ব্লগ: পরীর দেশে বন্ধ দুয়ার দিই হানা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অংশুমান কর

চায়ের দোকানের চেয়ে বড় রূপকথা বাঙালির জীবনে আর নেই। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যে, রবীন্দ্রনাথের “কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা” গানটা আসলে ছোট্ট চায়ের দোকানকে নিয়েই লেখা। যারা বোঝার তারা বোঝে। যে রূপকথার কথা ওই গানটিতে বলা আছে, চায়ের দোকানের কল্যাণেই মাঝে মাঝেই সেই রূপকথার ভেতরে আমিও প্রবেশ করেছি বই কি! ব্যাঙ্গমা, ব্যাঙ্গমী আমাকে পথ বলে দিয়েছে। দেখা পেয়েছি রাজপুত্র, রাজকন্যার।

ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী’র সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্পটা আগে বলি। গিয়েছি বোড়োল্যান্ড কবিতা উৎসবে। আমি, মৃদুল দাশগুপ্ত, আর তরুণ কবি পলাশ দে। উৎসবের পরের দিন উদ্যোক্তারা ঠিক করলেন যে, আমাদের একটি জলাশয় ঘিরে তৈরি হওয়া পার্ক দেখাতে নিয়ে যাবেন, মৃদুলদাকে খাওয়াবেন এক স্বর্গীয় সুরা জৌথাং। সেই মতো একটি গাড়িতে করে আমরা চলেছি। দু’পাশে জঙ্গল। তার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে পথ। এমনই পরিবেশ যে, আমার মনে হচ্ছিল ধারে কাছেই কোথাও একটা আছে নন্দনকানন আর পারিজাত পুষ্প। মদ্যে আমার আগ্রহ নেই, মানুষের বানানো পার্কেও তেমনটা না। তাই মন চাইছিল জলাশয়-সংলগ্ন পার্কটিতে না গিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে চলে যেতে ওই নন্দনকানন, কিন্তু পথ বলে দেবে কে? হঠাৎ চোখে পড়ল ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। চারটি খুঁটির মাথায় কালো পলিথিন। আর একটি টেবিলের ওপর চা বানানোর সামান্য সরঞ্জাম। ব্যাস, আর কিছুই নেই। চা বানাচ্ছেন এক পৃথুলা ভদ্রমহিলা, তাঁকে সাহায্য করছেন এক প্রৌঢ়। আমার ওদের দেখেই মনে হয়েছিল আরে, এই তো ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী! নন্দনকাননের পথ তো এঁরা জানেন। বড় ইচ্ছে ছিল ওই দোকানটিতে দু’দণ্ড বসি। এক পেয়ালা চা খাই। আর নন্দনকাননের পথ শুধিয়ে নিই। তা আর হয়ে ওঠেনি। তাড়া ছিল আমাদের। কোনপথে গেলে পাওয়া যাবে পারিজাত পুষ্পের দর্শন—সে কথা আর জানা হয়নি। দূর থেকে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীকে দেখেই ক্ষান্ত হতে হয়েছিল সেদিন। জীবনের সবচেয়ে বড় বড় না-পাওয়াগুলির মধ্যে এটি একটি। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সঙ্গে কথা বলতে না-পারার সেই দুঃখ আমার আজও যায়নি।

রাজকন্যার সঙ্গে অবশ্য দু’কথা বলতে আমি পেরেছিলাম। রাজকন্যার দেখা পেয়েছিলাম সেই কবিতা পড়তে গিয়েই। সেবার সাহিত্য অকাদেমির অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমরা অনেকে গেছি গ্যাংটক। আমার রুমমেট শ্রীজাত। আমরা রুমে ঢোকা মাত্র ঘটল এক বিপত্তি। কী এক নাম না-জানা পতঙ্গ হুল ফুটিয়ে দিল শ্রীজাতর আঙুলে। ব্যথায় যখন ছটফট করছে ও, তখন শিবাশিসদা আর পিনাকীদার ঘর থেকে একটি মলম নিয়ে এসে প্রাথমিক শুশ্রূষা করলাম। সাহায্য করলেন হোটেলের স্টাফেরাও। যন্ত্রণা একটু কমলে মুষড়ে পড়া শ্রীজাতকে নিয়ে আমি আর পিনাকীদা বেরোলাম চারপাশটা একটু ঘুরে দেখতে। তখনই দেখা পেলাম রাজকন্যার। আমাদের হোটেলের থেকে প্রায় ঢিল ছোড়া দূরত্বে ছোট্ট এক চায়ের দোকানে। সে নিজেই চা বানাচ্ছে, বিক্রি করছে মোমো। পার্থিব কোন বস্তুর সঙ্গেই তুলনীয় নয় তার রূপ। আমার মনে হয়েছিল ওই রাজকন্যাই নন্দনকাননের পারিজাত পুষ্প। সে পুষ্পের সৌরভ নিতে যে শ্রীজাত কফি আর চায়ের মধ্যে বাছতে গেলে সব সময় বেছে নেয় কফি, সেও যে কত কাপ চা খেয়েছিল ওই ছোট দোকানটিতে তার হিসেব করা মুশকিল। যে আমি দিনে তিন কাপের পর চতুর্থ কাপ চা সামনে ধরা হলে নির্ঘাত ঘুরিয়ে নিই মুখ সেই আমিও যে কতবার হানা দিয়েছিলাম ওই ছোট্ট চায়ের দোকানটিতে কোনও পাটিগণিত সে হিসেব করতে পারবে না! দুঃখের এই যে, ওই রাজকন্যার নামটি জানা হয়নি। অবশ্য রাজকন্যারা তো রাজকন্যাই, নামের খাঁচায় তাদের বন্দী করলে তাঁরা তখন শুধুই ‘কন্যা’ হয়ে পড়েন।

