মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৬

আমাদের যৌবন বাউল: এক চির-অনুসন্ধানী পথের নাবিক

বেবী সাউ

“থির বিজুরি,                    বদন গৌরী,
পেখনু ঘাটের কূলে।
কানড়া ছাঁদে,                   কবরী বান্ধে,
নবমল্লিকার মালে।।
সই মরম কহিনু তোরে।
আড় নয়নে,                   ঈষৎ হাসিয়া,
আকুল করিল মোরে।।” 

সমন্বয়ের কবি অলোকরঞ্জন  দাশগুপ্ত । দুটো আলাদা দেশ, মহাসময়ের বিরাট একটা প্রান্তর, ঈশ্বরচেতনা এবং মানবচেতনার দুই ভিন্ন অভিমুখ অন্য এক বোধের ধারা মিশে যায় তাঁর মধ্যে – ব্রেশট এবং চণ্ডীদাস এক সঙ্গে কথা বলেন তাঁর বিশ্বে, কখনও হয়ত খ্রীস্টপূর্বাব্দের রচনার সঙ্গেই সহবাস করে তাঁর অক্ষর। শব্দ। কথা। আবার কখনও বা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ক্ষতবিক্ষত দিনগুলোর সঙ্গে স্মৃতিবিদ্ধ হয় তাঁর  রচনা। একদিকে জার্মান কবি পাউল সেলানের রচনা,  মেধার সঙ্গে মিশে যায় তখন ভারতীয় মায়ের মায়া, স্নেহ। এবং এই কাজটি নিপুণ ভাবে করে দেখান,  আজকের দিনে বসেই অনায়াসে তিনি অপৌরুষেয় সৃষ্টির দায় বহন করার কথাও ভাবেন।

আরও পড়ুন : আমার ভাষাই হচ্ছে আমার আবাসন: সাক্ষাৎকার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

তাই দেখা যায় অভিমান বশতঃ বারবার বিচ্ছেদ তৈরি হয় আমাদের। বারবার আমরা বিপরীত মুখে হেঁটেও কোথাও যেন মিলেমিশে যাই। ভাবি, পথ কখনোই সরলরেখা নয়। তার গতি আছে, বেগ আছে। ভালোবাসাবাসি আছে, আর আছে দৃশ্যের কাছে নত হয়ে ভালোলাগা, মন্দলাগাটুকু শেয়ার করা, তার সাথে। তাই বোধহয় বারবার মিশে যায় পথ… হাঁটা…  তারচেয়ে বলা ভালো ফেরা। আমাদের। বারবার। যদিও সবসময়ই এর জন্য দায়ী করা হয়, পৃথিবীর গোলাকার আকৃতিকে। কিন্তু, আমি বহু ভেবে দেখেছি,  বেচারা পৃথিবীর এতে কোনও দোষ নেই! নাকি তার আকৃতি গোল, নাকি সে ইচ্ছে করে কাউকে মুখোমুখি  হোঁচট খাওয়াতে চায়! আর তাই যদি চাইত তবে কী এই বিপুল  গ্রহরাজির মাঝে নিজেই প্রথমে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত না! আসলে, এই ফেরা ইচ্ছের ফেরা। এই ফেরা মনের। ফিরতে চাই বলেই ফেরা হয়ত বা। কিন্তু তারপর?

“তুমি ভাবলে ফিরে-আসার পরেও

সব-কিছু তার নিজের জায়গায় রইবে অটুট;

চিত্রদারুধেনু চরিয়ে গোঠে সুরদাসের আঁকা

বালককৃষ্ণ দাড়িয়ে থাকবেন;

আবহমান কৃষ্ণচূড়ার নিচে

বোষ্টমী তার গান গাইতে গিয়ে

কন্ঠিবদল করবে থির বিজুরী

আগের মতো তোমার সঙ্গে!

