‘বিন্দুবিসর্গ’ প্রমাণ করে জনপ্রিয়তা ও উচ্চমানের সাহিত্যের মধ্যে কোনও তফাৎ নেই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

‘বিন্দুবিসর্গ’ ।। দেবতোষ দাশ ।। পত্রভারতী ।। ২০১৭ ।। ৩৭৫/-টাকা

দেবতোষ দাশের ‘বিন্দুবিসর্গ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৭-র ফেব্রুয়ারিতে। দ্বিতীয় মুদ্রণ ওই একই বছরের নভেম্বরে। লক্ষ করবার মতো, মাত্র আটমাসের মধ্যে দ্বিতীয় মুদ্রণ। বাংলা উপন্যাসের প্রকাশনায় এমনটা সচরাচর ঘটে না। কোনও কোনও লেখকের কেচ্ছ্বা-নির্ভর উপন্যাসের ক্ষেত্রে অবশ্যি এরকম হয়। নাহ! ‘বিন্দুবিসর্গ’-তে বিন্দুমাত্র কেচ্ছ্বা-কাহিনি নেই। কোনও রগরগে ঘটনার ঘনঘটাও নেই। নেই প্রেমভালোবাসা বা নরনারীর মিলন বর্ণনা। মধ্যবিত্তের সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দেওয়ারও চেষ্টা করেননি লেখক। তা সত্ত্বেও একটি উপন্যাস কী করে বেস্ট সেলার হয়ে উঠল—সেটাই দেখার।

অনেক সময় বেস্ট-সেলার, জনপ্রিয়তাকে আমরা সন্দেহের চোখে দেখি। অতি দ্রুত একাধিক সংস্করণ হলে তাকে সাহিত্য হিসেবে মান্যতা দিতে চাই না। আমাদের এইসব ভাবনাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে ‘বিন্দুবিসর্গ’। এই গ্রন্থের পাঠক অনুধাবন করবেন— জনপ্রিয়তার সঙ্গে উচ্চমানের সাহিত্য-শিল্পের কোনও বিরোধিতা নেই। আলোচ্য গ্রন্থটি একাধারে পাঠকপ্রিয় এবং সাহিত্য হিসেবেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই লেখা হয়েছে এই উপন্যাস। আরও স্পষ্ট করে বলা যেতে পারে—একটি বিশেষ তত্ত্বভাবনাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায় থেকেই দেবতোষের এহেন আখ্যান। তত্ত্বভাবনাটি কী? ‘কথামুখ’ অংশে লেখক স্পষ্ট করে বলেছেন—“লিটল ম্যাগাজিন মারফৎ কলিম খান ও তাঁর সহযোগী রবি চক্রবর্তীর চিন্তাভুবনের সঙ্গে কিছুটা পরিচয় ছিল, সেই সূত্রে জানা ছিল তাঁরা রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণসহ প্রাচীন সাহিত্যে লুকিয়ে থাকা সংকেতসূত্র ও তার আচ্ছাদন সরিয়ে বার করে আনছেন প্রকৃত সত্য। শব্দের প্রচলিত অর্থ পরিত্যাগ করে তাঁরা শব্দের ভিতর নিহিত ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ ব্যবহার করছেন, ফলে, কেবল প্রচলিত ধারণা নয়, কী আশ্চর্য, বদলে যাচ্ছে ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসও। এই দুই দার্শনিকের বিকল্প দর্শন-ইতিহাস-ভাষাতত্ত্বকে উপন্যাসে রূপ দিলে কেমন হয় ? কিন্তু চিন্তায় পড়লাম জটিল এবং চমকপ্রদ বিষয়ভাবনার প্রয়োগ নিয়ে। স্থির করলাম পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে উপন্যাসটির বহিরঙ্গ হবে থ্রিলারের।”

