সোমবার, অক্টোবর ২১

স্থানান্তর

সোমনাথ ঘোষাল

আজানের শব্দটা যেন ভোরের কুয়াশায় মিশে গিয়ে, মইরুলের কানে খুব আলতো করে ফুঁ দিচ্ছে। মইরুল ঘুম থেকে ওঠে। মায়ের মুখটা আলোর সুর মেখে আছে। খুব ভাল লাগে। মনে মনে প্রণাম করে নেয়। মইরুলের কাছে, সেই আল্লা আর সেই দুর্গা। এখানে সব ঘরগুলো গায়ে গায়ে। যেন একটাই বাড়ি। পাশের ঘরে কে কী করছে, সবই বোঝা যায়। মইরুলের বাবার অনেক জমি জায়গা ছিল। বাংলাদেশে। সেসব গল্পে মইরুল বিশেষ কান দেয়নি। দেখতে দেখতে বাইশ বছর কেটে গেছে। তেমন কোন কাজ নেই। এদিক ওদিক থেকে যেটুকু টাকা আসে আর বাবার রেখে যাওয়া কিছু টাকা। মইরুল চায়ের জল বসায়। কিছুদিন আগে অব্দি উনুনের ধোঁয়ায় দমবন্ধ লাগত, এখন প্রায় সব বাড়িতেই স্টোভ আর গ্যাস। মইরুল চা নিয়ে মায়ের কাছে আসে। মা এখন আর বিশেষ কথা বলতে পারে না। খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। বাকিটা ইশারায়। ডাক্তার বলেছে, এইভাবে যতদিন চলে। কোমর থেকে, পা অব্দি সবটাই অসাড়। কোনোদিনই ঠিক হবে না। পাশের বাড়ির এক মাসি এসে দেখাশোনা করে। মইরুলের পক্ষে সবটা করা সম্ভব নয়।

মইরুল চা আর বিস্কুট নিয়ে আসে। মাকে আস্তে আস্তে হেলান নিয়ে বসায়। দুজনে চা নিয়ে টুকটাক কথা বলে। মইরুলের মায়ের নাম প্রতিমা। হিন্দু ঘরের মেয়ে। মইরুলের বাবা ইকবালের সঙ্গে ভালোবাসা করে, বিয়ে করে। যদিও শেষের দিকে প্রতিমার বাড়ির লোক মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ততদিনে ইকবাল অসুখে মারা গেছে। তাই আর প্রতিমা ফিরে যায়নি। তাই মইরুল আর প্রতিমা। একটা ঘর। মইরুল যে মোবাইলের দোকানে কাজ করত, সেটা রাস্তা চওড়া করার জন্যে ভাঙা হয়েছে। এখন কোন কাজ নেই। আর মইরুল সব জায়গায় কাজও পায় না। মেয়েলি স্বভাব আর মেয়েদের মতন কথা বলে। পোশাক বলতে, ঢলা পাজামা আর গেঞ্জি। লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, কমলা, সবুজ। তাই পাড়াতে সবাই মইরুলকে মইয়া বলে ডাকে।

মা প্রথম প্রথম মইরুলের এই চালচলন নিয়ে খুব ঝামেলা করত। মারও খেয়েছে। ছোটবেলায় দরজার কোণে দাঁড়িয়ে, কাঁদতে কাঁদতে পিঁপড়ে খেয়ে, বলত, এবার আমি মরে যাব। বাবার মতো। প্রতিমা এখন মেনে নিয়েছে। সেও অসুস্থ। মইরুল ছাড়া আর কেউ নেই।

মইরুল ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। একটা কাঠের ব্রিজ পেড়িয়ে, সাইকেলটা গাছে হেলান নিয়ে রেখে, একটা গুমটির পাশে দাঁড়ায়। মইরুলের নেশা বলতে ঝাল লজেন খাওয়া। অতএব পকেটে সবসময় রাখে। মুখে একটা লজেন দিয়ে, খালের সাদা বকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক পৌনে দশটা নাগাদ রিক্সা করে, একটা মেয়ে স্কুলে যাবে। সেটাই শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখবে। কখনও কখনও স্কুলের সামনে চলে মইরুল।