তুমি নিজেই কি এক ফিরে-আসার পরেও?”  ( ফেরা)

কিন্তু কোথায়?  কোথায় ফেরা যেতে পারে এই মূহুর্তে?  কালো যমের মত ধেয়ে আসছে পাগলা হাতি। অসংখ্য মৃত্যু চিৎকার করে উঠছে চারপাশে। কাকে কাকে অবহেলা করা যায়! অবহেলা করে কি শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে সেই নির্ভরযোগ্য অবস্থানের কাছে! কবি অলোকরঞ্জন শুধু ওই বিপ বিপ সাইরেনের শব্দ শুনেছেন। আর তাতেই ফেরার ইচ্ছে থেকে,  পালানোর স্পৃহা জাগরিত হয়েছে তাঁর মনে। কিন্তু সাইরেন শব্দ কি বিপ বিপ! উঁহু! এই সাইরেন বিশ্বায়নের করাল গ্রাসের শব্দ নয়ত! সারা পৃথিবীর কাছে আজকে প্রমাণ দেওয়া আমি আছি… এই আমি…

আরও পড়ুন : ‘বয়স যেন মহিষদেহে বৃষ্টিধারা’ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা

“.অনেক খুঁজে ফুটপাতের দোকানে পেয়ে যাই

তোমার ‘নাগকেশর’

জীর্ণ মলাট, উইপোকারা এসে

আমার প্রিয় কবিতাগুলি থেকে

মুছে দিয়েছে দু-তিনটি অক্ষর” ( তোমার নাগকেশর)

আত্মঘোষণা?– যা কি না অপরের কাছ থেকে শুনতেই হবে? যা কি না “লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়” গোছের। আত্মতুষ্ঠি। সমাজের কাছে তুলে ধরা ব্যক্তি “আমি”কে!  “Our Pagan Times”  এর ওই লাইনগুলোর মতো! আইসিসের ঘোষণার মতো! আমি সব পারি– তোমার দেখো এই তার কার্ড। ঠিক বার্থ সার্টিফিকেটের মতো। জন্মেছি এটাই সত্য। এই সময়,  এই স্থানে। এই যে বর্তমান এটা মিথ্যে? আবার শ্মশানে চলে যাওয়া শোক, চিতা সব মিথ্যে হয়ে যায়– মৃত্যু্র প্রণাপত্রের অভাবে! আশ্চর্য! কিন্তু আশ্চর্য নয়। সত্যি অথচ মিথ্যেও নয়। তেতো একটা জীবন নয়?

আরও পড়ুন : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা : চলতে থাকার চালচিত্তির

এইযে আমি… আমার কায়া ছায়া… আমার আমিত্ব নিয়ে একটা চিরন্তন ভাবের উদয় হচ্ছে আর আমি এই বিশাল বিস্ময় এর কাছে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছি, মিলিয়ে নিচ্ছি মহা প্রকৃতির অংশ হিসেবে— তার মধ্যেই চলছে চিরজায়মান ধ্যানীর ঘুম ভাঙাচ্ছে অবিনশ্বর সেই চৈতন্য!  তখন কে বা আধার, কে যে আধেয়! এই প্রবহমান ধারায় ভেসে যাচ্ছে যে নৌকো, নৌকোর মাঝি অনন্ত জীবন প্রবাহপথে ভেসে যাওয়া মোহানার দিকে শব্দ দিয়ে কবি যেন ধরে রাখতে চাইছেন সেই অসীম ক্ষমতাময়ী ‘ আমাকে বলাও সেই কথা, যেকথার প্রতিধ্বনি / বৈকুণ্ঠবাসীরে করে আমার একান্ত প্রতিরূপ’।  আর সেই সুন্দরের দিকে হেঁটে যাওয়াটাই ঈশ্বর সাধনা! প্রকৃতির উপাসনা! আর এখানে কবিকে বলা যেতে পারে ঈশ্বর উপাসক; সৌন্দর্য উপাসক। তা তো কবি মাত্রই! মহাকালের নিগূঢ় তত্ত্বের প্রতিফলন তো তাঁর কলমের নিব দিয়েই প্রস্ফুটিত হতে চায়! হয়ও। তাই শতকের জতুগৃহদাহ থেকে বেরিয়ে, অন্ধকার রাতের মধ্য থেকে খোঁজ চালান হৈমবতী গৌরীর। জীবনের অন্ধকার ভেদ করে সেই আলোময়ী নারী তাঁকে দিতে পারেন করোজ্জ্বল আলোর সম্ভাবনাময় পথের হদিস। এই যে আলো এবং অন্ধকারের খেলায় মেতে উঠছেন কবি, কবির সত্ত্বা ; তবে কি এই “যৌবন বাউল” সুরে মন্দরিত হয়ে! তাই খেলা সাঙ্গ হলেই তিনি নিঃসঙ্গ নটরাজ! যেন সেই অমোঘ বার্তার কাছে, সৃষ্টি ও ধ্বংসের খেলায় এঁকে নিচ্ছেন তাঁর পথ। তাঁর অক্ষরের মালা। একের পর এক সাজিয়ে তুলছেন চির জাগ্রত সত্যকে! সুদীর্ঘ একুশ বছর পরে, এই যৌবন প্রারম্ভে তিনি যেন ফিরে যেতে চাইছেন,  তাঁর শিশু অবস্থাকে। বসুমতী মাকে। ঠিক এই আলোর খোঁজ চলছে তাঁর পরবর্তী কবিতায়, ” তোমার মনের গভীর অরণ্যে / গোপন ব্যথার অঞ্জলি আজ আনম্রঅঙ্কুর/ এখনো তার ইচ্ছা নামঞ্জুর / জানাও তারে; ‘ তুই এবার আলোর শরণ নে”।  তাই বুঝি জেগে প্রসন্ন প্রদীপ জ্বালিয়ে জেগে থাকে কল্যাণেশ্বরীর হাট? প্রগাঢ় নিষ্ঠায় বসে অপেক্ষার পথ গুণছে!