সাম্প্রতিককালের দুই ভাষাতাত্ত্বিক-দার্শনিক-চিন্তকের ভাবনাকে অধিকতর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য লেখক এতটাই বদ্ধপরিকর ছিলেন যে, তাই থ্রিলারের আঙ্গিক গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না, উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁদেরকেই—“মহর্ষি কলিম খান ও মহর্ষি রবি চক্রবর্তীকে”। লেখকের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। ‘বিন্দুবিসর্গ’-এর পাঠক মাত্রেরই উৎসাহ জাগে কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তীর কাজের প্রতি।

কলিম খান আখ্যানের প্রধান চরিত্র। উপন্যাসে তাঁর নাম কবীর খান। কলিম খানের চিন্তাভাবনাই হুবহু উঠে এসেছে আখ্যানে। ইতিহাসের মেধাবী ছাত্র কবীর ছাত্রাবস্থা থেকেই ছিলেন অন্যরকম। রামায়ণ মহাভারতের লাইন তুলে অর্থ জানতে চাইতেন স্যারেদের কাছে। কিছু উত্তর পেতেন, কিছু পেতেন না। নিজের ভাষায় লেখা সাহিত্যের অর্থ কেন বুঝতে পারবেন না — এই প্রশ্ন তাড়া করে বেড়াত তাঁকে। ফাইনাল ইয়ারে পরীক্ষা দেননি। নিজের কাজ, গবেষণা নিয়ে মগ্ন ছিলেন।

অনেক বছর পরে দেখা হয়ে যায় তাঁর বন্ধু ব্যাচমেট ইউনিভার্সিটি টপার বিল্বদল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বিলু অধ্যাপনা না করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে মিডিয়া কুলপতি। বাংলা ইংরেজি দুটি ভাষায় তাঁর কলাম যথেষ্ট জনপ্রিয়। পুরনো বন্ধু কবীরের কাজের প্রতি উৎসাহী হন তিনি। তাঁর মিডিয়া হাউস থেকে কবীরের লেখাগুলিকে প্রকাশ করতে চান।

আমাদের দেশ বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনও চিন্তকের বৈপ্লবিক ভাবনাকে মান্যতা দিতে চায় না। তার উদাহরণ কলিম খান তথা কবির খান। তবে মিডিয়াকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদ্যায়তনিক তাত্ত্বিক নয় বলেই কবীর খানের ভাবনা-বিশ্বকে তুলে ধরার দায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বন্ধু বিলু। তিনি জানতেন কতটা গুরুত্ব তাঁর খ্যাপাটে বন্ধু কবীরের ভাবনা। তিনি যে নিয়মিত কলামগুলি লিখতেন তাতে একটু একটু করে আলো ফেলতেন সেই নতুন ভাবনার জগতে। কলামগুলির বিষয় ছিল নতুন সভ্যতার ইতিহাস, মানুষের সভ্যতার ইতিহাস, ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। কবীরের সমগ্র লেখাগুলি অতি যত্নে আগলে রেখেছিলেন তিনি। বিশ্বস্ত সেক্রেটারির হাতেও দিতে চাননি। ল্যাপটপে টাইপ করিয়ে পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছিলেন নিজের হেপাজতে। যেটুকু সামান্য প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর বিভিন্ন কলামের মাধ্যমে তাতেই বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন নীলুর মতো লিডাররা।

উপন্যাসের শুরুতে দেখা যাচ্ছে দুঁদে সাংবাদিক, ‘ভোরের কাগজ’-এর সম্পাদক বিলু নিজের অফিসের চেম্বারে রাত বারোটার পর খুন হয়ে গেছেন। মৃত্যুর পূর্বে অস্পষ্টভাবে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—“৪, ৬, ১০, ১২, ১৬, ২…কবির গানকে…খুন… কোরো না…গান…খুন হলে সব শেষ…ইতিহাস… শেষ… অনুস্বর…বিসর্গ…চন্দ্রবিন্দু”। লালবাজার গোয়েন্দা বিভাগের নামকরা অফিসার রজত মিডিয়া ব্যারন এই ভিআইপি খুনের তদন্তে নেমেছেন। সঙ্গী তাঁর বন্ধু ধরণী কয়াল—ডিকে। ডিকে ধীরে ধীরে এই রহস্যময় গুপ্ত কথাগুলোর অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। তাঁর রহস্য-উন্মোচন ও তদন্তের সূত্রে কাহিনি এগিয়েছে। আমরাও আবিষ্কার করতে করতে গেছি কীভাবে কবির খানের নতুন চিন্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে বিলুর হত্যা রহস্য এবং জাতীয় রাজনীতি।

