শনিবার, এপ্রিল ২০

‘টেগোরস ল্যাঙ্গুয়েজ’-এ কবিতা শুনতে চাইলেন চিনের আয়োজকরা

চিনের সিচুয়ানের সেপ্টেম্বর মাসে হয়ে গেল ‘আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব’। নানা দেশের প্রখ্যাত কবিরা সেখানে গিয়েছিলেন কবিতা পড়তে। আর সেই উৎসবে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন বাংলাভাষার এক কবিও। এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের মধ্যে তিনিই ছিলেন বয়সে সব থেকে ছোট। চিন সফরের সেই আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা লিখলেন প্রমিতা ভৌমিক।  

মেঘলা আকাশ। এক চিলতে ঠান্ডা হাওয়া ঘিরে রেখেছে একটা অচেনা সকালকে। মাঝে-মাঝে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি, আবার হঠাৎ রোদ। সকাল সাড়ে সাতটা। চিনের সিচুয়ান প্রভিন্সের চেংডু শহর। পাঁচতারা বাই গাং ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের আটতলার বারান্দায় বসে তাকিয়েছিলাম দূরে।

ওপর থেকে দেখছিলাম অজানা মানুষজন, পথঘাট, ব্যস্ত শহর। এখানে সকাল হয় আমার শহরের থেকে বেশ আগে। চেংডু জেগে ওঠে ভোর পাঁচটা বাজার আগেই।

এয়ারপোর্টের কাছেই হোটেল। কিছু দূরে সাউথওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অফ ফিনান্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স। চিনদেশে প্রথম রাত কাটিয়ে ভোরে ঘুম ভাঙতেই একটা অন্য রকমের অনুভব আমায় টেনে ধরছিল। এই প্রথম বিদেশযাত্রা। তাও একলা। তার থেকেও বড় কথা- সাহিত্যের ডাকে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আসা। আগের দিন যখন কলকাতা ছেড়ে কুনমিং-এর পথে ফ্লাইটে বসে ভয়,  ভাবনা,  আনন্দ,  রোমাঞ্চ- সব কিছু কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে। হয়তো সবটা লিখে বুঝিয়ে বলার মতো নয়।

চিনের সিচুয়ানে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক কবিতা সপ্তাহ ২০১৮’। এ বছর এই কবিতা উৎসব জিগং শহরে। পৃথিবীর প্রায় দশটির বেশি দেশ থেকে কবিরা আসছেন সেখানে। তাদের সঙ্গে চিনের কবিরা। মোট পঞ্চাশ জন কবি। কবিতা পাঠ (নিজের ভাষায় এবং ইংরেজি অনুবাদে), কবিতা বিষয়ে আলোচনা, সেমিনার, বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রে অনুষ্ঠান, জিগং-এর স্থানীয় কিছু দর্শনীয় জায়গায় ভ্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,  ‘মিড অটাম ফেস্টিভ্যাল’ উদ্‌যাপন- মোটামুটি এই ছিল আমাদের এক সপ্তাহ উদ্‌যাপনের সূচি।

ইমেল মারফত এটুকুই জানানো হয়েছিল। এও জানানো হয়েছিল আমাকে যে,  এই কবিতা উৎসবে আমিই বয়সে কনিষ্ঠতম কবি।  এই সবকিছু ভাবতে-ভাবতে পৌঁছে গিয়েছিলাম কুনমিং-এ, চিনের মাটিতে। এ দেশে মুশকিল হল- ইংরেজি ভাষা এখানে খুব কম লোকই বোঝে। আর আমি চিনা ভাষা জানি না। সঙ্গে দোভাষীও নেই। আমাদের চেনা পরিচিত ভাষার বাইরেও যে বিশ্বপ্রকৃতি ভাষাহীন এক আভাস-ইঙ্গিতের স্পর্শে এগিয়ে চলেছে প্রতি মুহূর্তে, তা বেশ বুঝতে পারছিলাম তখন। টের পাচ্ছিলাম, আলো-অন্ধকারের ভেতর থেকে অনবরত বের হয়ে আসা ইশারা।

