হায়, কটাক্ষ করেছিল গণতন্ত্রের মন্দির!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রোহন ইসলাম

    সমকামিতাকে আইনি বৈধতা দিতে আজ থেকে আড়াই বছর আগে লোকসভায় একটি প্রাইভেট মেম্বার্স বিলের প্রস্তাবনা এনেছিলেন কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুর। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ সে দিন বিলটি প্রস্তাবের অনুমোদন দূর অস্ত্‌, আলোচনারও যোগ্য মনে করেননি। উপস্থিত সাংসদদের ভোটাভুটির ফলে (৭১-২৪) কয়েক মিনিটেই অপমৃত্যু ঘটেছিল ওই বিলের। লোকসভার পর্দায় সেই ফল ফুটে উঠতেই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের অশ্লীল হাসিতে মেতে ওঠেন আমাদের সাংসদেরা।

    এলজিবিটি সমাজের অধিকারের প্রশ্নটিকে সে দিন এ ভাবেই স্রেফ হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল এ দেশের গণতন্ত্রের মন্দির।

    ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ অনুচ্ছেদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় এক বড় পরিবর্তনের ভরসা জোগাল। দেড়শো বছরের পুরনো (যে আইনের উৎস ব্রিটেনের কুখ্যাত থমাস ক্রমওয়েল-এর মস্তিষ্কপ্রসূত ‘বাগেরি অ্যাক্ট অফ ১৫৩৩’) এই ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ হয়তো এ দেশের ‘আইনি পরিসর’ অচিরেই কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু, কোনও আইনই কি সাংসদদের এই হাসির রোল ঠেকাতে পারবে? তাঁদের আত্মমর্যাদায় সপাটে চড় মারতে পারবে? কেবল সাংসদই নন, তাঁরা যাঁদের প্রতিনিধি— দেশের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মানসিকতা কি পাল্টে যাবে? যে মানসিকতা প্রতিনিয়ত অপমান, বিদ্রুপ আর ঘৃণাই দিয়ে এসেছে এ দেশের এলজিবিটি+ সমাজকে। যে মানসিকতার ভয়ে এতদিন অবধি মানুষগুলো নিজেদের খোলসে ভরে রেখেছে। এক দিনেই কি লজ্জার সেই ছবিটা বদলে যাবে?

    সর্বোচ্চ আদালত স্বাভাবিক ভাবেই সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু সরকার আর তার নেতারা? এ দেশের সংখ্যাগুরু একাধিপত্যের রাজনীতি তো একটা বিকৃত মানসিকতাকে পরিবর্তনের বদলে প্রশ্রয়ই দিয়ে চলেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, দীর্ঘকাল ধরে এ দেশ এমন একটি মানসিকতাকে লালনপালন করে আসছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠের ‘সনাতন সামাজিক নৈতিকতা’কে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে ব্যস্ত। সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার তার কাছে তুচ্ছ। সাম্প্রতিক তিন তালাক থেকে ৩৭৭ অনুচ্ছেদ— সরকারের ভূমিকা উদ্বেগেজনকই। আইন সভাতেই যার মীমাংসা হয়ে যায় (হওয়া উচিতও), তার নিষ্পত্তিতে ‘সক্রিয়’ হতে হয় আদালতকেই। সরকারের এই দায় ঠেলার ছবিটার মূলে আঘাত চাই।

    এলজিবিটি সমাজের অধিকারই হোক বা পরকীয়া সম্পর্ক, কিংবা বৈবাহিক ধর্ষণ— প্রতিটি প্রশ্নকেই সুকৌশলে পবিত্রতা-শুদ্ধতা-ভাবাবেগের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের পরিচালকেরা। বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানকে ‘বাঁচিয়ে’ সনাতন ‘ভারতীয়’ সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ‘রক্ষা’ করার ‘দায়ে’ তারা সেই সংখ্যাগুরুর গণতন্ত্রকেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যা সমাজের বহুত্ববাদী স্বরকে কোনও দিনই মান্যতা দেবে না। এমন থাকবন্দি গণতন্ত্র কেবল একতরফা স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণকেই সুনিশ্চিত করে।

