বৃহস্পতিবার, জুন ২০

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা : চলতে থাকার চালচিত্তির

রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা উত্তররৈবিক বাংলা কবিতার তো বটেই, আবহমান বাংলা কবিতার নিরিখেও আমাদের এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। তাঁর কবিতা আমাদের মাতৃভাষার আকম্প্র সীমারেখাকে সম্প্রসারিত করে দেয় এক ধাক্কায়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক, বিশ্বসাহিত্যের বরেণ্য গবেষক, বাংলা ভাষায় গ্যোয়েটে-হাইনে-রিলকে-ব্রেশটের অনুবাদক সংগীতশিল্পরসজ্ঞ এই কবির মৌলিক কবিতার বইয়ের সংখ্যা ইতিমধ্যেই চুয়াল্লিশ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯) থেকে সদ্যতন ‘শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি’ (২০১৮) পর্যন্ত তাঁর কবিতার ‘মিহিন শাহেনশাহী’ জারি আছে।

অলোকরঞ্জনের প্রথম কবিতা-বই ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯) এক মাইলফলক। কিন্তু ‘যৌবনবাউল’ বই হয়ে বেরুবার ঢের আগেই পঞ্চাশের সেই দিনগুলোতে সহযাত্রী কবিবন্ধু শঙ্খ ঘোষ তাঁকে দেখছেন ‘বাংলা কবিতার যুবরাজ’ -রূপে। শঙ্খের সাখ্যে আমরা আরো জানতে পারছি ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে আয়োজিত ঐতিহাসিক কবিসম্মেলনে জীবনানন্দসহ বাহাত্তর জন প্রবীণ-তরুণ কবির মধ্যে অলোকরঞ্জনের ‘আমার ঠাকুমা’ কবিতাটি সকলেরই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে অনায়াসে ।

আসলে গত শতকের এই পাঁচের দশকেই বাংলা কবিতায় এক নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে গিয়েছিল। শঙ্খ-অলোক-আলোক-শক্তি-সুনীল-বিনয়-উৎপলকুমার প্রমুখ বিশিষ্ট কবির লেখালেখির সূচনা এই দশকেই। পঞ্চাশের এই বুধমণ্ডলীতেও অলোকরঞ্জন স্বয়ংপ্রভ।

আরও পড়ুন: আমার ভাষাই হচ্ছে আমার আবাসন: সাক্ষাৎকার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

বাস্তবিক, পঞ্চাশের ঠিক আগে উচ্চকিত স্লোগানধর্মী কবিতা, কিংবা একেবারে বিপরীত মেরুর যৌনতা-আক্রান্ত কবিতার বিস্ফোরণ থেকে বাংলা কবিতার ব্যক্তিত্বচিহ্নিত শুদ্ধ স্বরকে  বাঁচিয়ে রাখবার দায়িত্ব ছিল যাঁদের ওপর, অলোকরঞ্জন ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সেদিন কবিতাকে আবার কবিতার কাছে ফিরিয়ে আনবার অঙ্গীকারে প্রকাশিত হয়েছিল ‘শতভিষা’ (১৯৫১) এবং ‘কৃত্তিবাস’ (১৯৫৩)।
সভামিছিল কিংবা শায়াসেমিজের পিছনে ছোটাছুটি করাটাই যে কবির একতম অভিপ্রায় হতে পারে না,তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল পঞ্চাশের এই দুই নবজাত কবিতাপত্রের পাতায়। শুরু থেকেই সেদিনের এই দুই নবীন কবিতাপত্রিকায় অলোকরঞ্জনের উপস্থিতি ছিল অবিরল।

