‘মি টু’ রূপেন সংস্থিতা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শমীক ঘোষ

    কথাটা শুনেই চমকে উঠেছিল তৃষা। অসহ্য রাগ হয়েছিল তার। গোটা গা রি রি করে জ্বলে উঠেছিল যেন। আবার একই সঙ্গে গলা দিয়ে উঠে আসতে চাইছিল দলা দলা কান্না।

    সে শুধুই চুপ করে বসেছিল। মাথা নীচু করে। চোখটা নামিয়ে। যেন সেই একটা বিরাট দোষ করে বসে আছে।

    উলটো প্রান্তে বসা লোকটার কিন্তু নির্বিকার। সে বরং তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে তৃষার এই অস্বস্তি।

    এই লোকটা তৃষার বস। একটু আগে এই লোকটাই কাজের ছুতোয় অশোভন প্রস্তাব দিয়েছে তাকে।

    ‘ভগবান রূপ তো দিয়েছেন। কাজে লাগাও না কেন? মেনটেনই বা করো না কেন নিজেকে? দেখো নিজেকে একটু ব্যবহার না করলে… এই প্রফেশনে তুমি কাউকে খুশি রাখলে সেও তোমাকে…’

    ঈঙ্গিতটা স্পষ্ট। তৃষার মনে হয়েছিল ছুটে পালিয়ে যায় ওই ঘর থেকে।

    মাস্টারস্ করার পর এটাই তৃষার প্রথম চাকরি। কোম্পানিটা নাম করা। মাইনেও খারাপ না। সব থেকে বড় কথা হল এটাই ছিল তৃষার ড্রিম প্রফেশন।

    মা-বাবার মুখগুলো মনে পড়ছিল ওর। কলকাতা শহর থেকে দূর মফস্বলে থাকেন তাঁরা। বোঝেনও না কর্পোরেট দুনিয়ার হালহকিকৎ। অভাব অনটনের মাঝেও কোনও কার্পণ্য করেননি তৃষার বড় হওয়ায়। সাধ্যের অতীত চেষ্টা করেছেন। এই শহরে তৃষা একদম একা। নিজের চেষ্টায় দু’পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে কি এই লোকটার জন্য সব কিছু ছেড়ে ফিরে যাবে?

    একবার ভেবেছিল এইচ আরে কমপ্লেন করবে। কিংবা পুলিশে ডায়েরি।

    ‘ক্ষেপেছিস নাকি? তারপর তুই আর চাকরি পাবি? নাম খারাপ হবে তোর। তাছাড়া এইচ আর যে তোর ফরে কথা বলবে তার নিশ্চয়তাই বা কী?’ বুঝিয়েছিল বন্ধুরা।

    বিপাশার ঘটনাটাও একইরকম। প্রায় প্রতিদিনই তাকে ডেকে পাঠায় তার বস কৌস্তুভ। নানা কাজের ফিরিস্তি নেয়। কথা বলে। কথার মধ্যে কোনও খারাপ টোন নেই। কিন্তু প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই কৌস্তুভের সঙ্গে থাকে অফিসেই বিপাশার সিনিয়র নারায়ণ। নারায়ণ আর কৌস্তুভ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর প্রতিদিনই কৌস্তুভের সঙ্গে কথা বলার সময় বিপাশা টের পায় নারায়ণের চোখ দুটো মাপছে ওর গোটা শরীর। যেন গিলে খেতে চাইছে ওকে।

    অফিসের অন্য এক পুরুষ সহকর্মীই জানিয়েছিল কথাটা একদিন। ‘তোকে কেন ডাকে রোজ জানিস? নারায়ণই গিয়ে কৌস্তুভকে বলে মালটাকে একটু ডাক তো দেখি।’

    বিপাশার চামড়ার তলায় লেগেছিল অপমানটা। এইচ আরের কাছে যাবে?

    ‘কী প্রমাণ করবি? ওরা তো তোর সামনে কিছু করেনি। তুই কি প্রমাণ করতে পারবি কিছু? আদৌ?’

