পিঁপড়ের মতো পিষে ফেললেই সমাধান হবে না

১৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

জিষ্ণু বসু

বাংলা শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল বহুদিন থেকে, প্রয়োজন ছিল বিজ্ঞান, ইতিহাসের শিক্ষকেরও। পাঠানো হল উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষক। তাতেই উষ্মা। ছাত্রী অভিভাবক সকলের বক্তব্য, পড়ুয়াদের ৯০ শতাংশেরও বেশি হিন্দু। বাকি মুসলমান পড়ুয়ারা ক্লাস সেভেন-এইট পর্যন্ত আরবি পাঠ করতে পারে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকে উর্দু ভাষা নেওয়ার রেওয়াজই নেই বাংলাভাষী ওই অঞ্চলে। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের দাড়িভিট স্কুলেও সেই রেওয়াজ তাই ছিল না।

গত ১৮ তারিখ এইসব বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে ডি আই সাহেব স্কুলের লেটারহেডেই লিখে গেলেন সিদ্ধান্ত বদল হবে। উঠে গেল বিক্ষোভ, শুরু হল ক্লাস। স্থানীয়দের বক্তব্য হল নেপথ্যে কাজ করছিলেন এক সহ শিক্ষক নুরুল হুদা। প্রধান শিক্ষক শিলিগুড়িতে থাকেন। বকলমে হুদা সাহেব স্কুল চালাতেন। স্কুলের রোস্টারে উর্দু শিক্ষকের কথা তিনিই লিখেছেন। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের সহায়তায় আবার ডিআই-এর মত পরিবর্তন করা হল। তাই ২০ সেপ্টেম্বর স্কুলে যোগ দিতে এলেন উর্দু শিক্ষক সানাউল্লাহ রহমানি। সঙ্গে প্রচুর পুলিশ।

গোয়ালপোখরের বিধায়ক গোলাম রব্বানি পুলিশ পাঠানোতে সহযোগিতা করেছেন, নরুল হুদা তৃণমূল নেতৃত্বকে ধরে স্কুলে উর্দু চাপাতে চাইছেন, ইত্যাদি খবরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষও প্রতিবাদে সামিল হন। প্রথমে পড়ুয়ারা, তারপর পরিবারের সকলে। স্থানীয় মানুষের বক্তব্য হল, বোনেদের শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে দেখেই স্থানীয় কলেজ ছাত্র রাজেশ সরকার (২০) ও তাপস সরকার (২০) এসেছিল। দুজনেই গরিব দলিত পরিবারের ছেলে। রাজেশ নমঃশূদ্র আর তাপস রাজবংশী সম্প্রদায়ের। তারা আইটিআইয়ের ছাত্র। সেখানেই তারা গুলিবিদ্ধ হয়। দু’টি তরতাজা যুবক ছেলে মারা গেল। চিকিৎসকরা ক্ষত দেখে বলেছিলেন, ভারী রাইফেলের গুলি। গুলি এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে, তাই দেহের ভেতর ছিল না। বুলেটের ব্যালিস্টিক পরীক্ষা হলে ঠিকঠাক বোঝা যেত আগ্নেয়াস্ত্রটি আদতে কী ছিল। কিন্তু এতজন পুলিশের উপস্থিতিতে আততায়ীকে তো ধরা গেলই না, নাকি তাকে দেখাও যায়নি! আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গেল না, এমন কি গুলির নমুনাও নয়।

আরও পড়ুন দাড়িভিট কাণ্ড : শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করল আরএসএস

শিক্ষামন্ত্রী কোনও তদন্ত হওয়ার আগেই বললেন আরএসএসের চক্রান্ত। বিদেশ থেকে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীও তাই বললেন, কিন্তু চক্রান্তটা কী? লোক ক্ষেপানো? নাকি গুলি চালানো? কিংবা দুটোই? বলতেই পারেন কেউ। রাজেশ আর তাপসের সঙ্গে এবিভিপির সম্পর্ক ছিল। আরএসএসের গুণ্ডারা তা হলে বিদ্যার্থী পরিষদের ছেলেদের ওপর গুলি চালালো? এইসব অদ্ভুত কথাতে বিজেপি-আরএসএস কেন অন্য বিরোধীরাও শান্ত হচ্ছে না। এসএফআই এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। বামফ্রন্টের মিছিল বের হয়েছে জেলায় জেলায়। কলকাতা শহরে কংগ্রেসও প্রতিবাদ মিছিল করেছে। সুশীল সমাজ ২৩ সেপ্টেম্বর পদযাত্রা করেছেন মহানগরে। স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ি থেকে বড় মিছিল করেছিল এবিভিপি। ২৬ তারিখ রাজ্যে বন্‌ধের ডাক দিয়েছিল বিজেপি।

এই বন্‌ধের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রাজ্যের এক মন্ত্রী বললেন যে, বিজেপিকে পিঁপড়ের মতো মেরে ফেলতে পারেন তাঁরা। মন্ত্রীর আগ্রহ মানে তো কর্মীদের কাছে আদেশ। সেদিন সারা রাজ্যে তৃণমূলের যারা উন্নয়নের মুখ তারা রাস্তায় বন্‌ধ সমর্থকদের বেধড়ক পিটিয়েছেন। সবচেয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে যিনি মন্ত্রীমশাইয়ের আদেশ পালন করেছেন তিনি মহম্মদ আসদারুজ্জামান। বারাসাতের এক পঞ্চায়েত প্রধান। বারাসাতের রেলগেটের কাছে পিকেটিং করছিলেন বিজেপি কর্মী সমর্থকরা। আসদারুজ্জামানের বাহিনী তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। নির্মমভাবে মারধোর করে। নীলিমা দে সরকার নামে এক মহিলা বিজেপি কর্মী সেখানে ছিলেন। আসদারুজ্জামান নিজে সেই মহিলাকে পিছন থেকে সজোরে লাথি মারেন। সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরাতে সেই দৃশ্য সারা রাজ্যবাসী দেখেছেন। দেখেছেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্য পুলিশের ডিজিপি সাহেব, শিক্ষামন্ত্রী, সেই ‘পিষে ফেলার’ ফতোয়া দেওয়া মন্ত্রীমশাই, সব্বাই। আসদারুজ্জামান সাহেবই সেই বীর, যিনি, এরাজ্যে বিরোধীদের আক্ষরিক অর্থে পিষে ফেলতে পারেন।

