শনিবার, ডিসেম্বর ১৫

মোহনদাসকে এবার আমরা মুক্তি দিই

তিরিশ সালের গোড়ায় মোহনদাস সিদ্ধান্ত নিলেন নুন নিয়ে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করবেন। শুনে তাঁর দলের মধ্যেই অনেকে ছ্যা ছ্যা করে উঠলেন। নুন! সেটা আবার আন্দোলন, সত্যাগ্রহের একটা বিষয় হতে পারে!

তারপরে কী হল, আমরা কম বেশি সকলেই জানি। তথাকথিত ইতিহাসের পাঠ্যবইতে গোটা দেশের উন্মাদনা, উদ্দীপ্ত হওয়ার কাহিনী বিবৃত। সুদূর উত্তর বিহারে ডাণ্ডির মতো সমুদ্রের জল নেই, কিন্তু ধুলো তো আছে! গরম জলে তাই ফোটানো যাক গান্ধী মহারাজের অনুসরণে – এটা কী কম চমকপ্রদ ইতিহাস!

কিন্তু আসমুদ্র হিমাচলে ক’জন জানতেন, তার কয়েক বছর আগেই নুন খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন মোহনদাস নিজেই! ছাগলের দুধ ছাড়া তাঁর স্টেপল ফুড সবরকম আনাজের সেদ্ধ একটা মণ্ড, এবং অবশ্যই নুন-রহিত। কেন?

স্বাদ কে জয় করতে হবে। খাদ্য শুধু পিত্তরক্ষার জন্য, স্বাদ উপভোগের জন্য নয়।

এ তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণ। এ তাঁর সংযম। এও তাঁর ব্রহ্মচর্যেরই একটা দিক।

ভুললে চলবে না, এর বছর কুড়ি আগেই এক সমুদ্র-যাত্রায় মাত্র দশদিনের অসম্ভব তীব্র এক তাগিদে একটা চটিবই লিখে ফেলেছিলেন। শুধু যন্ত্র সভ্যতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ নির্দেশই করেননি, সেখানে তিনি বলেন, অতিভোজনে শরীর বেহাল হলে ‘পিল’ খেলে চলবে না, কারণ তাহলে লোভকে জয় করা হবে না। বরং লোভের পুনরাবৃত্তির পথ প্রশস্ত হবে।

কী সাংঘাতিক অবাস্তব ভাবনা, তাই না! অবাস্তবতা তো তাঁর পরতে পরতে। যখন তাঁর একদা প্রিয়, একদা-অনুগত, একদা-আপনজন বড় বড় নেতারা দেশটাকে দু’ভাগ করে বিভক্তসত্তার সঙ্গে আপোশ করে নিজেদের কুর্সির খোয়াব দেখছেন – দিকে দিকে আগুন যতই জ্বলুক, যতই লাল হোক হিন্দু-মুসলমানের তরবারি পরস্পরের রক্তে – তিনি এক অশক্ত বুড়ো মানুষ কার্যত একাকী ছুটে বেড়াচ্ছেন মানুষের বিবেক ফেরানোর চেষ্টায়। স্বেচ্ছা-সঙ্গী নির্মল বসু শুনছেন, রাতে তাঁর অস্ফুট আর্তনাদ, কী করি! আমি যে কী করি! তখনও কিন্তু তাঁর পাশে তার নাতনি – ব্রহ্মচর্যের আত্মনিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা নিরীক্ষা কিন্তু থামেনি।

এমন এক অবাস্তব লোক যে দিনের শেষে একা হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক।

তাই ’৪৭ সালের ক্রান্তিকালে তিনি যখন বললেন, কংগ্রেসের কাজ ফুরিয়েছে, একে ভেঙে দাও – গ্রামে গ্রামে নিজের সরকার গড়ে দাও – তাঁর সেই একদা ভক্তেরা বলেন, আরে লোকটা বলে কী? উন্মাদ না কি?

সত্যকে ঈশ্বর অভিহিত করা উন্মাদ-অবাস্তব এই শীর্ণকায় মানুষটিকে নিয়ে এত মাতামাতির কী আছে? দেড়শ বছর হলই বা!

আমরা তো বাস্তবের পূজারী। ধর্মে ধর্মে সংঘাত হবে, ধর্মেই মধ্যে উঁচুনীচুর দ্বন্দ্ব চলবে, সীমান্তের দু’ধারে ঠোকাঠুকি চলবে, গরম পরিবেশ গরমতর হবে –

তা নিয়ে রাজনীতি হবে, নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হবে, সরকার বদলের দামামা বাজবে – এটাই যে বাস্তব। কোটি কোটি শিশু খেতে পাবে না, স্কুলে যাবে না এটাই তো বাস্তব। নারী অত্যাচারিত হবে এটাই তো বাস্তব।

এই বাস্তবতার ঘনঘটায় আমরা মানুষটিকে বরং মুক্তি দিই না। ক্যালেন্ডার থেকে, থানার বড়বাবুর মাথার ওপর থেকে ছবি সরিয়ে, চক থেকে চৌকি – সর্বত্র তাঁর যে নাম খোদাই করা আছে সেখান থেকে নাম সরিয়ে।

আলগা শ্রদ্ধা, আলগা আদর, আলগা সম্মান তো অনেক হল!

Shares

Comments are closed.