শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

ব্লগ: শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?

অংশুমান কর

‘সিগারেটটা শেষ করার সময় দেবে তো?’—আমাকে জিজ্ঞেস করলেন সুনীলদা। সাহিত্য অকাদেমির অফিস ঘরে। তখন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলের সচিবের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি সুনীলদা। প্রয়াত হয়েছেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। তাঁর স্মরণে একটি অনুষ্ঠান হবে সাহিত্য অকাদেমিতে। এসেছেন শীর্ষেন্দুদাও। জমে গেছে আড্ডা। সুনীলদা একের পর এক সিগারেটে টান দিয়ে চলেছেন। এমনিতে সুনীলদা ছিলেন খুব পাংচুয়াল। কিন্তু সেদিন আড্ডার মৌতাতে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, এসে পড়ছে পুরনো সব কথা, পুড়ে যাচ্ছে সিগারেট। এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠানের। আমি তাই ভয়ে ভয়ে সুনীলদাকে বলেছিলাম, ‘শেষ মানে শেষ তো?’ তখন বুঝিনি যে, আমার ছোড়া এই প্রশ্নটিকে ছুঁয়েই সেদিনের অনুষ্ঠানে সুনীলদা সাজাবেন তাঁর কথা। বলেছিলেন, শেষ মানে শেষ। তারপরে আর কিছু নেই। উনি অমরত্বে বিশ্বাস করেন না। সত্যিই অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করার স্পর্ধা ওঁর মতো আর কেউই দেখাতে পেরেছেন কি? বলেছিলেন যে, একজন লেখক তাঁর মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকবেন কি না এটা নিয়ে বিচলিত হওয়ার মতো কিছুই নেই, কেননা, মৃত্যুর পরে তিনি বেঁচে রয়েছেন কি না সেটি দেখার জন্য লেখক নিজেই তো থাকবেন না! তেতো, কিন্তু খাঁটি কথা।

#

এই রকম ভাবে ভাবলে মনে হয় যে, শেষ যা হয়ে যায়, তা সত্যিই তো, একেবারেই শেষ হয়ে যায়। তখন ‘শেষ আসলে এক শুরু’—দার্শনিকদের এই কথা বিশ্বাস করতে মন চায় না। মনে হয়, যে ফুলটি ঝরে পড়ল মাটিতে, সে কি আর ফুটে উঠতে পারে? ঠিক তারই মতো  অন্য একটি ফুল হয়তো ফোটে আবার, কিন্তু সে ফুলটি তো আর সেই ঝরে যাওয়া ফুলটি নয়! হাতের মুঠো গলে পিছলে চলে যায় যে মুহূর্ত, সেই মুহূর্তও কি আর একই ভাবে ফিরে আসে? হারিয়ে যায় যে প্রেম, ফিরে কি আসে সে আর সেই প্রথমবারের মতো মহা সমারোহে?

#

শেষ যা হয়ে যায় তাকে নিয়ে এইরকম কাব্য করতে ভালই লাগে। কিন্তু, যা কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে তার মুখোমুখি হওয়া বেশ কঠিন কাজ। সকলে পারে না। আমি তো পারিই না। বিহ্বল লাগে। কথা হারিয়ে যায়। একটি ঘটনার কথা বলি। এমনিতে হিসেবী হিসেবে আমার বেশ দুর্নাম আছে। বন্ধু-বান্ধব, ছাত্র-ছাত্রী, মায় বাড়ির লোকেরাও ভাবে আমি কিপটে। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, তবে যেহেতু আর্থিক স্বাচ্ছল্যে বড় হইনি, তাই অপচয় আমি সহ্য করতে পারি না, তা সে একটি টাকা হলেও। একটি টাকার জন্যই আমি ঝগড়া শুরু করেছিলাম জেরক্সের দোকানে। এমনিতে বর্ধমানে একপাতা জেরক্স করতে লাগে এক টাকা। সেদিন যে দোকানটিতে জেরক্স করতে ঢুকলাম, সেই দোকানের লোকটি চেয়ে বসল, দু’টাকা। ব্যস, আমার মাথা গরম হয়ে গেল তক্ষুনি। কড়া ভাষায় শুনিয়ে দিলাম দু’কথা। কী আশ্চর্য! লোকটি একটুও রাগল না। খুব শান্ত স্বরে বরং আমায় বলল, ‘শুনুন, দু’টাকাই লাগবে।  কাল থেকে এই দোকানে আর জেরক্স হবে না। আমি বিক্রি করে দিয়েছি দোকানটা’। পরাজয় এক ধরনের শান্তি দেয়। সেদিন লোকটির মুখে লেপ্টে ছিল সেই পরাজয়ের প্রশান্তি, যে প্রশান্তি এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল আমাকে। আমি কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম; দেখছিলাম যে, সত্যিই একটি জেরক্স মেশিন ছাড়া দোকানটিতে আর কিছুই নেই। সেটিও, দেখে মনে হচ্ছিল, বেশ পুরনো। রাত তখন প্রায় ন’টা। আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল, আমি, এই দোকানের শেষ খরিদ্দার, একটি শবদেহের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি।

