শনিবার, মার্চ ২৩

‘মনে মনে দুটো জন্মই লাগে’

শুধু মিথ হতে পারত তাঁর কবিতাই। কিন্তু বাংলার ভাষার অন্যতম শক্তিশালী এই কবিকে ঘিরে ঘোরে অন্য মিথ। কতটা বাউণ্ডুলে ছিলেন তিনি। কতটাই বা বেখেয়ালি। কিন্তু সেই গাল-গল্পের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো যে তাঁর কবিতাই। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ে ৮৬ তম জন্মদিনে লিখলেন হিন্দোল ভট্টাচার্য। 

শুধুই ভবঘুরে নন তিনি। বা, নন শুধুই মাতাল। তিনি মানেই একগুচ্ছ গল্প, এক খাতা মিথ। কিন্তু কে খবর রাখে সেই সব ব্যক্তিগত এতোলবেতোলের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে কোন বাউল? কেন তিনি বাউল? কেন তিনি হাঁটতে হাঁটতে থমকে যান? কোথাও কি কাজ করে অন্তর্গত বিষাদ? যখন পুকুরের জলে তিনি দেখেন রক্তের সর, বা যখন চাকার বাতাসে ঝরাপাতা উড়ে যায়? সেই সব গল্পগুলির আস্তরণ সরিয়ে, ঝরাপাতা সরাতে সরাতে ঘন জঙ্গলের মধ্যে অন্য কোনও সময়ের অভিযাত্রীর মতো, যদি কেউ আবিষ্কার করেন নির্জনে ধুকপুক করতে থাকা আশ্চর্য শিলালিপিকে, তবে কি তিনি স্পর্শ করতে পারবেন না গুপ্তধনের আশ্চর্য ভাণ্ডার?

ধরে নিন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাই হল সেই গুপ্তধনের ম্যাপ। আর আপনি সেই আশ্চর্য অভিযাত্রী, যিনি আজ থেকেও একশো বছর পরে সময়, গল্প, কথন, অভ্যেস এবং মিথগুলির ঝরাপাতা সরাতে সরাতে খুঁজে পেয়েছেন পুরনো হয়ে যাওয়া, লাল রঙের, প্রায় ছিঁড়ে যাবে এমন সেই সব সম্পদ। আপনি জানেন না, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাজার করতে গিয়ে ভূটান চলে যেতেন, আপনি জানেন না তাঁর থেকে থেকেই মাতাল ও ভ্রমণকারী হয়ে ওঠার বোহেমিয়ান কাহিনিগুলি। আপনার জানার প্রয়োজনও নেই। আপনি পাঠক। আপনি খুঁজে পেয়েছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে। পড়ছেন তাঁর কবিতা। ধরা যাক, যে বইটি আপনি খুঁজে পেলেন, সেটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ। কী পড়ছেন আপনি? কাকে পড়ছেন আপনি? এ কী সেই সেভেন্থ সীলের ম্যাক্সভনসাইডো, যিনি মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে দাবা খেলতে চান? এ কী এমন এক শিশু, যিনি একই সঙ্গে তীব্র রোমান্টিক যেমন, তেমনি তীব্র উদাসীন। বুকের মধ্যে যেমন চিরকালীন আসক্ত প্রেমিক বসে আছে, তেমনই  বসে আছেন স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের উদাসীন সন্ন্যাসী। তিনি এত অস্থির, এত চঞ্চল, তবু অন্তরে এত স্থির কেমন করে? কীভাবে তিনি রচনা করছেন প্রথম কাব্যগ্রন্থেই বাংলা ভাষার অন্যতম মহৎ একটি কবিতা-

যে-মুখ অন্ধকারের মতো শীতল, চোখদুটি রিক্ত হ্রদের মতো কৃপণ করুণ, তাকে তোর মায়ের হাতে ছুঁয়ে ফিরিয়ে নিতে বলি। এ-মাঠ আর নয়, ধানের নাড়ায় বিঁধে কাতর হ’লো পা। সেবন্নে শাকের শরীর মাড়িয়ে মাড়িয়ে আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।

পচা ধানের গন্ধ, শ্যাওলার গন্ধ, ডুবো জলে তেচোকো মাছের আঁশগন্ধ সব আমার অন্ধকার অনুভবের ঘরে সারি-সারি তোর ভাঁড়ারের নুনমশলার পাত্র হ’লো, মা। আমি যখন অনঙ্গ অন্ধকারের হাত দেখি না, পা দেখি না, তখন তোর জরায় ভর ক’রে এ আমায় কোথায় নিয়ে এলি। আমি কখনো অনঙ্গ অন্ধকারের হাত দেখি না, পা দেখি না।

