সোমবার, এপ্রিল ২২

রোশনাই, কলরোল, মণ্ডপ, প্রতিমার সামনে সিগনালের লাল নিষেধ

সৌমেন পাল

চাকরিতে জয়েন করার  পরই জানতে পেরেছিলাম পুজোয় কোন ছুটি নেই!

মন খারাপ হয়েছিল খুব। দুর্গাপুজো বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব। কৈশোর থেকে এই সেদিন পর্যন্ত, কত মেদুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে পুজোকে ঘিরে!

এই চাকরিটা কিন্তু ভালোবেসেই করতে এসেছিলাম আমি। না, এমন নয় যে ছোট বেলা থেকেই ভাবতাম ট্রেন চালাব।

কিশোর বয়েসে সবাইকেই এক অমোঘ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় – বড় হয়ে কী হতে চাও?  নানারকম উত্তরও দিই আমরা –  কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ পাইলট, কেউ শিক্ষক… হরেকরকম্বা ‘হতে চাওয়ার’ এক কল্পলোক। কারও পূরণ হয়, কারও হয়না। অনেকের নির্দিষ্ট করে কিছুই হওয়ার থাকেনা। তাকে ওই প্রশ্ন করা হলে ভ্যাবলার মত চেয়ে থাকে! মুখে কথা ফোটেনা! আমারও ওরকমই। ‘কিছু হতে পারা’র আকাঙ্খা কোনদিনই ছিল না। এটুকু বুঝতাম, আর যাই হোক, বিরাট কোনও কিছু হয়ে ওঠা আমার ধাতে নেই। আসলে ‘হতে পারা’ ব্যাপারটা বরাবরই আমার কাছে এক কুয়াশাঘেরা ধাঁধা! আমরা কি আদৌ কেউ কিছু হতে পারি? আমি বরাবরই মুহূর্তে বাঁচতে ভালবাসি। আজকের চুটিয়ে বেঁচে নেওয়াটাই আমার বড় পাওনা। সুতরাং আগামীর চিন্তা কখনোই বিশেষ তাড়া করেনি, কী চেতনে কী অবচেতনে।

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যখন  ভর্তি হলাম, তখন থেকেই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু। কয়েকজন সিনিয়রকে দেখে, একটা ইচ্ছে ক্রমশ মাথায় চেপে বসল – ট্রেন চালাব। চালাবই। যদিও সে দেখাটা ছিল শুধুই বাইরে থেকে। তবু ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে শেকড়ে চারিয়ে গেল! ট্রেন চালকই হতে হবে কেন? নিজের মত করে অদ্ভুত কিছু যুক্তি খাড়া করলাম। যা মনে পড়লে এখন নিতান্তই ছেলেমানুষি মনে হয়, মজাও লাগে! যেমন –  মাটির উপর দিয়ে চলা সবচেয়ে বেশি চাকার গাড়িটা আমি চালাচ্ছি। অথবা আমাদের সমাজে চূড়ান্ত ক্ষমতাবান, অর্থবান কেউ চাইলেই একটা ব্যক্তিগত জাহাজ বা উড়োজাহাজ কিনতে পারেন। কিন্তু মাথা খুঁড়লেও আস্ত একটা ট্রেন কিনতে পারেন না। সাময়িক ভাড়া নেওয়া চলে। কিন্তু মালিকানা আগাগোড়া রাষ্ট্রের। সেই ট্রেন আমি চালাব। কোথাও যেন কিছু হতে না পারা মানুষের স্বর শুনতে পেতাম! যে ট্রেন চালিয়ে, কত পাহাড়-নদী-অরণ্য-ধানমাঠ পেরিয়ে চলে যাচ্ছে চেনা শহর থেকে অচেনা দিগন্তে!  কত মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছে গন্তব্যে! এইসব ভাবতে ভাবতে অজান্তেই মনের গুটিপোকার কোকুন বোনা শুরু। যা একদিন সত্যিই গুটি কেটে বেরিয়ে এল!

