

আমি ওখানে রবীন্দ্রনাথ, মির্জা গালিব, শঙ্খ ঘোষ পড়লাম। তার সঙ্গে  বব ডিলান, গুলজার, জ্যাক লন্ডন পড়লাম। শ্রীজাতও পড়লাম। দেখতে পাচ্ছিলাম লোকে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করছে। এই যে বব ডিলান পড়লাম এবং সঙ্গে ‘হাউ মেনি মাইলস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন’ গাওয়া হল মিউজিকের সঙ্গে, লোকেদের চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত উচ্ছ্বাস! অনুষ্ঠানের শেষে এক জন আমাকে এসে বললেন আমরা তো জানতামই না এঁদের অনেকে কথা। আপনি আমাদের জানালেন।

দেখো আমি কিন্তু নিজেকে জাহির করার জন্য ইংরাজি কবিতা পড়ি না। আমি ইংরেজিটা ভালো বলি। কিন্তু এতে আমার বিশেষ কোনও প্রজ্ঞা লাগে না। ইংরেজি অনেকেই ভালো বলেন। আরও একটা কথা হল, দর্শকের অভিরুচিটাকে একটু বদলে দেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু শিল্পীদেরও থাকে।

অংশুমান – কিন্তু কেউ কেউ তো মনে করে বাংলা ভাষা আক্রান্ত। কেউ তো তোমাকে বলতেই পারে যে তুমি পশ্চিমবঙ্গে কেন ইংরাজিতে কবিতা পড়ছো। কেন তুমি শুধু বাংলা ভাষার কবিতাই পড়বে না।

সুজয় – কেউ যদি ভাবেন এই অনুষ্ঠানে শুধু বাংলা ভাষা জানেন এমন লোকেরাই আসবেন তাহলে তো মুশকিল। পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে তো বিভিন্ন ভাষার মানুষরাই থাকেন। এক জন পাঞ্জাবি বা কন্নড় ভাষার মানুষও তো আসতে পারেন। আমাদের তো বুঝতে হবে যে শেষ অবধি আমরা ভারতীয়ই। আমাকে তো সেই সমষ্টিগত চেতনা নিয়েই ভাবতে হবে। আমি খুব খুশি হবো যদি আমি কখনও তোমার কবিতা ইংরাজিতে অনুবাদ করে কোথাও পাঠ করতে পারি। আমার যে কানাডার কবি বন্ধুটি আছে রবার্ট ফ্রিস্ট, তাঁর কবিতাটা কিন্তু তুমি বুঝতে পারবে কারণ তুমি ইংরাজি জানো। কিন্তু তোমার কবিতাটা তো আমি তাঁকে শোনাতে পারছি না।

অংশুমান – হ্যাঁ, আসলে বাঙালি অস্মিতার সঙ্গে ভারতীয়ত্বের সঙ্গে তো কোথাও কোনও সংঘাত নেই বরঞ্চ একটা সংযোগ আছে।

সুজয় – পাঞ্জাবি কিংবা ওড়িয়া কবিতা, সাঁওতালি কবিতা, আমি কিন্তু চেষ্টা করেছি আমার সাধ্যমতো সেই ভাষাতেও পড়তে। অমৃতা প্রীতমের কবিতা আমি আমার পাঠে কিন্তু পাঞ্জাবি ভাষাতেই পড়ি। তার পরে আমি তার ইংরাজি অনুবাদ পড়ি।

অংশুমান – চমৎকার। একটা অন্য কথা বলি। তুমি বলো তোমার প্রথাগত শিক্ষা নেই। সেটা থাকলে কি তোমার পক্ষে বাচিক শিল্পী বা অভিনেতা হিসেবে পারফর্ম করতে  একটু বেশি সুবিধা হত?

