সোমবার, ডিসেম্বর ১৬
TheWall
TheWall

৩৭৭ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়, সত্যিই কি সবটা জেতা হয়ে গেল?

দেবাদৃতা বসু

If a man also lie with mankind, as he lieth with a woman, both of them have committed an abomination: they shall surely be put to death; their blood shall be upon them.

Leviticus 20:13

সমকামী সম্পর্ক বৈধ হল আজ। ২০১৮, ৬ সেপ্টেম্বর। ভারতবর্ষ মুক্ত হল ১৫৭ বছর পুরনো ব্রিটিশ কলোনিয়াল মরালিটির হাত থেকে।

না, আর কখনো সমকামী মানুষকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে না। এবার থেকে ভারতে সমকামীরা যেমন খুশি বাঁচতে পারবে। আর ‘হোমো’, ‘মগা’, ‘লেবু’ বলে আওয়াজ দেবে না কেউ। মেয়েলি পুলরুষকে বৌদি বলবে না, পুরুষালি মেয়ের চুলের ছাঁট সকলেরই ‘কুল’ মনে হবে। স্কুলে, কলেজে, অফিসে কাউকে অপদস্থ হতে হবে না। ক্লাস ফাইভের বাচ্চা মেয়ে ক্লাস এইটের দিদিকে চুমু খেয়েছে বলে কোনও শিক্ষিকা তাকে গোটা ক্লাসের মধ্যে জামা খুলে দাঁড় করিয়ে রাখবে না, বা আগামী পাঁচ মাস তার জায়গা মাটিতে হবে না। বন্ধ হয়ে যাবে সমস্ত ‘কারেক্টিভ রেপ’। একজন উভকামী মানুষকে আর কেউ বলবে না, “তুমি তো গাছেরও খাও, তলারও কুড়াও” । হিজড়া মানুষকে দেখে নাক সিটকাবে না কেউ। এমনকি পাড়ার বা ক্লাবের আড্ডায় কাল থেকে আর কেউ কাউকে ‘হিজড়া’ বলে গালাগালি করবে না। রুপান্তরকামী মানুষকে দেখে আর কেউ হাসবে না আর। এবার থেকে সব ভয় দেখানো, সব অপমান ভ্যানিশ। অর্থাৎ, এই তো শুরু প্রকৃত স্বাধীনতার দিনগুলো।

তাই তো। এখনই তো উদযাপন করার সময়। কারন রাষ্ট্র আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে সেই স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী আমরা আর ক্রিমিনাল নই, এবং তাই, কাল ভোর থেকে আমাদের চারপাশের সমাজ এতদিনের কুৎসা, হিংসা ভুলে গিয়ে বরণ ডালা নিয়ে প্রায় তাড়া করবে আমাদের। এতটাও ইউটোপিয়ান হয়ত নয় এই সময়টা। সুপ্রিম কোর্টের রায় নিঃসন্দেহে ভারতের এলজিবিটি মানুষদের সম্পর্কের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এই স্বীকৃতি এক বৃহত্তর লড়াই। এই মাঠে একটা ছোট্ট পা ফেলা মাত্র। আজকের এই উদযাপন শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর, নির্দিষ্ট মনোভাবের মানুষের জন্য এই স্বীকৃতি। এই পর্যন্ত পৌছতে যেমন কেটে গেছে অনেক বছর, অনেক লড়াই এবং ত্যাগ, তেমনই আজকের সুপ্রিম কোর্টের রায় নতুন লড়াই এর পথ তৈরি করে দিল ভবিষ্যতের জন্য।

কলকাতার ইতিহাসে এই লড়াই জুড়ে থাকবে অনেক পাতা। যেভাবে একটা একটা সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যেভাবে পৌছনো গেছে সাধারণ মানুষের কাছে, নজির হয়ে থেকে যাবে আগামী প্রজন্মের কাছে। আজ যেমন বিভিন্ন রাজ্যে প্রাইড ওয়াক হয়, তার শুরু কলকাতায়। ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক শুরু হয় ১৯৯৯ এ, যা এখন চেহারা বদলাতে বদলাতে এক বিশাল রংচঙে জৌলুসে পরিণত হয়েছে। ১৮ বছর আগে প্রথম জন্ম নেয় স্যাফো, মেয়েদের জন্য প্রথম সাপোর্ট গ্রুপ। সেই স্যাফো যারা শুরু করেছিলেন, তখন তাদের ব্যবহার করতে হত ছদ্মনাম, আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তারা কাজগুলো করেছেন বলেই আজ প্রকাশ্য বিভিন্ন মিডিয়া তাদের কাছে জানতে চাইছে দীর্ঘ ১৮ বছরের গল্প। এভাবে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলা দিয়ে আজ ২০১৮র ৬ সেপ্টেম্বরে পৌঁছনো গেল। তবুও আমরা বহু বিশেষ সুবিধা পাই। কারন আমরা শহুরে, আমরা শিক্ষিত। যেমন রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে না সমস্ত থ্রেট, তেমনই তার বিরোধিতা করার জমিটাও কিছু শক্ত হল নিশ্চয়ই।

অথচ একবার ভাবুন একটি মেয়ের কথা। কোনও এক গ্রামে যার বাড়ি। পাশের বান্ধবীটিকে ভালবাসলেও সে কখনো সেই পরিসরটাই পাবে না তার ভালবাসার কথা প্রকাশ্যে আনার। একটি বিবাহিত মেয়ে, যে গোটা জীবনে কাউকে জানাতেই পারবে না যে সে একটি মেয়েকেই ভালবাসত আসলে। অথবা একটি ছেলে, যে সারা জীবনে কোনও সঙ্গীই খুঁজে পেলো না। শুধুমাত্র আইনি কাগজে যাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে থাকে না তাদের জন্যই দরকার আরও একটু বৃত্তটা বড় করার। সেই বড় হওয়ার জন্য আরও একটা দরজা খুলল আজ।

অবশ্যই উৎসব দরকার। দরকার প্রচুর হই হই করে রাস্তায় নেমে পরার। মানুষের কাছে নিজেদের অস্তিত্বকে যেমন পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন তেমনই প্রয়োজন সেই সব মানুষের কাছে পৌঁছনর যারা ‘কাম আউট’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়নি এখনো। এবং সব থেকে বেশি প্রয়োজন আশা রাখা।

যেভাবে আজকের দিনটাকে ছুঁয়ে দেখলাম আমরা, সেভাবেই স্বপ্ন দেখি একটা পৃথিবীর, যেখানে “কুইয়ার” শব্দের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না একদিন। প্রত্যেক মানুষ হয়ে উঠবে নর্মাল। নিজের মত করে নর্মাল। মুসলমান, দলিত, হিন্দু, সমকামি, উভকামি এই শব্দগুলোর বাইরে সবাই মানুষ হবে একদিন।

 

লেখক চিত্র পরিচালক, কবি, স্কুল শিক্ষিকা এবং বাইসেক্সুয়াল।  দেবাদৃতার ছবি এবং লেখা সমান্তরাল যৌনতা এবং লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী।

Comments are closed.