কুনমিং থেকে আরো একবার ফ্লাইট বদল। ঘণ্টা দেড়েকে পৌঁছে গেলাম চেংডু।  এয়ারপোর্টে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল ম্যাক্স। এই কবিতা উৎসবে ম্যাক্সই ছিল আমার চিনা গাইড। এ দেশের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁদের আন্তরিকতার স্পর্শে কেটে গেছে প্রতিটা দিন।  চেংডুতে এক রাত থেকে আমাদের গন্তব্য জিগং।  বিভিন্ন দেশ থেকে কবিরা একে-একে পৌঁছোলেন চেংডুতে। সেখান থেকে সকলে একসঙ্গে জিগং-এ যাবো- সেরকমই ছিল পরিকল্পনা।

আকাশে মেঘ ঘন হয়ে উঠছিল।  খুব ভোরে বেশ কিছুটা বৃষ্টি হয়ে গেছে ভিজে রাস্তা দেখে বুঝতে পারছিলাম।  এই সফরে চেংডু শহরে একটা রাতই ছিলাম।  সকালে প্রথম দেখা হল আমেরিকার কবি জ্যাক হার্শম্যান এবং অ্যাগনেটা ফকের সঙ্গে।  হার্শম্যান সানফ্রান্সিসকোয় ‘পোয়েট লরিয়েট’ নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত।  বর্ষীয়ান কবি।  অ্যাগনেটা কবি,  চিত্রশিল্পী,  অনুবাদক।  খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল,  বয়সের দীর্ঘ ব্যবধান সত্ত্বেও।  একে-একে পরিচয় হল তুরস্কের কবি আতাওল বেহরামগ্‌লু,  কিউবার অ্যালেক্স পাওসিদেস,  ফ্রান্সের ফ্রান্সিস কম্বস,  পোল্যাণ্ডের অ্যানা অ্যালিনা সাইবুলস্কা,  সারবিয়ার ড্রাগন ড্রাগজলভিক,  কুয়েতের মোহাম্মদ আল-নাভান,  কলম্বিয়ার ফারনেন্দো রেন্দন,  আর্মেনিয়ার সোনা ভ্যান,  নেপালের কেশব সিগদেল,  হণ্ডুরাসের রোল্যাণ্ডো কাতান সহ বেশ কয়েকজন বিদেশী কবির সঙ্গে।

বেলা বাড়তেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম জিগং-এর উদ্দেশ্যে।  সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক কবিতা সপ্তাহ।  বাস যখন ছাড়ল,  আকাশ থেকে মেঘের পর্দা সরে গেছে,  একটা মিঠে রোদ এসে যেন অভ্যর্থনা জানালো আমাদের।  বাস যতো এগলো,  ক্রমশ বুঝলাম,  কবিতার পাশাপাশি প্রকৃতিও এক উৎসব সাজিয়ে রেখেছে এখানে।  ঘন সবুজ নাম না জানা গাছ পথের দু’পাশে।  পুরো পথের সঙ্গে মিশে আছে এক অসামান্য পরিচ্ছন্নতা।  জিগং পাহাড়ি শহর।  চেংডু থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ।  নানা রঙের ছোট-ছোট ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোটা রাস্তা জুড়ে।  নাম জানতে চাইনি তার।  জানার থেকে অজানার মধ্যেই বোধ হয় বেশি আকর্ষণ জমা হয়ে থাকে।  প্রয়োজনের থেকে বেশি আনন্দ লেগে থাকে অপ্রয়োজনের গায়ে।

জিগং-এ আমাদের বাসস্থান হল তানমুলিন সেলেব্রিটি সিটি হোটেল।  সেখানে পৌঁছোনো মাত্র জানতে পারলাম,  সরকারি ভাবে প্রত্যেক আমন্ত্রিত কবিকে দেওয়া হবে জিগং-এর জিলিউজিং জেলার জিয়ানশানের সাম্মানিক নাগরিকত্ব।  শুধুমাত্র কবিতাকে ভালবেসে নানা দেশের কবির সঙ্গে দেখা করতে সেখানে এসেছিলেন অসংখ্য মানুষ।  একটা আশ্বিনের দুপুর হঠাৎ-ই ভরে উঠেছিল প্রাপ্তির অনুভবে।  দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এল।  এদিন বিকেলে ছিল বিভিন্ন দেশের কবিদের পরিচয় পর্ব।  এখানে আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিলেন চিনের কবিরা।  যদিও এই কবিতা উৎসবের চেয়ারম্যান অল চায়না রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেণ্ট কবি জিদি মাজিয়া বেইজিং থেকে এসে পৌঁছতে পারেন নি জিগং-এ বিশেষ কাজের প্রয়োজনে।  তিনি এসে যোগ দেন পরদিন সকালে।  তবে সেদিন উপস্থিত ছিলেন চিনের অন্যান্য কবিরা- আই জি,  চেন দংদং,  গং জুমিন,  জিয়ান নান,  লি লি,  লি শাওজুন,  লু ওয়েইপিং,  শাং ঝেন,  শু ইউ প্রমুখ।

