ব্লগ: নয় দুয়ে এগারো

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সন্দীপ বিশ্বাস 

    সালটা ২০০১। নিউ জার্সিতে যে স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে চাকরি করি হঠাৎই উঠে গেলো সেটা। সহজ কারণ – টাকা শেষ। চাকরি খুঁজছি, কিন্তু লাগছে না কিছুতেই। এ দিকে বাড়িতে চার বছরের শিশুকন্যা, এবং আমার মা যিনি তখন বেড়াতে গেছেন ওদেশে। দেখতে দেখতে মাসখানেক কেটে গেলো। বাড়ি ভাড়া থেকে ইলেকট্রিক, ফোন ইত্যাদির বিল ভরতে হল যথারীতি। বিনিদ্র রজনী যাপন আমার স্ত্রী ও আমার। ব্যাঙ্কে যেটুকু আছে তাই দিয়ে কতদিন আর চলবে এইভাবে? খেতে বেশি খরচ লাগে না ওদেশে, পেট্রোলও এতই সস্তা যে এক একবারে পুরো ট্যাঙ্ক ভরে নিয়ে বোঁ বোঁ ক’রে ঘুরে বেড়ানো যায় যত ইচ্ছে – কিন্তু সবচেয়ে খরচসাপেক্ষ হল হেলথ্ ইন্স্যুরেন্স, যেটা ছাড়া কোনোরকম চিকিৎসা পাওয়া সোজা নয় মোটেই। আর আমাদের জন্য এই ব্যবস্থা থাকা খুবই জরুরি তখন, কারণ ছোট বাচ্চা বাড়িতে। যতদিন চাকরি ছিল ইন্স্যুরেন্সের টাকা কোম্পানি দিত, কিন্তু এখন? এইরকম পাগল-করা পরিস্থিতিতে একটা ইন্টারভিউর ডাক এল আর এক স্টার্ট-আপ থেকে যারা একই ধরনের কাজ করছে তখন। বস্টনের কাছে মার্লবোরো নামে একটা ছোট শহর। আড়াইশো মাইল মতো বাড়ি থেকে। আমেরিকার আন্দাজে বিশেষ কোনও দূরত্ব নয় এটা। চার-পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা গাড়িতে। ইন্টারভিউ দিয়ে এলাম নির্ধারিত দিনে, এবং হয়েও গেলো চাকরিটা। জয়েন করতে হবে এক মঙ্গলবার। দু’সপ্তাহ ওরা হোটেলে থাকার পয়সা দেবে, তার মধ্যে বাড়ি ভাড়া খুঁজে নিতে হবে। তিন মহিলাকে নিয়ে দুর্গা বলে রওনা দিলাম একদিন আগে। সঙ্গে অতি প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু মালপত্র। মাসের শেষ পর্যন্ত ভাড়া দেওয়া আছে এই বাড়ির। ওখানে গিয়ে থাকার জায়গা ঠিক হলে তবেই পুরো সংসার উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন। মার্লবোরোর কাছাকাছি থাকতো আমাদের পরিচিত এক বাঙালি পরিবার। খবর পেয়েই তারা খুব ক’রে বলেছিলো অন্ততঃ কয়েকটা রাত তাদের বাড়িতে কাটাতে। সেইমতো পৌঁছে গেলাম যথাস্থানে|

    পরদিন নতুন অফিসে জয়েনিং। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম সবাইকে নিয়ে। প্ল্যানটা এইরকম — অফিসে হাজিরা দিয়ে প্রাথমিক ফর্মালিটিজ সেরে বেরিয়ে আসব খানিক সময়ের জন্য, যাতে আশপাশের কিছু বাড়ি খুঁজে দেখতে পারি। এই ব্যাপারে আমার স্ত্রী’র মতামতটাই মুখ্য, তাই তাকে তো যেতেই হবে। আমার মা নাতনিকে নিয়ে একা থাকতে চাইলেন না সেই পরিচিতের বাড়িতে। অগত্যা পুরো ব্যাটেলিয়ান নিয়েই বেরোতে হলো। ওদেশের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, প্রথম প্রথম এইসব কাজের জন্য বেরোলে অফিসওয়ালাদের গোঁসা হয় না মোটেই। যুক্তিটা সোজা, থাকার জায়গাই নেই ঠিক, কাজে মন বসবে কী ক’রে? সাড়ে আটটা নাগাদ ঢুকে গেলাম অফিসে। পথে ওদের নামিয়ে দিলাম কাছাকাছি এক ম্যাকডোনাল্ডস-এ। এটা ওদেশের বিশাল ম্যাক-গুলোর একটা যেখানে বাচ্চাদের খেলাধুলোর জন্য অঢেল ব্যবস্থা থাকে। কাজেই মেয়েকে নিয়ে সমস্যা হবে না কোনও। অফিসে নিয়মমাফিক দাঁত-টাত দেখিয়ে নিজের কিউব চিনে নিয়ে সবে বসেছি গ্যাঁট হয়ে। হঠাৎ মনে হল আশপাশের জনগণ কেমন যেন ছোটাছুটি শুরু করেছে! একটা বিশেষ দিকের পানে যেন দৌড় মারছে সবাই। কি ব্যাপার দেখার জন্য গেলাম পেছন পেছন। দেখি একটা ঘরে একটা টিভির সামনে ভিড় জমিয়েছে তারা। অবাক লাগলো। একবার অফিসে ঢুকেই সকলে মিলে টিভি দেখার বাতিক আগে তো দেখি নি কখনও! ভাবলাম বস্টন এলাকার অফিসে এইটাই রীতি হয়তো! নিজের কিউবে ফিরতে যাবো, হঠাৎ চোখ গেলো পর্দায়। দেখি একটা প্লেন এসে সোজা ঢুকে গেল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একটা টাওয়ারে! প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের চোখকে! তারপর ওখানেই সেঁটে গেলাম বলাই বাহুল্য।

