বৃহস্পতিবার, জুন ২০

প্রতিবাদ আছে চোখের জলে

আঠাশে অক্টোবর ষাট বছর বয়স হল কবি সুবোধ সরকারের। তিনি নিজেই একদিন কবিতার গা থেকে খুলে নিতে চেয়েছিলেন সব আভরণ। তাঁর কবিতায় তাই বারবার ঝলসে ওঠে রাগ, প্রতিবাদ। আবার আসে প্রেমও। সুবোধ সরকারের কবিতা নিয়ে লিখলেন কৌষিকী দাশগুপ্ত

স্বাধীনতার পরে অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। বাংলা কবিতারও বয়স বেড়েছে অনেকটা।

অতীতের কবরখানা থেকে, পোড়া ছাই এর ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছেন কিছু কবি যারা শুধু পারিপার্শ্বিক লৌহমেদুর ব্যবস্থাটিকে চ্যালেঞ্জই জানাননি, নিজের লেখার চলনে বলবে, কৃতিতে কর্মে বারবার উন্নাসিক হয়ে উঠেছেন। তাদের গগনচুম্বী স্পর্ধাকে ভয় দেখিয়েছে সবাই, ভয় দেখিয়েছে তার পূর্বপুরুষদের সিস্টেম, ভয় দেখিয়েছে আরশিনগরের অতলে লুকিয়ে থাকা রাজারানী গোলাম সবাই।

তবে ভয় যেখানে, অস্বস্তি যেখানে, ছটফটানি যেখানে সেখানেই তো আকর্ষণ, সেখানেই তো দুর্নিবার অপ্রতিরোধ্য টান। বাংলা কবিতার সুভাষ-শক্তি-সুনীল-শঙ্খ-নীরেন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে এই অস্বস্তির নাম সুবোধ সরকার।

এথেনার মন্দিরে তিনি বুকের বোতাম খুলে দাঁড়িয়ে থাকা উন্মাদ প্রেমিক, সরস্বতীর উঠোনে তিনি হা ঘরে বালক – চালচুলোহীন ভয়ংকর রাগ, এক নির্মম প্রতিবাদ।

সুবোধ সরকারের কবিতাকে প্রতিবাদের কবিতা বললে হয়ত সবটা বলা হয়না। এই প্রতিবাদ চিত্রগুপ্তের দিনলিপি নয়, এই প্রতিবাদ হাইব্রিড কাতলাসঙ্গীত নয়, এই প্রতিবাদ চুইয়ে পড়ে রোমান্স, চুইয়ে পড়ে আকাশচুম্বী প্রেমে। কী আশ্চর্য! প্রেমের সঙ্গে প্রতিবাদের এই কম্বিনেশন সত্যি বিরল। তার সমালোচকরা কী বলেন তাঁকে? কার্ল মার্ক্সের চেলা? না নেরুদার খোকা? কবিতায় তিনি যে অবিশ্রান্ত গল্প বলে চলেন, দুঃখ যন্ত্রণা, ঈর্ষা, ক্যাচাল-কুচাল সব কিছুই যেভাবে তার কবিতায় শীতের দুপুরে এলিয়ে থাকা ভীমরুলটির মতো গুপ্তঘাতক হয়ে ধরা দেয় – সেই সুবোধ সরকারের কবিতা বাংলা কবিতার ভারচুয়াল রিয়েলিটি বা রিয়েলিটির ভারচুয়াল।

তিনি নিজে হাতে হত্যা করেছেন কবিতার নুপুরনিক্কণ, হত্যা করেছেন গোলাপসুন্দরীদের, উঠে এসেছে কৃষ্ণকলি মাহাতো, উঠে এসেছে কলকাতার হেলেন, এমন একটা পোস্ট-কলোনিয়াল ভারতবর্ষ যেখানে একটা আধখাওয়া পাউরুটির টুকরোর জন্য এলিজির সঙ্গে অবিচুয়ারির নিরন্তর সংঘাত চলে।

সুবোধ সরকার প্রতিবাদের কবি, কিন্তু তার কবিতাকে কোনওদিন চিৎকার করে বলতে হয়নি, ‘চলো প্রতিবাদ করি – লেটস প্লে আ গেম।’

