আমাদের কবে গ্রেফতার করবেন মিত্রোঁ?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

হিন্দোল ভট্টাচার্য

ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের জীবনের দাম বেশি না প্রধানমন্ত্রীর? ছি ছি! এ প্রশ্ন কে করে? অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর।   প্রশ্নটি যদি আরেকটু বিস্তৃত করে বলা যায়,ভারতে মানুষের অধিকার বেশি না প্রধানমন্ত্রীর অধিকার? তিনি স্বয়ং রাজা। তিনিই নিয়ম। কিন্তু যদি বলি, এ দেশে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করার ছক হচ্ছে বলে ভুয়ো একটা কেস চাপিয়ে একজন বর্ষীয়ান কবি ও মানবাধিকার কর্মীর কণ্ঠরোধ করার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হল উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই, তবে? আহা! এমনই তো হওয়ার কথা!  শুধু তিনি নন, এভাবে ভুয়ো নানান কারণ দেখিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে গৌতম নাভালকা, সুধা ভরদ্বাজ, অরুণ ফেরেরা, ভার্নন গঞ্জালভেস, সুসান আব্রাহাম, আনন্দ টোলটুম্বে, স্তান স্বামী, সোমা সেন, সুরেন্দ্র গাডগিল, রোনা উইলিয়মস, সুধীর ধাবলে, মহেশ রাউত-দের যাঁরা পেশায় ও কাজে ছিলেন যথাক্রমে আইনজীবী, গবেষক, সম্পাদক, মানবাধিকার কর্মী, উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনের কর্মী, লেখক ও সমাজকর্মী, তাহলে হয়ত মনে আবছা হলেও প্রশ্ন জাগবে, নিশ্চয় এরা দেশদ্রোহী, তাই নয় কি? যদি বলি নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করার ছক কষার মতো সময় নষ্ট করার মতো সময় কবি ভারভারা রাওয়ের না থাকলেও, এই অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, অথচ গুজরাতে যিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সমস্ত রাস্তা ব্লক করে পুলিশ ও দাঙ্গাবাজ ঢুকিয়ে ভারতের হিংস্রতম ও জঘন্যতম দাঙ্গা করিয়েছিলেন, সেই নরেন্দ্র মোদী এ দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি স্বয়ং  কেন গ্রেফতার হবেন না এ বিষয়ে এ দেশে আওয়াজ ওঠে না, তখনও হয়ত আপনারা বলবেন- তওবা তওবা! রাজা তো মানুষ মারতেই মারেন। কিন্তু তিনি তো রাজা! তাঁকে গ্রেফতার? চুপ!

আরও স্পষ্ট করে বললে, দেশের প্রধান, যদি এক সময়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যার ছক কষে সফল হন, তবু তিনি দেশের প্রধান। তাই সাত খুন মাফ। দেশের প্রধান, যদি নানান আইন কানুন অর্থনীতি চাপিয়ে মানুষকে নানা ভাবে হত্যার ছক কষে থাকেন এবং কষেই চলেন, তাহলেও তাঁর বিরুদ্ধে মানুষ মারার অভিযোগ তোলা যাবে না। কারণ তিনি দেশের প্রধান। তিনি ও তাঁর অনুচরবর্গ যদি সারা দেশে ধর্মকে হাতিয়ার করে একনায়কতন্ত্র ছড়িয়ে  ঘৃণার এক বিষাক্ত বাতাবরণ ছড়িয়ে থাকেন, তবুও তাঁরা সন্ত্রাসবাদী নন। গ্রেফতার করার অধিকার শুধু রাষ্ট্রের হাতে।

তাহলে গ্রেফতার করা হচ্ছে কাদের? কেন? আমরা জানি কবি ভারভারা রাও দীর্ঘদিন ধরে গণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছেন। আরেক কবি ও গায়ক গদরের মতোই গণ আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কংগ্রেস আমলেও তিনি গ্রেফতার হয়ে বহুদিন জেলে কাটিয়েছেন। মোদীর আমলে যে তাঁকে গ্রেফতার করা হবে, এই বা আর নতুন কী! সমস্যা হল, মানবাধিকার কর্মী, দলিত সমাজের জন্য লড়াই করা মানুষ বা রাষ্ট্রের শোষণের বিরুদ্ধে যাঁরা মুখ খোলেন, আন্দোলন করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ছুতো খুঁজবেই। কিছু না থাকলে একটা শিখণ্ডী তো আছেই, আর তা হল রাষ্ট্রবিরোধী, দেশদ্রোহী বা মাওবাদী। এবার মোদী বা ত্যাগী বা শাহ—এরা তো নিজেদের অবিসংবাদী চরিত্র বলে মনে করেন রাষ্ট্রের। ফ্যাসিবাদের কাজটিই সেটি। কিছু কিছু মানুষকে দেশের স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর প্রধান করে তাদের এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে তাদের অবতার বলেই মনে করেন দেশের সাধারণ মানুষ। জার্মানির মতো দেশেই নাজিবাদের নামে এই ব্যক্তিপুজো এবং ব্যক্তিশাসন কায়েম করা সম্ভব হয়েছিল, তো ভারতের মতো দেশে তো এটি হবেই, যেখানে অবতার ও ব্যক্তিপুজো এক ঐতিহ্যের মতো।