    আজ ৯/১১। প্রতি বছরের মতো এই দিনটিতে বিশেষভাবে মনে পড়ে সেই সময়টার কথা। বিশদ বিবরণ প্রায় সকলেরই মুখস্থ বোধহয়। নিজে যা দেখেছি সেটুকুই বলব শুধু। অফিস-টফিস মাথায় উঠল সেদিন। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম, এলাম সেই ম্যাক-এ। ইতিমধ্যে ওরাও পেয়ে গেছে খবরটা। দু’টো টাওয়ারই ভেঙে পড়েছে ততক্ষণে। চারিদিকে শুধু স্তম্ভিত মানুষের মুখ। এরকম বিপর্যয় কখনও দেখেনি আমেরিকার জনগণ। একবার পার্ল হারবারে খুব ঝাড় খেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে এতদিন আগে যে মনে রাখাই মুশকিল। তাছাড়া সেটা ছিল বহু দূরে, মেইনল্যান্ডের ধারে কাছেও নয়। খোদ ম্যানহাটানের বুকে এরকম জগৎ বিখ্যাত জায়গায় এই ধ্বংসলীলা, স্বপ্নেও ভাবে নি কেউ কোনোদিন! পরিচিতের বাড়ি একটু দূরে। ভাবলাম এই পরিস্থিতিতে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করব না আর। কাছাকাছি একটা হোটেল ভাড়া নিলাম। ডেস্ক ক্লার্ক মহিলার চোখ ও মন পড়ে আছে টিভির পর্দায়, কোনও ক্রমে সারা হল পদ্ধতিটা। ঘরে ঢুকে আমাদেরও একটাই কাজ, টিভি চালিয়ে বসে থাকা। এর মধ্যে মনে হলো, প্রচুর বন্ধু আমাদের নিউ জার্সিতে। তাদের অনেকেই নিউ ইয়র্কে যায় চাকরি করতে। খবর নেওয়া দরকার তাদের। বারে বারে ফোন করা হল সবাইকে। লাইন পাওয়া গেলো না একবারও। পরে আমাদের পরিচিতের মধ্যে অনেক ভয়াবহ গল্প শুনেছি। একটি ছেলে নিউ জার্সি থেকে “প্যাথ ট্রেন” ধরে যেত ওয়াল স্ট্রিট এলাকায় চাকরি করতে। নামতো যে স্টেশনে সেটা ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ঠিক তলায়। সেদিন যখন পৌঁছেছে ঠিক তার আগেই প্রথম প্লেনটা ধাক্কা মেরেছে। পুরো টাওয়ারটা ধ্বসে পড়ার আগেই ভাগ্যক্রমে বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল সে। পুরো শহরে কোনো গাড়ি চলছে না তার পর থেকে। কোটি কোটি লোকের সঙ্গে পায়ে হেঁটে যখন সে বাড়ি পৌঁছয় তখন আঁধার নেমে গেছে। তার বৌয়ের কাছে শোনা, দরজা খুলে ছেলেটিকে দেখে চিনতে পারে নি সে। সারা দেহ ধুলো আর ছাই দিয়ে এতটাই ঢাকা ছিল! আর একজনের ঘটনা আরও ভয়াবহ। আগের দিন অনেক রাত পর্যন্ত ফাটিয়ে ঝগড়া হয়েছে বৌয়ের সঙ্গে। ফলে সকালে উঠতে দেরি। তার অফিস ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একদম ওপর দিকের কোনও তলায়। পৌঁছতে একটুখানি দেরি হয়েছে তার। ইতিমধ্যে ঘটে গেছে ঘটনা। তার প্রায় শ’খানেক কলিগ মারা যায় সেদিন। বেশ কিছুদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ছিল ছেলেটি। রাখে কৃষ্ণ মারে কে!