ঠিক এখানেই বাংলা কবিতার জয়যাত্রায় সূচনা হয়। অক্ষরে এসে বসে আলোময় পথ। তীক্ষ্ণ, তীব্র অথচ সিগ্ধ আলো রেখা বলে ওঠে ‘ অহম অস্মি’! আর আমরা চিরঋণী হয়ে থাকি কবি অলোকরঞ্জনের কাছে। তাঁর কবিতার আলো পথ দেখায় বাংলার শাশ্বত নীতির সঙ্গে  সহবস্থানের।  তাঁর কবিতা আমাদের নিয়ে যায় অনন্তকালীন সেই সত্ত্বার কাছে, এক চিরকালীন অভিযানের সঙ্গী করে। তাই তাঁর কবিতা সঙ্গে থাকলে আমারও মনে হয়ে যেন সেই সুদূর রহস্যময় পথ, আলোক বর্তিকা নিয়ে ডাক পাঠাচ্ছে আমার দিকে… আর তাতেই আমিও হয়ে উঠছি চির পথিক। নিঁখুত ভাবে চয়ন করে নিতে চাইছি আমার রাস্তা, পথ। কিন্তু এই পথ শুধু নির্মোহ ভাবে ছুটে যাওয়া আলোর দিকের পথ নয়… হাঁটতে হাঁটতে পথের দুধারের অসংখ্য দৃশ্য,  দৃশ্যের কারণ,  ছোট ছোট বিভিন্ন ঘটনা, রাস্তার দুধারের বসতি, স্নেহ, প্রেম, প্রীতি ; হিংসা- দ্বেষ— বৈরীতা সব তাঁর সঙ্গী হয়েছে। রাতের অন্ধকার নিয়ে তাই ভরে উঠছে নটরাজের ভোর। আকাশের পায়ে পা মেলাচ্ছেন ‘জননী পবন’! অক্সিজেন!  জীবন বায়ু! তিনি নিশ্চেষ্ট,  তিনি নির্মোহ এবং উদাসীন দ্রষ্টা। শুধু দেখে যাচ্ছেন, শুধু অনুভব করে যাচ্ছেন এই পথের সুরম্যতা। নিজেকে মিলিয়ে নিচ্ছেন মহাজগতের সঙ্গে। তাই এই যৌবন বাউল আসলে যেন সেই অনুসন্ধানী পথের নাবিক। কোনও পথ তাঁর কাছে মিথ্যা নয়, বরং এই অন্ধকার মিথ্যার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পাচ্ছে অনন্ত আলোর, সত্যের। তাই এই যৌবন বাউল এক অনুসন্ধানকারী পথিক, যিনি জানেন অনুসন্ধানের নানা পথ আছে, আছে নানা মত। সেই প্রকৃত পথটিকে খূঁজে পাওয়ার জন্য তিনি রচনা করেন পুজো পদ্ধতির। রিসার্চ করেন রূপের মধ্যে অরূপের। তাই যৌবনের অসংযমী আত্মা এখানে স্থির, সংযমী,  সহিষ্ণু, স্থিরপ্রতিজ্ঞ। তার সঙ্গে এসে মিশেছে তাঁর অভিযাত্রা। মেধা, মনন এবং দার্শনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে।