#

বললাম বটে মনে হয়েছিল শবদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু সত্যিকারের শবদেহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খুব খুব কঠিন, যদি সেই দেহটি হয় প্রিয়জনের।  মনে পড়ে, মধ্যরাত্রে একটা অ্যাম্বাসাডারে কোলের ওপর রাখা দেহটির গায়ে আমি কতবার যে হাত বোলাচ্ছিলাম সেদিন। তখন এখনকার মতো নিজেদের গাড়ি ছিল না আমাদের। ছিল না ইচ্ছে হলেই গাড়ি ভাড়া করে এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়ার সামর্থ্য। শুধু পুজোর সময় পুরুলিয়া থেকে গ্রামের বাড়ি বেলিয়াতোড়ে আসতাম আমরা একটা অ্যাম্বাসাডার ভাড়া করে। অ্যাম্বাসাডারই ভাড়া করতাম প্রতিবার কারণ, ওই গাড়িটিরই ভাড়া ছিল কম। সেই অ্যাম্বাসাডারে মুখে এক অপরিমেয় তৃপ্তি নিয়ে সম্রাটের মতো বসে থাকত আমার বাবা। কত কত বার যে পুরুলিয়া থেকে এইভাবে পুজোর সময় বাড়ি ফিরেছি আমরা! সেদিনও মধ্যরাত্রে পুরুলিয়া থেকে শেষবারের মতো বেলিয়াতোড় ফিরছিল বাবা। আমার আর ভাইয়ের কোলে শুয়ে। নিথর শরীরে। মুখ থেকে বারবার গড়িয়ে পড়ছিল ফেনার মতো কফ। আমি হাত দিয়ে  মুছে দিচ্ছিলাম তা। হাত বোলাচ্ছিলাম ঠান্ডা হয়ে যাওয়া একটা শরীরে যা তখন শক্ত হতে শুরু করেছে।

#

বাবার মুখাগ্নি আমি করেছিলাম ঠিক, কিন্তু চমৎকার করে সাজিয়ে রাখা কাঠের চিতায় বাবাকে তোলার আগেই আমি ফিরে এসেছিলাম বাড়ি। আমার মনে হয়েছিল, প্রিয়জনকে দাহ করার দৃশ্যের চেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্য পৃথিবী রচনা করতে পারেনি আজও। মনে হয়েছিল, আগুন ধীরে ধীরে গ্রাস করবে সেই শরীরটিকে, যে শরীরটি আমার অত নিবিড় ভাবে চেনা—সে দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারব না। মনে হয়েছিল, পুড়ে যা যাবে তা আসলে বাবার ত্বক নয়, আমারই চামড়া। শেষবারের মতো পুরুলিয়া থেকে বেলিয়াতোড়ে বাবাকে নিয়ে আসতে আসতে যেন চৈতন্য হয়েছিল আমার। বাবার বরফের মতো ঠান্ডা শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে হঠাৎই আমার মনে হয়েছিল, বাবার ত্বক ঠিক আমার ত্বকের মতো। মনে হতেই, কেন কে জানে, ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম খুব। শিরশির করে উঠেছিল শরীর।

#

আজও মাঝে মাঝে ওই শিরশিরে অনুভূতি আমায় বিহ্বল করে তোলে। কঠিন পরীক্ষা দিয়ে বড্ড ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আমার মেয়ে। আমি চুপ করে ওর পাশে এসে দাঁড়াই। মাথায়, গায়ে হাত বোলাই।  হাত বোলাতে বোলাতে যেন বিদ্যুতস্পৃষ্ট হই। মনে হয়, তিন্নির ত্বকও ঠিক আমার মতো। না, আমার মতো নয়, আমার বাবার ত্বকের মতো। আমার মনে পড়ে অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করা সুনীলদার একটি অতি প্রিয় গানের কথা। আমি শুনতে পাই ভরা জোয়ারের মতো কন্ঠে সুনীলদা গাইছেন, ‘ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে,/অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে’…। আমি শুনতে পাই আমার কানের কাছে জর্জ বিশ্বাস গাইছেন, ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে’…

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।    

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Shares

Comments are closed.