    বিপাশা বুঝেছিল চাকরিটা বদলানো ছাড়া গতি নেই। তৃষাও। কিন্তু নতুন কোম্পানিতে যে এইরকম লোক থাকবে না তার নিশ্চয়তা কী? উত্তর নেই কোনও।

    শুরু হয়ে গিয়েছে দেবীপক্ষ। মর্ত্যে নেমে আসছেন অসুরদলনী দূর্গা। নারী তিনি। পুরাণ মতে অশুভকে বধ করে শুভর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনিই। এই দেবীপক্ষেই হয়েছিল রাবণবধ। আর্য মতে সেও তো অশুভের বিনাশই।

    কিন্তু তৃষা বা বিদিশার মতো এমন বহু মেয়েই জানেন না কর্মক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে যৌন হয়রানি করা অশুভ দৈত্যগুলোর বিনাশ হবে কবে? কী ভাবেই বা হবে?

    শোনা যায়,  যৌন হয়রানি করতে পারে এমন লোকেদের সম্পর্কে গোপন তালিকা থাকে মেয়েদের। সেই তালিকা সম্পর্কে খুব সন্তর্পণে একে অপরকে জানিয়ে দেন তারা। কিন্তু সেই তালিকা বাইরে আসে না কখনই।

    কারণ ক্ষমতাবান যত নিকৃষ্টই হোক,  তার বিরুদ্ধে কথা বললেই দিতে হয় চড়া মাশুল। সামাজিক ভাবে যেমন,  তেমনই কিংবা তার থেকেও বেশি পেশাদার জায়গায়।

    আর ক্ষমতাবানরাও তাই মজাই পান। মহিলা সহকর্মীর যৌন হয়রানিকে নিজেদের অধিকার ভেবে বসেন তাঁরা।

    ঠিক যেমন অভিযোগ বিকাশ বহেলের বিরুদ্ধে। নারীকেন্দ্রিক ‘কুইন’ ছবিটা বানিয়ে তিনিই জিতে নিয়েছিলেন এই দেশের মহিলাদের মন। অথচ সেই এখন তাঁর সম্পর্কেই অভিযোগ উঠছে তিনি নাকি যৌন হয়রানি করেছিলেন ফ্যান্টম ফিল্মসে তাঁর জুনিয়ার এক মহিলা কলিগকে। তারপরও বারবার সেই ভদ্রমহিলাকে ভয় দেখাতেন তিনি। করতেন মানসিক নির্যাতন।

    সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত, অন্য ধারার ছবি করে ভারতীয় সিনেমায় প্রায় কাল্ট স্টেটাস পাওয়া ফ্যান্টম ফিল্মসের আরেক কর্ণধার অনুরাগ কাশ্যপকেও বিকাশ বহেলের এহেন আচরণের কথা জানিয়েছিলেন ওই ভদ্রমহিলা। কিন্তু তিন বছর ধরে, ব্যবস্থা নেব নেব করেও কখনওই ব্যবস্থা নেননি অনুরাগ। অবশেষে তিন বছর পর, ওই মহিলা যখন প্রায় মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত,  তখন ঘুম ভেঙেছে তার। তিনিই ফোন করে ওই মহিলাকে অনুরোধ করেছেন ওই ঘটনাটা মিডিয়াতে জানানোর। কদিন আগে এ-ও জানিয়েছেন যে, বিকাশকে সরানো সম্ভব নয় তাই ফ্যান্টম ফিল্মসই ভেঙে দিচ্ছেন তিনি।

    বলিউডের গুজবে কান পাতলে অবশ্য শোনা যাচ্ছে অন্য কথা। বিকাশ বহেলের সঙ্গে এমনিতেই নাকি গোলমাল হচ্ছিল অন্য পার্টনারদের। প্রশ্ন উঠছে, পুরনো ঘটনাকে সামনে এনে এখন বিকাশকে কোণঠাসা করার বন্দোবস্ত পাকা করছেন না তো অনুরাগ? সেইজন্যই কি এতদিন চুপ করে থাকার পর এখন যৌনহেনস্থা হওয়া ওই ভদ্রমহিলার পক্ষ নিচ্ছেন তিনি? প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইছেন আগে চুপ থাকার জন্য?

