শনিবার, ডিসেম্বর ১৫

রূপং দেহি, জয়ং দেহি, অনুভবে,স্পর্শে দেবী যেন ধরাছোঁয়ায়

শ্যামশ্রী দাশগুপ্ত

নিশুত রাত। ঘুমোচ্ছে আমার পৃথিবী। আমি নির্ঘুম। এ তাল বেতাল ভাবনায় সাঁতার কাটছি। মুখ বাড়িয়ে আকাশটাকে দেখার চেষ্টা করছি। মেঘগুলোকে ধরার চেষ্টা করছি। কিন্তু আরও দূরে চলে যাচ্ছে ওরা। অথচ হাত বাড়ালেই তো ছুঁতে পাওয়ার কথা ছিল। চোখে মুখে মেখে নেওয়ার কথা ছিল। প্রতিশ্রুতি শব্দটার সঙ্গে তাই আমার এত বৈরিতা।

নিশুত রাত। পিতৃপক্ষের শেষরাত। মাটিতে ঘুমোচ্ছে আমার পৃথিবী। আমি ঝুলছি। একা জাগছি। আমি মেঘ ছুঁতে চাইছি। পারছি না। দংশন তীব্র হচ্ছে আরও। মনে প্রাণে চাইছি জ্বালা জুড়াক। তিস্তার খোলা হাওয়া ভাসিয়ে নিয়ে যাক আমাকে। মহানন্দার চরে হুটোপুটি করি আবার। ময়ূরাক্ষীর জলে ঠান্ডা হওয়ার আসক্তি ঘন হচ্ছে আরও। ওই তো সাদা কাশের বন। আমার ছোট্ট নদীর ধারে আদিগন্ত কাশের বন। একটা তারা টুপ করে নদীতে ডুব দিলে শেষ হয়ে যেত পিতৃপক্ষের রাত। দেবীপক্ষের ভোর আসত মাঝির রাতজাগা চোখে ভেসে। রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিশো জহি। অনুভবে,স্পর্শে দেবী তখন ধরাছোঁয়ায়। আনন্দে হৃদি ভেসে যায়।

ঠাকুরের সিংহাসন। পাটভাঙা গরদে আমার মা। পাক খেয়ে উঠছে ধুনোর ধোঁয়া। দেবীর গন্ধ- মায়ের গন্ধ, দেবীর রূপ -মায়ের রূপ মিলেমিশে একাকার। মশারির ভিতর অন্ধকার। রেডিওয় কান পেতে আমার পিতামহের দেবীবরণ। পিতৃপক্ষ শেষ। দেবীপক্ষ শুরু।

পিতৃলোকে আমার পিতামহী। ভিজে কাপড়ে কোমর জলে পূর্বমুখী বাবা। অনামিকায় কুশের আংটি। নম: ব্রক্ষ্ম তৃপ্যতাম, নম: বিষ্ণু স্তৃপ্যতাম, নম: রুদ্র স্তৃপ্যতাম, নম: প্রজাপতি স্তৃপ্যতাম।

ফিকে হচ্ছে অন্ধকার। শিউলির হলুদ সাদায় মুখ ঢেকেছে উঠোনের ঘাস। স্টেশনের দিকে ছুট। বীরু, ভোলা, অবন। ছুটছি আমিও। সকাল হলেই ডানা মেলে উড়ে যাবে ছানার গজা, বাখরখানি। তার আগে মুঠোবন্দি করার তাগিদ। ঠোঙা হাতে আমার ফেরার অপেক্ষায় জানলায় চোখ পিতামহেরও।

রণাঙ্গণে দশহস্তে অস্ত্রসজ্জিতা দেবী। অস্তায়মান সূর্যের আলোয় মায়াবী ব্রক্ষ্মাণ্ড। কনে দেখা আলোয় যুদ্ধরতা মহামায়ার মুখেও এক আশ্চর্য মায়া। মুহূর্তের খণ্ডাংশে মুগ্ধতা স্থবির করে দেয় স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল লন্ডভন্ড করে দেওয়া মহিষাসুরকেও। বৈরিতার আবহে নয়, ভাললাগার আবেশেই বধ হয়ে গিয়েছিলেন মহাকবি বানভট্টের মহিষাসুর। কে যেন শুনিয়েছিল সে গল্প। মেঘ ছুঁতে না পারার কষ্ট হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

কী যাতনা বিষে, স্থবির হচ্ছি আবারও।মাটির পৃথিবী ডাকছে। আবারও ছুটছি আমি। ’লিফট- লিফট’। বিদেহী আত্মার মতো উঠে আসছে লিফট। কুড়ি আর একুশ তলার মাঝে আমি। বা তিরিশ আর একত্রিশ তলার মাঝে। ঝুলছি। মাটি আমাকে ছুঁতেই হবে। কানে শুনছি না কিছুই। শুধু তন্ত্রীতে ছড়িয়ে যাচ্ছে হারানো সুর। রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিশো জহি। ফিকে হচ্ছে রাত। সকাল হলেই ডানা মেলে উড়ে যাবে মহালয়ার ভোর। মাটি আমাকে ছুঁতেই হবে। প্রাণ ভরে নেব মাটির গন্ধ। শিশির ভিজে ঘাসে ছড়িয়ে থাকা শিউলির গন্ধ। মহালয়া, তোমার শরীরের গন্ধে ডুবে যেতে যেতে ঠিক ছুঁয়ে ফেলব তিস্তা চরের হাওয়াকে। মহানন্দার চরের বালিকে। মোহনায় দাঁড়িয়ে উৎসে অবগাহন করব আমি। আমি নামছি। খুব দ্রুত নামছি।

Shares

Comments are closed.