শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

বাঙালিকে আত্মবিস্মৃত করা প্রয়োজন

জিষ্ণু বসু

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলার বহুল প্রচারিত কিছু দৈনিকপত্রে বেশ কিছু প্রচলিত উৎসবকে কেন্দ্র করে একটি করে বিশেষ রচনা প্রকাশিত হচ্ছে। গত জন্মাষ্টমী বা কার্তিকপুজোর বিষয়ে এরকম লেখা নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা পুরাণে বর্ণিত কার্তিকের চরিত্র নিয়ে এমন লেখা হয়েছে যা বেশিরভাগ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছেই আপত্তিকর বা রসালো বলে মনে হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ করেছেন অনেকে। কিন্তু তাতে কী? বাংলার প্রিন্ট মিডিয়ার হাব ভাব দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে, ধর্মীয় সংস্কৃতিকে খাটো করাটাই প্রগতিশীলতা। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় সংস্কৃতি রক্ষার যতই যুক্তি থাকুক না কেন, ধ্বনিবর্ধক যন্ত্র এই বাংলায় কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় সংস্কৃতির বিরোধীদের হাতেই। যেদিন কোনও ধর্মনিষ্ঠ পরিবারে শ্রদ্ধাভক্তির সঙ্গে গোপালের ভোগ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে, বা বাড়ির সকলে বাসুদেবের নামে উপবাস করে আছে, সেদিন সকালের কাগজ খুলে তাঁরাই তাঁদের আরাধ্য দেবতাদের নামে কিছুটা আপত্তিকর কথা পড়বেন। যেদিন বাড়ির সকলে ভক্তিভরে কার্তিক পুজোর জোগাড় করছেন, সেদিন সকালে সেই পরিবারের সকলেই তাঁদের প্রিয় কাগজে পড়লেন যে কার্তিক আসলে একজন শ্লীলতাহানির দায়ে অভিযুক্ত এক বিতর্কিত চরিত্র। যে খবরের কাগজ ওই পরিবারটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পড়ছে, যার হরফের ধরনগুলো পর্যন্ত ওই পরিবারটি ভালোবেসে ফেলেছে, সেই পরিবারের প্রতি পত্রিকাটির পক্ষ থেকে যোগ্য প্রতিদানই বটে!

অনেক ক্ষেত্রেই দেবদেবীদের নাম নিয়ে এই ধরনের প্রতিবেদনগুলো কোনও অন্য ধর্মের মানুষদের দিয়ে লেখানো হয়। হয়তো বোঝানোর চেষ্টা হয় যে হিন্দুধর্মের অন্তঃসারশূন্যতা স্বধর্মের ধর্মপ্রাণদের পক্ষে বোঝাই সম্ভব নয়। মজার বিষয় হল বাংলার নবজাগরণের যুগে মনীষীরা প্রেরণাপুরুষ হিসেবে কৃষ্ণকে চিহ্নিত করেছিলেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণচরিত্র’ লিখেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আর শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কৃষ্ণপদাবলীর সংকলন করেছিলেন ‘পদরত্নাবলী’ গ্রন্থে। নবীনচন্দ্র সেন শ্রীকৃষ্ণকে ঘিরে ত্রয়ী মহাকাব্য রচনা করেছিলেন রৈবতক, কুরুক্ষেত্রে আর প্রভাস। এঁরা সকলেই কৃষ্ণের মধ্যে একটা জাতিকে জাগানোর রসদ পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন জন্মাষ্টমীর দিন, রাসপূর্ণিমায় বা দোলযাত্রায় বাংলার ‘প্রথম শ্রেনীর’ সংবাদ মাধ্যমে কৃষ্ণের যে আপত্তিকর রূপ তুলে ধরা হয়, তা এইসব মহারথীরা কেউ খুঁজে পাননি। তবে কি বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শ্রীশচন্দ্র বা নবীনচন্দ্র সেন কৃষ্ণচরিত্র বুঝতে পারেননি? নাকি আজকে এই বীভৎসরূপ প্রকাশের কোনও অন্য কারণ আছে?

