শনিবার, ডিসেম্বর ৭
TheWall
TheWall

একদিন প্রতিদিন

সুমিতা বীথি

আর পাঁচটা দিনের মতোই  ছিল। যে কোনও বছরের সেপ্টেম্বরের যে কোনও ৬ তারিখ। যে কোনও বৃহস্পতিবার।

সকালে এলোমেলো হাওয়া ছিল কেবল, বাতাসে জলকণা, মাঝে মাঝেই ইলশেগুঁড়ির ছিটে গায়ে এসে লাগছিল; আমি হুড়মুড় করে ছুটছিলাম দক্ষিণ কলকাতার এক ক্যাফের দিকে, সব কাজ ফেলে, দিনের সব থেকে বড়ো কাজটা করতে।

দিনটা আর অন্য একটা দিনের মতো রইল না। ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিশেষ হয়ে গেল সুপ্রিম কোর্টের দৌলতে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌন ইচ্ছার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না আর।

ওপরের লাইনটা লিখতে লিখতেই ভাবছি – এই ভারতে, এই গণতান্ত্রিক ভারতে, স্বাধীনতার ৭১ বছর পরেও, ১৮৬০ সালে বানানো একটা আইন আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল বৃহস্পতিবার অবধি, এমন একটা আইন যা ব্রিটেনেও বাতিল হয়ে গেছে কোন কালে – এর পিছনের যুক্তিটা কী? যা চলে গেল বলে আজ আমাদের এতো ফুর্তি হচ্ছে, তা আদপে ছিল কেন? যে সময় আইনটা বানানো হয়েছিল, মেকলে সাহেবের হাতে, সেকালে ইংরেজরা উপনিবেশগুলোর ঘাড়ে যা যা চাপিয়েছিল তার মধ্যে ভিক্টোরিয়ান মরালিটিও ছিল, এ আমরা জানি। কিন্তু সেই মরালিটির ঢেঁকুর কেন গতকাল অবধিও তুলে যাচ্ছিলাম সেইটা বোধহয় ভাবার বিষয়।

৩৭৭ ধারা বলে, মানে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে অবধি বলত, যে কেউ, প্রাপ্তবয়স্ক হলেও, স্বেচ্ছায় হলেও কোনও নারী, পুরুষ, শিশু বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ শারীরিক সঙ্গম করলে তাকে আইনের চোখে অপরাধী হিসাবে দেখা হবে।

২০০৯ সালের দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে এই ধারা থেকে প্রাপ্তবয়স্কের স্বেচ্ছায় করা যৌন আচরণকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টও সেই একই কথা বললেন। মাঝে একবার ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টই দিল্লি হাইকোর্টের রায় নাকচ করেছিলেন, মানে তখন আবার কিছু মানুষ কিছু সময়ের জন্য অপরাধী হয়ে গিয়েছিলেন।

ঠিক যেন একটা সার্কাস চলছে। ট্রাপিজের খেলার মতো দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছি আমরা। ঝুলে ঝুলে একদিক থেকে অন্যদিকে চলাচল করছি নিখুঁত ব্যালান্সের ওপর ভরসা করে। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই পতন সুনিশ্চিত। রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছে মতো অপরাধী বলে দেগে দেবে।

অথচ কেন অপরাধী, কোন আপরাধে? কাকে ঠকানোর কারণে?  কার ক্ষতি করেছি বলে, কী অন্যায় আমার বা আপনার, সেসব জানতে পারিনি। কিছু যৌন আচরণ রাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত, ‘প্রাকৃতিক’ বলে তারা সমাজস্বীকৃত, সেগুলোর বাইরে গেলে আমি অপরাধী। সে আমি সমকামী বা বিসমকামী যাই হই না কেন, সে আমি বিবাহিত বা অবিবাহিত যাই হই না কেন। হ্যাঁ, ৩৭৭ ধারা কিছু যৌন আচরণের কথাই বলে কেবল, সেটা যারা করে তারাই অপরাধী, অপরাধীকে সমকামী হতে হবে এমন কোনও কথা নেই।