    এগারো তারিখের ঘটনা। আর ষোলো তারিখ রবিবার, মায়ের দেশে ফেরার টিকিট নিউয়ার্ক এয়ারপোর্ট থেকে। যারা জানেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, এটি নিউ জার্সির একটি শহর, নিউ ইয়র্কের একদম গায়ে কিন্তু আলাদা জায়গা। বাড়ির বেশি কাছে বলে ততদিন পর্যন্ত এইখান দিয়েই দেশে যাতায়াত করতাম আমরা। এ দিকে ঘটনার পর থেকে সবরকম যাত্রীবাহী বিমান বন্ধ ক’রে দেওয়া হয়েছে। মা’র প্লেন আদৌ উড়বে কিনা বোঝা যাচ্ছে না কিছুই। ওদিকে তার টুরিস্ট ভিসার মেয়াদও শেষ প্রায়। এক্সটেনশন চাইলে পাওয়া যায় অন্যসময়, কিন্তু এই ডামাডোলে তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই চিন্তা নিয়ে সপ্তাহটা হোটেলে কাটালাম আমরা। অফিস করি আর ফিরে এসে টিভি দেখি। ওরা বেশিটাই ঘরে থাকে, যাহোক রান্নাবান্না ক’রে পেট চলে কোনও ক্রমে। শুক্রবার অফিসের পরে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম নিউ জার্সির দিকে, কারণ ইতিমধ্যে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে যে ১৬ তারিখ ভোরে মা যে ফ্লাইটে উঠবে সেটা সময়েই ছাড়বে। আমেরিকায় বসবাসকালে বহু হাজার মাইল গাড়ি চালিয়েছি আমি। এই সফরের মতো আর দেখি নি কখনও। রাত্রিবেলা হাইওয়ে এমনিতে অন্ধকার থাকে, কিন্তু আকাশে ঝিকমিক করে অজস্র প্লেনের আলো। এখন শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার চতুর্দিকে। গাড়ির সংখ্যাও অস্বাভাবিক রকমের কম। মাঝে মাঝে এক-একটা ওভারপাস। সেগুলোর রেলিংয়ের ওপর লাইন দিয়ে জ্বলন্ত মোমবাতি বসানো। আমাদের যাত্রাপথ ম্যানহাটানের একদম গা ঘেঁষে। যত কাছে যাচ্ছি দেখি তত বেশি ফাইটার প্লেন! খুব নিচু দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে সেগুলো। জোরালো আলো ফেলছে সব চলন্ত গাড়ির ওপর। নিউ জার্সিতে ঢুকে একটা জায়গায় হাইওয়ে থেকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার দেখা যেত। দেখি কিছুই নেই সেখানে! আলো জ্বেলে রাখা আছে। ধোঁয়ার স্তম্ভ দেখা যাচ্ছে তখনও! সব মিলিয়ে সে এক হাড়-হিম-করা অভিজ্ঞতা! শেষ পর্যন্ত মা ঠিক সময়েই রওনা দিতে পেরেছিল। পরে জানতে পারি, ৯/১১-এর পর সেটাই ছিল ঐ এয়ারপোর্ট থেকে ছাড়া প্রথম প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট!

    কারা এই কান্ড ঘটিয়েছিল এই নিয়ে এক অদ্ভুত তত্ত্ব শুনেছিলাম তখন। দশ শতাংশের বেশি ইহুদি মানুষের বাস নিউ ইয়র্ক সিটিতে, যাদের অনেকেই নাকি চাকরি করতে যেত ঐ বাড়িতে। কিন্তু প্রায় তিন হাজার নিহতের তালিকায় একজন ইহুদিরও নাম নেই! অর্থাৎ আগে থেকেই খবর ছিল তাদের কাছে, তাই বাড়ির বাইরে বের হয়নি কেউ ওই দিন। এতেই নাকি প্রমাণ হয় যে এটা ওই ধর্মের লোকেদেরই কীর্তি! উদ্দেশ্য, মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের হেয় করা সারা দুনিয়ার সামনে! বলাই বাহুল্য, আদপেই ধোপে টেকেনি এই যুক্তি।

    মা’র সফর শেষ হয়ে আসছে। আমরাও নিউ ইয়র্কের কাছ থেকে চলে যাচ্ছি। এইসব ভেবে ৯ তারিখে আমরা আর একবার ঘুরতে গিয়েছিলাম ম্যানহাটানে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে বেশ কিছু ছবি তোলা হয়েছিল ওই দিন। নস্ট্রাডামাসের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি প্রমাণ ক’রে কবেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে সেই আকাশছোঁয়া অট্টালিকা। শুধু স্মৃতি হিসাবে রয়ে গেছে একগুচ্ছ ধূসর হয়ে আসা সে দিনের ফোটোগ্রাফ!

    লেখক ব্যাঙ্গালুরু নিবাসীপেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More