কাহিনির শুরুতেই লেখক খুনির পরিচয় জানিয়ে দিয়েছেন। কবীর এবং বিলুরই ক্লাসমেট বন্ধু নীলকণ্ঠই হত্যা করেছেন বিলুকে। আল্ট্রা ন্যাশনালিস্ট গ্রুপের লিডার নীলু আগের দিনই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিলেন বিলুর সঙ্গে। আরও বলেছিল যে তিনি এখন নাম বদলেছেন। অদ্বৈত তার নতুন নাম। বিলু সিকিউরিটিকে অদ্বৈত নাম বলে রেখেছিলেন। চেহারায়ও বদল এনেছিলেন নীলু। ফলে প্রাথমিকভাবে খুনি অদ্বৈতকে ট্রেস করতে পারেনি পুলিশ। নীলু বন্ধুকে দলের স্বার্থে খুন করলেন। কারণ সেই একই, কবীর খানের ভাবনা। বিলুর পর কবীরই তাঁর টার্গেট। আর তা বুঝতে পেরেছিলেন বিলুর সেক্রেটারি নিবেদিতা। তাই বিলুর হত্যার পরেই তিনি কবীরকে নিয়ে ছুটেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। শেষ পর্যন্ত ডিকেও সঙ্গী হয়েছেন তাঁদের। নীলকণ্ঠ তাঁর দ্বিতীয় টার্গেট কবীরকে বড় সহজেই পেয়ে গেছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কবীরকে হত্যা করতে পারেননি। নিবেদিতাই বাঁচাতে পেরেছেন কবীরকে এবং তাঁর মহামূল্যবান পাণ্ডুলিপিকে। সে এক রোমহর্ষক কাহিনি।

কী এমন ছিল কবীরের চিন্তার জগতে ? রামায়ণ-মহাভারতের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবজাতির ইতিহাস। তিনি বাংলা ভাষার ভাব-বেসড্‌ সেমাটিক্স বা ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থ আবিষ্কার করে বিপ্লব করে দিয়েছেন। কয়েকটি লিট্‌ল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হলেও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছোয়নি। প্রাচীন ভারতবর্ষের প্রায় ছ-হাজার বছরের কোনও ইতিহাস নেই। ৫০০০ বিসি থেকে ১০০০ এডি। এই ৬০০০ বছরের ভারতীয় ইতিহাসের পথটা যেন জলে ডোবা রাস্তা। এ-মাথা থেকে ও-মাথায় যাতায়াতের জন্য মাঝে মাঝে একজোড়া ইঁট পাতা। বিলু তাঁর বন্ধু কবীরের ভাবনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এভাবেই বলেছেন বন্ধু নীলকণ্ঠকে। ইউরোপ আমাদের পুরাণকে ইতিহাস হিসেবে মানেনি। মাইথোলজি বলে দায় এড়িয়েছে। আর কবীর খান প্রমাণ করতে চেয়েছেন বেদ-পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত, উপনিষদ, সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র ইত্যাদি হল সুলিখিত ইতিহাস।

ইউরোপের কাছে সে ইতিহাস অজ্ঞাত হতে পারে, কিন্তু ভারতীয়দের কাছে তা অজ্ঞাত ছিল না। আছে ছান্দস হিসেবে। বৈদিক রচনাবলীকে এক কথায় ছান্দস বলে। আর হরিচরণের বঙ্গীয় শব্দকোষ বলছে ছান্দস মানে আচ্ছাদিত বা গুপ্ত। তিনি ভারতের ইতিহাসকে এভাবে ভেঙেছেন—সনাতন যুগ, বৈদিক যুগ, বৌদ্ধ যুগ, হিন্দু যুগ, মুঘল যুগ, তারপর ব্রিটিশ যুগ।