এ দেশে সন্ধে সাতটার আগেই শেষ হয়ে যায় রাতের খাওয়াদাওয়া।  প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম।  একেবারে যে অসুবিধা হয় নি এই নতুন রীতিতে,  তা নয়।  তবে ধীরে-ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম এই নতুন নিয়মের সঙ্গে।  একইসঙ্গে নতুন খাদ্যাভ্যাসে।  এ দেশে খাবার পরিবেশনের রীতি একেবারে বিপরীত আমাদের থেকে।  খাওয়া শুরু হয় নানা ধরনের মাংস দিয়ে।  তারপর মাছ,  সবজি,  রাইস অথবা ন্যুডলস,  ফল ক্রমানুসারে।  আর জলের বদলে স্যুপ।  পর দিন সকাল থেকে শুরু হবে কবিতা উৎসব,  সেই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আয়োজকরা।  আর আমরা মেতে ছিলাম নিজেদের ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনায়।

এই কবিতা উৎসবে কবিতা পাঠ ছিল দু’দিন, দুটো পর্বে।  প্রথম দিন ইংরেজি অনুবাদে কবিতা পাঠ,  দ্বিতীয় দিন প্রত্যেকে তাঁর নিজের ভাষায় পড়েছিলেন কবিতা।  আর সেই কবিতা বিষয়ে ইংরেজিতে বলেছিলেন দু-এক কথা,  যাতে সকলে সেই কবিতার ভাব এবং অর্থ কিছুটা হলেও বুঝতে পারে। এ প্রসঙ্গে প্রথম দিনের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা হয়তো সারা জীবন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে স্মৃতিতে। একে-একে বিভিন্ন দেশের কবিরা ইংরেজি অনুবাদে পড়ে চলেছেন তাঁদের কবিতা।  যহেতু বয়সে কনিষ্ঠতম আমি,  তাই ভেবেছিলাম- হয়তো সবার শেষে ডাক আসবে আমার।  কিন্তু শেষের বেশ কিছুটা আগেই কবিতা পড়ার সুযোগ পেলাম।  ইংরেজি অনুবাদে বাংলা কবিতা পড়ে যখন মঞ্চ থেকে নেমে আসছি,  অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মঞ্চে এসে আরো একবার ডেকে নিলেন আমাকে। সকলের সামনে ঘোষণা করলেন,  যদিও এ দিনের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র ইংরেজিতেই কবিতা পড়ার কথা,  তবু আয়োজকরা অন্তত একটি কবিতা সেদিন শুনতে চান ‘টেগোরস ল্যাঙ্গুয়েজে-এ।  সেদিন কেবলমাত্র আমি একাই নিজের ভাষায় একটা কবিতা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।  বাঙালি হিসেবে গর্ব হচ্ছিল।  গর্ব হচ্ছিল বাংলা ভাষার জন্য; সর্বোপরি যাঁকে বাদ দিয়ে অসম্পূর্ণ এ ভাষা,  তাঁর জন্য- রবীন্দ্রনাথের জন্য গর্বিত মনে হচ্ছিল।  বাংলায় একটা কবিতা পড়ার পর গোটা অডিটোরিয়ামের কবি ও শ্রোতার করতালিতে নিজের অজানতেই জল এসেছিল চোখে।

দ্বিতীয় দিনের কবিতা পাঠ ছিল প্রত্যেক কবির নিজের ভাষায়।  কবিতার যে একটা নিজস্ব ভাষা আছে,  ভাব আছে,  লয় আছে – তা সেদিন আরো একবার বুঝেছিলাম নতুন করে।  ইংরেজিতে কিছুটা ব্যাখ্যা করে দিলেও আসলে প্রতিটা কবিতা উজ্জ্বল হয়ে ছিল তার নিজস্ব ভাষাভঙ্গিতে।  পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কবিদের চোখে বাংলা ভাষার প্রতি,  বাংলা কবিদের প্রতি যে শ্রদ্ধা সেদিন দেখেছি,  তা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগে সত্যিই অজানা ছিল আমার কাছে।