প্রথম কবিতার বই ’৭৮-৮০’ (১৯৮০)। সময়টাই বেখাপ্পা। ১৯৭৫-৭৭ এর জরুরী অবস্থা দেশে তৈরি করেছে প্রতিবাদের নতুন আবহ, আয়প্পা পানিক্করের মতে, এই ‘পোয়েটিক্স অব এমারজেন্সি’ তার রাজনৈতিক অভিঘাত থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১০৮৩ সালে প্রকাশিত সুবোধের বই ‘ঋক্ষ মেষ কথা’-য় পরিষ্কার ধরা পড়েছে সমসাময়িক ভারতবর্ষে কোনটা স্বাধীনতা আর কোনটা ‘ফ্রিডম’।

সেই ভারতবর্ষ যেন জেমস বন্ডের গল্পের নায়কের মতো এক ঝা চকচকে হোটেলের সাদা বিছানায় শুয়ে লুকিয়ে থাকা একটি তাত্ত্বিক মশার সঙ্গে চু কিতকিত খেলছে। ‘জানামি ধর্মং ন চে মে প্রবৃত্তি/ জানামি অর্ধমং ন চে মে নিবৃত্তি’।

আমরা জানিতো কী হবে, জানি আমি আমার সঙ্গে কী করব – তবুও ‘আমি কাক, মুষিক, মূর্ম ও মৃগ পরিবৃত হয়ে একদিন ভেলকি দেখিয়েছিলাম রাজসভায়। আজ এক অন্ধের যষ্টি নিয়ে তার আগে খুঁড়িয়ে চলেছি’। এই প্রতিবাদ সুবোধ সরকারের কবিতাকে ক্ষুধা রক্ত-ক্ষিন্নতার অন্ধকার ছেড়ে দেয়নি, তাকে অ্যান্টি রোম্যান্টিক আত্মলীন প্রণয়ের প্রতি বিমুখ করে তোলেনি, মার্ক্সীয় ধ্রুবপথের বৃত্তে নিক্ষেপ করেনি, তার কবিতা উলটে প্রতিবাদের ন্যারেটিভটাকেই বদলে দিয়েছে।

তিনি ভাষাকে দুমড়ে মুচড়ে নতুন আইডিয়া, নতুন অ্যান্টিথিসিস তৈরি করে নিয়েছেন – জন্ম নিয়েছে প্রতিস্পর্ধী ‘সুররিয়্যাল’।

এই প্রতিস্পর্ধার কবিতা আনসেনসরড, ভালগার, কখনও মরবিড। এই কবিতাকে গারদে ভরতে চায় রাষ্ট্র। যে কোনও আভাগার্দ শিল্প সবসময় ক্ষমতার দিকে বিদ্রুপ ছুঁড়ে দেয়, যা অনন্ত অ্যাসথেটিক্সের সমুদ্র থেকে মুক্তো নয় লবণ তুলে আনে। পুঁজিবাদী অন্ধকারের গায়ে লেপটে থাকা শিফন মতাদর্শগুলিকে ধ্বংস করতে চায়, সেই শিল্প সেই কবিতা সবসময়েই কেমন একটা দলাপাকানো অস্বস্তির মতো গলার কাছে আটকে থাকে।

‘যদি কী কী করব তার আগে কী কী করব না ঠিক করে নিই/ যদি কী কী বলব তার আগে কী কী বলব তা ঠিক করে নিই/ যদি কী কী দেখব তার আগে কী কী দেখব না ঠিক করে নিই/ তাহলে জ্যোৎস্না উঠবে, বাড়ির পাশে বাংলাদেশ হবে, পেট ভরে খেতে পাব’। সুবোধ সরকারের আত্মখনন আত্মমোচনের দীর্ঘ অধ্যায়কে বুঝতে হলে এই ভাষার নির্মিতিকে বুঝতে হবে।

