শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

ব্লগ : সান সিমোন থেকে

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার এবারের এস্পানিয়ার নিমন্ত্রণ ছিল দুরকম, প্রথমত নিজের কবিতার বই প্রকাশ, আর ছিল সে দেশের অতলান্তিক উপকূলের ছোট্ট দ্বীপ সান সিমোন-এ বহুভাষী কবিতা অনুবাদ প্রকল্পে অংশগ্রহণ করা।

এই দ্বিতীয় অংশটাই রোমহর্ষক। এখন সারা দুনিয়া জুড়েই কবিরা পরস্পরের কবিতা অনুবাদ করেন, তার নানা কর্মশালা হয়, আমি নিজে এর আগে এরকম দুটি প্রকল্পে ছিলাম। কিন্তু এবারেরটা ভীষণ অন্যরকম। আমরা ৬ জন কবি,  টিমো বেরগের (জার্মানি, জার্মান ভাষা), শোসে মারিয়া কাক্কামো (এস্পানিয়া, গালেগো ভাষা), মিরেনাগুর মেয়াবে (এস্পানিয়া, ইউস্কেরা ভাষা), হোসালিস ব্রাঙ্কো (পর্তুগাল, পর্তুগিজ ভাষা), আব্দুল হাদি সাদউন (ইরাক, আরবি ভাষা), আর আমি এস্পানিওল ভাষার মারফৎ পরস্পরের ছটা কবিতা অনুবাদ করলাম পরস্পরের ভাষায়। দু’মাস আগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল কবিতাগুলো, আমাদের কাজ ছিল সান সিমোন দ্বীপে বসে সেই কবিতাগুলো পালিশ করে অনুবাদের সঠিক পাঠের কাছে পৌঁছনো। সেই চমৎকার কাজের অভিজ্ঞতার বাইরেও এক বিরাট দুনিয়ার কথা আজ বলব, সান সিমোন দ্বীপের কথা।

অতি প্রাচীন সময় থেকে এই ছোট্ট দ্বীপটা আদি গালায়েসিয়া রেগনুম বা গালিসিয়া দেশ বা আজকের এস্পানিয়া ও তার অঙ্গরাজ্য গালিসিয়ার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গা দখল করে আছে। এখানে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকের মধ্যে এসেছিলেন গালিসিয়ার ত্রবাদুর কবি মেন্দিনিও। এখানেই তিনি রচনা করেন তাঁর কান্তিগা বা কবি-গান। কিন্তু এই জনমানবহীন দ্বীপ (যা আসলে ২০০ মিটার লম্বা ও ৮৪ মিটার চওড়া) বিশ শতকে এসে সম্পূর্ণ অন্য চেহারা নেয়। এস্পানিয়ার স্বৈরাচারী সেনা-শাসক ফ্রাঙ্কো এই দ্বীপকে তাঁর কনসেনট্রেশান ক্যাম্প-এ পরিণত করেছিলেন।

১৯৩৯ সাল থেকে শুরু করে পাঁচের দশক অব্দি চলেছিল সেই ক্যাম্প। সেখানে ধরে আনা হত গালিসিয়া তথা এস্পানিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে বামপন্থী মানুষদের। এই দ্বীপে রাখা হত মূলত পুরুষদের। ফ্রাঙ্কোর এক পদ্ধতি ছিল এক বামপন্থী পরিবারের একজন পুরুষকে মেরে পাড়ার রাস্তায় ফেলে যাওয়া। তারপর গোটা পরিবারের লোকের উপর নজর রাখা। আমাদের জানাচ্ছিলেন শোসে কাক্কামো। তাঁর নিজের বাড়িতেই হয়েছে নানা ঘটনা। তাঁর বাবাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল গালিসিয়ার বাইরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে। পঞ্চাশের দশকের শিশু দেখেছিল স্বৈরতন্ত্রের থাবা। যদিও তিনি লিখতে শুরু করেন এস্পানিওল বা কাস্তেইয়ানো ভাষায় পরে ফিরে যান মাতৃভাষা গালেগোতে। আজ তিনি সে ভাষার এক প্রধান কবি। গোটা এস্পানিয়া তাঁকে শ্রদ্ধা করে, গালিসিয়া রাখে সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে। সম্ভ্রমে তিনি শঙ্খ ঘোষ, রসিকতায় তিনি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। আমাদের কর্মশালার নানা ফাঁকিবাজির ছলে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন দ্বীপ ও তার ইতিহাস।

দ্বীপে আমাদের থাকার আস্তানা। ( casa de cultura)

এই দ্বীপে যেমন অন্ধকার স্বৈরাচারের ছাপ আছে তেমনই আছে জুল ভের্নের স্মৃতি। এবং তার পিছনে আছে সেই উপনিবেশের কালের ষোড়শ শতকের স্প্যানিশ আর্মাডা। কথিত আছে যে একবার ইংরেজ ও ওলন্দাজদের তাড়া খেয়ে রূপো ভর্তি জাহাজ নিয়ে আর্মাডা মূল অতলান্তিক ছেড়ে ঢুকে পড়ে গালিসিয়ার খাঁজে। খাঁড়িতে। বড় জাহাজ সেখানে না ঢোকায় বেশ কিছু নৌকায় করে নিয়ে আসা হয় রূপো এই সান সিমোন দ্বীপের দিকে। কিন্তু খাঁড়ি হলেও অতলান্তিক তো! নৌকা ডুবে যায়। সঙ্গে তার রূপো। আর শুরু হয় সেই নিয়ে কাহিনির বয়ান। জুল ভের্ন Twenty thousand leagues under the sea লেখার সময় আসেন এই খাঁড়ির উল্টোদিকের প্রাচীন শহর বিগো-তে। সেই উপন্যাস এ পাওয়া যায় কীভাবে ক্যাপ্টেন নিমো উদ্ধার করেন সেই রূপো। আজ জুল ভের্নকে দেখা যায় মূর্তিরূপে। খাঁড়ির উপর। মাথায় জ্যান্ত সিগাল। এই দ্বীপ বর্তমানে ব্যবহার হয় এই ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। দুটি মাত্র বাড়ি। আর যন্ত্রণার স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে তৃতীয়টি। কনসেনট্রেশান ক্যাম্প।

এমন এক ভারী পরিবেশে আমাদের কাজ পরস্পরের কবিতা অনুবাদ করা, মেপে নেওয়া পরস্পরের অন্ধকারকে। স্থানাঙ্ক নির্ধারণ করে সেইসব প্রতিবাদী মানুষদের সঙ্গে নিঃশ্বাস নেবার।

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Shares

Comments are closed.