শনিবার, এপ্রিল ২০

দেবী দুর্গাকে যে রূপে আমরা পুজো করি, তার প্রকৃত অর্থ কী

স্বামী অলোকেশানন্দ

পুজো শেষ। নেমে এসেছে দশমীর সন্ধে। উৎসব শেষে এবার পালা দেবীর বিসর্জনের।

কিন্তু দেবী দুর্গাকে যে রূপে আরাধনা করলাম আমরা, কী তাঁর প্রকৃত অর্থ?

সচারাচর দুর্গার যে কাঠামো বাংলায় দেখা যায় তাতে থাকে সাতটা মূর্তি। কাঠামোর মাঝখানে দেবী দুর্গা। তাঁর ডানদিকে, ওপরে লক্ষ্মী, একটু নীচে গণেশ। বাঁদিকে একইভাবে ওপরে সরস্বতী, নীচে কার্তিক। আর দেবীর পায়ের কাছে একদিকে সিংহ, অন্যদিকে অসুর। দেবীর ডান পা সিংহের পিঠে। আর বাঁ পায়ের শ্রী আঙুল অসুরের কাঁধের রাখা।

দুর্গা শব্দটার বিভিন্ন অর্থের দ্যোতক। যিনি দুর্জ্ঞেয়া, মানে যাঁর তত্ত্ব দূরতিগম্য তিনিই দুর্গা। তিনি কৃপা করলে তবেই তাঁর তত্ত্ব জানা সম্ভব।

‘দুর্গা’ শব্দের ‘দ’ অক্ষরটা দৈত্যনাশক, ‘উ’-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ পাপনাশক এবং এবং ‘আ’-কার ভয় শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। আবার ‘দুর্গ’ নামের অসুরকে তিনি বধ করেছেন বলে তিনিই নিত্য দুর্গা নামে পরিচিত। এই দুর্গাই সমস্ত শক্তির আধার। সব দেবতাদের শক্তির ঘনীভূত মূর্তি। তিনি স্নেহময়ী মা, তাই তাঁর চোখ থেকে সবসময়েই বর্ষিত হচ্ছে করুণাধারা। হৃদয়ে মুক্তিপ্রদ কৃপা এবং যুদ্ধে মৃত্যপ্রদ কঠোরতা, মায়ের মধ্যে এই দুই ভাবের অপূর্ব সমন্বয়।

দেবীর বাহন সিংহ। সিংহ খুব শক্তিশালী পশু। রজোগুণের প্রতীক। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল এই রজোগুণের মধ্যেই রয়েছে এক প্রচণ্ড শক্তির উচ্ছ্বাস। সর্বসত্ত্বময়ী দেবী মহামায়া অসুরের বিরুদ্ধে রজোগুণের প্রতীক সিংহকে নিজের নিয়ন্ত্রণের রেখেছেন। দেবী দুর্গার পুজো করে মহাশক্তির অর্জন আমাদের পরম কাম্য। কিন্তু সত্ত্বগুণের অনুশীলন করে সেই মহাশক্তির উপযুক্ত প্রয়োগেরও শিক্কা জরুরী।

এর আরেকদিকও আছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই আছে পশুশক্তি। মানুষ যখন তাঁর পুরুষকার ও সাধনভজনের মাধ্যমে যথার্থ মনুষ্যত্বে উপনীত হয় তখন তার পশুভাব কেটে গিয়ে দেবভাব জাগ্রত হয়। তখনই সে প্রকৃত শরণাগত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। সার্থক জীবনের অধিকারী হয়। দেবীর পায়ের কাছে থাকা সিংহ সেই ভাবেরই প্রতীক।

অসুর মানে হল সুরবিরোধী। দৈবশক্তির সঙ্গে আসুরিক শক্তির সংগ্রাম চিরকালের। এই সংগ্রাম বাইরে যেমন চলছে, তেমনই রয়েছে মানুষের ভেতরেও। সাধকের সাধনার ক্ষেত্রেও। অসুর আসলে মানুষের প্রবহমান জীবনের প্রতীক। দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা ও অজ্ঞান – এইগুলো হল আসুরিক সম্পদ। সব ধরনের উন্নতি ও কল্যানের পথের অন্তরায় হয়ে ওঠে এই আসুরিকা ভাবগুলিই। অসুরের প্রাণশক্তি প্রচুর। কিন্তু সে মানুষকে অসৎ পথে চালিত করে। অন্যদিকে নির্ভীকতা, শুদ্ধ ব্যবহার, জ্ঞান ও যোগনিষ্ঠা, দান, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধহীনতা, ত্যাগ, শান্তি, জীবে দয়া, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্ষ ইত্যাদি হল দৈবী ভাব। আসুরিক ভাবগুলোকে পরাস্ত করে মানুষকে দৈবী ভাবে উন্নীত করার চেষ্টাই করেন দেবী দুর্গা।

লক্ষ্মী হলেন বিকাশ বা অভ্যুদয়ের প্রতীক। ধন, জ্ঞান এবং শীল এই তিনের বিকাশ হয় দেবী লক্ষ্মীর মাহাত্ম্যে। সর্বাত্মক বিকাশের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা তিনি। তাই তাঁর নাম কমলা। কমল বা পদ্মের মতোই সুন্দর তিনি।

পুরাণ অনুযায়ী লক্ষ্মী হলেন সমুদ্রসম্ভবা। সমুদ্রমন্থন করার পরেই তাঁর উৎপত্তি। সমুদ্র হল রত্নাকর। যাকে মন্থন করলে রত্ন পাওয়া যায়। বিশ্বপ্রকৃতিও তেমনই একটি সমুদ্র।