হোটেলের সাত তলার ঘর থেকে জিগং শহরটাকে কেমন যেন মায়াবী লাগতো আমার।  জানলা থেকে দূরে তাকালে কেবল সবুজ- গাঢ় সবুজ,  হালকা সবুজ,  হলদে সবুজ,  লালচে সবুজ,  এক সবুজে নানা সবুজের মেলা।  দূরে পাহাড়।  রোদ আর মেঘের লুকোচুরি।  মাঝে-মাঝে মেঘ ভেঙে জল।  সঙ্গে শিরশিরানি নোনতা হাওয়া। জিগং সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত মূলত তিনটি বিষয়ের জন্য- নুন,  লণ্ঠন আর ডাইনোসর।  সল্ট মিউজিয়াম,  ল্যানটার্ন মিউজিয়াম এবং ডাইনোসর মিউজিয়াম- এখানকার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দর্শনীয় স্থান।  ‘জিগং ল্যানটার্ন ফেস্টিভ্যাল’ চিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকসাংস্কৃতিক উৎসব।  প্রায় এক মাস ধরে চলে এই লণ্ঠন উৎসব।  বাঁশ,  রেশম,  কাগজ,  কাচ,  চিনামাটি ও আরো নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় এইসব লণ্ঠন।  পৌরাণিক,  ঐতিহাসিক,  লোকসাংস্কৃতিক বিভিন্ন মোটিফে তৈরি হয় এগুলি।  চিনের বিভিন্ন প্রদেশ সহ সারা পৃথিবীর মানুষ এসে একত্রিত হয় এই উৎসবে।  দক্ষিণ-পশ্চিম চিনের সিচুয়ান অঞ্চল বহন করে চলেছে সুদীর্ঘ কালের এই ঐতিহ্যকে।  এই লণ্ঠন শিল্প সিচুয়ানের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  জিগং-এ পৌঁছোনোর আগেই লণ্ঠন সম্পর্কে বেশ কিছু কথা আমাকে জানিয়েছিল আমার গাইড ম্যাক্স।  স্বভাবতই একটা উৎসাহ তৈরি হয়েছিল এ বিষয়ে।  আমরা যখন ল্যানটার্ন মিউজিয়ামে পৌঁছোলাম,  তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল।  জিগং-এর ল্যানটার্ন পার্কে প্রায় বাইশ হাজার বর্গমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই মিউজিয়াম।  মূল বিল্ডিংটা তৈরি করা হয়েছে একটা লণ্ঠনের আদলে।  বিভিন্ন রঙের,  বিভিন্ন আকৃতির লণ্ঠন ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারদিকে।  স্থানীয় মানুষরা মনে করেন,  জিগং হল ‘স্বর্গের নীচে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ লণ্ঠন’।  এই মিউজিয়ামে রয়েছে কয়েকটি প্রদর্শনী কেন্দ্র।  সুপ্রাচীন কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্বের লণ্ঠন সাজানো আছে সেখানে।  আছে চিনের লোকাচার,  লোক-ঐতিহ্যের সমাহার।  গোটা পৃথিবীর কাছে জিগং এক বিখ্যাত লণ্ঠন শহর।

ল্যানটার্ন মিউজিয়ামের পাশাপাশি জিগং সুপরিচিত তার ডাইনোসর মিউজিয়ামের জন্য।  জিগং শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে প্রায় পঁচিশ হাজার বর্গমিটার জায়গা নিয়ে নির্মিত এই মিউজিয়াম।  এখানে রয়েছে জুরাসিক পিরিয়ডের অগণিত ডাইনোসর ফসিল।  এই মিউজিয়ামের মূলত তিনটি অংশ।  প্রথম অংশে পাওয়া যায় ডাইনোসর সংক্রান্ত কিছু প্রাথমিক তথ্য।  যেমন- ডাইনোসর ফসিল,  বিবর্তন,  বিভিন্ন ধরনের ডাইনোসর সম্পর্কিত ধারণা ইত্যাদি।  দ্বিতীয় অংশে আছে নানা ধরনের ডাইনোসরের প্রদর্শনী এবং তৃতীয় অংশে দেখা যায় সংরক্ষিত সমাধিস্থ ডাইনোসরের দেহাবশেষ।  পৃথিবীর সবথেকে বেশি পরিমাণে ডাইনোসর ফসিল সংরক্ষিত আছে ১৯৮৭ সালে নির্মিত এই মিউজিয়ামে।  শুধুমাত্র ডাইনোসর নিয়ে তৈরি হওয়া এশিয়ার প্রথম মিউজিয়াম এটি।

