আজাদির যুদ্ধ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

    ইতিহাসের একটি চেহারা যদি তার লিখিত রূপ হয়, তা হলে অন্যটি অবশ্যই জনমনের নানা কল্পনা। তার মধ্যে তথ্য ইত্যাদির সত্যতা থাকুক বা না থাকুক, তা সমসময়কে অবশ্যই প্রভাবিত করে। এবং ইতিহাস যেহেতু শাসকের অনুগত প্রায় সর্বত্রই, তাই জনকল্পনার পরিসরকেও খতিয়ে না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়, শাসকের ইতিহাসের কতটা কোথায় এবং কেমন করে কাজ করছে।

    আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের মাটিতে পা রেখেছিল তা ঐতিহাসিক সত্য। এ-ও ঐতিহাসিক সত্য যে তাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চাদপসারণ করতে হয়েছিল। কিন্তু ইম্ফল থেকে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে মৈরাং-এর মাটিতে ত্রিবর্ণ রঞ্জিত ও লাফ দেওয়া বাঘ লাঞ্ছিত যে পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল, সেই পতাকার বাতাসে কাঁপন আজ অবধিও ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সোচ্চারে।

    যখন ছোট ছিলাম পাড়ার দাদু সন্ধের লোডশেডিং-এ কাঁপা কাঁপা হ্যারিকেনের আলোয় বসে গল্প বলতেন। দেশভাগের পর এপাশে চলে আসা মানুষটির মুখেই প্রথম শুনেছিলাম আজাদ হিন্দ ফৌজের কথা। শুনেছিলাম সুভাষচন্দ্র বসু, ভারতের মুক্তির জন্য হিটলার, মুসোলিনি এবং তোজোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। শুনেছিলাম কমিউনিস্টরা তাঁকে বলে কুইসলিং। শুনেছিলাম নেহরু ভারতের মুক্তির অমন সুবর্ণ লগ্নে বলেছিলেন সুভাষ যদি ভারতে তাঁর বাহিনী নিয়ে আসেন তা হলে মোকাবিলায় তিনি নিজে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে পড়বেন। এবং এ-ও শুনেছিলাম সুভাষচন্দ্র তারপরেও তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি ব্রিগেডের নাম রেখেছিলেন নেহরুর নামে।

    আরও একটি কথা তিনি খুব আবেগ নিয়ে বলতেন। আজাদ হিন্দ রেডিও থেকে সম্প্রচারিত তাঁর বেতার-বার্তাতে সুভাষই সর্বপ্রথম জাতির পিতা বলে গান্ধীকে সম্বোধিত করেন। মহাত্মা তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে থাকলেও এই সম্মান সুভাষই গান্ধীকে দিয়েছেন সবার আগে। দাদু গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে বলতেন, ‘জাতির পিতা, ভারতের মুক্তির এই পবিত্র যুদ্ধে আপনার আশীর্বাদ এবং শুভেচ্ছা চাই।’ এরপরে আরও দুটি কথা বলতেন। এই রেডিও-বার্তাটির উপরোক্ত লাইনগুলি যে সত্যি তা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

    যে ক্ষোভ, যে ক্রোধ নিয়ে দাদু এত কথা বলতেন, সেদিনের সেই অন্ধকারে – তা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। অমনই ক্ষোভ নিয়ে আরও অনেককে বলতে শুনেছি অনেক কথা। কমিউনিস্টরা ব্রিটিশের দালালি করত তখন, তারা নেতাজীকে বলে কুইসলিং? এত স্পর্ধা? ওদের স্ট্যালিন যখন হিটলারের সঙ্গে বসে তামাক খেয়েছিল তখন তো বলতে পারেনি কিছু? এই যে ক্রুশ্চেভ আমেরিকার সঙ্গে গলাগলি করল – একটা কথা বলার সাহস দেখিয়েছে ওরা?