‘কৃত্তিবাস অষ্টম সংকলনে’ কবি উৎপলকুমার বসু লিখছেন,  অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের শীঘ্র প্রকাশিতব্য একক কাব্যগ্রন্থের সম্ভাবিত নাম ‘যৌবনবাউল’ অথবা ‘পরান আমার স্রোতের দীয়া’। বলা বাহুল্য, প্রথমোক্ত নামেই প্রকাশিত হয় কবিদের কাছেও প্রতীক্ষিত অলোকরঞ্জনের এই প্রথম কবিতার বই পাঁচের দশকের একেবারে শেষ বছরটিতে । ইতিমধ্যে সহযাত্রী কবিবন্ধুদের প্রায় সকলেরই প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত ।

আরও পড়ুন: ‘বয়স যেন মহিষদেহে বৃষ্টিধারা’ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা

পরিসংখ্যানগতভাবে ‘যৌবনবাউল’ অলোকরঞ্জনের প্রথম বই হলেও এর আগে কবিবন্ধু আলোক সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর অনুবাদে প্রকাশ পেয়েছে বোদলেয়ার-মালার্মে-ভের্লেন-ভালেরি প্রমুখের ফরাসি গীতিকবিতার তন্বী সংকলিতা ‘ভিনদেশী ফুল’ (১৯৫৬,শতভিষা প্রকাশনী)। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্সি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাইটে ছাত্র অলোকরঞ্জন সম্পন্ন করেছেন ‘ভারতীয় কবিতায় লিরিকের উদ্ভব’ শীর্ষক মেধাবী গবেষণা । ১৯৫৭ থেকেই তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে তরুণ জনপ্রিয় অধ্যাপক ।

দুই

কবিতার যৌবরাজ্যে অলোকরঞ্জনের অভিষেক ‘যৌবনবাউল’ নামের সেই আশ্চর্য কবিতার বইটি দিয়েই।প্রথম কাব্যগ্রন্থেই এমন প্রজ্ঞাপরিণত,ছন্দোনিপুণ এবং সর্বোপরি নিজস্ব কাব্যভাষা ও জীবনদর্শনে স্থিতধী কবি শুধু বাংলাসাহিত্যে কেন,বিশ্বসাহিত্যেই বিরল।’যৌবনবাউল'(১৯৫৯) বেরোবার  প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ‘কৃত্তিবাস’-এর সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে যে, সে-বছরের ঘোষিত আকাদেমি-পুরস্কারের জন্য সেটাই হতে পারত যোগ্যতম বই।

‘যৌবনবাউল’-এ সর্বাগ্রে যা লক্ষণীয়, তা হল তরুণ কবির আত্মবিশ্বাস। বিভাব কবিতা শেষ  হচ্ছে এইভাবে :

‘মানুষ গেলে নামের খনি   আমার পরে এই ধরণী
সঙ্গোপনে অলোকরঞ্জনা।।’

অলোকরঞ্জন তাঁর কৈশোরের একটা পর্যায় কাটিয়েছিলেন নিসর্গসৌন্দর্যে ঋদ্ধ পশ্চিমের সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায়, তাঁর ঠাকুর্দা-ঠাকুমার কাছে। পূর্বে উল্লিখিত ‘আমার ঠাকুমা’ কবিতায় এই রিখিয়ানিখিলের জাদুচিত্র-

‘সাঁওতাল পরগনার গ্রাম মন্ত্রমুগ্ধ, রাত্রির সংকেতে
ভয় নেই, ঠাকুমার হাত কাঁপে হাতে কাঁপে কুপী,
বাড়ির বারান্দা কাঁপে সে-আলোয়, বাঁশবনের গায়ে
জড়োসড়ো পাতা কাঁপে, কাঁপে বনভূমি। তাকে ফেলে
কুপীর করুণ আলো অগ্রসর। হয়তো-বা ভূমা
যে এখনো দূরগম্য, তাকে খুঁজে নেবে। নিরুপায়
প্রান্তরে দাঁড়িয়ে যেন বড়ো একা আমার ঠাকুমা’

