বৃহস্পতিবার, জুন ২০

পুজোর গানের নস্টালজিয়া ভুলতে পারি না যে

হৈমন্তী শুক্লা

 ‘এখনও সারেঙ্গিটা বাজছে…’ সেই সুর সেই গান আজও শ্রোতাদের মনকে নাড়া দেয়। পুজো আসে, পুজো যায়। সেই সব গানে কৌলীন্যে এতটুকুও চিড় ধরেনি মানুষের মনে। কিন্তু সবই বড় অতীত। মনে ধরা সেই সব গান আজ কোথায়?

‘ধরো কোনও এক শ্বেত পাথরের প্রাসাদে’, ‘আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম’, ‘যখন কেউ আমাকে পাগল বলে’, ‘চলোনা দীঘার সৈকত ছেড়ে’, ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে দিয়ে বললাম…’ এমন কত গান এখনও পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বেজে ওঠে। মনকে ভরিয়ে দেয় অদ্ভুত এক নস্টালজিয়ায়।

সত্তর বা আশির দশকের পর থেকে সব কিছুই কেমন বদলে যেতে থাকল। ঠিক যেন জেনারেশন গ্যাপ। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পোঁছে তাদের রুচি ও মানসিকতার সঠিক পরিমাপ বুঝে নেওয়ারও কেউ রইল না। কেউ যেন কোনও দায়িত্বও নিল না। তাই নদীর মতো জল শুধু বয়ে গেল, ধরে রাখা গেল না। অবশ্য ধরতে গেলে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। সাধনা, সাহস, ঝুঁকি নিতে হয়।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য, উৎপলস্বা সেন, শ্যামল মিত্র থেকে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, পুজোর গান নিয়ে কত দিন, কত মাস রেওয়াজ, প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। শুধু কণ্ঠশিল্পী কেন, গীতিকার ও সুরকারদের ত্রয়ী মিলনে তা অন্য রূপ পেত। এমনও অনেক গান আছে, যেখানে শেষ সময়েও গানের কথা বদলে যেত, সুরের ঘাটতি বা সংযোজন হত প্রয়োজন অনুযায়ী। সেই গান রেকর্ডিং হয়ে গেলে অধীর প্রতীক্ষায় দিন গুনতে হত। শ্রোতাদের ভালো লেগেছে তো?

সময় অনেক কিছুই বদলে দেয়। নব্বই দশকের পর থেকেই সেই বদলে যাওয়া হাওয়ায় ভাসছে পরবর্তী প্রজন্ম। শিল্পীদের মধ্যেও এল পরিবর্তনের নতুন রূপ। যিনি গাইছেন, তিনিই গান লিখছেন, সুর দিচ্ছেন। ভালো-মন্দের এমনই দোলাচলে বাংলা গান ভেসে চলছে। অতীতে শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারের যে আলাদা ‘স্বাতন্ত্র্য’ ছিল তা পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রেই রইল না।

তবুও এগিয়ে চলছে সব কিছুই। গানের রেকর্ড থেকে অডিও সিডি। এখন সেই সময়ের মানুষ নেই। বরং কাজের মধ্যেই কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনে নেওয়া। ব্যস্ততার মধ্যেও গানকেই আঁকড়ে ধরা। অবশ্য সব সময় ‘হারিয়ে গেল, হারিয়ে গেল’ বিলাপ করেও লাভ নেই। মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে। বাংলা গানের এই বিশাল স্রোতে সামান্য হলেও বেশ কিছু ‘প্রতিভা’র সন্ধান পাওয়া গিয়েছে তাঁদের বিভিন্ন পারফরম্যান্সে। যোগ্যতার নিরিখে তা খুব অবহেলা করা যায় না। পরবর্তী প্রজন্ম তা গ্রহণও করেছে।

এত কিছুর পরেও পুজো এলেই মন কেমন করে। ভালো গান শোনার আশায় মনের মধ্যেই ঝড় ওঠে। এখন তো আর আগের মতো ‘পুজোর গানের বই’ বেরোয় না। রেডিওতে সেই ‘পুজোর গানের অনুষ্ঠান’-ও শোনা যায়। তাই ছোট পর্দায় দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয়। কারও কারও গান খুবই ভালো লাগে। কারও গান শুনে বড় দুঃখ হয়, ঈশ! গানটি গাওয়ার আগে আরও একটু রেওয়াজ করলে ভালো হত।

এত কিছুর পরেও এখনও মন টানে সেই স্বর্ণযুগের গানে। সেই সব গানে যাদু আছে কিনা জানিনা, তবে মনকে বড় হরণ করে। ভালো লাগার পাশাপাশি, চোখে জলও আনে। গান যে জীবনেরই একটি অঙ্গ। তাকে অস্বীকার করি কী করে?

অনুলিখন: বিপ্লব কুমার ঘোষ

Comments are closed.