 

” সুগত, এ-জন্মে আমি কেউ না তোমার।

আজ তবু সন্ধ্যায় যখন
জাতিস্মর জ্যোৎস্নার ঝালরে
তোমার হাসির মন্ত্র নীরব ঝর্ণায় ঝরে পড়ে,
আমারও নির্বেদ ঘিরে পূর্ণিমার তিলপর্ণিকার
অগুরু গন্ধের বৃষ্টি — মনে হল এখানে আবার
তোমার সময় থেকে বহুদূর শতাব্দীর তীরে
জয়শ্রীজীবন পাব ফিরে,
ফিরে পাব পরশরতন। ” ( বুদ্ধপূর্ণিমার রাত্রে)

তাঁর এই উচ্ছ্বাস প্রকৃত বাউলের। তাঁর এই খোঁজ প্রাজ্ঞ নির্জনতার। স্পষ্ট এক আলোর হাতছানি তাঁকে পথে নামিয়েছে। হাঁটার পথ দেখিয়ে দিয়েছে। আর তিনি এখানে সংশয়াচ্ছন্ন নন। নাকি, বিভ্রান্ত। এই পথটিকে তিনি তাই প্রকৃত জীবন মনে করেন। তিনি প্রবল প্রেমিক হয়ে শুরু করেন তাঁর জার্নি। তাই সহজেই আস্বাদ করতে পারেন স্পর্শ, গন্ধ, লয়কে। মাত্রাতিরিক্ত ভাবে যৌবনের উচ্ছ্বাস তার মধ্যে নেই। কিন্তু খোঁজ আছে। যৌবনের খোঁজ। রহস্যের, রোমাঞ্চের। তাই সহজ, অথচ নির্লিপ্তভাবে উচ্চারিত হয়, ” এ-জন্মে জানি না— তবু আর – জন্মে সুজাতা ছিলাম।’ আর এই অদৃশ্য বোধের খোঁজ পেতেই যেন কবির মনের মধ্যে বসতকরা বাউলের উদ্দেশ্য। তাঁর কবিতার এবং কাব্যব্যক্তিত্বের পথ চলা শুরু। যে পূর্ণ, অখণ্ড আলোক বর্তিকার খোঁজে তাঁর পথ চলা শুরু অক্ষরের মাধ্যমে। চিরজায়মান সেই সূর্যমুখী নারী কোন অতল গহ্বরে লুকিয়ে আছেন তাঁকে খুঁজে বের করাই কবির কাজ— বিভিন্ন রূপে বা অরূপে। সেকি আলো!  নারী!  দেবী! নাকি চির শ্বাশত সত্য সেই? এলিয়ট যাকে তুলনা করেছিলেন স্বচ্ছ হীরকখণ্ডের সঙ্গে! তাই কবির চেতন, অচেতনে কাজ করে চলেছে সেই খোঁজের প্রয়াস। ইচ্ছে। আমরা তাঁর ‘তমসো মা’ কবিতাটিতে দেখে নেব সেই খোঁজের অদমনীয় ইচ্ছেকে—

” দেখেছি সে- এক অন্ধ ধানক্ষেতে সারারাত্রি ঘুরে
সূর্যকে জাগাবে বলে বিষন্ন বাঁশির সুরে সুরে
একা একা জ্বলে ওঠে, আবার বিদীর্ণ আলে- আলে
বিধাতার মতো বুঝি স্বরচিত সে- আগুন জ্বালে! 


