বুধবার, আগস্ট ২১

‘ডন– তাকে ভালো লাগে’: একা হওয়ার, স্বপ্ন দেখার কার্নিভাল

শমীক ঘোষ 

‘আমার বিশ্বাস কেবল সেরবানতেসের অবক্ষয় হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যে’। লিখেছিলেন চেক লেখক মিলান কুন্দেরা।

মিগেল দে সেরবানতেস। স্পেনের লেখক। পৃথিবীর প্রথম ঔপন্যাসিক তিনিই। ১৬০৫ সালে তাঁর লেখা বিশ্বের সর্বপ্রথম উপন্যাস, ‘দোন কিহোতে’।

দোন কিহোতে। যার ঢাল আছে। তরোয়ালও আছে। তবু তিনি দোন কিহোতেই।

নিজেকে ইউরোপের নাইট ভাবতেন । বিশ্বাস করতেন নাইটদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে। মানবিকতায়, মূল্যবোধে। তার পরেও যুদ্ধ করতেন ছায়ার সঙ্গে। দৈত্য ভেবে লড়াই করতেন উইন্ডমিলের সঙ্গে। কিংবা ভেড়ার পালকে ভেবে নিতেন শত্রুপক্ষ।

উন্মাদ! দোনকেও সবাই তাই-ই ভাবত। কিন্তু তিনি অবিচল। তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি লড়াই করছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

ইউরোপের সমালোচকদের মধ্যে দোন কিহোতেকে কীভাবে দেখতে হবে, তা নিয়ে বিরোধ আছে। কারও মতে, সেরবানতেস আসলে দোনের অস্পষ্ট মূল্যবোধকেই ব্যঙ্গ করেছেন। আবার কারও মতে, তা নয়। আসলে দোনের উন্মাদ বাস্তববিরোধী অথচ অনড় অবস্থানেরই উদযাপন এই উপন্যাস।

ইউরোপের প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম যেমন। তাঁর মতে, কঠোর বাস্তবকে পেছনে ঠেলে দিয়ে ফ্যানটাসিকেই মহিমান্বিত করাই ছিল এই উপন্যাসের মূল উদ্দেশ্য। সেই অর্থে এই লেখাটা ভীষণ ভাবে নিহিলিস্ট কিংবা নৈরাষ্ট্রবাদী। মৃত্যুর থেকে বড় বাস্তব তো আসলে এই জীবনে নেই। আর সেই মৃত্যুর বোধ থেকেই তো জন্ম নেয় ক্ষমতার ভয়, অনুশাসন, লোভও।

দোন কিহোতের মূল্যবোধ বা মহত্বের আদর্শ আসলে বাস্তব সমাজ জীবনে বড়ই অচল। হয়ত বা হাস্যাস্পদও।

সেরবানতেসের এই দোন কিহোতেকে নিয়েই ডেল ওয়াসেরম্যানের নাটক, ‘দ্য মান অব লা মানচা’। তবে এই নাটকের মূল চরিত্র দোন নন, বরং খোদ সেরবানতেস। তিনিই যেন নাটক করাচ্ছেন ‘দোন কিহোতে’ নিয়ে। নাটকের মধ্যে নাটক নিয়ে আদ্যন্ত মিউজিকাল এক উপস্থাপনা। ব্রডওয়েতে হত এই নাটক। মজার গল্প হল, ১৫৬৯ সালে সত্যিই মিগেল দে সেরবানতেসের নামে একটা ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সেরবানতেসই লেখক সেরবানতেস কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই নাটকে দোন কিহোতের ঘোড়া হারানোর দৃশ্যটাও ছিল না মূল উপন্যাসে।

চেতনা নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনা ‘ডন তাকে ভালো লাগে’ সেই ‘দ্য ম্যান অব লা মানচা’-রই অরুণ মুখোপাধ্যায়ের করা রিইনটারপ্রিটেশন। নব্বইয়ের দশকে এই নাটকটা মঞ্চস্থ করেছিল চেতনাই। তখন এর নাম ছিল ‘দুখীমুখি যোদ্ধা’।

সেই নাটকটিরই আরও পরিমার্জন করে আমাদের অনেক চেনা, অনেক সমসাময়িক করেছেন সুজন মুখোপাধ্যায়।

এই নাটক আমাদের সময়কে অতিক্রম করে দোন কিহোতের মূল্যবোধ এর ‘ফ্যানটাসি’তে ঢুকে যাওয়ার প্রবল কার্নিভালেস্ক উদযাপন।

সেরবানতেস নন। এই নাটকের মূল কুশীলব হলেন শুভময় দত্ত। রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগে তাঁকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছে। আর সেই কারাগারে তাঁর বিচার শুরু করেছে অন্য বন্দিরা। শুভময় সেই বিচারের পাল্টা সওয়াল করছেন ডনকে নিয়ে একটা নাটক করেই। ডন– দোন কিহোতে। বাস্তবের উলটো পিঠে দাঁড়িয়ে সেই ডনের মূল্যবোধের ফ্যানটাসিই যেন শুভময়ের মূল প্রতিপাদ্য।

মঞ্চ জুড়ে সেট সেই কারাগারের গারদেরই। কিন্তু এই গারদের মধ্যেও থাকে যেন অন্য ঈঙ্গিত। সেই ফ্যান্টাসিরই। আর সেই গারদ সরে গিয়েই শুরু হয় নাটকের ভিতরে নাটকের স্বপ্নকল্পনার অন্য উড়ান।

ঠিক যেমন অপরাধীদের হাতেই শুভময়ের বিচারের মধ্যেও থাকে অন্য দ্যোতনা– উগ্রজাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠা রাষ্ট্রের নিজস্ব যুক্তিকাঠামোয় চাপিয়ে দেওয়া বিচারের প্রতি শ্লেষ। আর শুভময়ের বিপক্ষে উকিল যে চিটফান্ড কেলেংকারির অভিযুক্ত!