ল্যানটার্ন মিউজিয়াম,  ডাইনোসর মিউজিয়ামের আগে আমাদের বেড়ানো শুরু হয়েছিল ‘জিগং সল্ট হিস্ট্রি মিউজিয়াম’ দিয়ে।  এটি সিচুয়ানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থান।  কিং সাম্রাজ্যের সম্রাট কিয়ানলং-এর রাজত্বকালে ১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল জিকিন গিল্ডহল।  চিনের শানশি অঞ্চলের নুনের ব্যবসায়ীরা ব্যবসার প্রয়োজনে মিলিত হতেন এখানে।  বর্তমানে এখানেই জিগং সল্ট মিউজিয়াম তৈরি হয়েছে।  এই মিউজিয়ামের বাইরের এবং ভেতরের স্থাপত্য শিল্প অসাধারণ।  পাথর এবং কাঠ খোদাই করে তা নির্মাণ করা হয়েছে।  ড্রাগন ও ফিনিক্সের অসামান্য পাথরের মূর্তি চোখে পড়ে মিউজিয়ামে ঢোকার মুখেই।  জিগং-এর লবণ শিল্প দু হাজার বছরের বেশি প্রাচীন।  সারা পৃথিবীতে ‘সল্ট সিটি’ নামে পরিচিত জিগং।  ১৯৫৯ সালে তৈরি হয়েছিল চিনের একমাত্র সল্ট মিউজিয়াম।  চিনের লবণ শিল্পের ইতিহাসকে খুঁজে পাওয়া যায় এখানে।  কিন সাম্রাজ্যের আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে কিভাবে মাটির তলা থেকে নুন সংগ্রহ করা হতো,  তা বিস্তৃত ভাবে প্রদর্শিত হয়েছে এখানে।  এই মিউজিয়ামের এক দিকে যেমন আছে জিকিন গিল্ড হল,  অন্য দিকে আছে ওয়াংয়ে মিয়াও টেম্পল।  সম্রাট জিয়ানফেং-এর আমলে নুনের ব্যবসায়ীরা তৈরি করেছিল এটি।  এ দুইই উচ্চমানের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের নিদর্শন হিসাবে চিহ্নিত।  এবারের চিন সফরে জিগং-এর এই তিনটি মিউজিয়াম চিনিয়ে দিয়েছিল একটা শহরের ইতিহাস,  লোক সংস্কৃতি,  লোকাচার,  শিল্প,  ঐতিহ্য ও তার অন্তর্নিহিত রূপকে।

জিগং-এ বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা একেবারে অন্য রকম।  সেখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল বিভিন্ন ভাষার কবিদের রঙ-বেরঙের লণ্ঠনের গায়ে নিজের ভাষায় বার্তা লিখে আসার পর্ব।  অথবা কেউ চাইলে রঙ-তুলির আঁচড়ে এঁকেও এসেছেন তাঁদের ইচ্ছে মতো।  পরিবর্তে সেখান থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া গেছে রঙিন লণ্ঠন।

আগেই বলেছি,  আন্তর্জাতিক কবিতা সপ্তাহ উদ্‌যাপন উপলক্ষে প্রত্যেক বিদেশি কবিকে দেওয়া হয়েছে জিগং-এর জিয়ানশান অঞ্চলের সাম্মানিক নাগরিকত্ব।  সেই জিয়ানশানে একদিন বিকেলে আমরা সকলে পৌঁছোলাম ‘কালচারাল হেরিটেজ এক্সিবিশন’ দেখতে।  সেখানকার চিত্র শিল্প,  ভাস্কর্য থেকে শুরু করে আঞ্চলিক খাবার- সব কিছুই ছিল এই প্রদর্শনীতে।  সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমাদের গন্তব্য ছিল জিয়ানশানের তাওইউয়ান ব্রিজের কাছে ‘মিড অটাম ফেস্টিভ্যাল’ উদ্‌যাপন। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।  শিল্প এবং প্রযুক্তির এক অসামান্য সমন্বয়।  ব্রিজের সামনে এক দীর্ঘ জলাশয়।  জলাশয়ের অপর প্রান্তে বসে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।  চিনে শরৎ কালের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব এই ‘মিড অটাম ফেস্টিভ্যাল’।  পূর্ণিমার সন্ধেতে তা উদ্‌যাপন করা হয়।  খোলা আকাশের নীচে আমরা উপভোগ করেছি এই উৎসবকে।