কিন্তু বিরোধীদের পিষে ফেললে এ রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে সব কালিমা কি ধুয়ে ফেলা যাবে? এই সরকার আসার পরই উচ্চ শিক্ষার প্রাঙ্গনে আরাবুলের মতো ‘তাজা ছেলেরা’ প্রবেশ করেছিলেন। আজকে যিনি শিক্ষামন্ত্রী তিনি সস্নেহে আরাবুলকে তাজা ছেলের শিরোপা দিয়েছিলেন। আজ রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শুরু করে প্রতিটি কলেজের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে অমনই সব তাজা ছেলেরা। যারা তাদের অপছন্দের কোনও কথা শুনলে কলেজের অধ্যাপিকার মুখ লক্ষ্য করে জলের জগ ছুড়ে মারতেও দ্বিধা করে না। এই তাজা ছেলেদের দাপটে প্রতিদিন কোনও না কোনও কলেজে অধ্যাপক নিগ্রহ হচ্ছে।

উচ্চ শিক্ষায় বেনিয়মের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই সরকার। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় কোথাও ইউজিসির নিয়ম মানা হচ্ছে না। কলেজ ভর্তির জন্য প্রকাশ্যে টাকা নেওয়া নিয়ে টিএমসিপি আর তৃণমুল কংগ্রেসের বিবাদ সামনে এসেছে। এ বছরই প্রথমবর্ষের ভর্তির সময় সমগ্র রাজ্যবাসী এই বীভৎস দৃশ্য দেখেছে। শিক্ষামন্ত্রীর হম্বিতম্বিই সার হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি।

অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবধি লুঠ চলছে। যারা টাকা দিচ্ছেন না তাঁদের ডাকাই হচ্ছে না। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ব্যাপক দুর্নীতি ধরা পড়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাইকোর্টস তাই বাংলা, ইতিহাস ও সোশিওলজি বিভাগে অধ্যাপক-অধ্যাপিকা নিয়োগের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা থেকে মধ্যশিক্ষা, দুর্নীতির নাগপাশে হাঁসফাস করছে। ২০১৫ সালে টিচার এলিজিবিলিটি টেস্ট (টিইটি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর প্রকাশ্যে আসে। প্রায় ২০ লক্ষ যুবক-যুবতী ৩০ হাজার পদের জন্য পরীক্ষা দিয়েছিল। ২০১৫ সালের পর থেকে দুর্নীতি আর স্বজনপোষন ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষক পদে আর নিয়োগ হবে না এমনটাই রাজ্যবাসী নিশ্চিতভাবে বুঝে গেছে।

শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে চলছে অবাধ দুর্নীতি। গো-পাচার সিন্ডিকেটের মতো শিক্ষক নিয়োগই হয়ে উঠেছে আর একটি টাকা তোলার বড় উৎস। যে দাড়িভিট স্কুলে দুজন ছাত্র মারা গেল তার থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে মনিভিটা হাইস্কুল। সেখানে ১১ জন শিক্ষক নিয়োগপত্র পেয়েও স্কুলে যোগ দিতে পারছেন না। কারণ স্কুলের হেডমাস্টার মশাই একজন প্রভাবশালী নেতা মহম্মদ ইসর। ইসলামপুর ব্লকের পণ্ডিতপোতা ১ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য। মাথা পিছু কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয় নতুন এসএসসিতে নিয়োগ হওয়া শিক্ষকদের কাছ থেকে। এই স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রই মুসলমান। গত ১৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষকের দাবিতে এই স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তা অবরোধ করেছিল। ইসলামপুর – গোয়ালপোখর রাস্তায় যাত্রী বোঝাই একটা সরকারি বাস ভাঙচুর করা হয়। প্রশ্নটা দুর্নীতি, স্বজনপোষন আর তোলাবাজির। প্রতিবাদ করছেন হিন্দু মুসলমান সবাই।

বন্‌ধের দিন আসদারুজ্জামান যখন দিনের আলোয় পুলিশকে সাক্ষী রেখে শত শত মানুষের সামনে মহিলাকে সজোরে লাথি মারল, তখন ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’-এর শেষ কটা লাইন বারবার মনে পড়ছিল। ‘তোরা সত্যিটাকে রক্তের সাগরে ডুবিয়ে মারতে পারবি না…’ মা চিৎকার করে উঠতেই ওরা তার হাতে সজোরে প্রহার করে।

“তোরা যত অত্যাচার করবি লোকে তত তোদের ঘেন্না করবে। নির্বোধের দল! তোদের ওপরেই…”  ওদের একজন মায়ের গলা টিপে ধরল তারপর তাকে পিষে দিতে লাগল। তার গলা থেকে কেবল ঘরঘর শব্দ বের হল, “হতভাগা অত্যাচারীর দল…”

ড. জিষ্ণু বসুসাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More