এই ভাবে প্রায় বছর খানেক কেটে গেছে। যদিও মেয়েটার নাম জানে না। কোথায় থাকে তাও জানে না! কোনোদিন কথা বলারও সাহস হয়নি। শুধু দূর থেকে দেখেই চলে যেত মইরুল। আর মেয়েটাকেও সেটা বুঝতে দেয়নি। তাই প্রতিটা সিনেমার চরিত্রের মত, মেয়েটাও নতুন নতুন নাম দিত। সেখানে নায়িকার মুখ সরিয়ে ওইখানে সেই মেয়েটার মুখ বসিয়ে ভাবতো মইরুল।

এদিকে মইরুলের মায়ের অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছে। ডাক্তার বলেছে, ফিজিওথেরাপি করাতে। কিন্তু রোজ দুশো টাকা। মইরুল খুব চিন্তায় থাকে। সবসময় আনমনা। ঘরের জমানো টাকা দিয়ে, কোনমতে চলছে। কিন্তু এই ভাবে আর কতদিন চলবে! তার মধ্যে নোট বাতিলের ফলে সব টাকা ব্যাঙ্ক থেকে পালটাতে পারিনি। আর মা যে কোথায় টাকা গুঁজে গুঁজে রাখত, সংসারের জন্যে, সেটা এখন আর মায়েরও মনে নেই। যেটুকু খুঁজেখাঁজে টাকা পেয়েছে, সেটুকুই মইরুলের এক কাকার হাতে দিয়েছে, পালটানোর জন্যে। মইরুলের কাকা একজন ব্যাঙ্ক কর্মীর মারফৎ সব টাকা পালটে দেয়। কিন্তু এর বিনিময় ওই ব্যাঙ্ককর্মী কিছু টাকাও নিয়েছে। মইরুলের পক্ষে রোজ রোজ বাঙ্কে গিয়ে টাকা পালটানো সম্ভব ছিল না। মায়ের কাছেই থাকতে হত সবসময়। দু-তিনদিন গিয়ে বাঙ্কে লাইন দিয়েছিল। কিন্তু কোনোদিনই টাকা পায়নি। তাই এইভাবে কিছু টাকা দিয়ে টাকা পালটাতে হল। কারণ এই সময় মইরুলের টাকাটা খুব দরকার মায়ের চিকিৎসার জন্যে। মইরুলের কাকা জাকির, প্রায়দিন বাড়িতে চলে আসত। মইরুল এমনিতে শান্ত স্বভাবের ছেলে। মিষ্টি দেখতেও। কোনরকম ছুঁতয় নাতায় মইরুল যখন রান্না করত, রান্নাঘরে চলে এসে জোর করে মইরুলের শরীরের নানান জায়গাতে হাত দিত। মইরুল বাঁধা দিলেই বলত, তোদেরকে আমাকেই তো সামলাতে হবে। দ্যাখ, আমি তোকে ভালোবাসি। তুই এটা মেনে নে, নাহলে আমি আর তোদের দেখবো না। আপদে বিপদে আমাকেই পাবি। তোদের তো টাকাও লাগবে। মইরুল কিছুই বলতে পারে না। সারাগায়ে কামড়ের দাগ নিয়েও মুখ, বুজে সবকিছু মেনে নেয়। মাঝে মধ্যে পায়খানার দ্বার দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। এই যন্ত্রণা নিয়েও মইরুল রোজ কাঠের ব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত শুধু মেয়েটাকে দেখার জন্যে। সাদা বকগুলো যেন ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। খালের ধারে ধারে ঝুপড়ি গুলো কুয়াশার চাদর জড়িয়ে শীত পোয়াচ্ছে। চারিদিক ধূসর কালো সাদা মইরুল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে একটা ঝাল লজেন দিয়ে। প্রায় পাঁচ সাতদিন হয়ে গেল, মেয়েটাকে আর দেখতে পাচ্ছে না।

