শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

রাজনীতির জাতপাত

দেবেশ রায়

আমাদের বয়েসী যারা তাদের মুখে তো বটেই, এমন কি যারা এখনও পঞ্চাশ ছোঁয়নি, অর্থাৎ যাদের জন্ম প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়, ১৯৬৭ তে, তাদের মুখেও হাল হামেশা শুনি – ‘আমাদের রাজনীতির আর কোনও স্ট্যান্ডার্ড নেই, যেমন সব নেতা, তেমনি তাদের সব ক্যাডার, কোনও ভদ্রলোক আর রাজনীতি করে না।’

বেশ স্পষ্ট মনে করতে পারি কথাটা প্রথম উঠেছিল – মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন জনসভায় বক্তৃতা করে করে ও লোকসভায় ভোটে জিতে জিতে জননেত্রী হয়ে উঠেছেন।

সত্যিই কি তাই? রাজনীতির কি জাত আছে? বা থাকা উচিত?

এখন আমার দুটো ঘটনা মনে পড়ে, দুটোই প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৮৫ সালে নিখিল ভারত কংগ্রেসের জন্ম। ভারতবাসীর একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন। বছরে একটি করে অধিবেশন হয়। সারা ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আসেন।

কিন্তু দেশের মানুষজন, সব শ্রেনীর মানুষজনই, আরও বেশি কিছু চাইছিল। সেই চাওয়া থেকেই ‘প্রাদেশিক সম্মিলন’ শুরু হয় বাংলায়। প্রত্যেক বছর বাংলার কোনও জেলা শহরে প্রাদেশিক সম্মিলন সংগঠিত হতে শুরু করল। এটা সরাসরি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত না হলেও, প্রদেশের রাজনীতি নিয়ে এখানে খুব স্পষ্ট কথা হত, ও নানা রকম কথা হত। হাতাহাতিও হত।

তাঁর তিরিশ বছর বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ এই প্রাদেশিক সম্মিলনগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ঠাকুরবাড়ির অনেকেই ছিলেন। বিশ শতকের একেবারে গোড়ায় নাটোরে এই প্রাদেশিক সম্মিলন ডাকা হয়েছিল। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনারায়ণ ছিলেন অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি। আর সম্মিলনের সভাপতি ছিলেন সদ্য অবসর নেওয়া ভারতের প্রথম আই সি এস, রবীন্দ্রনাথের মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

জগদিন্দ্রনারায়ণ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জিগরি দোস্ত। দু’জন মিলে প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিলেন, সম্মিলনের সব কাজ, বক্তৃতা ও প্রস্তাব, বাংলাতে হবে। সে সম্মিলনে তো সারা বাংলার যে কোনও ধরনের রাজনীতিচেতন মানুষ এসে জড়ো হতেন কিন্তু তাঁদের অনেকেই বাংলায় বক্তৃতা করতে পারতেন না। ইংরাজি ছাড়া স্কুলেও পড়াশুনো হত না। মুনশেফ কোর্টেও মামলা হত না। একজন কাঠবাঙাল দিব্যি হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে আড্ডা মারছে বা একজন কেষ্টনগরের ঘটি ঘাটে বসে গায়ে তেল মাখছে – কিন্তু যেই তাকে জামা-কাপড় পরিয়ে দশজনে সামনে খাড়া করিয়ে দেওয়া হল, সে আর ইংরেজি ছাড়া জিভ নাড়াতে পারে না।

ফলে রবীন্দ্রনাথ-জগদিন্দ্রনারয়ণের প্রস্তাব কমিটিতে পাশ হলেও সম্মিলনে খুব গোলমাল বাঁধল – আরে ইংরাজিতে না বললে পলিটিক্স হবে কী করে? এমন কথাও রটল যে রবীন্দ্রনাথ নিজে ইংরাজি জানেন না বলেই এই প্রস্তাব পাশ করিয়েছেন (প্রশান্তকুমার পাল, ‘রবিজীবনী’ চতুর্থ খণ্ড)।

শেষে মিটমাট হল যে যাঁরা ইংরাজি ছাড়া বলতে পারেন না, তাঁদেরই বক্তৃতা রবীন্দ্রনাথ বাংলা করে দেবেন। কিন্তু সম্মিলনে ভাষা বাংলাই থাকবে।

সম্মিলনের মূল সভাপতি সত্যেন ঠাকুর ইংরেজিতেই বললেন। ডবলিউ সি বোনার্জি, কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি ইংরেজিতে বক্তৃতা শেষ করে রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘ডু ইয়োর চাষাজ অ্যান্ড ভুষাজ ফলো ইয়োর বেঙ্গলি মোর দ্যান মাই ইংলিশ?’ (প্রশান্তকুমার পাল, ‘রবিজীবনী’ চতুর্থ খণ্ড)।