    বিকাশের বিরুদ্ধে অবশ্য ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন কুইনেরই নায়িকা কঙ্গনা রানাওয়াত। অভিযোগ করেছেন, কুইন করার সময়েও সঙ্গত আচরণ করত না বিকাশ।

    বিকাশ অবশ্য এই নিয়ে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি।

    এই ঘটনার জানাজানি হলো বলিউডেরই আরেক নায়িকা তনুশ্রী দত্ত মুখ খোলার পর। তিনি জানাচ্ছেন প্রায় দশ বছর আগে প্রখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকরে নাকি যৌন হেনস্থা করেছিলেন তাঁর। ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির সময় নাকি ঘটেছিল ওই ঘটনা। কিন্তু দশ বছর কেন চুপ করেছিলেন তনুশ্রী? বলিউড ছেড়ে এখন আমেরিকায় থাকেন তিনি। এখন কিছু বললে আর প্রভাব পড়বে না তার বলিউডি কেরিয়ারে। তাই কি মুখ খুললেন তিনি?

    নানার বিরুদ্ধে তনুশ্রী এই মুখ খোলা নিয়ে অবশ্য নানা মুনির নানা মত। কেউ বলছেন অ্যাক্টিভিস্ট নানাকে সমাজের চোখে হেঁট করার জন্যই নাকি এখন মুখ খুলছেন তনুশ্রী। নানা নিজে চুপ। সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেও শেষ বললেন যে আইনজ্ঞরা এই বিষয়ে তাঁকে মুখ না খোলারই পরামর্শ দিয়েছেন।

    তনুশ্রী অবশ্য মুখ খুলেছেন সিনেমা জগতে ভারতের বর্তমান শাসক দলের প্রায় পোস্টার বয় বিবেক অগ্নিহোত্রীর সম্পর্কেও। বিবেক নাকি তাকে জামাকাপড় খুলে নাচতে বলেছিলেন। এই অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন বিবেক। উকিলের চিঠি পাঠিয়েছেন তনুশ্রীকে।

    এই বছরেরই শুরু দিকে নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতীয় আক্যাডেমিক্সের নানা যৌন হেনস্থাকারী অধ্যাপকদের নাম দিয়েছিলেন আইনের ছাত্রী রায়া সরকার। সেই সময় ভারতের পরিচিত নারীবাদীরাও যথেষ্ট আক্রমণ করেছিলেন রায়াকে। মানতে চাননি তাঁর অভিযোগ।

    কেউ কেউ বলছেন, প্রায় সমমর্যাদার, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, প্রতিষ্ঠিত কাউকে এইভাবে অভিযুক্ত করবে ক্ষমতার অলিন্দের বাইরে থাকা একজন ছাপোষা কেউ, এটা মেনে নিতে পারেন না নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কেউই। আমেরিকার নামি অধ্যাপক আভিটাল রনেলের বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ উঠেছিল, তখনও রে রে করে উঠেছিলেন সে দেশের নারীবাদীরা। পরে কিন্তু প্রমাণিত হয় যে রনেল যৌন হেনস্থাকারী। রায়ার অভিযোগ সত্যি না মিথ্যে জানা যায় না। কিন্তু এই শহরের বিশ্ববিদ্যালয়েও কান পাতলে শোনা যায় এমন অনেক অধ্যাপকদের নাম যাঁদের কাছ ঘেষতে চান না অনেক ছাত্রীই।

    মুখ খোলা কিন্তু বন্ধ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে জনপ্রিয় ইংরাজি লেখক চেতন ভগতের বিরুদ্ধেও। তিনিও এক মহিলাকে আপত্তিকর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মিডিয়া হোক বা সোশ্যাল মিডিয়া, প্রায় সব কিছুতেই নিজের মত ব্যক্ত করা চেতন অবশেষে এখন তাঁর স্ত্রীর কাছে এবং সেই ভদ্রমহিলার কাছে ক্ষমা চাইছেন। বলছেন ওই ভদ্রমহিলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শুধু আকৃষ্ট হলেই কাউকে অশোভন প্রস্তাব যে দেওয়া যায় না, সে কথা কি জানতেন না চেতন?