এমন ঈঙ্গিত এই নাটকে আরও অনেক আছে। যেমন নাটকের ভেতরের নাটকে মুসলমান চরিত্রকেই চার্চের প্রতিভূ করে দেওয়া।

‘ডন– তাকে ভালো লাগে’ স্টেজ জুড়ে একটা আপাদমস্তক কার্নিভাল। মিউজিকালের ছত্রে ছত্রে পপুলার অনুষঙ্গ। যেমন এই মিউজিকালের অনেক গানের সুরই আমাদের খুব চেনা। পপুলার সিনেমার গানের ইঙ্গিত। আর ঠিক তেমনি মুগ্ধ করে এই প্রযোজনায় আলোর ব্যবহার।

ডন উন্মাদ। কিন্তু তার স্পষ্ট আদর্শ আছে। আর আদর্শের জন্য যে পাগল সে ক্ষমতার কাছে ভীষণ বিপজ্জনক। যুক্তির নিজস্ব প্রকোষ্ঠে বসানোও যায় না তাকে। তাই ডনকেও কাবু করতে, কিংবা ‘সুস্থ’ করতে নেমে পড়ে চিকিৎসক এবং চার্চ।

কিন্তু ডন? সে কি সত্যিই চায় রাষ্ট্রের যৌক্তিকতায় বাস্তববাদী হতে? নাকি যুক্তিকে ভেঙে দিয়ে মূল্যবোধ, নিজস্ব যৌক্তিকতার ফ্যানটাসিতেই বাঁচতে চায় সে? অনড় ভাবে আসলে লড়ে যেতে চায় নিজের বিশ্বাসের জন্য?

ডনের ভূমিকায় সুমন মুখোপাধ্যায়। বাংলা থিয়েটার গত পঁচিশ বছর তাকে দেখেনি অভিনয় করতে। বরং নির্দেশক হিসেবেই তাঁকে চিনেছি আমরা এত দিন। তবু কলকাতার থিয়েটার মহলে কান পাতলে শোনা যেত একটা কথা। সুমন মুখোপাধ্যায় অসম্ভব বুদ্ধিমান এক অভিনেতা।

শুভময় দত্ত – ডনের ভূমিকায় সুমন বোঝালেন কেন কথাটা সত্যি। ফিজিক্যাল অ্যাক্টিংয়ের চূড়ান্ত নিদর্শন তাঁর এই অভিনয়টা মনে থেকে যাবে বহু দিন। ঠিক যেমন মনে থেকে যাবে তাঁর গানগুলোও।

মুগ্ধ করেন নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়ও। ডনের প্রেয়সী, সরাইখানার কর্মী দুলসেনিয়ার ভূমিকায় নিবেদিতা মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। গোটা মঞ্চ জুড়ে তাঁর দাপট অনেক দিন মনে থেকে যাবে।

ডনের ছায়া সহচর, সহযোগী সানচো পাঞ্জা, এই নাটকে সত্রাজিত রায়ের ভূমিকায় নির্দেশক সুজনও অসামান্য। যেমন মুগ্ধ করেন অমিতাভ ঘোষও।

খুব ছোট্ট একটা চরিত্রে এক বার মঞ্চে আসেন অরুন মুখোপাধ্যায়ও। প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীত অন্য মাত্রা দেয় গোটা প্রযোজনাটাকেই।

নাটকের শেষে সেরবানতেসের দোন কিহোতেরূপী শুভময় দত্তর ডন ছুড়ে দেয় সেরবানতেসের সমসাময়িক শেক্সপিয়রের খুব পরিচিত একটা লাইন– ‘টু বি অর নট টু বি।’

বর্তমান সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, প্রশ্ন তুললেই খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ংকর বাস্তবে, সত্যিই বাস্তবোচিত ক্ষমতার নিয়মতন্ত্রে আবদ্ধ হবে কি এক জন শিল্পী-বুদ্ধিজীবী?

নাকি তিনি দোনের মতই সব ‘বাস্তব’কে সরিয়ে দিয়ে আসলে থেকে যাবেন নিজের মূল্যবোধে অবিচল? যতই অবাস্তব, ভুল, হাস্যাস্পদ মনে হোক না কেন সমসময়ের  যুক্তিতে?

‘টু বি অর নট টু বি’। এই ইংরাজি ‘বি’ শব্দটা যেন আবারও মনে পড়ায়, মানুষকে ভীষণ অস্তিত্ববাদী আবার ভীষণ রাজনৈতিক হাইডেগারের সেই ‘ম্যাজিকাল’ উদ্ধৃতিতে, ‘দ্য ফরগেটিং অব বিয়িং’-এ। বিয়িং– যেমন বাস্তব, তেমনই বিয়িং তো অস্তিত্বই।

আসুন আমরা কার্নিভাল করি সেরবানতেসের সেই অবক্ষয় হয়ে যাওয়া ঐতিহ্য নিয়ে। ক্ষমতার কঠোর বাস্তবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একা মানুষের মূল্যবোধের স্বপ্ন দেখার ঐতিহ্য।

দোন কিহোতের মতো, মিলান কুন্দেরার মতো, কিংবা চেতনার ডনের মতো।

ছবি: শ্বাশত চট্টোপাধ্যায় 
ছবি সৌজন্য: চেতনা নাট্যগোষ্ঠী/ সুজন মুখোপাধ্যায় 

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.