শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

‘উইপোকারা’ও এখন দু’দল

জয়দীপ বিশ্বাস 

ভারতীয় জনতা পার্টির প্রবল পরাক্রমশালী সভাপতি অমিত শাহ গো-বলয়ের নির্বাচনমুখী রাজ্যগুলিতে প্রচারসভায় বারংবার নানা ভাবভঙ্গি ও ভাষায় অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়া মানুষদের গালমন্দ করেছেন। কখনও এই চল্লিশ লক্ষ লোককে ‘ঘুসপৈঠিয়ো’ (অনুপ্রবেশকারী) বলে সম্বোধন করেছেন তিনি। কখনও বা সোজাসাপটা তুলনা টেনেছেন উইপোকার সঙ্গে।

হিন্দু ধর্মে মানুষকে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ জীব মনে করা হয়। সেই মনুষ্যপ্রজাতির একাংশকে হিন্দুত্ববাদী দলটির সর্বাধিনায়ক যখন কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তখন তার কারণ থাকবে বইকী। এই উইপোকাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ক্রোধের ‘অমিত’ বিস্ফোরণের পিছনে একটি রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা থাকাও অস্বাভাবিক নয়।

সরকারি ভাবে আমরা কেউই জানি না, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির পূর্ণাঙ্গ খসড়ায় যে চল্লিশ লক্ষ স্থান পাননি, তাঁদের কতজন হিন্দু আর কতজন মুসলমান। একই ভাবে তাঁদের ভাষাগত পরিচিতিও আমাদের অজানা। জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত আবেদনপত্রে ভাষা বা ধর্ম জানানোর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ৩ কোটি ২৯ লক্ষ আবেদনকারীর ধর্ম ও ভাষাগত হিসেব স্বাভাবিকভাবেই সরকারি স্তরে উপলব্ধ নয়। বিগত তিন মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসমিয়াভাষী এবং রাজ্যে সুপ্রাচীনকাল থেকে বসবাসরত আদিবাসীদের নামও খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।  আমাদের স্বাভাবিক বুদ্ধি এটাও বলছে যে একজন ডিমাসা, বড়ো বা রাজবংশী মানুষের নাম বাদ পড়াটা নেহাতই অনিচ্ছাকৃত। অসমের ‘আদি-বাসিন্দা’দের ক্ষেত্রে কিছু আইনগত রক্ষাকবচ আছে। ফলে এঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অবশ্যই স্থান করে নেবে।  এটা আদৌ কোনও সমস্যার বিষয় নয়। তাছাড়া অসমিয়া এবং আদিবাসীদের মধ্যে এনআরসিতে নাম ওঠেনি এমন সংখ্যাটাও খুবই নগণ্য বলেই শোনা যাচ্ছে। ,ধারণা করাই যায় যে এনআরসি-ব্রাত্যরা প্রায় সবাই বাঙালি।

আরও পড়ুন: Breaking: অসমে নাগরিকপঞ্জি নিয়ে আপত্তি জানানোর সময়সীমা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়াল সুপ্রিম কোর্ট

গত ২৯ অক্টোবর মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ বাঙালি হেনস্থার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বেঙ্গলি ইউনাইটেড ফোরাম অব অসম (বুফা)-এর আনা একটি জনস্বার্থ মামলা নাকচ করে দেয়। রাজ্যের চোদ্দটি সংগঠনের যৌথমঞ্চ ‘বুফা’-র মামলায় কোনও সারবত্তা খুঁজে পাননি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি সঞ্জয় কৌল এবং বিচারপতি কে এম জোসেফের এজলাস। অর্থাৎ, অসমে বিদেশি বিতাড়ন এবং এনআরসি নবীকরণের নামে কার্যত বাঙালিরা হেনস্থার শিকার হচ্ছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটিই বস্তুতপক্ষে বাঙালি বিরোধী অভিযান এমন অভিযোগ করাই এখন প্রকারান্তরে আদালত অবমাননার সমার্থক হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গোটা এনআরসি নবীকরণ প্রক্রিয়াটিই উচ্চতম আদালতের উৎসাহে এবং প্রত্যক্ষ নজরদারি ও সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধীন ভারতবর্ষে জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম বা বিচারব্যবস্থার তৎপরতার অনন্য নজির হয়ে থাকবে অসমের এনআরসি অধ্যায়। আইনসভা ও সরকারের কোনও ভূমিকাই এনআরসি-সংক্রান্ত নীতি গ্রহণে আর স্বীকৃত নয়।

আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা সব সময়েই সন্দেহের ঊর্ধে রাখা হয়। বিচারকদের ধর্ম, ভাষা, জাত বা লিঙ্গভিত্তিক পরিচিত ন্যায় পালনের ক্ষেত্রে কখনই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, এমনটাই আমাদের বিশ্বাস। তাই যে এজলাসে অসমের নাগরিকত্ব – এনআরসি এবং সমজাতীয় মামলাগুলোর শুনানি চলছে এবং বিভিন্ন রায় বার হচ্ছে,সেখানে বিচারপতির অসম সংযোগও কিন্তু বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করায়নি। বরং দেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতিতে যে আইন ও ন্যায় বিচারের প্রসঙ্গে অটল সে কথাই বারংবার উঠে এসেছে।  অসমের বাঙালিরা এখনও দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ন্যায়ব্যবস্থার ওপর গভীর আস্থা রেখে তার জাতীয় জীবনের এই তীব্র সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রহর গুনছেন।

আরও পড়ুন: নাগরিকতা জট: আতঙ্কে আত্মহত্যা অসমের বাঙালিদের, আইনি জটে প্রশাসন

১ নভেম্বর, সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চের সিদ্ধান্তও আশা বাড়িয়েছে এই এনআরসি-ছুটদের। এবার থেকে আবেদন করার বেলায়, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির, অসমের সঞ্চালক প্রতীক হাজেলার ফরমানে বর্জিত পাঁচটি নথি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন তাঁরা। জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে নাম না উঠলে, সেই নিয়ে অভিযোগ জানানোর সময়সীমাও ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ অবধি বাড়িয়েছে আদালত।

কিন্তু এই আইনি জটিলতার মধ্যে পড়ে রাজ্যে এনআরসি-ব্রাত্য বাঙালিদের অবস্থা খুবই করুণ। ১৯৯৭ সাল থেকে নির্বাচন আয়োগের এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তের ফলে ‘ডি’ বা ডাউটফুল অর্থাৎ সন্দেহভাজন এক ভোটার শ্রেণী তৈরি করা হয়েছে। বলাই বাহুল্য, এরা সবাই বাংলাভাষী।

সম্পূর্ণ সন্দেহের বশে পুলিশ যাকে তাকে সম্ভাব্য বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করছে। ২০০৫ পর্যন্ত ইলিগ্যাল মাইগ্র্যান্ট ডিটারমিনেশন বাই ট্রাইবুনাল, সংক্ষেপে আইএমডিটি আইন বহাল থাকার ফলে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হত যে অভিযুক্ত সত্যিই বিদেশি। কিন্তু ওই বছর রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, সেই সময়ের আসু নেতা, সর্বানন্দ সোনোয়ালের দায়ের করা মামলায় সর্বোচ্চ আদালত এই আইনটি খারিজ করে দেয়। বিগত তেরো বছর ধরে তাই বিদেশি আইন ১৯৪৬ এর মাধ্যমে রাজ্যে বিদেশি বিতাড়নের প্রক্রিয়া চলছে। এই পদ্ধতিতে অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হয় তিনি নির্দোষ, অর্থাৎ ভারতীয়। অভিযোগ উঠছে, এর ফলে হেনস্থা বেড়েছে চতুর্গুণ। বিদেশি নোটিস এবং ডি নোটিস এই দুই ক্ষেত্রেই কোনও প্রাথমিক তদন্ত সে ভাবে করা হয় না। অনেকের মতেই, সম্পূর্ণ খেয়াল খুশি মতো গণহারে যাকে তাকে বিদেশি বলে দেগে দিচ্ছে পুলিশ। সহায়সম্বলহীন নিরক্ষর লোকজনরাই এই ব্যবস্থার শিকার হন বেশি। কারও কারও মতে এটাও এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। শোনা যায়, প্রায়শই অপরাধী তার অপরাধ জানতেই পারে না, তার আগেই নাকি বিচার সারা হয়ে যায়। অভিযোগ উঠছে, এক তরফা রায়ে বিদেশি বলে ঘোষিত হচ্ছেন হাজার হাজার বাঙালি। সাংবাদিক অরিজিৎ আদিত্য এই নিয়ে একটা বই লিখেছেন – ‘ডি রাষ্ট্রই যখন নিপীড়ক’। উল্লেখযোগ্য, এই বইয়ের প্রথম কপিটি তিনি তুলে দিয়েছিলেন সদ্য প্রাক্তন বাঙালি রাষ্ট্রপতির হাতে। কিন্তু তারপরও অসমের বর্তমান অবস্থার কোনও হেরফের হয়নি।