‘অন্যকে দোষ দেওয়ার আগে ধরি নিজের ভুল/ পেরেছি আমি রাস্তা থেকে কাউকে তুলে এনে পড়াতে? পেরেছি আমি কাউকে খেতে দিতে?’ – এই বৈপরীত্যের অবভাসগুলিই সুবোধ সরকারের প্রতিবাদ। আশির দশকের কবিতায় যে বুনো গোলাপের গন্ধ অন্ধ কোকিলের ডাকের সঙ্গে মিশে যায়, সে কবিতা দেখতে পায় – ‘আরো কয়েক কিলোমিটার মরুভূমি এগিয়ে এসেছে – চালাঘর মাইক্রোওয়েভ, জোৎস্নার তারকাঁটা, পপির বাগান ডুবে যাচ্ছে একটু একটু করে’। এই পরিবর্তন আশির পরিবর্তন। রাজনীতি এখানে গৌণ, মুখ্য হল ঘ্রাণ নেওয়ার চেতনা। এই ঘ্রাণ নেওয়ার আশ্চর্য চেতনা আমরা পেয়েছি মায়াকোভস্কির লেখায়, পেয়েছি আলেকজান্ডার সলঝেনিৎসিনে, পেয়েছিল স্লাওমির স্রোজেকে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ে। আরও আরও অনেকের গল্পে, নাটকে প্রবন্ধে কবিতায়। লেখক এখানে রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি, প্রতিভা বনাম জেলখানা বা ইজম বনাম ইডিওলজির তরলীকৃত দ্বন্দ্বে আবদ্ধ হন, তাকে ক্রান্তদর্শী বললেও বড্ড বেশি এসথেটিক শোনায়। তিনি এখানে সময়ের প্যারাডাইম শিফটকে মুঠোয় পুরে ভাষামুক্তি ঘটিয়েছেন, আত্মমুক্তি ঘটিয়েছেন, অনাবৃত করেছেন আর্তনাদের ‘সিনেকডমি।’

নব্বইয়ের কবিতা বলছে, ‘আমার বাবাকে যারা খুন করেছিল/ এ পাবক, বলো আমি তাদের কে হই?/ তারা আজ রেডরোডে রডোডেনড্রন/ হে পাবক, আমি কারো অন্ধকার নই? ভারতে ইজরায়েলে, লাহোরে লন্ডনে/ বাবার খুনির সঙ্গে ছেলে মিশে যায়।’ কবিতা এখানে বিষন্ন কাশফুল, সংস্কৃতির চৈতন্যের সঙ্গে যার মন কষাকষি হয়েছে বহুদিন। এই ‘বাবা’-কে অনেকভাবে পড়া যায়। অনেক অর্থে ডিকোড় করা যায় এই প্রতিবাদ। এই বাবা উত্তর ঔপনিবেশিক যন্ত্রণা। এমন একটা শূন্যস্থান যেখানে অতীত আছে, অথচ অতীত নেই। আছে সিম্বল-মেটাফরের উদ্বাস্তু দুনিয়া, লাস্যময়ী প্রেমিকার ছদ্মবেশ ধরে যে ধনতন্ত্র আসে তার মেদুর উপস্থিতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা ন্যুব্জ ব্যর্থতা  – ‘তোমার বাবার পথ ছিল গোধুলিতে/ চাই আজ হাইওয়ে, দিগন্ত মুঠোয়/ এসো পুত্র, প্রযুক্তির কালোশশী মেঘ/ পুত্র আমি, কিন্তু কারো অন্ধকার নই।’

উত্তর সোভিয়েত সময়ে, বিশ্বায়নের পানশালায় এলিয়ে পড়া সময়ে, করপোরেটের উল্লসিত ঢক্কানিনাদে জর্জরিত সময়ে সুবোধ সরকার প্রতিবাদকে দাঁড় করিয়েছেন প্রত্যাখান ও পরিমার্জনের ক্লাইম্যাক্সে। এই প্রতিবাদ ঘড়ির কাটা মেপে গড়িয়ে চলে না। উন্মত্ত বেদনার মতো ঝাঁপ দেয় ইঞ্জিনের সামনে। কিন্তু হারিয়ে যায়না।