সুজয় – একটা গল্প কী ভাবে এক জন গল্পবলিয়ে বলবে, সেটার প্রশিক্ষণ নিশ্চয় হতে পারে। যেমন কবিতার হতে পারে। ধরো, আমি তোমার লেখা কবিতা ‘পাড়াগাঁয়ের রূপকথা’ কোথাও পাঠ করছি। কবিতাটার কোথাও কি কোনও ছন্দরীতি আছে? সেই ব্যাকরণটা কিন্ত আমি জানি না। তাই আমার কাছে কবিতাটা যত ক্ষণ না আমার অন্তরের অভিযাত্রা হয়ে উঠছে, আমার ভেতরকে যত ক্ষণ না পুরোপুরি গ্রাস করছে, তত ক্ষণ আমার বলাটা গল্পের মতো হবে না।

ধরো তুমি একটা ছবি আঁকছো। একটা তুলি রঙে ডুবিয়ে আঁকতে শুরু করবে। তারও তো নিজস্ব একটা নিয়ম আছে। কিন্তু সেটা তুমি যদি না জানো। তুমি এক ভাবে করছো, সেভাবেও তো এগিয়ে যেতে পারো। আমি ওই ভাবেই এগিয়ে গিয়েছি। হৃদয়ই আমাকে শাসন করেছে। মনের থেকে বোধ হয় হৃদয়ই বেশি ছিল। অনেক পরে মনের ব্যাপারটাও এসেছে।

অংশুমান –অনেকের সঙ্গেই তো তুমি কাজ করেছ।

সুজয় – থিয়েটারটা মূলত শিখেছি সুদীপা বসু, চন্দন সেন এবং ব্যারি জনের কাছে। শিখেছি মানে কাজ করতে করতে শিখেছি।

বিজয়লক্ষ্মী বর্মনের আবৃত্তির পাঠ শুনেছি দীর্ঘদিন ধরে । শুনে শুনে শিখেছি কীভাবে ভাষা এবং শব্দের ব্যাঞ্জনা একটা পরিবৃত্ত সৃষ্টি করে। কিন্তু আমি তো ক্লাস করিনি কখনও। আমি বিজয়লক্ষ্মীদির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শিখেছি।

আমাকে প্রথম ঠেলেঠুলে পাঠ করিয়েছেন চৈতালী দাশগুপ্ত। তপন থিয়েটারে। সেটাই আমার হাতে-খড়ি। আমার সঞ্চালনার ধরনটা অনেকেই কিন্তু বলে চৈতালীদির মতো। আমি যে সচেতন ভাবে ওঁকে অনুকরণ করেছি তা কিন্তু নয়। তবে আমি নিশ্চয় কিছু দিন চৈতালীদির অনুসরণ করেছি। শুধুমাত্র কাব্যিক না করে, দর্শককে শ্রদ্ধা দেখিয়ে তাদের সঙ্গে একদম স্বাভাবিক ভাবে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া এটাই ওর স্টাইলের নির্যাস। সেটা কিন্তু আমি নিয়েছি।

অংশুমান –  গান শিখতে না পারা নিয়ে তুমি একটা আক্ষেপের কথা বলেছিল একদিন।

সুজয় – হ্যাঁ আক্ষেপ একটা আছে। সেটা হল গান। গানটা আমার পুরোপুরি কোনও দিনই শেখা হল না। আসলে আমি যাঁর কাছে গান শিখতাম তিনি আমাকে কোনও দিনই পরিপূর্ণতা দিতে পারেননি। গানটা অবশ্য ছাড়তে হল পড়াশোনার জন্য। সে সময় আমি দিল্লি চলে গিয়েছিলাম পড়তে। পারিবারিক ভাবেও তখন কিছু সমস্যা চলছিল। কিন্তু গানটা আমি সত্যিই খুব ভালোবাসি। আমাকে যদি একটা মাত্র শিল্পই বেছে নিতে হত, তাহলে কিন্তু আমি গানটাকেই বেছে নিতাম। তার একটা কারণও আছে। আমি একটা জিনিস পারি, সেটা আমি সচেতন ভাবে বুঝে গিয়েছিলাম অনেক দিন ধরে। আমি গানের মধ্যে দিয়েও একটা গল্প বলতে পারতাম।