আরও পড়ুন : নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হল 

যে রাজপুত্রের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে তার নাম অবশ্য আমি জানি। তিনিও চা বানান। তার নাম ‘ময়না’। তার লিঙ্গ পরিচয় না দিয়ে একদিন আমার সহকর্মীদের কাছে প্রশংসা করছিলাম তার বানানো চায়ের। আমাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড় অভিভাবক-তুল্য নন্দিনীদি জিজ্ঞেস করল, ভদ্রমহিলার চায়ের বিশেষত্বটা কী? আমি ওর ভুল সংশোধন করে বললাম, উনি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা নন; ওর আসল নাম শেখ মইনুদ্দিন। মইনুদ্দিনই কখন হয়ে গেছে ময়না। তো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ময়নার ছোট্ট চা দোকানটিতে আমাকে প্রথম নিয়ে যান নিয়াজুলদা। এবং একথা মানতেই হবে যে, পৃথিবীর কোনও চায়ের দোকানে ময়নার বানানো চায়ের স্বাদ আমি পাইনি। কী যে জাদু আছে ওর হাতে কে জানে! ওর করস্পর্শে চা মুহূর্তে হয়ে ওঠে অমৃত। ওর বাবা দুখু মিঞার কাছ থেকে কিশোর বয়সেই ও পেয়েছিল চা বানানোর পাঠ। তারপর নিজেও নিজেও পাঠ নিয়েছে খানিক। ট্র্যাডশিন আর ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্টের অপূর্ব সংমিশ্রণে তাই সারাদিন ধরে ওর দোকানে সবসময়ই সমান ভিড়। ওর কাছেই জেনেছি যে, ছোট্ট ওই দোকান থেকে সারাদিনে বিক্রি হয় কয়েক হাজার টাকার চা আর টোস্ট। কী উপায়ে ওর চা হয়ে ওঠে অমৃত তা ময়না আমাকে জানায়নি, তবে বলেছে, আছে কিছু গূহ্য পদ্ধতি, যা কিনা ট্রেড সিক্রেট, তাই বলা যাবে না। আর বলেছে যে, ভাল চা বানাতে সবচেয়ে আগে লাগে একটা ভাল ‘মন’। একদিন দেখলাম, ময়নাকে সাহায্য করছে মাথায় নীল রঙ করা চুলের একটি ছেলে। জিজ্ঞেস করলাম, ময়না, ও বুঝি তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট? দ্রুত উত্তর এল ময়নার, আমার কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই, ও আমার কর্মচারী। শুনে মনে হল, আরে, এ কার সঙ্গে কথা বলছি, শীর্ণ চেহারার এই পুরুষটির মাথায় তো রয়েছে এক লুকোনো উষ্ণীষ। এ তো সাধারণ মানুষ নয়, মেজাজে এ তো নবাবের সন্তান, এক রাজপুত্র!

আরও পড়ুন : ব্লগ ব্লগ : প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম

তবে চায়ের দোকানের রূপকথার গল্পের নটেগাছটি মুড়োবে না, যদি না আমি আমার গ্রাম বেলিয়াতোড়ের টিমটিমে আলো-জ্বলা চায়ের দোকানগুলির কথা বলি। সেইসব দোকানে একসময় আড্ডা দিতাম আমরা, মানে রাজকল্যাণ চেল, সুব্রত চেল, প্রণব চট্টোপাধ্যায়, প্রবীর দত্ত, নয়ন রায়, প্রলয় মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ হালদার, অসিত দাসরা। পরে যুক্ত হয়েছিল স্বরূপ, আনন্দ,সুদীপ, তিমির। কত কত পরিকল্পনা যে হত ওই আড্ডাগুলিতে। সেসব পরিকল্পনার অবশ্য অর্ধেকই রূপায়িত হয়নি। তবে রূপায়িত না হওয়াতেই ছিল ওই পরিকল্পপনাগুলির গৌরব। রূপায়িত হয়ে গেলে সব স্বপ্ন তো আর স্বপ্ন থাকে না। তখন আর তাদের গায়ে লেগে থাকে না রূপকথার মিঠে কুয়াশা। সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই তো এরকম অযুত-নিযুত চায়ের দোকান ছড়িয়ে রয়েছে যেখানে বসে বসে মানুষ বড় বড় দুই চোখ নিয়ে আজও স্বপ্ন দেখে, রূপকথা বোনে। বড় চেনের সুসজ্জিত চায়ের দোকানগুলি আজ আমাদের জীবনযাপনের অংশ হয়ে গেছে ঠিকই, তাদের এড়ানো আজ হয়তো আমাদের পক্ষে অসম্ভবই, তবে এইসব সুসজ্জিত চায়ের বিপণি নয়, আমার চিরকালই মনে হয় যে, টিমটিমে আলো-জ্বলা ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই আমাদের স্বপ্নের উড়ানের বাহন, ঠিক যেন এক পক্ষীরাজ ঘোড়া। তার পিঠে চড়েই তো আমরা বারবার পরীর দেশের বন্ধ দুয়ারে হানা দিই।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।  

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More