‘যৌবনবাউল’-এর ঈশ্বরচেতনা বস্তুত মানব-অস্তিত্বের এক দেবায়ন। এক ঐশী অসন্তোষ তরুণ রিলকের মতো অলোকরঞ্জনের কবিতায়খুঁজছিল এমন এক ঈশ্বরকে ,মানুষের অভাবে যিনি অসম্পূর্ণ :
‘এখনো তোমাকে যদি বাহুডোরে বুকের ভিতরে
না পাই, আমাকে যদি অবিশ্বাসে দুই পায়ে দলে
চলে যাও,তাহলে ঈশ্বর
বন্ধুরা তোমায় যেন ব্যঙ্গ করে নিরীশ্বর বলে’
(‘বন্ধুরা বিদ্রূপ করে’)

কবি রিখিয়া থেকে শান্তিনিকেতনে আসেন ক্লাস সিক্সে ভর্তি হতে। শান্তিনিকেতনের নিসর্গও উঠে আসে ‘যৌবনবাউলে’-র চরণস্পন্দে,’একলা খুশির পালক ছড়িয়ে কোপাইয়ের জল কাঁপে’ (‘গোধূলির শান্তিনিকেতন’) ।

অলোকরঞ্জনের দ্বিতীয় কবিতার বই ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী'(১৯৬৭) বেরুল আট বছরের ব্যবধানে। মা নীহারিকা দাশগুপ্তকে উৎসর্গীকৃত এই কাব্যগ্রন্থে ঈশ্বরচেতনা যেন মানবতাকে প্রণিপাত করছে:

‘যেদিকে ফেরাও উট, এই দ্যাখো করপুটে একটি গণ্ডূষ/ বিশ্বাসের জল, তুমি পান করো, আমি জল না খেয়ে মরব।’ (‘ঈশ্বরের প্রতি’) এই বইতেই আমরা পাবো, “কে তবু বলল ট্রামে  উঠবার আগে:/’এবার কিন্তু আঙ্গিক বদলান।’ ” (‘যে-রাখাল দূরদেশী’) বাস্তবিক,আঙ্গিক বদলের সূচনা কিন্তু ঘটে গিয়েছিল ।

কবিবন্ধু শঙ্খ ঘোষকে উৎসর্গ করা ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থ থেকে আমরা দেখে নেব এক চিত্রধর্মী নিরাসক্তি-

“ধানখেতে এসেছিল বেড়াতে দু-জন
ধানখেতে শিশু রেখে পালাচ্ছে দু-জন;

‘এবার স্টেশনে চলো’ বলল একজন;
‘এবার স্টেশনে চলো’ বলল একজন ।

‘সাঁকো বেয়ে নিচে এসো’ এ ওকে বলল,
‘সাঁকো বেয়ে নিচে এসো’ এ ওকে বলল।

আর নেমে এসে দ্যাখে সুন্দর কাঁথায়
রক্তমাখা শিশু নিয়ে ধানী নৌকো যায়।”
( ‘রক্তাক্ত ঝরোখা–৯’)

ছায়ামায়ালোকের কবিতার প্রথম পর্ব পেরিয়ে কবি পা বাড়াচ্ছেন নিত্যব্যবহার্য জীবনের রক্তিমতার দিকে।

তিন

বহু ওঠাপড়া সত্ত্বেও ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯) থেকে ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ (১৯৬৯) পর্যন্ত তাঁর প্রথম দশ বছরের কবিতাযাপনকে একটি পর্যায় বলে ভাবতে পারি।

‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’ (১৯৭৩) বইটি থেকে এক নবপর্যায়ের সূচনা। ইতিমধ্যে অদীনপুণ্য কবির ব্যক্তিগত যাপনে ঘটে গেছে পরিবর্তন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ জনপ্রিয় অধ্যাপক কবি জার্মানির বিশ্ববিশ্রুত হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন ১৯৭১ সালে। কলকাতা ও জার্মানির  মধ্যে তাঁর সময় এখন থেকেই দ্বিধাবিভক্ত। ‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ’ উৎসর্গীকৃত ট্রুডবার্টা  হেসলিঙারকে, যিনি তখনও কবিপত্নী হয়ে ওঠেননি, অচিরে ১০ মার্চ, ১৯৭৩ হয়ে উঠবেন শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত।