২০০৬-এ যোগ দিলাম চাকরিতে। পোশাকি নাম  –  অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকোমোটিভ পাইলট অর্থাৎ সহকারী চালক। পোস্টিং পশ্চিম ওড়িশার ব্রজরাজনগর। তখন কী আর জানতাম, পড়েছি যবনের হাতে! এ চাকরির নিয়মকানুন আর পাঁচটা চাকরির থেকে ভিন্ন! মনের একটা ইচ্ছে পূরণ হল বটে। তবে কোপ পড়ল অন্য অনেক ইচ্ছেদের উপর। অসম্ভব কড়াকড়ির ফাঁস সেধে গলায় পরলাম। অন্য চাকরির মতো সাধারণ ছুটিছাটা বিলকুল নেই। এমনকি জাতীয় ছুটিও না। যার ক্যালেন্ডারে কোন লাল কালির তারিখ নেই। কোন পুজো-পার্বণ নেই। আনন্দ উৎসবে সামিল হওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। বরং প্রতিটা সামাজিক উৎসবে জনজীবন সচল রাখতে, মানুষের অংশগ্রহণ সর্বাঙ্গীন করতে একজন ট্রেন চালককে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। সবার ছুটিতেই তার কর্তব্যের পারদ চড়ে। ও সময় তার ছুটি নেই। থাকতে নেই। নইলে স্তব্ধ হয়ে যাবে প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম  –  লাইফ লাইন অব ইন্ডিয়া। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি… নিরবিচ্ছিন্ন পরিষেবা দিয়ে যেতে হবে। এমনকি স্থানীয় উৎসবেও ছাড় নেই। তারপরও পান থেকে চুন খসলেই যাত্রীদের কটুক্তি, চোখরাঙানি সহ্য করতে হয়। ট্রেন লেট চলার প্রত্যক্ষ দায়ী না হয়েও আমাদের দিকেই ছুটে আসে অশ্রাব্য গালিগালাজ। এমনকি ইট-পাটকেল পর্যন্ত। কারণ আমরা পাবলিক সার্ভেন্ট। এবং জনতা জনার্দন! এহেন চরম অসহিষ্ণুতার আবহে মাথা ঠান্ডা রেখে, সিগনাল দেখে একজন চালককে নিরন্তর কাজ করে যেতে হয়। নিরাপদে পৌঁছে দিতে হয় সেই মারমুখি যাত্রীদের। এ যেন সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটা…!

অতএব চাকরির প্রথম থেকেই ওই আকাশি-নীল ইউনিফর্মই আমার পুজোর পোশাক। পঞ্চমী থেকে দশমী ইঞ্জিনের ক্যাবরুমটাই পুজোমণ্ডপ। প্রথম প্রথম বয়স কম, খুব কান্না পেত! সবাই ঘুরছে ফিরছে! সারাটা বছরের জমানো সুখ দুঃখ ভাগ করে নিচ্ছে প্রিয়জনের সঙ্গে! কত আলো, রোশনাই, হাসি, গান রুমালে বেঁধে মানুষ বন্ধুর হাতে হাত রেখে পথে নেমেছে! আমরা নিরুপায়… শুধু ডিউটি ডিউটি ডিউটি। আস্তে আস্তে সইয়ে নিয়েছি। তবু মনখারাপ আরও বেড়ে যায়, যখন দেখি পুজোর নতুন জামাকাপড়ে সেজে, সুগন্ধি চর্চিত সুখী পরিবারের কর্তা মা, বাবা, বউ, ছেলে মেয়ে নিয়ে,  উৎসবের আমেজ গায়ে মেখে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায়, ঠাকুর দেখতে চলেছে। ওই লাখো লাখো দর্শনার্থীদের ভিড়ে ভেসে ওঠে বাড়ির মানুষগুলোর মুখ। মা-বাবার মুখ। বন্ধুদের মুখ। যারা আমার পথ চেয়ে বসে থাকে অন্তহীন অপেক্ষায়।

অথচ কথা রাখা হয়না আমার। ডিজেল ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়ায় ফেলে আসা রেল লাইনে মিলিয়ে যায় প্রতিশ্রুতির খোলামকুচি। সন্ধেয় ফিরব বলেও ফেরা হয়না। সময় বয়ে যায়। গভীর হয় রাত। উৎসবের রোশনাই এগিয়ে আসে না আমাদের চৌকাঠে। প্রতিমা, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা, কোলাহল পিছনে ফেলে শিউলির ভোর মাড়িয়ে অবসন্ন এক ট্রেন চালক ঘরে ফেরে। ততক্ষণে পুজোর প্রিয় জামাটা পরেই ঘুমিয়ে পড়েছে ছোট্টো শিশু। স্ত্রী অধীর উৎকন্ঠায় জানলার পাশে – চেয়ে আছে রাস্তার নিভে আসা টুনিগুলোর দিকে। আর মা-বাবা নিশ্চল প্রহর গুনছে ছেলের ঘরে ফেরার। মিউট করা চ্যানেলের পুজো পরিক্রমা অতিক্রম করে চলেছে উত্তর… দক্ষিণ… মধ্য… মফস্বল… থেকে কলেজ… ম্যাডক্স চতুর্ভূজ।

