শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

‘আমি, অনুকূলদা আর ওরা’: নাটকের পরতে মনস্তত্ত্বের জটিলতা

শমীক ঘোষ 

কন্যাভ্রূণ হত্যার দেশে বাবাকে খুন করতে আসছে তারই না জন্মানো সন্তান। তার সঙ্গী স্বয়ং ঈশ্বর।

আয়রনি। আশ্চর্য আয়রনি। গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো আয়রনি।

মঞ্চ জুড়ে দু’টো ঢাউস মশারি। পিছনের স্ক্রিনে প্রায় বিমূর্ত ভিডিওর অবিরাম আসা-যাওয়া। মঞ্চের এক কোণে একটা হাসপাতালের বেড। তাতে সারা গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা এক মরণাপন্ন রোগী।

অ্যাক্সিডেন্টে মারাত্মক জখম হয়েছে সে। বাঁচার কোনও আশা নেই।

সব কিছু আছে তার। সাধারণ মানুষ যা চায়। অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি। অথচ এইগুলো পেতে গিয়ে জীবনের সব কিছুই হারিয়েছে সে। তাই এই হাসপাতালের বেডে কেউ দেখা করতে আসে না তার সঙ্গে।

সর্বগ্রাসী এই মৃত্যুর অনুষঙ্গেই শুরু হয় ব্রাত্য বসুর লেখা, অভি চক্রবর্তীর নির্দেশিত নাটক, ‘আমি, অনুকূলদা আর ওরা।’

জীবনের চরম সত্য হল শেষ অবধি নিশ্চিত মৃত্যুতে পৌঁছোনো। আর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হল, সেই মৃত্যুকে বারবার অতিক্রম করে চলা। এই অস্তিত্ববাদের যথার্থ প্রেক্ষাপট তো আইসিইউ-এর বেডই হতে পারে। কিন্তু মনুষ্যজীবনের রহস্য তো শুধু এটাই নয়। তার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে মনস্তত্ত্বের জটিল সংঘাত।

মরণাপন্ন সেই রোগীর (সোমেশ) মনস্তত্ত্বই যেন অভিনীত হতে লাগল ডাউন স্টেজে। বাস্তবকে মুছে দিয়ে অবাস্তব, অতিবাস্তবের এক আখ্যানে। এক দিকে পাপবোধ, গ্লানি আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষের দুর্দমনীয় জীবনীশক্তি-– বেঁচে থাকার, জিতে নেওয়ার অফুরান ইচ্ছেয় সে সব কিছুকে মুছে দিয়ে মানুষের নিজের নির্মিত যুক্তিকাঠামো। এই দুইয়ের বৈপরীত্য কিংবা দ্বৈত।

জটিল, মনস্তাত্ত্বিক অথচ প্রায় কবিতা হয়ে ওঠা এই আখ্যানের জন্য নির্দেশক অভিও বেছে নিলেন চমৎকার এক ডিজাইন। গোটা নাটকেই বেশির ভাগ সময় ধরে স্টেজে কেবল দু’জন অভিনেতা, স্টেজের কোণায় শুয়ে থাকা মরণাপন্ন রোগীকে বাদ দিলে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম স্টেজে ‘গোডো’ বা ঈশ্বরের আগমনের দৃশ্য ছাড়া। ভ্রূণ অবস্থাতেই বাবার জন্য খুন হয়ে যাওয়া মেয়ের সঙ্গে সেই সময় মঞ্চে উপস্থিত থাকেন ঈশ্বরও। শুভ-অশুভে, পাপ–শাস্তির কী আশ্চর্য একটা মুহূর্তের বুনোট তৈরি করে ফেলেন ব্রাত্য।

সোমেশের সঙ্গে প্রথম দেখা করতে আসে তার এক সময়ের পরিচিত অনুকূলদা। সাধারণ ভাবে শুরু করার পর হঠাৎ কখন যেন সম্পূর্ণ অন্য মোড় নেয় এই চরিত্রটা। ধর্মগুরু হয়ে উঠতে চাওয়া অনুকূলদার কথাগুলি কোথাও যেন সাধারণ মানুষের খুব চেনা ধর্মের ধারণাকেই শ্লেষে বিদ্ধ করে। আসলে এখানে অনুকূল যেন সোমেশের নিজেরই ধর্ম চেতনা। কারণ তখনও পাপবোধে সম্পূর্ণ ভাবে জারিত হয়নি সে।

ঠিক একই ভাবে শিহরণ জাগে যখন না-জন্মানো সেই মেয়েই বাবাকে যৌনতায় প্রলুব্ধ করতে চায়। তাকে না জন্মাতে দেওয়া বাবার বিরুদ্ধে এটাই যেন তাঁর এক অন্য জেহাদ। আবার পর ক্ষণেই মনে হয়, এ যেন চরম ফ্রয়েডিয় এক মনস্তত্ত্ব। যেখানে গভীর অচেতনে কোনও দায় নেই, সমাজের বানানো নিয়মের তোয়াক্কা করার।