কৃষ্ণনগর রেলস্টেশনের মধ্যে বসেই সুবোধ লিখে চলেন আত্মবিলোপের জন্মদর্শন। ‘যখন সারাটা দেশ দাঁড়িয়ে আছে ঘুষের টাকার ওপর/ তখন রবীন্দ্ররচনাবলী দিয়ে চাপা দেওয়া একটা সুইসাইড নোট’ – সুবোধ সরকার প্রতিবাদ ক্ষোভ প্রকাশ করতে জানেন, বিদ্রুপ করতে জানেন, রেগে ছুঁড়ে ফেলে দিতে জানেন, প্রেমের নিশুতিকে পড়তে জানেন, কিন্তু প্রত্যয়? আত্মহননের প্ররোচনা, অবচেতনের অন্তর্দেশের জমে থাকা মেলাঙ্কলির প্ররোচনা, হিরন্ময় চন্দ্রালোকে ব্যভিচারের প্ররোচনা সুবোধ সরকারের প্রতিবাদের কবিতায় প্রত্যয় বা ইটারনাল অবটিমিজমকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানায় – ‘মাছঅলা কবিতা পড়েনা/ মধু বিক্রেতাও কবিতা পড়েনা/ মুমূর্ষু কিশোর, ভাই তুমিও পড়ো না’।

এই ভয়ংকর বিনির্মাণ, এই বিশুদ্ধ প্রত্যাখান আসলে কবির ক্ষমতাকেই জাস্টিফাই করে। কবিতার চৌম্বকীয় বৃত্তের অবস্থান করেও ক্ষমতার সিম্বলগুলিকে কামড়ে ধরে। হয়ত ফেলতে পারেনা, ফেলা সম্ভব হয়না, তবু ফ্রয়েডিয় আনকনশাসের মতো তা বারবার সমগ্র অস্তিত্বের প্রশ্নটিকেই ভালনারেবল করে তোলে। আরও একবার মণ্ডপে ঢাকিরে পাশে বসে থাকা বিষন্ন বালকটির কাছেই ফিরে আসেন সুবোধ। এক অন্ধকার থেকে অন্য অন্ধকারে যাবার আগের মুহূর্তের সূর্যালোক কি একবারের জন্যও ঝলসে দেয়না খিদে আর দারিদ্রের নির্বিকল্প হায়ারার্কিকে? দেয় নিশ্চয় নইলে কী করে তিনি লিখবেন, ‘রাষ্ট্র কাউকে ভালোবাসা দিতে আসেনি, ভালোবাসা নিতে আসেনা কখনো রাষ্ট্র/ রাষ্ট্র, কেউ কি তোমায় পাঠায় গোলাপ? বেহুলা যেভাবে অরণিকে ভালোবাসত’।

একজন রুপোলি মাছের সংসারের বসে একটা দোমড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের থালায় ভাত খান আর অন্যজন পোড়া ডানা নিয়ে সোভিয়েত পার হয়ে কমিউনিজম পার হয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদের ধারে বসে মুচকি হাসেন। সেই মুচকি হাসিটাই তো প্রতিবাদের চলন পালটে দেয়। প্রতিবাদ মানে তো শুধু দেরিদিয়ান বা ফুকোডিয়ান ধর্মতত্ত্বচর্চা নয়, প্রতিবাদ মানে শুশ্রুষা, ভালোবাসা, কৌতুক, বিদ্রুপ, আশ্বাস, বিশ্বাস, অবিশ্বাস সব।

পাররা, নেরুদা, নীরেন, সমর, সুভাষ সবাই তো বয়ে চলেছেন দু’রকম সুবোধ সরকারের মধ্যে – বিষন্ন আত্মগ্লানি আর নিরন্তর স্নায়ুযুদ্ধের মাঝখানে বালিকার চুলের ফিতে হয়ে শুধু আছে ভুবন সন্ধানী প্রেম। তাই প্রেমকে বাদ দিয়ে এই প্রতিবাদ পঙ্গু। প্রতিবাদকে বাদ দিয়ে প্রেম শুধু পারফিউম। সুবোধ সরকার কোনও প্রোটেস্ট পোয়েট্রি লেখেননি, প্রেমের কবিতাও লেখেননি। তার কবিতা, কবিতাই।