    অভিযোগ উঠেছে প্রায় সবাইকে কমেডির মোড়কে বিদ্ধ করা এআইবির কমেডিয়ানদের বিরুদ্ধেও। অন্যকে যতই শ্লেষে বিদ্ধ করুন, যৌন হেনস্থার অভিযোগের ক্ষেত্রে একটুও কম যান না অল ইন্ডিয়া বকচোদের তরুণ তুর্কিরা। এঁদের একজন উৎসব চক্রবর্তী সম্পর্কে অভিযোগ তিনি চ্যাটে অল্পবয়সীদের নগ্ন ছবি দেখতে চাইতেন। প্রতিষ্ঠাতা তন্ময় ভাটের বিরুদ্ধে আপত্তিকর প্রস্তাবের অভিযোগ করেছেন এক ২২ বছরের তরুণী। এআইবি অবশ্য ব্যবস্থা নিয়েছে তন্ময়ের বিরুদ্ধে। তাঁকে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত গুরসিমরন খাম্বাকেও ছুটিতে পাঠিয়েছে ওই প্রতিষ্ঠান। সরানো হয়েছে উৎসব চক্রবর্তীর সব পারফর্মেন্সের ভিডিও।

    প্রায় একই রকম অভিযোগে অভিযুক্ত অভিনেতা রজত কাপুরও। তিনি অবশ্য এখন ক্ষমা চাইছেন চেতনের সুরে।

    এক মহিলা কলিগের অভিযোগে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন হিন্দুস্তান টাইমসের ব্যুরো চিফ প্রশান্ত ঝা-ও।

    তারপরেই আবার অভিযোগ উঠেছে বর্ষীয়ান অভিনেতা ‘অলোকনাথ’ এর বিরুদ্ধে। এক নয় দু’দু’জন অভিযোগ করেছেন তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আরেক স্তম্ভ এখন রাজনীতিতে যোগ দেওয়া এম জে আকবরের বিরুদ্ধে।

    এই দেশে যেখানে মাতৃরূপে পুজিত হন দেবীরা। অথচ সেই দেশেরই বিরোধাভাস কন্যাভ্রূণ হত্যা, ধর্ষণ, বধূ নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিকতা। পুরুষের সঙ্গেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পেশাদার দুনিয়ায় পা রাখছেন নারীরা। বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাঁরাও কম নন কোনও অংশে। অথচ সেই পেশাদার দুনিয়াতেই পুরুষের লালসার শিকার হচ্ছেন তাঁরা। আর সেই নিয়ে মুখ খুললেই সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানা সমস্যার। সমাজের থেকেও বেশি একঘরে হচ্ছেন সেই পেশাদার জগতেই। লালসার শিকার হওয়া নারীরা মুখ খুললেই শাস্তি পাচ্ছেন সেই পেশাদার দুনিয়াতেই। ক্ষমতার বিরুদ্ধে মুখ খোলার শাস্তি।

    ফরাসী তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো লিখেছিলেন, একটা নয় আসলে বহু নৈঃশব্দ থাকে। কোনও আলোচনাকে প্রসারিত হতে দেওয়া হবে, নাকি চাপা দেওয়া হবে সেই রণনীতির অখণ্ড অংশ হল ওই নৈঃশব্দগুলোই।

    স্বস্তির কথা একটাই,  নৈঃশব্দ ভেঙে এগিয়ে আসছেন নারীরাই। ভারতবর্ষের মতো একটা আদ্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক দেশে। সমাজের অনুশাসন, ভীতি, দোষারোপের নিদানকে অগ্রাহ্য করে।

    এরা যত মুখ খুলবেন তত দুর্বল হবে লালসার এই ক্ষমতাতন্ত্র। কমবে সমাজের ভিকটিমাইজেশন করার বিকৃত মানসিকতা। অশুভর বিরুদ্ধে শুভর এই লড়াইয়ে সম্পূর্ণ জয় হতে হয়তো দরকার আরো অনেকদিন। ততদিন এই দেশের বুকে নেমে আসুক আরও অনেক ‘মি টু’র দেবীপক্ষ। এই ‘মি টু’ রূপেই সংস্থিতা হোক নারীর নিজের প্রতিবাদ, অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তি। তাদের সম্মিলিত আওয়াজে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাক জবরদস্তি সম্মতিবিহীন যৌন লালসা চরিতার্থ করার ক্ষমতা প্রকোষ্ঠ।

    উচ্চশ্রেণীর ক্ষমতায়িত নারী প্রকোষ্ঠ থেকে এই ‘মি টু’ ছড়িয়ে যাক ভারতবর্ষের অন্ত্যজ শ্রেণীর দুনিয়াতেও।

    চরৈবেতি, চরৈবেতি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More