ডি-র সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এনআরসি-আতঙ্ক। বেসরকারি হিসেব বলছে, অন্তত তিরিশজন আত্মঘাতী হয়েছেন ডি এবং এনআরসি সন্ত্রাসে। মৃত্যু মিছিলের নতুন পদাতিক হলে নামনি অসমের ওদালগুড়ির দীপক দেবনাথ। অক্টোবর মাসেই উপায়ন্তর না পেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন দলগাঁওয়ের নীরদবরণ দাস।

এই চরম মানবিক সংকটের ক্রান্তিকালে অসম এখন ভাষা ও ধর্মের নামে শতধাবিভক্ত। বিজেপি খুড়োর কল ঝুলিয়ে দিয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। এতে বাঙালি হিন্দুরা ভাবছেন, তাদের আর চিন্তা কী? এনআরসিতে নাম নাই বা উঠল, এই বিল আইনে পরিণত হলেই নাগরিকত্বর হরির লুঠ আটকায় কে? ফলে বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের অরক্ষিত ভাবছেন।

অসমিয়া জাতীয়তাবাদী শিবির ধর্ম বিভাজনে বন্দি বাঙালির এই অবস্থা দেখে খুবই উল্লসিত। অসম আন্দোলন পরবর্তী তিন দশকে রাজ্যে অসমিয়া বাঙালি সম্পর্ক যথেষ্ট মজবুত চেহারা নিয়েছিল। আশির দশকের তিক্ততা ও হিংসার আবহাওয়া মিলিয়ে গেছিল। কিন্তু এনআরসি ও বিল রাজনীতি আবারও বরাক-ব্রহ্মপুত্রের ব্যবধান বাড়িয়ে দিতে অনেকটাই সফল হয়েছে। তারপরও, এখন অবধি স্বস্তির চিহ্ন এটাই যে সাধারণ অসমিয়া-বাঙালি মানুষ রাজনীতি ও অসমিয়া প্রচার মাধ্যমের একাংশের উস্কানিতে প্ররোচিত হননি।

তবে ধর্মীয় বিভাজনের কৌশল অনেকটাই সফল হয়েছে। অমিত শাহ যখন উইপোকাদের এদেশ থেকে তাড়ানোর হুংকার দেন, তখন হিন্দু উইপোকারা ভাবেন, ভয় পাবে তো মুসলমান উইপোকারা। প্রশ্ন হচ্ছে, রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশে অসমের উইপোকারা গুরুত্ব পায় কেন? উত্তরটাও খুব সহজ। বিজেপি-প্রধান এই বার্তাই দেবেন যে, ফের ক্ষমতায় এলে দেশ থেকে মুসলমান উইপোকা তাড়াব। রাজ্যে রাজ্যে এনআরসি হবে। দিলীপ ঘোষ তাই থেকে থেকে শাসানি দিচ্ছেন, এবার এনআরসি হবে পশ্চিমবঙ্গে। এতে ভাগ্যবিড়ম্বিত দেশভাগের শিকার বাঙালি হিন্দুদের অনেকেই চরম পুলক অনুভব করেন। নিজের নাক না হয় কাটলই, ‘ওদের’ যাত্রা তো ভঙ্গ হবে!

অসমের সামাজিক বিভঙ্গের বর্তমান বিন্যাস চার্লস ডিকেন্সের ‘আ টেল অব টু সিটিজ’ উপন্যাস মনে করায়। ডোভারগামী ডাকগাড়ি রাতের অন্ধকার চিরে এগিয়ে চলছে। রক্ষী সন্দেহ করছে যাত্রীদের। প্রত্যেক যাত্রী আবার সন্দেহ করছে অন্যদের। কোচোয়ান বিশ্বাস করছে শুধু তার ঘোড়াদের। দুঃখ এটাই, অসমে এই মুহূর্তে দুটো বিশ্বাসী ঘোড়াও যে নেই!

মতামত  লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক শিলচর কাছাড় কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক

Shares

Comments are closed.