শরতের সাদা মেঘ পুনের বাঙালিকে পুজোর কথা মনে করিয়ে দেয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অপরাজিতা ভট্টাচার্য

    বিমান নগরের পুজো

    কথায় বলে দশ জন বাঙালি একত্র হলেই দুর্গা পুজো হয়। সেখানে প্রায় দশ লক্ষ বাঙালির বাস পুণেতে। কুড়িটার বেশি দুর্গা পুজো হয়। মূলতঃ জীবিকার কারণে বহু বাঙালি পুণের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। আর সেই কারণেই বাঙালির প্রাণের উৎসব  দুর্গা পুজোর আয়োজন। প্রবাসে দুর্গা পুজো আয়োজনের সব থেকে বড় সমস্যা ছুটি। দশমীর দিন ছাড়া স্কুল,কলেজ, অফিসে ছুটি থাকে না। কিন্তু তাতে তো আর উৎসাহে ভাঁটা পড়ে না। প্রায় মাস তিনেক আগে থেকে পুজো কমিটির কর্ম কর্তারা পরিকল্পনা শুরু করেন। সেইমত দায়িত্বও ভাগ করে নেওয়া হয়। প্রবাসে পুজোর একটা বড় আকর্ষণ হল পুজোর চারদিন দুপুরবেলা খিচুড়ি ভোগ বিতরণের ব্যবস্থা। এই আয়োজন পুজো কমিটিই করে থাকেন। বিকেল থেকে পুজো সংলগ্ন  স্টলগুলোতে আমিষ এবং নিরামিষের রকমারি পদ পাওয়া যায়। দৈনন্দিনে যে লোভনীয় পদ গুলো পাওয়ার সুযোগ হয় না সেসবই মেলে স্টলগুলোতে। অত্যন্ত জনপ্রিয়  ফুচকা, ঝাল মুড়ি, আলু কাবলি, এগরোল, চিকেন রোল, বিরিয়ানি এবং কোলকাতার মিষ্টি। পুজোর চারদিন হেঁসেল বন্ধ রাখা যায়। গৃহিণীদের এটা উপরি পাওনা।

    ঠাকুর আনা, ঠাকুরের সাজ, আনন্দ নাড়ু, ভোগ রান্নার তদারকির ব্যবস্থা, সন্ধি পুজোর জোগাড় ইত্যাদি হাজারো কাজে মেতে ওঠেন সবাই। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা গান, নাচ, নাটকের অনুষ্ঠান হয়। মাস খানেক আগে থেকে এই অনুষ্ঠানের মহড়া চলে। কাজকর্ম সেরে রোজ রিহার্সাল এবং আড্ডায় বাংলাকে ছুঁয়ে থাকা যায়। কোলকাতা থেকে বিখ্যাত শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করতে আসেন।পঞ্চমীর দিন মণ্ডপ গুলিতে আনন্দমেলা হয়। এই মেলা সত্যিই আনন্দের, বিনিময়ের, বাংলায় কথা বলার।

    পুণেতে কাশ ফুল চোখে পড়ে না। কিন্তু আকাশ তো প্রবাস মানে না। শ্রাবণের কালো মেঘ কেটে পুণেতেও  তুলোর মত মেঘ ভাসতে থাকে গণপতি পুজোর পরেই। আর এই মেঘ পুণের বাঙ্গালিকেও দুর্গা পুজোর কথা মনে করিয়ে দেবেই ।

    এই মেঘ সত্যিই  শরতের অতিথি হয়ে রোজকার ক্লিশে রুটিনে আলাদা উন্মাদনা তৈরি করে। পুজোর কেনাকাটা , তোড়জোড় ইত্যাদি শুরু হয়। অনেকেই অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিয়ে অফিসে রওয়ানা হন। সন্ধ্যেবেলাগুলিতেও  কাজ শেষ করে মণ্ডপে পৌঁছন। প্রবাসে বেড়ে ওঠা ছেলে মেয়েরা পুজোকে চেনে। পুজোর প্রতিটি আচার অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে পালন করা হয়। মন্ত্রপাঠ, ধূপধুনো, অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধি পুজোর একশ আট প্রদীপ,  ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা আর  ঢাকের সঙ্গতে  বাংলা পুণে একাকার হয়ে যায় ।