গান,  নাচ,  কবিতা,  নাটকের মধ্যে দিয়ে পূর্ণিমার সন্ধেতে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত,  মোহময় পরিবেশ।  অনুষ্ঠান শেষ হয় থ্রি ডি রঙিন হাওয়াই লণ্ঠন ওড়ানো এবং মুন কেক খাওয়ার মধ্যে দিয়ে।  চিনে মিড অটাম ফেস্টিভ্যালের একটি অন্যতম অঙ্গ এই ‘মুন কেক’।  পূর্ণিমার চাঁদের আলোকে উদ্‌যাপন করা হয় সকলের সঙ্গে মুন কেক ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে।  সকলে একত্রিত হয়ে খাওয়া হয় মুন কেক।  মুন কেক কেবল খাবার নয়,  তা সূচিত করে একত্ববোধকে। চিনাদের কাছে পূর্ণিমার চাঁদ সৌভাগ্যের ইঙ্গিতবাহী।  আর গোলাকার মুন কেক সেই পূর্ণ চাঁদের সাফল্যকেই তুলে ধরে।

এই কবিতা উৎসবের শেষ দিন ছিল কবিতা বিষয়ে আলোচনা।  এ দিন প্রত্যেকে তাঁদের নিজের ভাষার কবিতা বিষয়ে বলেছিলেন দু-চার কথা।  বলেছিলেন তাঁদের ভাষার সমসাময়িক কবিতা চর্চা সম্পর্কে,  বলেছিলেন,  কিভাবে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে বদলে গেছে কবিতার বিষয়,  চলন,  আঙ্গিক।  বাংলা কবিতা বিষয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম সেদিন।  এই আলোচনা সভার শেষে দেশ,  ভাষা,  সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকলে একটা বিশ্বাসের কথাই উচ্চারণ করেছিলাম- কবিতা আসলে একটা যাপন।  শুধুমাত্র তত্ত্বকথা বা ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়,  কবিতা তুলে ধরে একটা জীবনকে,  জীবনবোধকে।  আর সেই যাপন একই সঙ্গে চূড়ান্ত বাস্তব এবং কল্পনায় মোড়া।

পর দিন সকালে ঘরে ফেরার পালা।  এই অল্প কয়েক দিনে একটা নতুন দেশ নিজের অজানতেই কেমন যেন আপন করে নিয়েছিল আমাকে।  নতুন মানুষ,  নতুন প্রকৃতি- সব কিছুকেই খুব কাছের বলে মনে হচ্ছিল।  সময় তো থেমে থাকে না কারুর জন্য।  আর আমরাও দাঁড়িয়ে থাকি না কোথাও।  অনবরত ঘটে চলা ঘটনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যায় নিজের অনুভূতি,  উপলব্ধি,  পরিচয়।  বিদেশের মাটিতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ক্রমশ চঞ্চল হয়ে উঠছিল মন।  শুধুমাত্র কবিতার জন্য পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের এই মিলন প্রতিদিনের তুচ্ছ চাওয়া-পাওয়া-না পাওয়ার থেকে বাইরে এসে দাঁড় করিয়ে দেয় অনায়াসে।  এসব কথা ভাবতে-ভাবতেই সকাল হয়ে গেল।  এবারের মত চিনে এটাই শেষ সকাল।  ব্রেকফাস্ট সেরে সবাইকে বিদায় জানিয়ে চেংডু এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা।  সেখান থেকে কুনমিং হয়ে কলকাতা।  আমার ভেতরে ক্রমশ একটা অনুভূতি ঘনিয়ে উঠছিল ধীরে-ধীরে।  তাকে একটা শব্দে ‘আনন্দ’ ছাড়া আর কি-ই বা বলতে পারি! ক্রমশ এক ছবির স্রোত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছিল আমাকে।  আমি একটা দেশ আর অসংখ্য ছোট-বড় মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরে ফিরছিলাম আমার শহরে।

Shares

Comments are closed.