কোমল বাতাস এলে ভাবি, কাছেই সমুদ্র! তুই তোর জরার হাতে কঠিন বাঁধন দিস। অর্থ হয়, আমার যা-কিছু আছে তার অন্ধকার নিয়ে নাইতে নামলে সমুদ্র স’রে যাবে শীতল স’রে যাবে মৃত্যু স’রে যাবে। তবে হয়তো মৃত্যু প্রসব করেছিস জীবনের ভুলে। অন্ধকার আছি, অন্ধকার থাকবো, বা অন্ধকার হবো।

আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।  (জরাসন্ধ)

ছবি: তিতি রায় এর সূত্রে প্রাপ্ত

নাহ, কিছুতেই সম্ভব না, এই নির্জ্ঞানের সঙ্গে কথা বলে যাওয়া কবির কেবল বাহ্যিক রূপেই সন্তুষ্ট থাকা। কোথা থেকে এলো এই মৃত্যুচেতনা? মনের ভিতরে কি তবে গুনগুন করে বেড়াত এক অস্থির বাউল? ‘দূর হতে দেখি তব উড্ডীন শাল’ ! কার? কাকে দেখেছেন তিনি? কাকে বারবার দেখে ছুটে গেছেন শক্তি এক অচেনা আরশিনগরের দিকে? ‘আমার বন্ধু শক্তি’ শীর্ষক একটি লেখায় সমীর সেনগুপ্ত লিখেছিলেন- ‘ধরে নিয়েছিলাম শক্তি থাকবে চিরকাল, মানুষকে চিরদিন ভালোবাসবে, পশুপাখিকে ভালোবাসবে, গাছপালাকে ভালোবাসবে। হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দেবে, ওর বিরোধ সব শুধু ওর নিজের সঙ্গে, ও পালাতে চায় শুধুমাত্র নিজের কাছ থেকে—নিজে ছাড়া আর সকলেই ওর বন্ধু। সমস্ত মানুষের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠতা, অথচ ভিতরে ভিতরে এত সুদূর, এমন মানুষ আর দেখব না। সামাজিকতার সম্পর্ক পার হয়ে, বাক্‌ ও অর্থের হানাহানি শেষ হবার পর একটা জায়গায় শক্তির মতো নিঃসঙ্গ কেউ ছিল না, অমন অনুপস্থিত মানুষ আর কখনো দেখিনি।’ তবে কি আপনার দেখা হল এই শক্তির সঙ্গে? যে শক্তির ধূসর বিষাদের মধ্যেও ভালোবাসার কথা লিখে গেছেন? গেলেন কি আপনি শক্তির সেই আরশিনগরে, যেখানে তিনি সারাজীবন ধরে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন?

বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল

চিঠি-পত্রের বাক্স বলতে তো কিছু নেই – পাথরের ফাঁক – ফোকরে রেখে এলেই কাজ হাসিল-

অনেক সময়তো ঘর গড়তেও মন চায় ।

মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে

আমাদের সবই দরকার । আমরা ঘরবাড়ি গড়বো – সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো

রূপোলী মাছ পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে

একবার তুমি ভলবাসতে চেষ্টা করো । (একবার তুমি)

যে দেশে একটি মানুষের থেকে আরেকটি মানুষের দূরত্ব ক্রমশ বেড়ে যায়, অথচ একটি গাছের থেকে আরেকটি গাছের দূরত্ব বাড়ে না, যে দেশে দেখা হলে দেখা হয়, দেখা না হলে দেখা হয় না, সেই দেশ থেকে তিনি একটু দূরেই হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি তবু তো খুঁজে পাচ্ছেন না সেই আরশিনগরের ঠিকানা। তাহলে আপনি কীভাবে যাবেন? কীভাবে খুঁজে পাবেন শক্তিকে? তিনি কি তবে কবরের উপর পড়ে থাকা একটি নীরব ফুলের মতো পড়ে আছেন  রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের ঠিক মাঝখানে? অথচ তিনি তো এসেছেন পরে? সময় সব গুলিয়ে যায় মাঝেমাঝে? ঠিক, এই এত বছর পরে শক্তির কবিতা খুঁজে পেলে মনে হয়, তিনি জীবনানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যবর্তী এক সাঁকোর মতো। তিনি আধুনিকতা ও আবহমানতার মধ্যবর্তী এক সেতু। যা ক্রমশ দুলছে। কিন্তু ভেঙে পড়ে যাচ্ছে না। তিনি অনুভব করছেন এই সময়টা খুব একটা সুখের সময় নয়। এ সময়টায় ফুটপাথ বদল হয় মধ্যরাতে। নাহ, এটি এক মাতালের আত্মদর্শন নয়। বরং তার সমসাময়িক সময়ের কাফকাস্ক রূপকে তিনি প্রত্যক্ষ করছেন। কিন্তু কখনওই অনুভব করছেন না যে নিজে তিনি এক পোকার মতো। তিনি এই ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক সমসাময়িক   আধুনিকতার  অসুখে আক্রান্ত। কিন্তু নিজে সেই অসুখ নয়। তিনি লড়াই করছেন এই অসুখের বিরুদ্ধে। কারণ হেমন্তের অরণ্যে তিনি পোস্টম্যান। রাজনীতির উচ্চকিত কবিতা তাঁর কলমে ধরা দেয় না। কারণ তিনি অনন্ত কুয়োর জলে চাঁদ পড়ে থাকতে দেখেছেন। দেখেছেন মৃত্যুর মুখে কী অপরূপ জ্যোৎস্নার আলো পড়ে আছে। তাই সমসাময়িক যন্ত্রণা প্রতীকী ভাষ্যে তাঁর কবিতায় এক মিস্টিক জগতে  আত্মপ্রকাশ করছে। এত সবকিছুর মধ্যে তিনি লিখতে পারছেন   প্লাতেরোর কথ, লিখতে পারছেন- ভালোবাসা পেলে সব লণ্ডভণ্ড করে চলে যাব।