তার দিব্য দুই হাতে আমাকে ছুঁয়েছে কালরাতে,
স্পর্শের অনলে কেঁপে পুণ্য হল আমার শরীর ;
অগ্নিদেব শুধালেন; ‘ হাত রাখ আমার দুহাতে,
মানুষের নামে বল এই গাঢ় শীতশর্বরীর

আড়াল যে- প্রাণজ্যোতি, তুমি তাঁর বিতন্ত্রিত বীণা
তোমার জীবনে নিয়ে এ বিশ্বে বিকীর্ণ হবে কিনা?
রাগিনীর বৃষ্টি হয়ে খরশর জৈষ্ঠের জ্বালায়
প্রান্তরে ছড়াবে নাকি প্রাণভরা পুবালিদখিনা,
রূপান্তর দেবে তাকে হেমন্তের হিরণ্যথালায়”….  

তাঁর কাব্য আসলে ভিড়ের মধ্যে নির্জনতার কথা বলে চলা এক বাউলের মতোই উদাসীন অথচ আসক্ত, মায়াবী। যে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলে, অথচ, থেকে যাওয়াটাও প্রবল তাঁর কাছে। প্রেমে উদারতায় বিশ্বাসী আবার উপেক্ষা করতে পারে না প্রেমিকার অভিমান… চাওয়া। তাই হয় বারবার চেষ্টা করেও তাঁর প্রকৃত বাউল আর সাজা হয়ে ওঠে না। একতারাতে সুরে বিশ্বের সাথে মিলনের আর্তি বেজে ওঠে তখন। উদাসীনতার সঙ্গে আসক্তি সম্পর্ক তৈরি করে! তাই,  তাঁর কবিতা বলে ওঠে ” সারাদিন আমি দুর্বিষহ রহস্যের পাশে/ দাঁড়িয়ে রয়েছি একা। যে আমাকে দূরের প্রবাসে/ নির্বাসন দিয়ে সুখী,  দীপ্ত সেই রহস্যময়ীর/ চেয়ে বুঝি এ-রহস্য আর গাঢ় অতল গভীর,/ এবার আমাকে তাই কিছুতেই মুক্তি দেবে না সে”  কিন্তু সম্পর্ক তো আছেই। সম্পর্ক থাকেই। একজন শিল্পী ততই বাহ্যিক উদাসীন হয়ে পড়েন, যত তিনি প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর এই উদাসীনতা আসলে নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ ঢুকে পড়ার সাধনার মতোই প্রসারিত, একান্ত। তখন সমস্ত দৃশ্য,  রঙ, রূপ নিয়ে দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গের সাথে বসবাস শুরু হয় তাঁর।  তখন তাঁর সঙ্গে বসবাস করে বিরহের অক্ষর,  ইতিহাসের ঝরা পাতা, বাস্তবের অক্ষরমালা — ক্রমে দেখা যায় তাঁর সেই অন্ধ কুঠুরি ভরে ওঠে সুদীর্ঘ অভিযাত্রায়।  সেখানকার নিরঙ্কুশ নাবিক তখন তিনি নিজেই।  কখনও বা পর্যটক। তাই হয় দৃশ্যের  সঙ্গে ভাব করতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন প্রকৃত বাউল— কখনও বা সামান্য গ্রাম্য যুবক।আর এই পথচলার মধ্যে, এই উদাসীনতার মধ্যেই ঢুকে পড়ে মৃত্যুচেতনা, প্রেম ও সৌন্দর্যচেতনার মতো বিষয়, তখন কবি নিজেই কবিতার সঙ্গে মিলেয়ে নেন নিজেকে, তৈরি করে ফেলেন বসতবাড়ি… আনন্দের।

” বন্ধুরা বিদ্রূপ করে তোমাকে বিশ্বাস করি বলে;
তোমার চেয়েও তারা বিশ্বাসের উপযোগী হলে
আমি কি তোমার কাছে আসতাম ভুলেও কখনো?  

চারিদিকে অন্ধকার, দেখতেও চায়না ওরা কিছু,
কী-যেন দূরের শব্দে মাঝে-মাঝে সামনে গিয়ে পিছু
ফিরে এসে বলে ওরা শোনেনি দূরের শব্দ কোনো! 

