কংগ্রেস, তৃণমূলে সিবিআইয়ের ‘অসুর নিধন’ উল্লাস কেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শোভন চক্রবর্তী 

    গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে আসরে নামতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সিবিআই ‘গ্যাং ওয়ার’-এর দুই মাথা ডিরেক্টর অলোক বর্মা এবং স্পেশাল ডিরেক্টর রাকেশ আস্থানাকে। অন্তর্বর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ডিরেক্টর করা হয়েছে তেলেগু আইপিএস এম নাগেশ্বর রাও-কে। এরপরই কংগ্রেস এবং তৃণমূলের ভিতর শুরু হয়ে গিয়েছে ‘অসুর নিধন’ উল্লাস।

    বিরোধী শিবিরের অনেক দিন ধরেই অভিযোগ সিবিআই-কে রাজনীতির হাতিয়ার করছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। অতি পুরনো মামলা সব টেনে বের করছে। আর সেগুলি দিয়েই বিরোধীদের মাজা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছেন মোদী, অমিত শাহরা। সে চারা ঘোটালায় (পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি) লালুপ্রসাদকে জেলে পাঠানো হোক, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরমের ছেলে কার্তি চিদম্বরমের পিছনে ইডি, সিবিআই-কে লেলিয়ে দেওয়া হোক বা বাংলায় সারদা, রোজভ্যালি। সেখানে তদন্ত করা যতটা না উদ্দেশ্য তার থেকে বেশি বিরোধীদের বিব্রত করা। উনিশের ভোটের আগে সেটা ক্রমশ তীব্রতর হবে বলে আশঙ্কা ছিলই বিরোধীদের। হচ্ছিল-ও তাই। লালুপ্রসাদ যাদব ইতিমধ্যেই রয়েছেন রাঁচির জেলে। চিদম্বরম-পুত্রকে ডাকা হয়েছে বেশ কয়েক বার। এমনকী চিদম্বরমকেও ছুটতে হয়েছে দিল্লি পাতিয়ালা হাউস কোর্টে। এ দিকে সারদা রোজভ্যালি কাণ্ডে কুণাল ঘোষ থেকে শুরু করে শিবাজি পাঁজা, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, আইপিএস রাজীবকুমারদের ডাকা শুরু হয়ে গিয়েছিল। দিলীপ ঘোষরা খোলামেলা বলতে শুরু করে দিয়েছিলেন, পুজোর পরে কী খেলা হবে দেখতে পাবেন। গোটা তৃণমূল দলটাই জেলে ঢুকে যাবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি। এসব কথা থেকেই অনেকে সন্দেহ করছিলেন, তাহলে কি গেরুয়াবাহিনীর অঙ্গুলি হেলনেই কাজ করছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এই সংস্থা? কয়েক দিন আগেই একদা তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড তথা আজকের বিজেপি নেতা মুকুল রায় এবং কেন্দ্রীয় বিজেপি-র তরফে বাংলার পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়র ফোনের কথোপকথনের অডিও টেপ ফাঁস হয়ে যায়। যাতে শোনা গিয়েছিল মুকুলবাবু বলছেন, অমিত শাহের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে যে, যাতে সিবিআই আধিকারিকরা বাংলার কয়েকজন পুলিশ কর্তাকে একটু ডাকাডাকি করে ভয় পাইয়ে দেয়। কলকাতায় আয়কর দফতরের এক অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর নিয়োগের বিষয়েও কথাবার্তা শোনা গিয়েছিল। তাতে সিবিআই-বিজেপি’র ওতপ্রোত যোগের সন্দেহ আরও খানিকটা বেড়ে যায়।