আরও পড়ুন: আমাদের যৌবন বাউল: এক চির-অনুসন্ধানী পথের নাবিক

এই কাব্যগ্রন্থে উঠে এল শব্দচয়নে আন্তর্জাতিক পরিসর। ট্যুবিঙ্গেন, বাভারিয়া, ফ্লোরেন্স কিংবা শিলার, হ্যোল্ডারলিন এখানে স্বভাবসম্মিত সৌজন্যেই শোভমান। শব্দচয়নের পাশাপাশি পুরাণপ্রতিমার এতদিনের পূর্বমুখী গঙ্গাতরঙ্গে পশ্চিম প্রাণের যমুনার স্রোত এসে মিলল। পরবর্তী ‘গিলোটিনে আলপনা’ (১৯৭৭) কাব্যগ্রন্থের ‘আন্তিগোনে’,বা ‘টর্সো’,’জবাবদিহির টিলা’ (১৯৮১) কাব্যগ্রন্থের ‘তান্তালাস’ এবং ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’ (১৯৮৩) কাব্যগ্রন্থের তাইরেসিয়াসের প্রতীকে যা সোচ্চারতর।

সত্তর দশকে এমার্জেন্সি ও নকশাল আন্দোলনের ঝাপট তাঁর কবিসত্তাকে এই মর্মে বার্তা দিল যে, কবিতাকে শাশ্বতে ন্যস্ত রেখেও যুগাবর্তের সামিল হতে হবে। ‘গিলোটিনে আলপনা’ (১৯৭৭) বই থেকেই সামাজিক অঙ্গীকারের কবিতার ধারাটি স্পষ্টকৃত। এই বইয়ের তাৎপর্যপূর্ণ ‘তিলতর্পণ’ কবিতায় আমরা দেখবো এক খয়েরি হয়ে আসা ছাত্রাবাসের চিত্রকল্প,’ এই ছাত্রাবাসে আজ কেউ নেই শুধু এক শিউলিশাদা চুল বৃদ্ধ অধ্যাপক তাঁর শরীর/ নুয়ে গিয়েছে ব্যবহারবিহীন ধনুক তির নেই ছিলা জুড়ে দ্বাপর যুগের কান্না,একা তিনি অপেক্ষায়/যদি তাঁর প্রিয় ছাত্র অরিন্দম– নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের নীলকান্ত মণি আচমকা একবার/ফিরে আসে’… এই কবিতায় আমরা দেখতে পাবো পুলিশি হেফাজতে লুপ্ত হয়ে যাওয়া সাতের দশকের আরো অনেক কিশোরের মতো তাঁদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় ছাত্র তিমিরবরন সিংহের ছবি। তিমির-হত্যা এ বইয়ের আলম্বন বিভাব। অনাহত প্রতীতির জায়গাটা বিদীর্ণ হতে হতে ঈশ্বর এখন প্রকরণ।

এমনকী আক্রমণকারীদের ‘বাকরীতির নিসর্গের দিকে তাকিয়ে’ কবি বলে ওঠেন ‘এবার চলো বিপ্রতীপে’ (১৯৮৪)। ‘দ্ব্যর্থক ঝরনায়’ অভিস্নাত কবি বলতে পারেন,
‘যার নাম মুহূর্ত তারি অন্য নাম ব্যাপ্ত পরম্পরা
তোমার রয়েছে শুধু একসঙ্গে বাঁচা আর মরা’।

আকস্মিক পথদুর্ঘটনায় কবির প্রিয় মেজো ভাই দিলীপরঞ্জনের মৃত্যু কবির অনাহত ঈশ্বরবিশ্বাসে চিড় ধরায়।’ধুনুরি দিয়েছে টংকার’ (১৯৮৮) বইতে দেখা যাবে দেহতত্ত্বের ছিলাটান বিধুনন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গাল্ফ যুদ্ধের বীভৎসা কবির জন্য রেখে গেল পূর্বতন কাব্যমীমাংসার বদলে নতুন কাব্যজিজ্ঞাসা। ‘আয়না যখন নিঃশ্বাস নেয়’ (১৯৯১) এবং ‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) কবিতা-বইদুটিতে এই পর্বের রেখাপাত। সমকালীন বিশ্ববিশৃঙ্খলা, জগৎজোড়া শরণার্থীসংকট তাঁর কাব্যে এখন থেকেই ছায়া ফেলতে থাকে।