    সেই নিয়ন্ত্রিত সমাজ, যা কিছুই আমাদের মতো নয়, যা কিছুই ‘অপর’— তা নিয়ে আমাদের মনে বড় ধোঁয়াশা ছড়ায়। অস্বস্তি বাড়ায়। এই তৈরি করা বিপন্নতা আমাদের ‘ভিন্ন’ কোনও কিছুকেই মেনে নিতে দেয় না। তা সে ভিন্‌ বর্ণই হোক বা ধর্ম। ভিন্‌ দেশিই হোক বা জাতি। আর প্রতিষ্ঠিত যৌনতার অচেনা প্রবণতা থাকলে তো কথাই নেই। কখনও প্রকৃতি, কখনও বা ধর্ম, ‘বিরুদ্ধতা’র অজুহাতে এই সমাজে আমরা এই ‘অপর’দের সমস্ত ‘ভিন্নতা’কে ছেঁটে আমাদের মতো হয়ে উঠতে বাধ্য করি। আর রাষ্ট্র লালিত আমাদের এই মানসিকতাই ‘ওদের’ ‘অপরিচিত’ ‘ভিন্ন’ অস্তিত্বকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চায়।

    হাজার হাজার বছর ধরে এই সংখ্যাগুরু-মানসিকতা মনে করে আসছে— তাঁদের মতো নয়, এমন সব কিছুই ‘অস্বাভাবিক’। শুধু মনে করাই নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এলজিবিটি+ সমাজের প্রতি এই মানসিকতার প্রতিক্রিয়া বরাবরই নির্মম এবং ন্যক্কারজনক। এই মানসিকতা মনে করে ‘আমাদের’ বেঁচে থাকাটাই ‘মূল’। আর বাকিদের, ‘ভিন্ন’। হাজার হাজার বছর ধরে নিজেদের ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতিষ্ঠিত করার একাধিপত্যের অভ্যেস ভুলে যায়, এই ‘অপর’-এর কাছে আমরাও ‘ভিন্ন’। তাই সংখ্যাগুরুর এ ভাবে ‘দেখা’টা কোনও ভাবেই ‘সাধারণ’ নয়। নয় ‘স্বাভাবিক’ও।

    ছবিটা পাল্টে দেওয়ার ভার ছিল যার হাতে, এ দেশের ভোটবাক্সমুখী গণতন্ত্রের সেই রক্ষণশীল রাজনীতি, বরাবরই তার দায় এড়িয়ে চলেছে। বল ঠেলে দিয়েছে আদালতে। এই দায় এড়ানোর খেলায় বিজেপি-কংগ্রেস, দেশের প্রধান দু’দলই একে অপরের দোসর। অথচ ক্ষমতায় থাকার সময় বিষয়টি নিয়ে লোকসভা-রাজ্যসভায় আলোচনার কোনও স্থানই কেউ দেয়নি। আমল দেয়নি ২০০০ সালে ‘ল’ কমিশনের ১৭২তম রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৭৭ অনুচ্ছেদ বাতিলের সুপারিশ। এনজিও ‘নাজ ফাউন্ডেশনে’র মামলার (২০০২) প্রেক্ষিতে দিল্লি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় (২০০৯) সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর্বে (২০১২) ইউপিএ সরকার দেশের এলজিবিটি+ সমাজের পাশে দাঁড়ায়নি। আবার উচ্চ আদালতের পরামর্শ মেনে আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেয়নি। ক্ষমতা হারানোর পরে অবস্থান পাল্টেছে কংগ্রেস!

