শনিবার, মার্চ ২৩

নীতি ও দুর্নীতি

এমন নয় যে আমজনতা কিছুই জানতেন না, কিছু বুঝতেন না। এমন নয় যে প্রতিষ্ঠানটার অন্তর্নিহিত সততা ও নীতিনিষ্ঠা নিয়ে কোনও প্রশ্ন, সংশয় ছিল না। এমন নয় যে, প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে রাজনৈতিক প্রভুদের পদলেহনের ও তাদের স্বার্থরক্ষায় ‘শত্রু’ নিধনে হাত ধুয়ে নেমে পড়ার অভিযোগ আগে ওঠেনি। তাই এমন শ্লেষ সহকারে দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন প্রতিষ্ঠানটিকে ‘খাঁচায় বন্দী তোতাপাখি’ বলে অভিহিত করল, তখন কেউ বিশেষ একটা বিস্মিত হননি।

কারণ তাঁরা ইতিমধ্যেই জানতেন যে সিবিআই নামক কেউকেটা আর যাই হোক, সবরমতী আশ্রম নয়।

কিন্তু গত কয়েকদিনে যা ঘটছে, তা বোধহয় অভূতপূর্ব। দেশ থেকে দুর্নীতি তাড়ানোর সব চেয়ে শক্তিশালী অভিভাবক সংস্থার পয়লা নম্বর ও দু’নম্বর কর্তা পরস্পরের বিরুদ্ধে যে ভাবে বিষ উগরে দিচ্ছেন, একজন আরেকজনকে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, তোলাবাজ বলে সম্ভাষণ করছেন, এবং এই কদর্য ঝগড়ার জেরে যে ভাবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ধরপাকড় চলছে – হতবাক করে দেওয়ার মতো ঘটনা বইকি। কাদামাটির ওপর রঙের যতটুকু পোঁচ অবশিষ্ট ছিল, তাও খসে পড়ছে। বেরিয়ে পড়ছে বেআব্রু চেহারাটা। ক্ষমতাসীন প্রভুরাও ধামাচাপা দিতে পারছেন না, অশান্তি লুকোতে পারছেন না। এবং ভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রভু, যাঁরা গত প্রায় অর্ধদশক বৃত্তের বাইরে চলে গিয়ে গুমরোচ্ছেন, তাঁরা একদা যাই করুন না কেন, এখন নীতিবাগীশ সেজে নানাবিধ নীতিবাক্য শোনাচ্ছেন সিবিআইয়ের মুণ্ডুপাত করে।

সংবাদমাধ্যমও মাঠে নেমেছে। খবরের কাগজের প্রথম পাতা দখল করেছেন বর্মা মহোদয়, আস্থানা সাহেব। হঠাৎ মাথা তুলেছেন নাগেশ্বর মহাশয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মাথাব্যথা কতটুকু? আমজনতার চিন্তা ভাবনা ও চর্চার দর্পণ সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে এর উপস্থিতি কতটুকু?

সোজাসাপটা উত্তর, নিতান্তই নগন্য। #মিটু নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক আছে, শবরীমালার প্রবেশাধিকার নিয়েও গবেষণা প্রভূত। কিন্তু এই বিষয়ে গোটা সমাজটাই কার্যত চুপ। কারণ কী? কারণ একটাই – দুর্নীতির প্রশ্ন মানুষকে নাড়ায় না। মানুষ উদ্বিগ্ন হয় না। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, রাজনীতির অলিন্দের পরতে পরতে দুর্নীতি বাসা বেধে ছিল, আছে এবং থাকবে – এটাই যেন প্রকৃতির নিয়ম। এর সঙ্গে সহাবস্থান করে, সমঝোতা করে, আপোশ করে বেঁচে থাকতে হবে। নীতিভ্রষ্টতার জলাশয়ে গলা পর্যন্ত ডুবে থেকেও নেতা-নেত্রীরা ভাষণ দেবেন, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেবে, এবং আমরা প্রশ্ন না তুলে, উত্তেজিত ও উদ্বিগ্ন না হয়ে তাকে গ্রহণ করব – এটাই তো দস্তুর।

এ ভাবেই চলবে।  এ ভাবেই ভোট আসবে, যাবে, আবার আসবে। এবং আমরা পবিত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ করে কখনও ক-বাবু, তো কখনও খ-দেবীকে মসনদে সম্ভাষণ করব।

সংবেদনশীলতা ঝেড়ে ফেলে, মোটা চামড়ার বর্ম পরে নিলে বেঁচে থাকা সহজ হয় – অন্তত দুর্নীতির প্রশ্নে।

Shares

Comments are closed.