    এবার আসি কিছু পুজোর কথায়।

    পুণের প্রাচীনতম দুটো পুজো হল পার্ক রোডে খাড়কি কালীবাড়ির দুর্গা পুজো এবং কংগ্রেস ভবনের ( শিবাজিনগর) পুজো। খাড়কি কালীবাড়ির পুজোর এবার ঊনআশিতম বর্ষ। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে তৈরি হয়েছে এবারের পুজো মণ্ডপ। পুজোর চারদিনই দুপুরে বিনামূল্যে ভোগ বিতরণের ব্যবস্থা থাকে। সন্ধি পুজোর পর বলি হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় প্রতিদিন সন্ধ্যায়।

    খাড়কি কালীবাড়ির পুজো

    বঙ্গীয় সংস্কৃতি সংসদের পরিচালনায় কংগ্রেস ভবনের পুজো এবার আটাত্তর বর্ষে পা দিল। পুণের বাঙালিরা প্রতিমা এবং কোলকাতার মিষ্টির জন্য এখানে ভিড় জমান।

    খারকি ঔন্ধ রোডের ওপর পুণের কুমোরটুলি। কর্ণধার শ্রী সুখরঞ্জন পালের তত্ত্বাবধানে কোলকাতা থেকে আসা শিল্পীরা এখানে প্রতিমা তৈরির কাজ করেন।

    প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে

    গত সতের বছর ধরে কোরেগাঁও পার্কে দুর্গা পুজো হচ্ছে। এই পুজোর ভোগ জনপ্রিয়। স্টলগুলোতে লোভনীয় আমিষ এবং নিরামিষ বাঙালি পদ পাওয়া যায়।

    ভোঁসলে নগর , হাডাপসারের পুজোটিও সাবেকিয়ানায় উজ্জ্বল। পনেরো বছর ধরে পুজোটি হয়ে আসছে।

    ঐকতান বঙ্গীয় পরিষদের পুজোর এবার সপ্তম বর্ষ। প্রতি বছর তারাপীঠ থেকে পুরোহিত আসেন। রাঁধুনে এবং হালুইকরও আসে বাংলা থেকেই। তিন দিনে প্রায় সাত হাজার দর্শনার্থীকে ভোগ পরিবেশন করা হয়। ন্যূনতম বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যমে এখানে পরিবেশ সহায়ক পুজো হয়। কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত।

    বিমান নগরের এবার চোদ্দতম দুর্গা পুজো। চারদিনের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর মাধ্যমে জমজমাট হয়ে ওঠে এই পুজো।

    অগ্রদূত বঙ্গসমাজের পরিচালনায় খাড়াডি সার্বজনীন দুর্গোৎসবের এই বছর প্রথম প্রয়াস । পঞ্চমীতে ছোটদের বসে আঁক প্রতিযোগিতা এবং রক্তদান শিবির আয়োজনের মাধ্যমে পুজোর সূচনা হল ।

    খাড়াডির প্রতিমা
    খাড়াডিতে ছোটদের বসে আঁকো প্রতিযোগিতা
    খাড়াডির রক্তদান শিবির

    চাকরি , ব্যবসা ইত্যাদি ব্যস্ততার মধ্যেও শুধুমাত্র এই পুজোকে কেন্দ্র করে পুণের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালিরা মণ্ডপে মণ্ডপে একত্র হন । মহালয়ার পরের দিন অর্থাৎ প্রথমা থেকেই মারাঠি সহ অবাঙ্গালি সম্প্রদায়ের মানুষের নবরাত্রি উৎসব শুরু হয়ে যায় । ফলে তাঁরাও প্রতিমা দর্শনে আসেন ।  উৎসবের দিন গুলো আলোয় আনন্দে ভরে ওঠে । প্রবাসে এই চারদিন সাজ পোষাকে, খাওয়া দাওয়ায়, অনুষ্ঠানে বাঙ্গালিয়ানা উদযাপনের নাম দুর্গা পুজো । সারা বছরের পাওয়ার হাউস হয়ে ওঠে দুর্গা পুজো ।

    দ্য ওয়াল পুজো ম্যাগাজিন ১৪২৫ পড়তে ক্লিক করুন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More