দুর্গাপুজোর সময়েও এই একই ঘটনা দেখা যায়। কখনও শারদীয়া পত্রিকার প্রচ্ছদে, কখনও বিশেষ রচনায় এমন ছবি থাকে যা রূচিশীলতার পরিচয় নয়। এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয় যা অদ্ভুত ও অসমীচীন। এইসব ‘এগিয়ে থাকা’ কাগজের মালিকরা, সম্পাদকরা ভুলে যান যে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষ শয়নে, স্বপনে, নিদ্রায়, জাগরণে, যাত্রাকালে, বিপদকালে, আনন্দে, বিষাদে, দুর্গানাম জপ করে থাকে। তাদের কাছে দুর্গাপুজোর দিনগুলি কেবল উৎসব আর উদযাপনের দিন নয়, পুজার্চনার দিন, সাধনার সময়। তাদের একান্ত আরাধ্য মাতৃমূর্তির ওই মনে ব্যথা দেওয়া ছবি তারা দেখতে চায় না। দেখলে বা বাধ্য হয়ে পড়তে হলে একান্ত কষ্ট পায়।

কার্তিক পুজো পশ্চিমবঙ্গে কাটোয়ার মতো হাতে গোনা দু’একটি জায়গা ছাড়া বারোয়ারি ভাবে প্রায় কোথাও হয় না। একান্ত ঘরোয়া অনুষ্ঠান। সন্তান কামনার জন্য করা এক বাঙালি লোকাচার। সারা ভারতে কার্তিককে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের লোকাচার, গল্পগাথা আছে। শত শত বছর ধরে, লেখা পুরাণেও কত বিচিত্র ধরনের বর্ণনা আছে। তার থেকে খুঁজে খুঁজে ধর্মপ্রাণদের মনে আঘাত লাগে এমন অংশ উপস্থাপন করা কেন?

এর একটা কারন তো হতেই পারে জ্ঞানচর্চা। প্রাচীন সাহিত্যের পুনরালোচনা করে তার রসাস্বাদন। এই প্রজ্ঞাচর্চায় কোনও সম্প্রদায়ের বিশ্বাস বা ভক্তির কোনও আলাদা গুরুত্ব নেই। জ্ঞান তো আলোর মতোই। সেখানে ধর্মবিশ্বাসের বাধা অগ্রাহ্য করাই উচিত। কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন হল, তাহলে অন্য ধর্মের পরবের দিনও এরকম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় কি? সেই সব ধর্মপুরুষের পবিত্র জীবন নিয়ে এমন আধুনিক আলোচনা করার ‘অ্যাকাডেমিক ইন্টেরেস্ট’ এগিয়ে থাকা কাগজের সম্পাদকেরও হয় না। বলা প্রয়োজন, হিন্দু, মুসলমান বা খ্রীষ্টান বা যে কোনও ধর্মেরই শ্রদ্ধেয় দেবতা বা তাঁর প্রেরিত দূতের নামে ধর্মীয় উৎসবের দিনে এমন রসালো আলোচনা প্রকাশ করাকে আমি কুরুচিকর মনে করি। এই সব গ্রন্থ শত শত বছর আগে লেখা। সেসময়ের সংস্কার, সামাজিক রীতি, শ্রেয়-অশ্রেয় হিসাবে ভক্তিমান মানুষেরা লিখেছেন। যেটা আজকের যুগ ও মূল্যবোধের পক্ষে অনুপযোগী, সেইসব রীতি অবশ্যই পরিবর্তন করা প্রয়োজন। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধাস্পদকে অসম্মান করাকে কোনও অ্যাকাডেমিক তাগিদ বলে যুক্তিগ্রাহ্য করা যায় না। এই তথাকথিত প্রগতিবাদীরা বোধহয় সে কথা বোঝেননা।

আসলে বাংলার সংখ্যাগুরু মানুষই হলেন সুকুমার রায়ের বাবুরাম সাপুড়ের সেই বিখ্যাত সাপের মতো। সে সাপের চোখ নেই/ শিং নেই নখ নেই, ছোটে নাকো হাঁটে না/ কাউকে সে কাটে না/ করে নাকো ফোঁসফাঁস/ খায় শুধু দুধভাত। তাই প্রগতিশীলতার নামে এই নখদন্তহীন সাপদেরই ‘তেড়ে মেরে ডান্ডা/ করে দেব ঠান্ডার’ সহজ পন্থা। কারণ অন্য গোষ্ঠীর ব্যাপারে বলতে গেলে হাঙ্গামা হবে, প্রাণনাশের হুমকি আসবে আর কাগজের মালিক ভয় পেয়ে যাবেন। তাই পশ্চিমবঙ্গে যদি প্রগতিশীলতা দেখাতে চাও, ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বলতে চাও তবে একটাই সফট টার্গেট আছে। তাই দেবদেবীদের নিয়ে যত অপমানজনক কথা বলা হোক না কেন, একদল লোক ধন্য ধন্য করবে। শুধু এক ধর্মের উপাস্য দেবতাদের নিয়ে বাংলার পত্রপত্রিকায় আপত্তিকর ভাষা প্রয়োগে কোনোও বাধা নেই।