দ্বিতীয় ঘটনাটা মহম্মদ আলি জিন্নাকে নিয়ে। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের একেবারে সবচেয়ে উঁচু সারির নেতা। গান্ধীজী ভারতে এসে আন্দোলন শুরু করার সময় (১৯২০) জিন্নাকে বলেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’। জিন্না ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক, সত্যিকারের ঐহিকতাবাদী, মুক্তমনা, বুদ্ধিজীবী, নমাজ পড়তে পর্যন্ত জানতেন না, নিষিদ্ধ মাংস খেতেন। তিনি যখন দেখলেন – গান্ধীজির আন্দোলনে সারা ভারতের চাষাভুষো এসে ছুটছে ও নেতা হিসেবে গান্ধীজি অপ্রতিরোধ্য, তিনি সোজা ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রিভি কাউন্সিলে প্র্যাকটিস শুরু করলেন আর কোনও একটা আসন থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ার জন্য টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। অনেক দিন পর পণ্ডিত নেহরু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কেন জিন্না কংগ্রেস ছেড়ে গেলেন, ‘কংগ্রেসের যে রূপান্তর ঘটে গেল বাপুর নেতৃত্বে সেটা ওঁর রুচি ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খেল না।’

আজকের রাজনীতির কোনও স্ট্যান্ডার্ড আছে কি না – এই প্রশ্নটার সঙ্গে এই দুটো গল্প বা সত্যিকারের ঘটনা একেবারে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়ানো।

পরাধীন দেশের স্বাধীনতা লাভের জন্য আন্দোলন থেকে যে রাজনীতি তৈরি হয়ে ওঠে, তার প্রধানতম ও একমাত্র উদ্দেশ্য – সশস্ত্র, ক্ষমতাবান ও বিদেশি শাসকের সমস্ত রকমের আদেশ নির্দেশের অধিকারকে অস্বীকার করার সাহস সংহত করা।

যে সব রাজনৈতিক পার্টি – কংগ্রেস থেকে শুরু করে সব বামপন্থী পার্টি – পরাধীন দেশের এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আকারগুলো (প্রচার, পোস্টারিং, জনসভা, গেদারিং, হরতাল)- কে এখনও অনুসরণ করে চলেছেন, তাঁরা ক্রমেই আবিষ্কার করছেন – তাঁদের পার্টি আছে, পার্টির সমর্থকও আছেন, কিন্তু তাঁদের কোনও কাজ নেই, প্রাসঙ্গিকতা নেই। যে কমিউনিস্ট পার্টি চল্লিশের দশকে নিজেদের দৈনিক পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’ বের করে বাংলা সাংবাদিকতাকে অন্য ধরনের সংবাদপত্রের পরিচয় দেখিয়েছিল তারাই এই সেদিন তাদের দৈনিক কাগজ ‘কালান্তর’ বন্ধ করে দিল। এর কারণ অর্থাভাব নয়। এর কারণ – নতুন রাজনীতি চিনতে না পারা।

এখন রাজনীতি করছেন অনেক বেশি মানুষ ও তাঁরা রাজনীতি করছেন প্রতিদিন তাঁর নিজের বাড়িতে বসে। প্রমাণ – অজস্র নতুন কাগজ বার হচ্ছে, এক একটা তেমন কাগজের সংস্করণ বেরচ্ছে পাঁচ সাতটি জায়গা থেকে তো বটেই, এমন কি ২২ টি জায়গা থেকেও (দি হিন্দু) বা ১০ টা জায়গা থেকে (দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস) বা একই মহানগর (মেট্রোপোলিস) –এর নিকটতম উপনগর থেকেও (দি হিন্দুস্তান টাইমস) বা দু’ধরনের সংস্করণ (দি টাইমস অব ইন্ডিয়া)। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য আঞ্চলিক টেলিভিশন চ্যানেল ও নিউজ পোর্টাল গুলো।  স্থানীয়  এটা নিশ্চয় অর্থনীতি বা ব্যবসার বিষয়। কিন্তু তার ভিত্তি কিন্তু রাজনৈতিক। প্রতিটি স্থানীয় ঘটনা দ্রুততম সময়ে জাতীয় ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। তার ওপর টিভি। পড়াশুনো বেড়েছে, শিক্ষা বেড়েছে, বৃত্তি বেড়েছে, জীবনযাপনের বিস্তার ঘটেছে, সামাজিকতার বিনিময় ঘটেছে, একজন গুজরাতিও একজন আসামি মুখোমুখি না হয়েও পরস্পরের জীবন জেনে ফেলছে।