রোজ ফিজিওথেরাপি করেও মায়ের কিছুই ভাল হয়নি। ডাক্তার বলছে, আর কদিন! শরীরের না কী সবকিছুই খারাপ হয়ে গেছে। কিছুদিন পর মইরুলের মা মারা যায়। জাকির কাকাই সব ব্যবস্থা করে। কবর থেকে সবকিছু। এখনও ভরের আজান শুনতে পায় মইরুল। শুধু বিছানার পাশে খুঁজতে থাকে মায়ের মুখটা…। শীত প্রায় শেষের দিকে। এখন আর সাইকেল করে কাঠের ব্রিজের দিকে যাওয়া হয় না। অনেকদিন হয়ে গেছে মেয়েটাকে দেখেনি মইরুল। ঘরে যেটুকু জমানো টাকা ছিল তলানিতে। মইরুলের কাকা এখন এক দুদিন ছাড়াই চলে আসে। হাতে কিছু টাকা দেয়। পাশাপাশি মইরুলের যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। রক্ত জমাট বাঁধতে থাকে চামড়ায়, শিরায় উপশিরায়! মউরুল আয়না দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। জানলা দিয়ে আকাশ গুনতে থাকে। মইরুল অন্ধকার হয়ে যায়।

বাইপাস বেলেঘাটা মোড়ের একটা চায়ের দোকানে মইরুল বসে আছে। বিকেলের দিকে। অসময় তুমুল বৃষ্টি। মইরুল যেন জানত এই বৃষ্টি আসার কথা। গাড়ি গুলো জ্যামে আটকে আছে। সবার চরম ব্যাস্ততা। মইরুল হাঁ করে দেখছে। যেন কিছুই দেখছে না। তবুও তাকিয়ে আছে। এই হাজারো মানুষের মন, ভালোবাসা, টাকা, গাড়ি, বাড়ি, শরীর, হিসেব আরও কত কী! মইরুলে গায়ে বৃষ্টির জল লাগছে। আর সেই জলে মইরুলে বিন্দু বিন্দু রক্ত গুলো মিশে যাচ্ছে। কাঁদতে থাকে। একটা চওড়া হাত, চায়ের ভাঁড় সমেত মইরুলের দিকে এগিয়ে আসে।

কি হয়েছে তোর…?

মইরুল চমকে গিয়ে তাকায়। দেখে একজন লাল ঝলমলে শাড়ি পরা হিজড়ে, এক ভাঁড় চা এগিয়ে দিয়ে মইরুলকে বলছে। মইরুল কিছু বলে না।

শোন, আমাকে ভয় পাস না। আমি বিজলী। আমাকে নিজের লোক ভাব।

মইরুল উত্তর দেয়- কেন?

বিজলী – নে চা ধর। আমাকে ধরতে বলিনি! হা হা হা…

মইরুল- উত্তর দেয় না।

বিজলী- কি হয়েছে বল… কাঁদছিস কেন? আমি সব সামলে নেব! দ্যাখ, তুই আমাদের লাইনে চলে আয়। এখানে তুই ভাল থাকবি। তোর মাসীকে আমি চিনি। তার কাছে, তোর ব্যাপারে অনেককিছু শুনেছি।

মইরুল- কিছুই বলে না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে… বৃষ্টির জল ফোঁটা ফোঁটা চায়ের ভাঁড়ে পড়ে।

বিজলীর কথাগুলো কখন যে গাড়ির শব্দে মিলিয়ে আসে। বিজলী বিরক্ত হয়ে খিস্তি মেরে চলে যায়। মইরুলের মুখে একটা আবছা হাসি যেন, এই বৃষ্টি ভেজা শহরে বিজ্ঞাপনে মুখ দেখে! একটা ঝাল লজেন মুখে দেয়।