কিন্তু এর কারণ কী? বুর্জোয়া মালিকেরা এমন ‘অ্যাডভেঞ্চারাস ভেঞ্চারে’ আগ্রহ দেখান কেন? ধর্মীয় জনবিন্যাসের আনুপাতিক হার বদলে গেলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংজ্ঞা তো বদলে যায়নি। তবু এত বড় বাজার নিয়ে মালিকরা খেলছেন কেন? একটা যুক্তি হল এই সব কাগজ ভোগবাদীদের মুখপত্র। আর ভোগবাদের প্রাথমিক শর্তই হল কোনও রকম আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা না রাখা। তবেই তো মানুষ দেদার ফূর্তি করবে, অনেক পন্য কিনবে, আর কাগজের মুখ ঢেকে যাবে বিজ্ঞাপনে।

এই ধারাবাহিক প্রয়াসের আরও একটা কারণ মাঝেমাঝেই প্রকাশিত হচ্ছে। সেটা আরও ভয়াবহ। একটা জাতিকে পদানত করে রাখবার সবচেয়ে বড় উপায় হল তার অতীত গৌরবকে ভুলিয়ে দেওয়া। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় বিধানসভা ভেঙে জন্ম নিয়েছিল পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা। অবিভক্ত বাংলার হিন্দুপ্রধান অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। আজ স্বাধীনতার ৭১ বছর পরে আবারও সেই একই ধরনের মৌলবাদ চাড়া দিয়ে উঠছে।

নজরুল ইসলাম, সৈয়দ মুস্তাবা আলি বা হাজি মহম্মদ মহসীনেরা দেশুপ্রেমের প্রতীক ছিলেন। কিন্তু আজকাল বাইরে থেকে কলকাতা বন্দরে কাজ করতে এসে, অন্ধকার জগতের হাত ধরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়াদেরই রমরমা। ক্ষমতা চলে যাচ্ছে এমন মানুষদের হাতে যাঁরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকাকে পাশের দেশের সঙ্গে তুলনা করতে দ্বিধা করেন না। গত ৩ অক্টোবরে কলকাতায় দাবী উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১৬টিতে সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার হিসেবেও নিয়োগ করতে হবে সেই ধর্মেরই কাউকে।

রাজনীতির ব্যবসায়ীরা হয়তো মৌলবাদী শক্তিকে খুশি করতে হয়তো আরও বড় প্যাকেজ ভেবে রেখেছে। এর জন্য প্রয়োজনে কারও পদত্যাগ, অপসারণ হবে, রাতারাতি পরিবর্তন করা হবে আইন।

তাই বাঙালির স্বাভিমান বোধ মুছে দিতে হবে। কলকাতার মানুষ যেন ভুলে যায় সাহিত্য সম্রাট ‘আনন্দমঠ’ লিখেছিলেন, ‘বন্দেমাতরম গান’ লিখেছিলেন, শ্রী অরবিন্দ ‘বন্দেমাতরম’কে মন্ত্র হিসেবে সারা দেশের সামনে রেখেছিলেন, অবন ঠাকুর প্রথম ভারতমাতার প্রতিমা এঁকেছিলেন, কলকাতার মহানাগরিক ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাষের মতো মহামানব। এইসব মনে থাকলে বন্দরের উর্দুভাষী মাফিয়ারা শাসন করতে পারবে না। এই ভুলিয়ে দেওয়ার কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে পারে কলকাতার এগিয়ে থাকা প্রচারমাধ্যম। যে জাগরণের কথা ভেবে বঙ্কিম ‘কৃষ্ণচরিত্র’ লিখেছিলেন, তাকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যই তো এত কাণ্ড!

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

ড. জিষ্ণু বসুসাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Shares

Comments are closed.