    দেশের এই গরিমাশালী সংস্থাকে নিয়ে একটা সময় মানুষের মধ্যে একটা আস্থা ছিল সেটাই যেন ভাঙতে শুরু করেছিল। বাম আমলে ছোট আঙারিয়া থেকে নানুরের সূচপুর, একাধিক ঘটনায় তৎকালীন বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিবিআই তদন্তের দাবি করতেন। কারণ, সিবিআই-এর মর্যাদা ছিল ততটাই উঁচুতে। বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিলই বেশ কয়ে দিন ধরে। কিন্তু আস্থানা বনাম বর্মার যে যুদ্ধ লেগেছিল, তাতে একেবারে বেআব্রু হয়ে যায় সিবিআইয়ের ভিতরকার অবস্থা। এই ঘটনার পর সিবিআই সম্পর্কে সেই মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে বলেই মত অনেকের।

    কংগ্রেসের এক নেতার কথায়, “নরেন্দ্র মোদী একটা কথা বারবার বলেন। যে, ‘সত্তর সালমে কংগ্রেস নে জো নেহি কর পায়া। হামনে পাঁচ সালমে কর দিখায়া।’ উনি ঠিকই বলেন। সত্তর বছরে কংগ্রেস যা করতে পারেনি উনি পাঁচ বছরে তা করে দেখিয়েছেন। সিবিআইয়ের যে বিশ্বাসযোগ্যতা, সেটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। দেশের এত বড় ক্ষতি সত্তর বছরে কেউ করেনি।”

    সিবিআই-কে নিয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনীতির যে ঘটনা প্রবাহ এটাকেই ‘অসুর’ বলে মনে করছেন অনেকে। আর সেই ‘অসুর নিধন’-এর উল্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূলের ভিতর। শুধু কংগ্রেস তৃণমূল নয়। এই উল্লাস শুরু হয়েছে আরজেডি-র ভিতরেও। লালু-পুত্রের টুইট বার্তায় সে ইঙ্গিত স্পষ্ট।

    সামনের মাস থেকেই শুরু পাঁচ রাজ্যের ভোট প্রক্রিয়া। যাকে অনেকেই বলছেন উনিশের ভোটের সেমি ফাইনাল। সেই ভোট প্রচারে কংগ্রেস বলছে, এই কারণেই সিবিআই বসুন্ধরা রাজের বিরুদ্ধে তদন্ত করেনি। মধ্যপ্রদেশে ব্যপম কেলেঙ্কারিতে সিবিআই-এর ক্লিনচিটও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সারদা, রোজভ্যালি, নারদ তদন্তে সিবিআইয়ের গা ঝাড়াদেওয়া নিয়ে তৃণমূলও ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এর মধ্যে আবার মুকুল-কৈলাসের দ্বিতীয় অডিও টেপ ফাঁসের পর সামনে এসেছে নারদ স্টিং-এর নায়ক ম্যাথু স্যামুয়েল প্রসঙ্গ। নারদ কাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত মুকুলবাবুকে বলতে শোনা যাচ্ছে ম্যাথুর কাছে একটি চব্বিশ ঘণ্টার এমন ডকুমেন্টরি আছে যাতে তৃণমূল দলটাই উঠে যাবে। সেটা কেনার দাম নিয়েও আলোচনা হয় মুকুল-কৈলাসের। ফলে সিবিআই যে বিজেপি-র রিমোটে পরিচালিত হচ্ছে এ কথা বলার ভুরিভুরি উদাহরণ মজুত রয়েছে বিরোধীদের হাতে। এরপর যদি উনিশের ভোটের আগে নতুন ডিরেক্টর নাগেশ্বর রাও-কে দিয়ে ধরপাকড় প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন কংগ্রেস, তৃণমূল বলতে পারবে এ সবটাই রাজনীতির খেলা। জবরদস্তি ফাঁসানো হচ্ছে। তারই প্রেক্ষাপট তৈরি করতে কোজাগরী পূর্ণিমার দিন থেকেই নেমে পড়লেন রাহুল গান্ধী থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

    তবে খেলা এখানেই শেষ নয়। কারণ নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ জুটি রাজনীতিতে ক্ষুরধার। এরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। এখন তাঁরা কী করেন সেটাই দেখার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More