মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৬

সর্বজনীন ‘মি টু’? কবে হবে?

দশ বছর পর, দেশান্তরী হয়ে, অবশেষে মুখ খুললেন ভদ্রমহিলা। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বর্ষীয়ান অভিনেতা এই অভিযোগ শুনে বললেন ‘না, না!’। সাংবাদিক বৈঠক ডেকেও বললেন নানা কথা। শুধু মূল অভিযোগ প্রসঙ্গে আবারও সেই ‘না’ ‘না’। উকিলরা বারণ করেছে মুখ খুলতে। এমন একটা অভিযোগের পর সাংবাদিক বৈঠক ডেকেও যদি নানা উকিলের ‘না’ ‘না’ নিষেধেরই কথা বলতে হয় তবে বৈঠক ডাকা কেন?

এর পর মুখ খুললেন আরও একজন। তারপর একে একে আরো অনেকে। ক্রমশ যেন খুলে গেল প্যান্ডোরাস বক্স। অভিনেতা,চলচ্চিত্র পরিচালক, লেখক, সাংবাদিক, কমেডিয়ান – যৌন অপরাধের অভিযোগ থেকে বাদ গেলেন না কেউ। দু’একজন আবার প্রকাশ্যে ক্ষমাও চাইলেন।

শুরু হয়ে গেল আমেরিকার বিখ্যাত ‘মি টু’ আন্দোলনের ভারতীয় সংস্করণ।

প্রথমে ভাবা হয়েছিল কয়েকজন মুখ খুললেও সবাই মুখ খুলতে চাইবেন না। এই দেশের সব থেকে বেশি উচ্চতা সম্পন্ন প্রাজ্ঞ অভিনেতাটিই যেমন। নারী সুরক্ষা নারী অধিকার নিয়ে এমনিতে যতই সরব হোন না কেন তিনি, এই প্রসঙ্গে কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্ন ডজ করে নীরবতারই আশ্রয় নিলেন তিনি।

তাঁর এই নীরবতাকে উড়িয়ে দিয়ে কদিন পরেই কিন্তু মুখ খুললেন তাঁর পুত্রবধূ। রোজ সংযোজিত হতে লাগল নতুন নতুন নাম। অভিযোগকারিণীর, অভিযুক্তের এবং অভিযোগের বিরুদ্ধে তার থেকেও বেশি লোকের।

মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়া – আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠল এই ভারতীয় ‘মি টু।’ মনে হল যেন এত বছর ধরে ভারতীয় সমাজে নারীর অবদমন, যৌন লাঞ্ছনার শেষ দিন আগত প্রায়। এবার বদলে যাবে সব কিছু।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? সাহস করে মুখ খুললেন যে সব নারীরা, তাঁরা প্রত্যেকেই তো সমাজের উচ্চকোটির বাসিন্দা। ক্ষমতায়িত নারী।

কিন্তু এঁদের বাইরে রয়েছেন যে লক্ষ কোটি মধ্যম ও নিম্ন শ্রেণীর ভারতীয় নারীরা? এই দেশের কন্যাভ্রূণ হত্যা, বধূ নির্যাতন,ধর্ষণ, যৌন হেনস্থার লজ্জাজনক পরিসংখ্যানের সিংহভাগ জুড়েই আসলে রয়েছেন যাঁরা,  তাঁদের সত্যিই কি এবার সাহস হবে মুখ খোলার?

খাপ পঞ্চায়েত, সমাজের মোড়লদের দাদাগিরি, আইনের রক্ষকদের বিরাট অংশের অসংবেদনশীলতা, সব থেকে বড় কথা – যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলা মহিলাটিকেই কলঙ্ক দেগে দেওয়ার আমাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য, সে সব ছাপিয়ে কি সত্যিই নিজের লাঞ্ছনার কথা বলতে পারবেন সব ভারতীয় নারী?

সমাজের মোড়লরাই ধর্ষণ করেছ। তারপর সে কথা জানাজানি হতেই, তারাই ‘দায়িত্ব’ নিয়ে ‘চরিত্রহীন’ বলে দাগ দিয়েছেন সেই ধর্ষিতাকেই – এমন উদাহরণ এই দেশে ভুরিভুরি।

‘মি টু’ শুরু তো হল। কিন্তু সেই ‘মি টু’ বলতে পারার অধিকার কবে পাবে গোটা ভারতবর্ষ?+

ছবি: প্রতীকী

Shares

Comments are closed.