সনাতন যুগে যা ছিল যৌথ সম্পত্তি। বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ বা জ্ঞানজীবীরা সেই যৌথ সম্পত্তির ওপর পূর্ণ অধিকার করে নেয়। ফলে সনাতন যুগের বিপরীতে গিয়ে বৈদিক যুগে মন্দিরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা এস্টাব্লিশড্‌ হয়। যা কিছু মন্দ সেইসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হত মন্দিরে। বেদজীবী ব্রাহ্মণরা অত্যাচারী হয়ে ওঠে। সনাতন সমাজে জ্ঞানকর্মীর কোনও বিভাজন ছিল না। এই যুগেই নগরকেন্দ্রিক সভ্যতাগুলো গড়ে ওঠে। হরপ্পা-মহেঞ্জদাড়ো। এরপর নগরকেন্দ্রিক সাম্যবাদী সভ্যতা ভেঙে পড়ে। গড়ে ওঠে মন্দির-কেন্দ্রিক বৈদিক সভ্যতা। সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম ডিভিশন অফ লেবার। তিন রকম পরিচালক—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য। পাঁচ পাঁচ পাঁচ অনুপাত। বাকি ৮৫ শতাংশ কর্মী-মানুষ শূদ্র। আর তা হয়ে দাঁড়াল বংশানুক্রমিক। পুরোহিত তন্ত্রের এই অত্যাচার চরমে উঠলে দরকার হল পালটা ধর্মের। বৌদ্ধ ধর্ম তা পূরণ করে। শুরু হয় রামরাজত্বের। বিপ্লববাদী বাল্মীকিরা লিখে রেখে গেছেন সেই ইতিহাস। তাই এখনো সুদিনকে রামরাজত্ব বলি। সেই বৌদ্ধ ধর্মও পরে মৌলবাদীদের খপ্পরে পড়ে গেল। যে বুদ্ধ মূর্তিপূজার বিরোধী ছিলেন সেই বুদ্ধের একার মূর্তিসংখ্যা যা পাওয়া গেল ভারতে তার আগের সমস্ত বিগ্রহের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেল।

ততদিনে বহু মূর্তি মন্দিরে জায়গা করে নিয়েছে। পুরোহিত তন্ত্রের রমরমা। মন্দির বা দেউলগুলো হয়েছে সম্পদ জমানোর সেন্টার। তারাই একাধারে মানুষের প্রতিনিধি, বিধানদাতা, বিচারক ও ব্যাংকার। এই দেউলগুলোই মানুষের সর্বস্ব হরণ করে মানুষকে দেউলিয়া করে দিচ্ছে। পুরোহিত ব্রাহ্মণও হয়ে উঠেছে জনগণের কাছে ঠক্‌ বা ঠক্কর, পরে যারা ঠাকুর।

পুরাণের অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা। শব্দ খুঁড়ে খুঁড়ে কবীরের এই বিপজ্জনক খেলা মেনে নিতে পারেন না নীলকণ্ঠের মতো সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতারা। কবীরের ভাবনা পুরোটা প্রকাশ হলে ভারতবর্ষের দলিত ইতিহাস পাল্টে যাবে। কবীরের ভাবনায়— যাকে হীন বানানো হয়েছে সেই অন্তেবাসী শূদ্রই হিন্দু। তাদের দেশই হিন্দুস্থান। be-hind, hind, hindrance প্রভৃতি hin-যুক্ত শব্দগুলো একই ‘হীন’ গোত্রের শব্দের ইউরোপীয় উত্তরসূরি। হীন ইউরোপে গিয়ে hin হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপ একদল লোককে hind নাম দিয়েছিল, যাদের অবস্থা আমাদের হিন্দুযুগের শূদ্রের সঙ্গে মিলে যায়। তারা মাঠে বা hinterland-এ থাকে অর্থ্যাৎ অন্তেবাসী। মালিকের শস্য পাহারা দেয়। ক্রীতদাস।