ফলে, রাজনীতির পরিধিই রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। যে রাজনৈতিক দলগুলি আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করে, তারাই রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠছে। দিল্লিতে তো সব পার্টিরই সর্ব ভারতীয় অফিস ও ভবন আছে। কিন্তু সেই ‘সর্বভারতীয়’ নেতারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে ২০১৯-এর বিজেপি বিরোধী ফ্রন্ট তৈরি করতে পারছেন না। অন্ধ্রপ্রদেশের অভিজ্ঞ মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু অবিজেপি রাজ্যগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পরিধি কেন্দ্রে আসতে চাইছে – এটাই নতুন রাজনীতি।

এই নতুন রাজনীতির একটা খুব বড় সহায় আমাদের বিচার-ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, এমনকি সিবিআই-এর মতো সংগঠনগুলির স্বয়ম্ভর স্বাধীনতা। আবার #মিটু-র ঘূর্ণিঝড়ের মত সামাজিক আন্দোলন – এমন আন্দোলন কেন্দ্রীয় যা মন্ত্রিসভার সদস্যকেও পদত্যাগে বাধ্য করে। শস্যবীমা বা চাষের জন্য ব্যাঙ্কঋণ তো কত বছরের চাহিদা। কোনও সরকারের সাহস নেই এই দাবিগুলোকে এড়িয়ে চলা। কৃষকদের মহারাষ্ট্র জাঠা ও দিল্লি জাঠা প্রমাণ করে দিয়েছে: কৃষকরা ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে চাইছে।

তাহলে হিসেবটা সোজা হয়ে যায়। মেয়েরা বোধহয় আমাদের দেশের মোট ভোটার সংখ্যার ৪৯ শতাংশ। দলিতরা হয়তো ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। রাজনীতি সেখানে এসে পৌছেছে তাতে গুজরাতের পাতিদার ও হরিয়ানার জাঠরা দলিত হতে চাইছে, সংরক্ষণ চাইছে।

রাজনীতি রাজনীতিই আছে। তার ভাষা বদলেছে, তার পদ্ধতি বদলেছে। তাই পুরনো ধরনের পার্টি কাঠামো ভেঙে পড়ছে। কংগ্রেস এত পুরনো দল যে সে ধাক্কা সামলে নিচ্ছে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সাংসদ, বিধায়কদের লজ্জাটুকুও অবশিষ্ট নেই অন্য দলে গিয়ে নাম লেখাতে। ‘পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা, আর চলিবে না।’

আমরা রাজনীতির সেই ক্রান্তিবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছি যে ২০১৯ এর ভোটে বিজেপি সম্পূর্ন পরাজিত না হলে দেশের সংবিধান পর্যন্ত ওরা বদলে দেবে। আর, পরাজিত হলে আমাদের গণতন্ত্রের ভিত আরও অনেক গভীর স্থায়ী হবে। সম্ভবত তাই হবে। এই সম্ভাবনাকে সত্য করে তোলাই তো রাজনীতি। সেই রাজনীতিতে ভারত টগবগ করছে।

আমাদের তো অনেক অনেক দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলন। ফলে আমরা হিমালয়সদৃশ নেতা দেখেছি। মহাত্মা গান্ধী – তিনি দুনিয়ার মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নৈতিক জীবনের। জওহরলাল নেহরু – তিনি ভারতকে মাত্র আঠারো বছরে আধুনিক ভারতের অন্যতম নেতা করে তুলেছেন। বল্লভভাই পটেল – তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ আশ্রয় থেকে তাকে অধিকারচ্যুত করেছেন। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ – স্বাধীনতা গ্রহণের কঠিন মুহূর্তে যিনি ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি। আচার্য নরেন্দ্র দেব – যিনি সমাজতন্ত্রকে ভারতীয় ভাষা দিয়েছিলেন। নাম্বুদিরিপাদ – যিনি তাঁর তোতলামো সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষকে তাঁর জনসভার বক্তৃতার যুক্তিতে গেঁথে ফেলতেন। সুভাষ চন্দ্র বসু – অপরাজেয় ব্যক্তিগত সাহস ও শৌর্যে যিনি ছিলেন অর্জুনের মত। কামরাজ নাদার – যিনি তাঁর নীরবতা বাঙ্খয় করে তুলে পারতেন কর্মের তপে। পি সি জোশী যিনি প্রথম ভেবেছিলেন সাংস্কৃতিক রাজনীতির কথা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা।

এঁদের সঙ্গে এখনকার নেতাদের তুলনাটাই ভুল।

এই সময়ই এই সময়ের রাজনীতির নেতা তৈরি করে তুলছে।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

লেখক বাংলা ভাষার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক

Shares

Comments are closed.