অংশুমান – আমি ক’দিন আগেই একটা পার্টিতে তোমার গান শুনছিলাম। গানের মধ্যেও তো একটা নিজস্ব ন্যারেশন থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই যাঁরা গান করেন, তাঁরা সুরকে যতটা গুরুত্ব দেন, ততটা গুরুত্ব এই ন্যারেশনটাকে দেন না।

সুজয় – সুছন্দা ঘোষের মা, লিপিকা ঘোষ, তিনি এখন প্রয়াত, তিনি আমাকে খুব যত্ন করে গান শিখিয়েছিলেন। সেটা অনেক পরে। আমি তখন কলেজে পড়ি। মাঝে মাঝে লিপিকা কাকিমার কাছে গান শিখতে যেতাম। গানের প্রতি আমার টানটা উনি বুঝতে পারতেন। খুব যত্ন করে আমাকে উনি কিছু গান শিখিয়েছিলেন। সেই গানে কিন্তু ব্যাকরণটা বা স্বরলিপিটা মুখ্য ছিল না। স্বরলিপি নিশ্চয় ছিল। কিন্তু তার থেকেও যেটা বেশি করে শিখিয়েছেন সেটা হল গানটাকে বুঝতে।

সাউথ পয়েন্ট স্কুলে আমাদের গান শেখাতেন গীতা ঘটক এবং নমিতা ঘোষাল। গীতা আন্টির কাছে গান শেখাটা একটা অন্য পৃথিবীর উন্মোচন করে। উনিই আমাদের গান পড়তে শিখিয়েছেন। এই গান পড়ার অভ্যেসটা কিন্তু আমার এখনও যায়নি।

আমি সকালবেলা কিছুক্ষণ হলেও, এমনকী অনেক সময় বাথরুমেও গীতবিতানটা পাঠ করি মনে মনে। ওটা আমার কাছে একটা ধর্মগ্রন্থ।

অংশুমান – ওটা আমাদের অনেকের কাছেই একটা ধর্মগ্রন্থ।

সুজয় – রবীন্দ্রনাথে আমি বোল্ড হয়ে যাই। উনি তো আমার থেরাপিস্ট। উনি না থাকলে আমি হয়ত বেঁচেই থাকতাম না। আমার সব থেকে দুর্বল মুহূর্তে তো উনিই আমার হাত ধরেছেন। উনি আমার কাছে দেবতা নন, উনি আমার সহচর, আমার বন্ধু। ওঁর লেখা পড়ে আমি একটা দুর্দমনীয় শক্তি পাই। আমার যদি খুব মন খারাপ থাকে, আমি গীতবিতান পড়ি। দশটা মিনিট পাতা উল্টানোর পরেই আমার মনে হয়, এই রে, এইবার তো সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু হয়েছে আমার সঙ্গে।

অংশুমান – এটা আমারও আছে। তবে আমি গীতবিতানের পাশাপাশি আরও একটা বইয়ের কাছে ফিরে যাই। সেটা হল ‘লিপিকা’। সেটার কথা আজকাল কেউ খুব একটা বলে না দেখি।

সুজয় – ‘লিপিকা’। নিঃসন্দেহে! আমার ‘গল্পগুছ’ পড়তেও খুব ভালো লাগে। তোমার একটা কথা ধার করেই বলি, আমি ভাবি ওঁর থেকে আধুনিক আর কী হতে পারে।

অংশুমান – আমরা যেহেতু শব্দ নিয়ে কাজ করি, রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে অনেক সময়েই চমকে যাই, থমকেও যাই, ভাবি এর পর আর কী লিখব? আবার দেখ, কথাটা খুব অহংকারী শোনাতে পারে, কিন্তু যেহেতু আমি বাংলা ভাষাতেই দু’লাইন লিখি, উনি কোথাও যেন আমার প্রতিদ্বন্দ্বীও বটেন। সে লড়াইয়ে বারবার পরাজিতও হই। তবে সে বড় মধুর পরাজয়। ওঁর ভাষাতেই বলতে হয়, ‘যে পক্ষের পরাজয় সে পক্ষ ত্যাজিতে মোরে কোরো না আহ্বান’।

সুজয় – (হেসে) ‘জয়ী হোক, রাজা হোক পাণ্ডবসন্তান/ আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে’।

অংশুমান – পনেরো বছর কাজ হয়ে গেল। এখন শিল্পী হিসেবে লক্ষ্য কী?