পরিচিত গল্পকে কবীর অদ্ভুতভাবে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন নতুন অর্থ আরোপ করে। ডিকে কবীরের লিট্‌ল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত পুরনো কিছু লেখা পড়েছেন এই রহস্য-উন্মোচন করতে গিয়ে। সেই সূত্রে কবীরের লেখা থেকে পাতার পর পাতা উদ্ধৃত করেছেন লেখক। আর সেই উদ্ধৃতি উদ্ধৃত করবার প্রলোভন ত্যাগ করতে পারছি না। প্রকৃত পক্ষে যা কলিম খানের প্রবন্ধেরই অংশ।

“…আদিকালে সমগ্র সমাজের চেতনা এবং ঐ সমাজের যে কোনও একজন সদস্যের চেতনা সমান ছিল, একজন মানুষ যা জানত বুঝত, সমাজের প্রত্যেক সদস্যই তাই জানত বুঝত।

প্রত্যেকের আক্কেল বা বুদ্ধি সমান। কারো কম বা কারো বেশি নয়। কীটপতঙ্গের সমাজে বা কুকুর-বেড়ালের সমাজে যেমনটি হয়। তেমন মানুষকে সেকালে নর বলা হত না, বলা হত ‘মহ’ বা ‘মহান’। বায়ুপুরাণ বা বিষ্ণুপুরাণসহ প্রায় সব পুরাণের ‘আদিসর্গে’ এই ‘মহ’ বা ‘মহান’দের আবির্ভাবের কথা আছে।

সংস্কৃত ও প্রাচীন বাংলায় বিপ্রতীপ শব্দসৃষ্টির একটি নিয়ম দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, হিংসা থেকে সিংহ, রাধা থেকে ধারা, মরা থেকে রাম ইত্যাদি। অনুসন্ধানে জানা যায় হংস, নদী, মন, শব ইত্যাদি বহু শব্দ ঐ একই নিয়মে তৈরি হয়েছে।

সেই নিয়মানুসারেই ভারতের ‘মহ’ =MOHO বিদেশে গিয়ে হয়েছে ‘হোম’ =HOMO। পরে তা Homo sapiens হল। sapiens মানে আক্কেল বা বুদ্ধি। অর্থ্যাৎ যাদের বুদ্ধি একইরকম মানে সেই ‘মহ’ বা ‘মহান’দের কথা। …এই ‘মহ’-ই পরবর্তীকালে নমনীয় হয়ে একদিন ‘মনুঃ’ (=MAN-HU) হল এবং বিদেশে গিয়ে একই নিয়মে হল HU-MAN। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে ‘মহ’ বা ‘মহান’-এর পরই ‘মনু’র আগমন। প্রায় সব পুরাণই এর সাক্ষী।

আর মহান মনুতে পরিণত ‘হয়েছে’ বলে ইংরেজিতে কথাটা Human being (=মনু হওয়া) হয়েছে, না হলে ‘being’ কথাটা কেন ‘human’-এর লেজুড় হয়ে থেকে যাবে!

এই মহান-দের দ্বারা জাত সমাজবৃক্ষ বা দারু-ই ‘মহান-জ-দারু’, যার ধ্বংসাবশেষ মহেঞ্জোদাড়ো নামেই আমাদের কাছেই পরিচিত। গোটা ইতিহাসটাই এইভাবে গুছিয়ে বলা আছে আমাদের ইতিহাসে অর্থ্যাৎ পুরাণে।”

 

ডিকের মতো উপন্যাসের পাঠকও অনুভব করেন— কীভাবে আমরা নিজেদের সম্পদকে ফেলে রেখেছি ধর্মীয় পুস্তকাবলি নাম দিয়ে। ভারতীয় ইতিহাসের প্রকৃত পাঠ হয়নি। ইউরোপিয়ানদের শেখানো ইতিহাস শিখেই আমাদের ইতিহাস চর্চা। ইতিহাস আর পুরাণকে একসঙ্গে আজ পর্যন্ত কোনও ঐতিহাসিকই মেলাননি। কবীর চেয়েছেন পুরাণের গল্পগুলির সঙ্গে ইতিহাসকে মেলাতে। পুরাণ যদি গল্পগাথা বা রূপকথাই হয় তাহলে ইতিহাসের এত স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেন ?