বেশ কয়েকবছর আগের কথা। তখন অন্ডালে পোস্টিং। ছুটিতে বাড়ির সবার জন্য কেনাকাটা সেরে গেছি। অনেক বলে-কয়ে অষ্টমীর ভোররাতে ডিউটি নিলাম। যাতে বেলায় অফ করে দুপুরের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারি। অষ্টমীর সন্ধেটা পরিবার-বন্ধুদের সাথে কাটিয়ে পরদিন কর্মস্থলে ফিরব। মালগাড়ি চালাই। সিডিউলের কোন ঠিক ঠিকানা নেই। অন্ডাল থেকে ট্রেন রামপুরহাট পৌঁছে দিয়ে তবেই মুক্তি। দুর্গাপুরে গাড়ি ইয়ার্ডে নিল। চালানোর নাম নেই! খবর পেলাম আগে ওভারহেড লাইনে গোলোযোগের দরুন লম্বা ব্লক চলছে। মালগাড়ি চালাতে দেরি হবে। তবু আশায় বাঁচে চাষা। এদিকে বেলা গড়িয়ে যায়। বাড়িতে খবর দিলাম ফিরতে অনেক দেরি হবে। অবশেষে দুপুরের দিকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেল। থমকে থমকে চলছি। সন্ধে নেমে এল। মহা অষ্টমী – রাস্তায় ঢল নেমেছে। আলো-সুরে মুখরিত চারপাশ। বাতাসে ভেসে আসছে উচ্ছ্বাস। মাইকে জনপ্রিয় গান। সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ। রেলপথ থেকে দেখা প্যান্ডেলগুলোর চূড়ো আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে! ইচ্ছে করছে সব ফেলে একছুটে চলে যাই মা’র কাছে। বলি, ‘আমি চলে এসেছি মা। ঠাকুর দেখতে যাবেনা?’ কিন্তু উপায় তো নেই। কর্তব্যের বেড়ি বড় কঠিন।

রামপুরহাট পৌছলাম, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা। ব্যারাকপুর ওখান থেকে অনেকটা পথ। তেমন ট্রেনও নেই। মাকে বললাম,  ‘আজকেও পারলাম না মা।’  দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে মা সান্তনা দিল,  ‘মনখারাপ করিস না। পুজো তো আবার আসবে।‘ ফোনের ওপারে মার ভেঙে পড়া মুখটা যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম! হ্যাঁ, পুজো আবার আসবে। চোখধাঁধানো রোশনাই, শরতে চুইয়ে নামা মৃদু শীতের আমেজ, পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আদর মেখে পুজোর কার্নিভালে ভেলা ভাসাবে সবাই। ডুবে যাবে উদযাপনের অমৃতে। তাদের উৎসবের রাজপথ সচল রাখতে দিনরাত চব্বিশঘন্টা নিয়োজিত যারা –এ রোশনাই, কলরোল, মণ্ডপ, প্রতিমা তাদের জন্য নয়!  সেখানে শুধুই  সিগনালের নিষেধের লাল।  কিন্তু তাদেরও একটা ঘর আছে। একটা পরিবার – যেখানে মাবাবা ছেলের অপেক্ষায়, স্ত্রী স্বামীর অপেক্ষায়, সন্তান বাবার অপেক্ষায় উৎসবের আনন্দ মুঠোয় চেপে পথ চেয়ে থাকে। বেলোয়ারি ঝাড়বাতির নিচে সেই মানুষগুলোর মুখ কেউ দেখতে পায় না।

সেই মুখ ঢাকা পড়ে থাকে চালক কেবিনের চাপ চাপ গাঢ় অন্ধকারে। যে অন্ধকার ফিরিয়ে দেয় সেই অমোঘ প্রশ্ন – বড় হয়ে কী হতে চাও? আমার ভেতর থেকে এক কিশোর বলে ওঠে  – ‘বড়’ হতে চাইনা…

কিন্তু বড় তো হয়েই গেছি। সমান্তরাল দুটো ইস্পাতের লাইন দিয়ে তাই ছুটে যাই শুধু ইঞ্জিন নিয়ে। আর তার হুইসলে চাপা পড়ে যায় ঢাকের আওয়াজ।

Shares

Comments are closed.