আজ দুপুরে জাকিরকে মইরুল কুপিয়ে এসেছে। জামাটা পালটে এলেও, গায়ে এখনও রক্ত। বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ধুয়ে যাচ্ছে যন্ত্রণা, কালশিটে দাগগুলো… মইরুল চুপ করে থাকে। চোখটাও যে কখন বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। সন্ধে হয়ে আসে। আলোগুলো জেগে উঠেছে। ভেজা ভেজা আলোরা মইরুলের হাত ধরে এগিয়ে যায়। মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মইরুল, মাকে ডাকতে থাকে। চিৎকার করে। কোন উত্তর আসে না। শুধু ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। ব্যাঙের ডাক। বাকিটা নৈশব্দ। মইরুলের শূন্য লাগে। জাকিরের রক্ত মাখা দেহটা বিছানার চাদর জড়ানো। একটা ভয়। একটা শান্তি। একটা আতঙ্ক। মইরুল সেই কাঠের ব্রিজের সামনে যায়। খালের ধারের বাড়িগুলোতে টিমটিমে আলো জ্বলছে। মইরুলের ভয় বাড়তে থাকে… বেলেঘাটা থানায় যায় মইরুল। ছোটবাবুকে সবকিছু জানায়। যদিও থানার মইরুলের কথা বিশ্বাস হয় না। সেইদিন রাতেই মইরুলের বাড়িতে পুলিশ যায়। জাকিরের দেহ পোস্টমর্টেম করতে পাঠায়। মইরুলকে কোর্টে তোলা হলে, সাতদিন পুলিশি হেপাজতে রাখার নির্দেশ দেয়। জেলের ভেতর বাকি আসামীদের সঙ্গেই রাখা হয় মইরুলকে।  তদন্ত চলতে থাকে। একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মইরুলের পাশে দাঁড়ায়। মইরুলের বয়স পরিস্থিতি অবস্থা বিচার করে, সাত বছরের জেল হয়। যেহেতু মইরুল নির্দোষ, নিজে বাঁচার জন্যে জাকিরকে খুন করেছিল। দিনের পর দিন ধর্ষণ হওয়া থেকে বাঁচতে। তাই মইরুলের মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। যাতে মইরুল আবার সমাজের মুলস্রোতে  ফিরে আসতে পারে। লেখাপড়ার পাশাপাশি হাতের কাজও শেখানো হয় মইরুলকে। সময় কাটতে থাকে। প্রথমদিকে খারাপ হলেও, আস্তে আস্তে মইরুলকে সবাই ভালবাসে।

বাইপাস বেলেঘাটা সিগনালে, বিজলী ও তার সঙ্গীরা গাড়িতে টোকা মেরে, টাকা চাইছে। বিজলীর এখন বয়স হয়েছে। সঙ্গে আরও নতুন কিছু মুখ। এখানে সবাই হিজড়ে নয়। পেটের টানে, বেঁচে থাকার তাগিদে আরও কিছু মানুষ এই লাইনে নামছে। পাশাপাশি ছোলা বাদাম চিপস নিয়ে কিছু মানুষ দৌড়চ্ছে। ঠিক তেমনি “ মিষ্টি মুখে ঝাল লজেন” বলে, কালো নীল লাল হলদে সবুজ লজেন নিয়ে মইরুল বিভিন্ন গাড়ির কাঁচে টোকা মারতে থাকে।

সোমনাথ ঘোষাল শূন্য দশকের কবি। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতার বরানগর অঞ্চলে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা দশ। প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাসও। প্রায় পঞ্চাশটার বেশি গানের লিরিসিস্ট। প্রকাশিত হয়েছে একাধিক অডিও অ্যালবাম। শর্ট ফিল্মও বানিয়েছেন।

Comments are closed.