সুজয় – আমি খুব চাই এবার আমার নিজের স্টেজ পারমর্ফেন্স আস্তে আস্তে কমে যাক। এখন আমি নতুনদের নিয়ে কাজ করতে চাই। তার বাইরে আমি শুধু সেই কাজই করব যেটা করার আমার তাগিদ থাকবে। এই যেমন ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি আর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাজ করলাম। আমি মনে করি এরকম কাজ আমাদের দেশের বিভিন্ন শহরে হলে ভারতবর্ষই উপকৃত হবে। আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে, বিশ্বশান্তি নিয়ে যে সব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের পাশাপাশি আমরা যদি কবিতাকে রাখি, কবিদের রাখি তাহলে দেখব তাঁরা কিন্তু অনেক আগেই এইসব লিখে গেছেন যেটা এখন থিয়োরি হিসেবে আসছে।

অংশুমান – হ্যাঁ, আর তাঁদের লেখাগুলোর মাধ্যমে মানুষে কাছে পৌঁছনোও সহজ হয়। নতুনদের সঙ্গে কেমন কাজ করতে চাও?

সুজয় – আমি আসলে নতুন প্রজন্মকে তৈরি করতে চাই। তাদের কবিতা পড়াতে চাই না আমি। আমি চাই তাঁদের শেখাতে, কীভাবে ভালো গল্প বলতে হয়।

চিত্রপরিচালক গৌতম ঘোষ একটা কথা বলেছিলেন আমার ইন্টারডিসিপ্লিনারি আর্ট সিলেকটিভের উদ্বোধনে এসে। উনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আজকে ক’জন শিল্প পরিচালক আর চিত্রকলার প্রদর্শনী দেখতে যান? এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমি কিন্তু এটা আমার কালেকটিভে করি।

অংশুমান – এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা।

সুজয় – আরও একটা জিনিস যেন আমি শেখাতে চাই। সেটা হল এই লিঙ্গ, ধর্ম, ভেদাভেদ এইগুলোর ঊর্ধ্বে গিয়ে শুধু মানবতা নয়, মানুষ যেন এমন একটা কিছু করে যাতে আর কোনও বৈষম্য না থাকে। যে বৈষম্যের সম্মুখীন আমাকে এখনও প্রতিটা ক্ষেত্রে হতে হয়। এইটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করবার সাহস, শক্তি বা শিক্ষা সকলের থাকে না। আমার কিন্তু সময় লেগেছে। পৃথিবীর যে কোনও জায়গায়, যে কোনও দেশে কিছু বৈষম্য থাকবেই। সেই বৈষম্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে তুমি কী ভাবে তোমার শিল্প করছো সেটাই বড় কথা। আমার এক কানাডিয়ান বান্ধবী, অভিনেত্রী। সে বলেছিল, “উই ক্রিয়েট আর্ট ইরেস্পেকটিভ অব হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং অ্যাট দ্য হোয়াইট হাউজ।” এর থেকে সুন্দর কথা আর হয় না। এর মধ্যে কিন্তু কোনও উদাসীনতা নেই। পালিয়ে যাওয়া নেই। আমরা কেউ রাজনীতির ঊর্ধ্বে নই। আমরা সবাই এক ভাবে রাজনৈতিক। কিন্তু রাজনীতির রাজনীতিকে গুরুত্ব না দিয়ে আমার মনে হয় আমাদের সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেটাকে আমরা বলি হিউম্যানিটি অব পলিটিক্স।

অংশুমান – খুব ভালো বলেছো। আগামী দিনে তোমার এই লক্ষ্য পূরণ হোক। তোমার লড়াই জারি থাকুক। আর গোটা পৃথিবীতে এই হিউম্যানিটি অব পলিটিক্স জয়ী হোক। অনেক শুভেচ্ছা তোমায়।

সুজয় – অনেক শুভেচ্ছা তোমাকেও।

Shares

Comments are closed.