ওরা কেউ কারো নয়, ওরা ঘরে-ঘরে
মৃত্যুর অপেক্ষা নিয়ে প্রতিদিন মরে। 

আমি যে কোথায় যাব, কখন… কোথায়…
এই ভেবে আমারো বেলা অবেলায় যায় ডুবে যায়। 

এখনো তোমাকে যদি বাহুডোরে বুকের ভিতরে
না পাই, আমাকে যদি অবিশ্বাসে দুই পায়ে দলে
চলে যাও, তাহলে ঈশ্বর
বন্ধুরা তোমায় যেন ব্যঙ্গ করে নিরীশ্বর বলে।। ” ( বন্ধুরা বিদ্রূপ করে) 

এই কবিতাটিকে কি একটা জার্নি বলা যায় ? একটা পথ থেকে হেঁটে যাওয়া আরেকটা পথ বলা উচিত! গাঢ়তর এই বিশ্বাসে মিলে যেতে পারে অদ্ভুত সেই আলোক। বিশ্বাস! হ্যাঁ!  পরিপূর্ণ বিশ্বাস! শুধু কি ঈশ্বর সাধনার ক্ষেত্রে! নাকি সমস্ত পথের স্মৃতির উপাচার নিয়ে ঘর বাঁধা তাঁর সাথে! চার্বাক দর্শন বলছে- ‘ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ’— একবার মৃত্যু হলে ফেরা যায়না কখনও। নেগেটিভ মুহূর্তের প্রতিফলন। যেখানে ফেরা নেই, সেখানে মায়াও নেই। আমি আছি কিন্তু আংশিকভাবে। তাই ‘যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ……”। গ্রীক দর্শনও তাই বলে– ইন্দ্রিয় সুখভোগই শেষ কথা। কিন্তু কবি এখানে স্থির। ক্ষতের কাছে, বেদনার কাছে থেকে তিনি উপলব্ধি করছেন কবিতা রূপী আত্মাকে। সত্যকে। আলোকিত পথের দিকে হাঁটাপথ খুঁজে চলেছেন তিনি। বিসর্জন শেখেননি তিনি; বরং সৃজনের কাছে তুলে ধরছেন তাঁর মর্ম স্পর্শী অক্ষরমালাকে।  মায়াকে ভালোবাসেন তিনি। সংসার সত্য। জীবন সত্য। তাই তাঁর কাছে সমস্ত কষ্ট সন্ধের উপপ্রান্তে এসে হাজির হয়। যার একটু পরেই ভোর। আলো। কিন্তু সম্ভাব্য কিছু ভাবনা নিয়ে তো আর নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যায় না। তবু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-র এই কবিতাটি অন্তত এমন এক সত্যের কাছে নিয়ে আসে, যেখানে প্রাকৃতিক নিরভিসন্ধিকেই এক আশ্চর্য মেধা ও হৃদয়ের যুগলবন্দিতে দেখতে পাই আমরা, আর সেখানে এসে মেশে ঈশ্বর চেতনা। প্রেম এখানে এক জার্নি। যে পথ বিশ্বাস দেয়, আলো দেয়… আশ্বাসে ভরিয়ে আলো করে তোলে নেগেটিভ পৃথিবীর প্ররোচনাকে! তখন, এখানেই কবিকে সাহসী হতে দেখি! দেখি তিনি নত নন কিছু সারভূতিশূন্য বাক্যের কাছে। বরং আরও বেশি করে আকড়ে ধরেন তাঁকে… সেই, যাঁর প্রেম আছে, প্রীতি আছে আর আছে বিরাট বিশাল বড় একটি হৃদয়! বন্ধুদের মতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা অপমান, তাচ্ছিল্য নেই বরং এক সহবস্থান আছে, আশ্রয় আছে তাঁর কাছে। তখন মনে হয়, প্রকৃত পরাজয় কী! যদি ধরে নিই মানুষ যখন নিজের সামনে নিজে এসে দাঁড়ায়, দেখে তারপর ভাবে আর সেই আয়নার প্রতিবিম্ব-এ প্রস্ফুটিত ছায়াকে দেখে নিজেই নিজের মনে কুঁকড়ে যায়, ঘৃণায় লাল হয়ে ওঠে চোখ মুখ– তখন কি তার পরাজয় ঘটে? নাকি শত্রু পক্ষ যখন তাকে অজস্র আঘাতের পরে ফেলে যায় ফুটপাত কিংবা কোন নির্জন এক প্রান্তরের ছায়ায় তখন? নাকি সমস্ত সমাজ, প্রিয়জন যখন তাকে আঙুল তুলে বলে– তুমি ভুল, তোমার এই পথ আসলে কোনও সঠিক মাত্রাকে তুলে ধরতে পারে না, তুমি হেরে গেছ, তুমি মুছে গেছ এই মন থেকে, দৃশ্য থেকে। তখন? আসলে এ সবই পরাজয়ের একটি অনুমাপন,  যাকে আমরা ইচ্ছে মত সাজিয়ে গুছিয়ে নিজেকে ভাঙি, অপরকে ভেঙে ফেলার তোড়জোড় শুরু করি। তখন সামনে এসে দাঁড়ায় বিরাট এক ছায়া, কালো এবং ভয়ার্ত। যার আনাচে কানাচে কোথাও আলোর রেশ নেই।

“একোবেশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি।
তমাত্মস্থংযেহনুপশ্যন্তি ধীরাস্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম।।” (কঠোপনিষদ 2/2/12)

” এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্ত স্বতন্ত্র ;
এক পাহাড়ের চূড়া আবার আর পাহাড়ের চূড়া,
টাল খেয়ে যাও পথিক, তবু থেম না একবারও।  

দেবতাদের অনড় আসন নক্ষত্রের উপর।
বিপর্যয়ী হাওয়া তোমার নশ্বরতার সুনাম
রক্ষা করে। দেবতারা অপরিবর্তিত,
সঠিক অর্থে মৃত। 

সদ্যোমৃত আমি, এখন প্রেতের অরূপ শরীর
আমার, আমি এখন তোমায় মহুয়াডাল থেকে
দেখতে পাচ্ছি। একি, তুমি পাহাড়ের টাল খেয়ে
কাঁদছ, একি, মানুষ হবার সুদীপ্র দায়িত্ব
ভুলে গিয়ে উদ্বন্ধন মেনে নেওয়ার জন্য
হাত বাড়িয়ে মহুয়া ডাল ধরার চেষ্টা করছ। ” ( ছোটনাগপুর) 

এক একটা সময় আসে, একেকটা যুগ পেরিয়ে হেঁটে আসেন কবি, সঙ্গে তাঁর অক্ষর, অনুভব, দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনার অনুভূতি মালা। তারপর তিনি স্থির;  তিনি সাধকের মতো ক্ষয়হীন। শোক মেলে ধরেছেন সুন্দরের বেশে, আলো রূপে ছড়িয়ে দিচ্ছেন রক্তাভ সূর্যোদয়ের ছবি আর সমস্ত প্রাচীর ভেঙে সেদিন সমস্ত সূর্যাস্ত একটা কালের ঘোষনায় উন্মুখ হয়ে বসে আছে। অলীক বলয়ের মধ্যে ছেড়ে দিচ্ছে হতাহতদের গল্প।  ছোটোখাটো অন্ধকারগুলিকে সূচের ডগায় গেঁথে জন্ম নিচ্ছে কবিতা। কবি হাততালি দিয়ে উঠছেন? উঁহু! তিনি আরও শান্ত, আরও নিবার্ক– নিবিষ্ট। কান পেতে ধরছেন শব্দ! অনুভব! উড়ানের গল্প। আর তখনই নেচে উঠছে কবিতা। ময়ূরের মতো বিস্তৃত তার পেখম। ডানা। আর মৃদু অথচ দৃঢ় ঢঙে কবি অলোকরঞ্জন সূচনা করছেন এক নতুন দিকের… নতুন পথের…  শব্দের…

“মাঝে-মাঝে স্পষ্ট করে বলা দরকার
ঈশ্বর আছেন,
মগডালে-বসে-থাকা পাপিয়াকে আর
পর্যবশিত বস্তুপৃথিবীকে স্নান করাচ্ছেন।

মাঝে-মাঝে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন

তুমি যে আমার
সাধনার ধন,

তুমি চলে গেছ বলে আমাকে গাহন করাবার

কেউ নেই, যত্রতত্র সেরে নেই মধ্যাহ্নভোজন। “( পান্থ)

চিত্রঋণ :  এলিজাবেথ গ্যুন্টার, ছন্দা বসু 

Shares

Comments are closed.