আফগানিস্তানে যুদ্ধ এবং বোমাবিস্ফোরণ নতুন শতাব্দীতে অলোকরঞ্জনকে ব্যথাতুর করল,’যুদ্ধ এসে গুঁড়িয়ে দিল পীরের হাটবাজার’ (শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে, ২০০১)।                       

চার

গ্যোয়েটের ‘ডিভান’ বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে মরমিয়া-সূফি-দরবেশ-বাউলদের লোকায়ত চেতনাকে পুনরাবিষ্কার করেন যৌবনবাউল। ‘শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে’ (২০০১) বইয়ের অধিকাংশ কবিতা এই পর্যায়ের।
“কুতুব, যিনি ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র, তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম/ এইটুকু সময়ে কী করে পার হলাম নগ্ন মরু?/ তিনি বললেন: ‘তোমার কাজ পৌঁছে যাওয়া, প্রশ্ন তোলা নয়।” (‘কুতব’)

২০০৫ সালের ২৩ নভেম্বর। চলে গেলেন জীবনসঙ্গিনী শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত। ২০০৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত কাব্যযুগল ‘ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন’ এবং ‘সমস্ত হৃদয় শুধু ভূকম্পপ্রবণ হয়ে আছে’ তাঁর স্মৃতিতে অনুস্যূত। ঈশ্বর-নিরীশ্বরের দোলাচল এখানে পরিস্ফুটতর। পরবর্তী  ‘সে কি খুঁজে পেল ঈশ্বরকণা’ (২০১২), ‘নিরীশ্বর পাখিদের উপাসনালয়ে'(২০১৩), ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি'(২০১৬), ‘তোমরা কি চাও, শিউলি  না টিউলিপ'(২০১৭) ছাড়িয়ে তাঁর কাব্যপ্রবাহ সঞ্চরমাণ। অলোকরঞ্জনের সাম্প্রত লেখালেখিতে মুহূর্তে পরম্পরা কিংবা পরম্পরায় মুহূর্ত আত্মপ্রতিবাদের ঐক্যে জড়িয়ে থাকে, তাঁর পরম্পরাগত ঈথারের জামায় যেমন জড়িয়ে থাকে ব্রহ্মাণ্ডের ধূলি।

খণ্ডিত এই প্রতিবেদনটি প্রায় শেষের মুখে। গোড়াতেই বলেছি,আমাদের বিনীত বিবেচনায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা আমাদের এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার ।কথা হচ্ছে, এই উত্তরাধিকার সম্পর্কে আমরা কতখানি উদাসীন? অলোকরঞ্জনের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বাজারে অমিল।তাঁর অধিকাংশ কবিতার বই, ছোটো ছোটো প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বলেই হয়তো, পাওয়া যায় না।কবিতাসংগ্রহের মাত্র তিন খণ্ডই প্রকাশিত, যাতে ধরা আছে ‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) পর্যন্ত কবিতাবলি।এক পরিণাম মুছে ফেলে অন্য পরিণামের দিকে নিত্য ধাবমান অলোকরঞ্জনের কবিতার অসামান্যতাকে কি আমরা প্রাপ্য সমাদর দিতে পেরেছি? আজও?বাংলা কবিতার নগণ্য পাঠক হিসেবে আমাদের এ প্রশ্ন বোধহয় ফেলে দেওয়ার নয়।

 চিত্রঋণ :  এলিজাবেথ গ্যুন্টার, ছন্দা বসু 

Comments are closed.