    উল্টো দিকে, ক্ষমতাসীন বিজেপি অনেক বেশি সতর্ক। এই ঐতিহাসিক রায়ের পরে তারা মুখে কুলুপ এঁটেছে। পর্তুগালের জঙ্গলে আগুন লাগলেও যিনি ট্যুইট করেন, বৃহস্পতিবার দিনভর তিনিও চুপ। অবশ্য ৩৭৭ অনুচ্ছেদ নিয়ে তাদের সরকার কোনও অবস্থান (দায়?) নেবে না বলে আগেই আদালতক জানিইয়ে দিয়েছিল। যৌনাভ্যাসকে ব্যক্তিগত পছন্দের সূত্রে পর্যালোচনা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদও। অথচ মামলার শুনানিতে সরকারের অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল আমাদের অবাক করে সেই বিদ্রুপের ভঙ্গিতে এলজিবিটি+ সমাজের বিরুদ্ধে ‘বিপথগামিতা’র যুক্তি সাজালেন। আবার রায়ের আগে-পরে, দলের জনপ্রিয় সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ঘোষণা করেছেন, এই ধরনের যৌনাভ্যাস মোটেও ‘স্বাভাবিক’ নয়। এবং একেবারেই হিন্দুত্ব-বিরোধী। এই ‘অসুখ’ সারানোর পথ খোঁজা উচিত বলেও তাঁর দাবি। অর্থাৎ, আদালতে কোনও ‘পক্ষ’ না নিয়ে সমাজের ‘প্রগতিশীল’ অংশকে চটাতে চায়নি বিজেপি। আবার স্বামীদের মতো নেতাদের সামনে এগিয়ে দিয়ে তারা রক্ষণশীল অংশকেও সামলে রাখায় সক্রিয়। তিন তালাকের মতো এখনও এই ঐতিহাসিক রায়ের কৃতিত্বে ভাগ বসায়নি বিজেপি। তবে কি উচ্চ আদালতের ঘাড়ে ‘দোষ’ চাপিয়ে রক্ষণশীল ভোটবাক্স অটুট রাখার দিকেই তাদের মন?

    যদিও এই রায়ে বিজেপি-র উদ্বেগ বাড়বে। কারণ, ৩৭৭ অনুচ্ছেদ আংশিক বাতিল বিবাহ-সম্পত্তি-গার্হস্থ্য নির্যাতনের মতো নানা সামাজিক ক্ষেত্রে এলজিবিটি+ সমাজের যাবতীয় নাগরিক অধিকারের পথ খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভরসা দিচ্ছে। এই আশঙ্কাতেই উচ্চ আদালতের কাছে বিজেপি সরকার আগেই আবেদনে জানিয়ে রেখেছিল, এই রায় কেবল যেন ৩৭৭ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক বৈধতার প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকে। আদালত যে পথ খুলে দিতে চায়, সেই পথ রুদ্ধ রেখে সংখ্যালঘু এলজিবিটি+ সমাজকে কেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করেই রাখতে চায় সরকার?

    অথচ প্রধান বিচারপতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বরাবরই মনে করিয়ে দিয়েছেন, সংখ্যাগুরুর এবং জনপ্রিয় সামাজিক নৈতিকতার দায় সংবিধানের নেই। এই ঐতিহাসিক রায়ের ভিত্তি সাংবিধানিক নৈতিকতার ভিত্তিতেই। সেই ভিত্তি বরাবরই বহুত্ববাদী এই সমাজের অধিকার রক্ষা করে এসেছে। কোনও সরকারই তাকে টলাতে পারবে না।

    ৩৭৭ অনুচ্ছেদ কিন্তু এই লড়াইয়ে সব থেকে বড় বাধা ছিল না। সেটি একটি জগদ্দল পাথর মাত্র। উৎপাটিত তার হওয়ারই ছিল। এলজিবিটি+ প্রশ্নকে ঘিরে এ দেশের আইনি পরিসরে এত বড় একটি ‘প্যারাডাইম শিফট্‌’ অনেকেরই আতঙ্ক বাড়াবে। এত দিন ছিল কেবল সম্মতির সূত্রে মানুষের মধ্যে যৌনতার অধিকারের প্রশ্ন। লড়ছিল এইড্‌স নিয়ে কাজ করা এনজিও। এখন প্রশ্নটা কেবল যৌনতা বা সঙ্গী বেছে নেওয়ার নয়। নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া খোলস থেকে বেরিয়ে এসে আদালতকে সরাসরি সেই প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করালেন এলজিবি্টি সমাজই। সরকার কত দিন তার দায় এড়িয়ে বাঁচবে?

    সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় যদি আদালতকেই বারবার সক্রিয় হতে হয়, তা হলে আইন সভার কী প্রয়োজন? অন্যের ঘাড়ে দায় ঠেলার এই খেলা বিপজ্জনক। আইনের একটি সংশোধনী, একটা একমাত্রিক মানসিকতাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে না। বদলানোর সুযোগ দেবে মাত্র। পাল্টানোর এই সুযোগ কী আমাদের রাজনীতিও নেবে?

    লেখক ফলতা সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক

    মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

    দ্য ওয়ালের ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More