কবীর তাঁর ব্যাখ্যাকে অসামান্য দক্ষতায় প্রামাণ্য করে তুলেছেন। পড়তে গিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ জন্মায় না। যেমন, কবীরের মতে রাবণ পুরোহিত শ্রেষ্ঠ। ‘রব’ থেকে জাত, অর্থ্যাৎ উচ্চরব করে যারা তাদের রাবণ বলা হয়। বড় বড় প্রতিশ্রুতি প্রদানকারী। বর্তমান নেতাদের পূর্বসূরী। পুরোহিততন্ত্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে বলা হত লঙ্কা। জনসমুদ্রের মাঝে শিলীভূত দ্বীপ। এযুগের পার্লামেন্টের মতো। যারা যেত লঙ্কায় তাদের রাবণ বলা হত। এর দশটা দপ্তর। তাই দশানন। রাম এই পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে রাবণকে হত্যা করে বৈষম্যহীন রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রামের ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ রম, যে স্থানে রমণ করা হয়। ফিনান্স ক্যাপিটালকে ঘিরেই এই রমণ। বৌদ্ধযুগের অস্তবেলায় রাম অতি ঘৃণ্য বলে ঘোষিত হয়। তাই অতি ঘৃণার প্রকাশস্বরূপ শিক্ষিতরা রাম-রাম উচ্চারণ করে থাকেন।

আবার, প্রাচীন ভারতে সরকার-স্বীকৃত অর্জনকে বলা হত অর্জুন। এখন বলে হোয়াইট মানি। আর যে অর্জন সরকার-স্বীকৃত নয় তা পরিণয় হয় কৃষ্ণধনে। এখন যাকে বলা হয় ব্ল্যাকমানি। অর্জনের অংশ সরকার নিয়ে নেওয়ার ফলে উপার্জন থেকে কালো রঙ চলে যায়। পরিণত হয় সাদা টাকায়, আইনি টাকায়। সরকার গৃহীত সেই অংশটিকে প্রাচীনকালে বলা হত ‘অগ্রহর’, অর্থ্যাৎ অগ্রভাগ হরণ। কর বা ট্যাক্স। নগদ নারায়ণ মর্তে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ওই ট্যাক্সখোর ট্যাক্সজীবীদের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ হিসেবে। ট্যাক্সখোর মানে যারা সামাজিক পুঁজি বা যৌথ পুঁজির সমর্থক। শ্রীকৃষ্ণ ব্যক্তিপুঁজির। তখন মানুষের অর্জনের অংশ যে দাবি করত তাকে কংস বলা হত।

এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ববিদের মতো কবীর খানও আসলে খনন করতে করতে এগিয়েছেন আবিষ্কারের লক্ষ্যে। পুরনো কথাগুলোই খুঁড়ে বার করেছেন। পড়তে পড়তে বারবার মনে হয় ভয়ংকর সামাজিক সত্য লুকিয়ে আছে কবীরের পাণ্ডুলিপিতে। কবীর খান যে কাজ শুরু করেছেন ভবিষ্যতে নিশ্চয় সেই পথের পথিক হবেন আরও আরও পণ্ডিত তত্ত্বভাবুকেরা। সেদিন সত্যিই হয়তো সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে যাবে আমাদের দেশে। এই আখ্যান আমাদের এরকম একটি বোধে উন্নীত করে। এক অলৌকিক ঐতিহাসিক বিভ্রমের শিকার হই আমরা। অথবা দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত ঐতিহাসিক বিভ্রম থেকে     মুক্তি দেয় এই উপন্যাস।  লেখকের কৃতিত্ব এখানেই।

কবীর খানের ভাবনালোকে একবার ঢুকলে আর বেরোনো যায় না। তাঁর কথা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে শুনি। প্রতি মুহুর্তে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে করতে চলি। এরকম অভিনব এবং চমকপ্রদ কাহিনি যে কোনও পাঠককেই আকৃষ্ট করবে। তারপরও লেখক থ্রিলারের আশ্রয় নিলেন! পাঠককে ভরসা করলেন না!