    এখনকার সময় অন্তর্জালে তর্কগুলো ভেসে আসে। আজাদ হিন্দ ফৌজের পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লায় পতাকা তুলবেন, ভাষণ দেবেন। এ নিয়ে বেশ উত্তপ্ত ভাব কিছু কিছু আলাপচারিতায়। তার শুরু হয় অনেকটা এমন ভাবে। ‘হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নিজের দলকে দেখুন! সুভাষ যখন যুদ্ধ করছেন, সাভারকাররা তো ব্রিটিশের সঙ্গে। ব্রিটিশের কাছে মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বার হয়ে আসা লোক আর কী করবে! সেনাদলে বেশি বেশি করে হিন্দুকে ঢোকাতে চাইছে যুদ্ধে অকারণ মরতে। অন্যদিকে কংগ্রেস লড়েছে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। আইএনএ-এর বিচারের উকিল সব কংগ্রেসই দিয়েছিল। নেহরু নিজে ছিলেন। কোথায় ছিল তখন হিন্দুত্ববাদীরা?’ অর্থাৎ লেখকের কংগ্রেসি সূত্র পাওয়া গেল। রে রে করে আসবেন প্রতিপক্ষ! ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কি করেছিল গান্ধী? কংগ্রেস? ব্যুয়োর যুদ্ধে কেন মেডেল পেয়েছিলেন গান্ধী? এত যে কথা বলছেন এ সব কি ইতিহাস না? সাভারকর চেয়েছিলেন হিন্দুরা বেশি করে ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনীতে ঢুকুন। যাতে হিন্দুদের অধিকার রক্ষার যুদ্ধে সৈন্য সুশিক্ষিত হয় এবং মজুদ থাকে। সাভারকরেরা জানতেন পার্টিশন হবেই। যদি স্রেফ কয়েক লক্ষ হিন্দু ঢুকে যেত না, আজ আর পাকিস্তান দেখতে হত না। তারাই সব বুঝে নিত’।

    এইখানে এলেন নেতাজী-ভক্ত। দল-টল সবের চাইতে তাঁর কাছে বড় নেতাজী। ‘কথা হচ্ছে নেতাজীকে নিয়ে! এ সব সাভারকার-গান্ধী না করে আসল কথাটা হোক। নেতাজী নেতাজীই। অমন আর কেউ আসেনি, আসবেনও না। তাঁকে ইতিহাসে অবজ্ঞা করেছে সবাই। আজাদ হিন্দ ফৌজের সেপাইদের, স্বাধীনতার পরেও আর স্বাধীন ভারতের ফৌজে নেওয়া হল না কেন? কেন ব্রিটিশদের সঙ্গে গোপন চুক্তিতে এ ভাবে প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের বঞ্চনা করা হয়েছে? তাঁরা নেতাজীর ডাকে সর্বস্ব দিয়েছিলেন বলে? তাঁরা সেনাবাহিনীতে থাকলে কোনো সরকারের সাহস হবে না যা খুশী তাই করার বলে?’ এইবারে আলোচনা এমন একটা দিকে চলে যাচ্ছে যেখানে আমরা কেউই খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করি না। সামরিক বাহিনী খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তার একদিকে রয়েছে সামরিক বাহিনী মানেই অত্যাচারী একটা ব্যবস্থা, অন্যদিকে রয়েছে সিয়াচেনে সৈন্যরা হিমশীতলতায়…। এর মাঝামাঝি কোনো আলোচনা বেশীক্ষণ চালানো অসম্ভব। অতএব আলোচনা ঘুরে যেতে থাকে আবার। বা অন্যত্র শুরু হয় নতুন করে।

    ‘রাফায়েল নিয়ে প্রশ্ন ওঠাতেই তো এ সব হচ্ছে! লোক যাতে কথা না বলে তাই আজাদ হিন্দ ফৌজকে মনে পড়া। অনিল আম্বানি কত কোটির মানহানির মামলা করেছে যেন?

    ”গলি গলি মে শোর হ্যায় রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়! বোফর্স ভুলে গেলি ভাই? গোটা স্বাধীনতা সংগ্রামে স্রেফ গান্ধী-নেহরুরাই যা করার করেছে। বাকী সব ফালতু ছিল। এই তো ইতিহাস বানিয়েছিস! আমরা প্যাটেল, সুভাষ – সবাইকে সম্মান জানাচ্ছি তাই অত কথা।’ ‘প্যাটেল হিন্দুত্ববাদীদের সহ্য করতে পারতেন না। নেতাজীর আদর্শ ছিল সেকুলার ভারত। যদি জানতেন আজকের হিন্দুত্ববাদীরা তাঁর নাম নেবে তা হলে লজ্জাতে মরে যেতেন।’ এই সবের ফাঁক গলে কয়েকজন চলে আসবেন যাঁরা দু’দিককেই সমান তালে খোঁচাবেন। ‘সুভাষ চন্দ্র কলকাতা কর্পোরেশনের জন্য হিন্দু মহাসভার সঙ্গে জোট করেছিলেন। ওদিকে নাৎসি হিটলার-ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি-তোজোর সঙ্গে।’ ‘এই যে বামৈস্লামিক এসে গেছে’! ‘কমিউনিস্টরা তো অটলের সঙ্গে সভাও করেছিল ব্রিগেডে। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে হবে’? দুদিক খোঁচানোর লোক দলহীন বা তৃতীয় ধারার হলে এই খোঁচা কাজ করবে না। ‘ওই জন্য তো হাতে আজ ক্ষমতা বদল হল।  ফজলুল হক মিনিস্ট্রিতে কৃষক প্রজার সঙ্গে লীগ ছিল। তোমাদের হিন্দু মহাসভাও ছিল’। ‘কত সাল। কোন মিনিস্ট্রি? লিঙ্ক দে!’ ‘জম্মু-কাশ্মীরে মেহবুবার সঙ্গেও তো ছিলে বাবা, লিঙ্ক দিতে হবে তার’? ‘এটা নকশাল রে! তোদের জন্য একমাত্র দাওয়াই এনকাউন্টার’। ‘তৃণমূলও হতে পারে। তোরা কার্নিভাল করছিস, বাংলার গর্ব নেতাজীর কথা মনে নেই না’? ‘কী করে মনে থাকবে? কেউ বলে দেয়নি তো ডহরবাবুদের’! ‘আর্‌রে, নেত্রীর ছবি ২৩শে জানুয়ারিতে নেতাজীর চেয়েও বড় করে দেয় ওরা’!