কেবল টাকাপয়সাই ধন নয়। মানুষের চরিত্রধনই তার মহাধন। যার অর্থ নেই সে লক্ষ্মীহীন। কিন্তু যার চরিত্রধন নেই সে লক্ষ্মীছাড়া। আবার সাধক লক্ষ্মীর আরাধনা করে মুক্তিধনের জন্য।

লক্ষ্মী শব্দটার আরও একটা অর্থ হল মঙ্গল। লক্ষ্মী মঙ্গলেরও দেবী।

লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। পেঁচা দিবান্ধ। যারা দিবান্ধ, তারা তত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞ। এই রকম মানুষকে পেচকধর্মী বলা হয়। মানুষ যতদিন পেচকধর্মী থাকে ততদিন ধনধান্যদি পার্থির বস্তুর অধিষ্ঠাত্রী দেবীর উপাসনা করে।

পেঁচা আবার যমের দূতও। যম হলেন ধর্মরাজ। যারা কুপথে যাবে, অধর্ম করবে, যমের দণ্ড তাদের মাথায় পড়বে। পেঁচার চিৎকার যেন একথাই ঘোষণা করে।  আবার পেঁচা দিনের বেলায় ঘুমোয়। রাত্রে জেগে থাকে। ভোগীর যা রাত, তাই যোগীর দিন। ভোগীর যা দিন, তাই যোগীর রাতও।

গণেশ সিদ্ধির দেবতা। আবার তিনি গণদেবতাও। গণশকি এক্যবদ্ধ হলে সব ধরনের বাধা সরে যায়। গণেশের আরও এক নাম বিঘ্নেশ। অর্থাৎ বিঘ্ননাশকারী।

গণেশের বাহন ইঁদুর। জীবের কর্মফল অজ্ঞাতসারে অপহরণ করে বলে ইঁদুরকে মূষিক বলা হয়।

গণেশের পুজো করলে মোক্ষা প্রত্যাশী, মায়াজাল ছিঁড়ে অষ্টপাশের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করে। আবার ইঁদুর দাঁত দিয়ে শক্ত জাল ও দড়ি ছিঁড়ে ফেলতে পারে। ইঁদুর তাই মায়াজান ছিন্ন করার, অষ্টপাশের বন্ধ থেকে মুক্ত হওয়ার প্রতীক।

সরস্বতী বিদ্যাদায়িনী। তিনি মায়ের জ্ঞানশক্তি। দেবীর হাতে পুস্তক ও বীনা। পুস্তক হল বেদ শব্দব্রহ্ম। বীণা সুরছন্দের প্রতীক। সরস্বতী শুদ্ধ সত্ত্বগুণের পূর্তি তাই সর্বশুক্লা। শ্বেতবর্ণটা প্রকাশাত্মক।

সরস্বতীর বাহন হাঁস। যে সাধক দিনরাত অজপা মন্ত্রে সিদ্ধ হন তিনি হংসধর্মী। মানুষের শরীরের সবসময় একুশহাজার ছশো ‘হংস’ এই অজপা মন্ত্রজপের রূপে শ্বাস-প্রশ্বাস করে। মানুষ যতদিন এই স্বাভাবিক জপ উপলব্ধি করতে পারে, ততদিন সে ‘হংসধর্মী’ হতে পারে না। ফলে ব্রহ্মবিদ্যারও সন্ধান পায় না।

হাঁস জলে থাকে। কিন্তু তার গায়ে জল লাগে না। যাঁরা পরমহংস তাঁরা সংসারে বাস করেন, কিন্তু সংসার তাঁদের ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। হাঁস সম্পর্কে বলা হয়, যে তাকে জল আর দুধ মিশিয়ে দিলে সে জল বাদ দিয়ে দুধ খাবে। আর হাঁসের গতি সবসময় সোজা। মানুষ যখন সংসার থেকে শুধু প্রকৃত সারটুকুই নিতে পারে, তার গতিও হয় যখন শুধু ঈশ্বরের দিকে, তখনই সে ব্রহ্মবিদ্যালাভ করে। ঈশ্বর দর্শন করে।

কার্তিক দেবসেনাপতি। সৌন্দর্য ও শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। সাধক জীবন ও ব্যবহারিক জীবনে কার্তিককে প্রসন্ন করলে মানুষ শৌর্য-বীর্যের অধিকারী হয়।

কার্তিকের বাহন ময়ূর। সৌন্দর্য ও বীর্য, কার্তিকের এই দুই ভাব ময়ুরের মধ্যেও আছে। ময়ুরের মত অনলস, কর্মকৌশলী, নারীরক্ষায় উদ্যমী, বিষাক্ত-ভক্ষক, স্বজন-প্রীতিমান অথচ সৌন্দর্যশালী প্রাণী আর নেই।

মা দুর্গা স্বয়ং সমস্ত শক্তির আধার। তাঁকে পরিবৃত করে আছেন সর্বাত্মক বিকাশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী, শৌর্য ও বীর্যের প্রতীক কার্তিক এবং সর্ববিঘ্নবিনাশকারী সিদ্ধিদাতা গণেশ। অতএব, সেই দেবী দুর্গাকে যে প্রসন্ন করতে পারবে বিদ্যা, যশ, শ্রী – সব কিছুই যে তার অধীন হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

লেখক রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী 

পূজা – বিজ্ঞান  স্বামী প্রমেয়ানন্দ  থেকে সংকলিত  

Shares

Comments are closed.