এই আইনটা গতকাল অবধি ছিল, মানে এখনও আছে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক হলে, নিজের শোয়ার ঘরের নিভৃতিতে ঘটালে, স্বেচ্ছায় লিপ্ত হলে, ছাড় মিলছে। যে কাজ অনিচ্ছা বশত করতে হয় বা জোর করে কাউকে দিয়ে করতে বাধ্য করানো হয়, সেটা যে ভালো কথা নয় এ বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না। প্রাপ্তবয়স্ক নয় এমন মানুষদের ক্ষেত্রে বিশেষত যৌনতার ক্ষেত্রে নানান ধোঁয়াশা আছে এও আমরা জানি, জানি যে তাদের জন্য সম্মতি আর সজ্ঞান-সম্মতি এই দুটো বিষয় মিলিয়ে দেখতে হবে। শোয়ার ঘর বা এমন কোনও নিভৃত জায়গার প্রয়োজনীয়তা তো চিরদিনই আছে, পথেঘাটে, অন্যের চোখের সামনে যেকোনো দৃশ্যদূষণ ঘটিয়ে বেড়ালে সেটা অপরাধ বলেই গণ্য হবার কথা (রাস্তায় দাঁড়িয়ে সর্বসমক্ষে জলবিয়োগ এর বাইরে পড়ে বোধহয়)। নতুন কথা তাহলে কী? কোনটা? সাধারণ যুক্তিবুদ্ধি, সাধারণ জ্ঞান, এসব দিয়ে তো আগে থেকেই জানি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিভৃতে, স্বেচ্ছায়, অন্য মানুষের ক্ষতি না করে যৌনতা করলে সেটা অপরাধ নয়। সুপ্রিম কোর্ট তবে ৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৮র মেঘলা সকালে কী নতুন কথা বললেন, কী প্রাপ্তি হল আমার, আমাদের, যা নিয়ে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত বোধ করছি?

এমনকি কিছু যৌন আচরণ এখনও ‘প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ’ থেকে গেছে। সেসব প্রাপ্তবয়স্ক আমি স্বেচ্ছায় শোয়ার ঘরে এখন করতে পারি বটে, তবু তাদের ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ বলেই দেগে দেওয়া হবে। আর সুপ্রিম কোর্ট যা খুশি বলুক, আরএসএস কিন্তু বলে দেবে আমি বিকৃত, অস্বাভাবিক। এ যেন কিছু মানুষকে বিকৃত-অপরাধীর তালিকা থেকে বার করে এনে শুধু বিকৃতের তালিকায় ঢোকানো হল। কারণ আইন চলে তার নিজের পথে, নিজের নিয়মে। কোনও আইন বদলে গেলে কিছু মানুষকে সেই মুহূর্তে কিছু সুবিধা দেওয়া যায়, কিন্তু সমাজ তার দৃষ্টিভঙ্গি এতো সহজে বদলায় না, সমাজের চোখে যুক্তির থেকেও বড়ো হয়ে ওঠে নীতি। লিগ্যালিটির সঙ্গে যুক্তি দিয়ে কথা বলা যায় হয়ত, কিন্তু সামাজিক মরালিটির চোখ-কান মোড়কে ঢাকা থাকে, যাকে আবার রাষ্ট্র ব্যবহার করে তার নিজের প্রয়োজনে, রাজনীতির পাশার দান হয়ে যায় সেই মরালিটি, তাকে ঘিরে ক্ষমতার উৎসব চলে।

আবারও ভাবছি, তবে কী হল? প্রায় কুড়ি বছরের যুদ্ধের শেষে যারা জমা হয়েছিলাম ওই ক্যাফেতে, একসঙ্গে বসে  এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে প্রত্যক্ষ করব বলে, কী নিয়ে পরের পা ফেলব তবে?

পা ফেলব এই জেনে যে আইনের সমর্থন এবার আমাকে সাহায্য করবে সমাজের সঙ্গে আলোচনা জারি রাখতে। এটাও জেনে যে রাষ্ট্র আমাকে হয়ত এই মুহূর্তে কিছু আইনি স্বস্তি দিল, কিন্তু তার মানে আমার আনুগত্য কিনে নিল তা নয়। পা ফেলব এইসব মনে রেখে যে আমার নানা সঙ্গী এখনও গৃহবন্দি, এখনও কাশ্মীরে, বস্তারে, উত্তর-পূর্বে আগুন জ্বলছে। গোটা দেশ মৌলবাদী-ফ্যাসিবাদি সন্ত্রাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে … আমি মনে রাখব …

লেখক ক্যুইয়ার ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট এবং স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি-র সদস্য

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত         

Comments are closed.