    যাঁকে নিয়ে এত কথা, তিনি কিন্তু চলে যাবেন কাউন্টার ন্যারেটিভে। শব্দের পর শব্দ লেখা হবে, উচ্চারিত হবে, সোল্লাসে প্রচারিত হবে সবার রাজনীতি-মনস্কতা। কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং তার স্বপ্ন? খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য এ সব প্রয়োজন মানুষের। পরাধীন ভারতবর্ষেই সুভাষচন্দ্র বোস কংগ্রেসে থাকাকালীন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কমিশন গড়েছিলেন এ সবের উত্তর খুঁজতে। ব্রিটিশ চলে গেলেই শুধু মুক্তি নেই, মানুষের কল্যাণে মুক্তি আছে। ব্রিটিশ তাড়াও তাই শুধু এজেন্ডা হতে পারে না। তাড়ালে যে ভারতবর্ষ হবে, সে ভারতবর্ষকে কেমন করে গড়া হবে তার পরিকল্পনাও হোক। স্বাধীন ভারতে সোভিয়েত মডেলে গড়া সে পরিকল্পনা কমিশন থেকে আজ নীতি আয়োগ হয়েছে। তার মধ্যে যা হয়েছে তা সকলেই দেখতে পাচ্ছেন। কার উন্নয়ন-কত অনুন্নয়ন সে সবের খতিয়ান ইতিহাস জমা করে চলেছে তার মত করে। শাসকের ইতিহাস,শাসিতের ইতিহাস, জনকল্পনার ইতিহাস সব স্রোতেই তার চিহ্ন থেকে যাচ্ছে।

    জনপরিসরের ইতিহাসচর্চা তার মধ্যে একধরণের মিশ্র অনুভূতিতে চলতেই থাকে। নিষ্কাশন করে তার সত্য-মিথ্যা। সত্তরের প্রায়ান্ধকার সেই সব সন্ধেতে ঐ দাদু বলতেন তিনি আজাদ হিন্দের সৈনিক। অপেক্ষা করে আছেন নেতাজীর ফেরার। নেতাজী খড়গপুরের ইন্দা মোড় দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যেমন গেছিলেন আফগানিস্তান, তেমনই ফিরবেন আবার। জানতে চাইতাম ফিরলে কী হবে! প্রায় ফিসফিস করে শ্লেষ্মা জড়ানো ঘড়ঘড়ে কন্ঠে দাদু বলতেন ‘যুদ্ধ হবে।’ শিহরিত হতাম, ভয় পেতাম, উত্তেজিতও হতাম। ‘কীসের দাদু’? ‘আজাদির’! এখন বয়সকালে বুঝি মৈরাং-এর পতাকাটি যদি লালকেল্লায় দেখা গেছে সত্যিই বলে দাদু মেনে নিতেন তা হলে তো গোপন যুদ্ধের কথাই আর আসত না। যাই হয়ে থাকুক, যাই হোক এখনও, জনপরিসরের ইতিহাস চেতনায় আশা-নিরাশা মিশ্রিত মুখ যেন ঝলসে ওঠে বারেবারে। ‘যুদ্ধ হবে’। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য’র যুদ্ধ? অপেক্ষাতে থেকে যাচ্ছে জনপরিসর, সেখানে ভোট-টোট ছাপিয়েও মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

    মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

    লেখক সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং নাট্যকর্মী

    The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More