প্রথম পর্বের একদম শেষ দৃশ্যে মেয়ে যখন তাঁর জামা খুলে ফেলে, মনে হয় যেন ব্যান্ডেজের মোড়া না জন্মানো ভ্রুণই তরুণী হয়ে উঠেছে। যৌনতা ও অপরাধবোধের মিশেলে এইখানে এক অনবদ্য মুহূর্ত তৈরি করেন নির্দেশক অভি।

আর মানুষ নিজেই যখন অন্ধকার, তখন তাঁর ঈশ্বরও অন্ধকার। সর্বশক্তিমান তাঁর সঙ্গে কোনও তফাত নেই শয়তানের। আসলে সে যে মানুষেরই মূর্ত প্রতিফলন। তাই মহান ক্ষমাশীল হওয়ার কোনও দায় নেই তাঁর। ব্রাত্য বসুর স্ক্রিপ্ট এখানে কোথাও যেন অসম্ভব কাফকান। আবার একই সঙ্গে তাঁর গোডো কোথাও যেন সেমিওটিক ঈশ্বরের ধারণার কথাও মনে করায়।

এক আখ্যানে এত কিছু বুনে দেওয়া সহজ নয়। অথচ ব্রাত্য কী অনায়াস দক্ষতায় পরতের পর পরত নির্মাণ করে ফেলতে পারেন। বোঝা যায়, কেন এই সময়ের ভারতীয় নাট্যকারদের মধ্যে অগ্রগণ্য তিনি।

আবার এই ঈশ্বরকেই শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করে সোমেশ। ঈশ্বর প্রদত্ত মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রবল ভাবে বুড়ো আঙুল দেখায় মানুষের অদম্য জীবনবোধ।

পাপবোধ, গ্লানি, ভয় এইগুলো তো আসলে মানুষের গভীর অচেতনেই। কিন্তু সেই অচেতনকে ঢেকে দেয় বেঁচে থাকার অদম্য স্পৃহা। জীবনের চালিকা শক্তি।

অভি চক্রবর্তী আবার চমকে দেন মশারির উপর হার্টবিটের রেখার প্রক্ষেপণ করে। কখনও শ্যাডোগ্রাফির ব্যবহার। কখনও আবার রোগীর চাদর উড়িয়ে দেওয়া কিংবা চরিত্রদের সংঘাতে রোগীর বেড ভেঙে ফেলা – তারিফ করার মতো।

সোমেশের চরিত্রে মুগ্ধ করেন ঋষভ বসু। এই রকম কঠিন একটা নাটকের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করা সহজ নয়। ঋষভ সেটাকে সহজ করে দেন তার অভিনয়ের মুন্সিয়ানায়।

অসামান্য অভীপ্সা ঘোষ। সোমেশের না জন্মানো মেয়ের ভূমিকায় অসাধারণ এই সদ্য তরুণী। বাবাকে প্রলুব্ধ করার দৃশ্যেই হোক, বা পিতৃহন্তারক হতে চাওয়ার হিংস্রতায়– সর্বত্র অনায়াসে বিচরণ করেন তিনি।

গোডো চরিত্রে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ও নাটকটাকে অন্য মাত্রা দেয়।

নার্স চরিত্রে সঙ্গীতা চক্রবর্তীর অভিনয়ের বিশেষ জায়গা রাখেননি নাট্যকার ব্রাত্য বা নির্দেশক অভি। তিনি শুধু সেটুকুই করে গেছেন।

অনুকূলদার চরিত্রে সুমন্ত রায় খুব ভালো অভিনেতা। তবুও কেন যেন  এই অভিনয় তাঁর অন্য নাটকেরই পুনরাবৃত্তি মনে হয়

নাটকের দ্বিতীয় অংশ টানটান। চোখ ফেরানো যায় না। কিন্তু প্রথম অংশে কখনও কখনও যেন একটু ক্লান্তিকর লাগে। প্রথম অংশের ওই জায়গাগুলো মেরামতি করতে উদ্যোগী হতে পারেন নির্দেশক।

এর আগেও রবিশংকর বলের উপন্যাস নিয়ে ‘নেমেসিস’, ব্রাত্য বসুরই ‘ঈশ্বর যৌনতা’ মতো কাব্য ঘেঁষা মনস্তাত্বিক কাজ করেছেন অভি চক্রবর্তী।

নাট্য নির্দেশক হিসেবে অভি যে প্রজন্মের, তাঁদের একটা মস্ত অসুবিধা হল তাঁদের আগের প্রজন্মের চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্য। হয়ত সেই আলোয় কোথাও ঢাকা পড়ে যান তাঁদের অনেকের প্রতিভাই।

‘‘আমি, অনুকূলদা আর ওরা’ -এর মতো এমন জটিল নাটকের অনবদ্য মুন্সিয়ানায় অভি যেন আবার বুঝিয়ে দিলেন বাংলা থিয়েটারের পরবর্তী প্রজন্মও কিন্তু যথেষ্ট তৈরি। 

 ছবি সৌজন্য: অশোকনগর নাট্যমুখ 

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.