থ্রিলার হিসেবেও খুব টানটান। অনেকগুলো পরত তার। কিন্তু দিনের শেষে বড্ড ম্লান হয়ে যায় থ্রিলারের রহস্য। কবীর খান-কৃত পুরাণ-ইতিহাস-ভাষাতত্ত্বের অমোঘ ব্যাখ্যার ঘোর থেকে বেরোতে পারি না আমরা। এই কাহিনির নিজস্ব একটা ভার আছে। তার উপর থ্রিলারের আঙ্গিক বড় বেশি ভারী করে তুলেছে। কবীর খানের ভাবনার সূত্রে আমরা পরিচিত শব্দের ভিতর রহস্যময় অর্থ আবিষ্কার করেছি। তার সঙ্গে আবার থ্রিলারের রহস্য! বস্তুত থ্রিলারের আঙ্গিক দাবি করেনি আশ্চর্য এই কাহিনি।

থ্রিলারের আঙ্গিক বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্যও বলেছেন লেখক। কোনও বিশেষ তত্ত্বকে প্রকাশ করবার তাগিদ থেকে সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রাণিত হলে সেক্ষেত্রে শৈল্পিক দিকটির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখানে অবশ্য তেমনটা না হয়নি। উপন্যাসের উদ্দেশ্য বিঘ্নিত করেনি তার সাহিত্যমূল্যকে। লেখকের ‘কথামুখ’ অংশের উক্ত স্বীকারোক্তি না থাকলে পাঠকের কাছে অজানা থেকে যেত কলিম খানের কথা। কিন্তু তাতে উপন্যাসের বিশেষ ক্ষতি বৃদ্ধি হত না।

‘কথামুখ’ অংশে লেখক আরও একটি কথা বলেছেন—“বছর দশেক আগে দা ভিঞ্চি কোড পড়েই ভাবনাটি প্রথম মাথায় আসে, বাংলাতেও এমন উপন্যাস সম্ভব।” অর্থ্যাৎ তিনি খুব সচেতনভাবেই ‘দা ভিঞ্চি কোড’-এর কথা মাথায় রেখে বাংলা ভাষায় একটি এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলেন। সেই এক্সপেরিমেন্টের সফল ফসল ‘বিন্দুবিসর্গ’। এই আখ্যানের চরিত্রের মতো লেখকও শব্দ খনন করতে করতে এগিয়েছেন। গবেষকের অন্বেষা তাঁর মধ্যেও আছে সমান মাত্রায়। তাই অসামান্য মুনশিয়ানায় পাঠকের অনুসন্ধিৎসাকে উসকে দিতে সক্ষম হয়েছেন। বোধে ও ভাবনায় চারিয়ে দিতে পেরেছেন অমোঘ সব প্রশ্ন। উপন্যাস পড়া শেষ হয়। কিন্তু প্রশ্ন শেষ হয় না। প্রচলিত ইতিহাসচর্চার প্রতি প্রশ্ন। প্রচলিত পুরাণচর্চাকে প্রশ্ন। প্রচলিত পাঠভ্যাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় এই আখ্যান। সমসাময়িক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবহও ম্লান হয়ে যায়নি। আর সেদিকেও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন লেখক। শুধু এক রহস্যভেদী থ্রিলার বা আখ্যান-নির্ভর উপন্যাস নয়, ‘বিন্দুবিসর্গ’ তার চেয়েও বেশি কিছু। অনেকদিন পর বাংলায় এরকম গবেষণাধর্মী একটি উপন্যাস পড়ার সুযোগ হল। যা শুধু মাত্র উপন্যাসের ঘেরাটোপে আটকে থাকে না, মহত্তর এক প্রত্ন-অন্বেষার সন্ধান দেয়।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More