কখনও কি আবিষ্কার হবে শক্তির কাব্যভাণ্ডারের সেই রত্ন? হ্যাঁ, অনেক লিখেছেন তিনি। একপ্রকার কাব্যভাবনা আসে, যা শেখায়, যা কিছুই মনে আসছে, তা-ই লিখে ফেলতে নেই। মনের মধ্যেও রয়েছে এক ভাস্করের কুঠার। কিন্তু কে না জানে, তিনি তো স্বয়ং প্রকৃতির ঘরের লোক। প্রকৃতি এত কিছু সম্পাদনা করে যদি জগৎ সৃষ্টি করত, তাহলে হয়ত জগতের এত রসের , এত রূপের, এত আলো অন্ধকারের দেখা পেতামনা আমরা। শক্তি তো নিজে মহাকালজয়ী্  হতে চাননি। তিনি রূপের মধ্যে অরূপের সন্ধান করে গেছেন, যত ক্ষুদ্রই হোক না সেই রূপ। তিনি জানেন একটি ঘাসফুলের মধ্যেও অনন্তের নক্ষত্র জন্ম নেয়। আবার একটি নক্ষত্রের মৃত্যুতেও ঘাসফুল বিবর্ণ হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন তো কোনওকিছুই নয়। খণ্ড নয় কিছু। তিনি জানতেন, এই প্রকৃতিই হল সেই সম্পদ, যার মধ্যে অনন্তের সত্য লুকিয়ে আছে। হয়ত সেই সত্যকে দেখতে খুব সুন্দরী রূপসীর মতো নয়। বা, হয়ত সে সামান্য এক আলো। আলো আর অন্ধকার যেভাবে একে অপরের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে, তেমন সকলেই আছে বিচ্ছিন্ন হয়ে। মুখ ফিরিয়ে। তাঁকে তো কথা বলতেই হবে, সকলের সঙ্গেই।

মনে মনে বহুদূর চলে গেছি – যেখান থেকে ফিরতে হলে আরো একবার জন্মাতে হয়

জন্মেই হাঁটতে হয়

হাঁটতে-হাঁটতে হাঁটতে-হাঁটতে

একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি

পথ তো একটা নয় –

তবু, সবগুলোই ঘুরে ফিরে ঘুরে ফিরে শুরু আর শেষের কাছে বাঁধা

নদীর দু–প্রান্তের মূল

একপ্রান্তে জনপদ অন্যপ্রান্ত জনশূন্য

দুদিকেই কূল, দু’দিকেই এপার-ওপার, আসা-যাওয়া, টানাপোড়েন –

দুটো জন্মই লাগে

মনে মনে দুটো জন্মই লাগে  (মনে মনে বহুদূর চলে গেছি)

একশো বছর পরে এই সব আশা করি এই সব কবিতা আবিষ্কৃত হবে। সমস্ত ঝরাপাতাসুলভ গল্প-কাহিনি এবং মিথের আস্তরণ সরিয়ে কেউ না কেউ আবিষ্কার করবেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় নামক রত্নভাণ্ডারকে। প্রতিটি মূল্যবান সভ্যতার মতো তিনিও এখন চাপা পড়ে আছেন । প্রয়োজন প্রকৃত খনন।

হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।

Shares

Comments are closed.