আর সেই জন্যেই এই কবিতা প্রতিবাদের অবভাসকে নির্মাণ করতে পারে, বিনির্মাণ করতে পারে। ‘হাহাকার এবং ইঞ্জেকশনের মাঝখানে একটা সুন্দর বিকেল আছে/ যেখানে আমি এবং আমি এবং আমি… / এবং পরমানুমুক্ত একটা সুন্দর সন্ধ্যার দিকে/ তুমি খোলা পিঠ দাঁড়িয়ে রয়েছ আর/ কোমর থেকে ঝুলে আছে সেই চাবি’। এই চাবিটিই কি সেই ডুয়াল স্পেস নয় যা ভাষা তৈরি করবে, ভাষা ভেঙে দেবে? ভাষাই এখানে ভাষার আশ্রয়। ভাষাই তার ঘাতক। এই ভাষাদ্বন্দ্বই তো আরও বৃহত্তর পরিসরে তৈরি করে সাংস্কৃতিক ‘আত্ম’কে।

এই ‘আত্ম’-কে নিয়েই সুবোধ সরকার জন্মাবধি খেলে গেলেন তাঁর কবিতায়। তিনি কি থামতে জানেন না? কবিকে কখনও কখনও থামতে হয়, শুধু দিগন্তবিহীন খালাসিটোলার দিকে ছুটে চলাই তো তার নিয়তি হতে পারেনা। থেমেছেন বৈকি তিনি। ওই তো তাকে দেখতে পাই লিখছেন, ‘রেড রোডে বসে থাকতে পারি আমরা/ যার ওপর রাগ তাকে বেদম মারতে পারি, বেদম/ কিন্তু এই মহাদিকচক্রবাল আমরা তাকে মেরে তো ফেলতে পারি না’।

সত্যিই তো, এই মহাদিকচক্রবালেই তো কোথাও ভাত বেড়ে বসে আছেন মা, লাঠি হাতে অপেক্ষা করছেন বাবা, এক গ্লাস জল বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হাসছে প্রেমিকা – সবাই তো সেই অনন্ত বিরহকে বুকে নিয়ে আকাশরেখা নির্মাণ করছেন প্রতিবাদের কবিতার জন্য।

কী করে এড়াবেন তাকে সুবোধ? শোক এবং হনিমুন কোনওটাই যে স্থায়ী নয়। ছায়ারহস্যের বিস্ফোরণে মহাদিকচক্রবাল এসে দাঁড়ায় রান্নাঘরে – কবির ভাষায় তা আসলে চোখের জল। তাকে মাঝেমাঝে গিলে নিতে হয়, কখনও কখনও বিলিয়ে দিতে হয় পারপিচুয়াল প্রেজেন্সে।

মিছিলে মিছিলে বৃষ্টিতে বারুদে সেই চোখ যত পুড়বে তত বিশুদ্ধ হবে তার আধারচৈতন্য। তত অনাসক্ত হবে প্রতিবাদ। ফ্রয়েডিয়ান আনকনশাসের জগত ছেড়ে উত্তর ঔপনিবেশিক চ্যালেঞ্জকে এই চোখের জলের মধ্যেই রাখতে চেয়েছেন সুবোধ সরকার।

কবিতার রক্তমাংস অস্থিমজ্জা ভেদ করে, তীব্র মেলাঙ্কলির মধ্যে দিয়ে এই দুই ফোঁটা চোখের জল আমাদের সমস্ত মাওবাদ ও কৃষ্ণবাদকে অস্বীকার করে, কালচার ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত ফরমুলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শেষমেশ ভালোবাসার সমুদ্রে এসে মিশেছে।

একদিন হয়ত সে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে গুমোট শহরে, আমাদের বিপন্ন বেডরুমে লেনিন আর বুদ্ধ একে অপরের গালে এঁকে দেবেন গভীর চুম্বন – এই ইচ্ছেটুকু, প্রত্যাশাটুকু নিয়েই সুবোধ সরকার লিখে চলবেন…

‘তোমার দীঘির জলে এল সুপ্রভাত
আমি যে অংশে থাকি তার জল সোনা
তুমি সেই জলের মালিক
তোমার তরঙ্গকে করেছি রচনা।’

লেখক ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক

Comments are closed.