কিন্তু কথা সেটি নয়। কথা হল এই যে ইচ্ছে মতো মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, ইচ্ছে মতো যে কারুর মাথার উপর হত্যার ছক বা হেন বা তেন রাষ্ট্রবিরোধী তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে, এ তো এক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের নগ্ন শাসনব্যবস্থার লক্ষণ। এ যেন, তুমি প্রশ্ন করেছ, অতএব তুমি রাষ্ট্রবিরোধী। তুমি বিরোধী ভাবনা ধারণ কর, অতএব তুমি রাষ্ট্রের পক্ষে বিপদজনক।

এ দেশ অদ্ভুত! এ দেশে দাঙ্গা বাঁধাবার জন্য মানুষকে গ্রেফতার করা হয় না। তিনি বা তাঁরা কম বিপদজনক মানুষ হয়ে যান। এ দেশে যাদের শাসনকালে গত তিন বছরে ১৩০০০ কৃষক সারা দেশে আত্মহত্যা করেন, তাঁরা দেশদ্রোহী হন না। যাঁদের শাসনকালে পেট্রলের দাম বেড়ে ৮০ টাকা প্রতি লিটার হয়ে যায়, যার জন্য দেশে সবরকম জিনিসের দাম আকাশ ছুঁতে থাকে, তাঁরা দেশদ্রোহী হন না। যাঁদের শাসিত রাজ্যে যাঁদের পার্টির লোকজন গোরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে মানুষকে হত্যা করে সকলের সামনে তাঁরা দেশদ্রোহী হননা। প্রত্যক্ষ ভাবে যাঁরা অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে উৎসাহ দেন, তাঁরা দেশদ্রোহী হন না। দেশের সমগ্র অর্থনীতিকেই যাঁরা বহুজাতিক ও কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে ও দেশিয় বড়লোক ব্যবসায়ীদের হাতে বেচে দেন, নিজেদের ও নিজেদের পার্টির লক্ষ লক্ষ কোটি কালো টাকা সাদা করেন নিজেরাই সাধারণ মানুষের উপর নিয়মের পর নিয়ম চাপিয়ে তাঁরা দেশদ্রোহী হন না। দেশদ্রোহী হন সেই সব মানুষ, যাঁরা এই সব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দেশদ্রোহী হন সেই সব দলিত মানুষদের প্রতিনিধি, যাঁরা উচ্চবর্ণের মানুষদের দলিত মানুষদের উপর অত্যাচার নিয়ে কথা বলেন। দেশদ্রোহী হন সেই সব শিক্ষিত মানুষ, যাঁরা নিয়মিত মানুষের অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন করে চলেন।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে না-হয় তাঁরা অন্তরীন থাকার অনুমতি পেলেন। কিন্তু বলুন তো, আজ কবি ভারভারা রাও বা গৌতম নাভালকরের জায়গায় যদি আমি-আপনি হতাম, তাহলে কি দেশের বিচারব্যবস্থা এত সহজে আমাদের মাথার উপর থেকে মোদীহত্যার ছকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ‘শিরোপা’ থেকে মুক্তি দিত? আজ এই সব ভুয়ো অভিযোগ চাপিয়ে এই সব বিদ্বজ্জনদের গ্রেফতার করা তো দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এক সংকেত পৌঁছনো, যে মুখ খুলো না। মুখ খুললে তোমার অবস্থা এদের চেয়েও মারাত্মক হবে। হয়ত পুলিশের কাছেও যেতে হবে না। আমাদের গেরুয়া সৈনিকরাই তোমাদের যা করার করে দিয়ে যাবে। এ হল আতঙ্ক ছড়ানো। ফ্যাসিবাদের যা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিছু মানুষকে তুমুল অত্যাচার করবে, কিছু মানুষকে নিজেদের মন্ত্রে সৈনিক করে তুলবে এবং কিছু মানুষকে স্রেফ ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখবে।

আসল কথা হল আমার কথায়, আমাদের কথায় কণ্ঠ না মেলালে তুমি শত্রু। আমার হাতে ক্ষমতা আছে।  যা ইচ্ছে আমি তা করতে পারি। জরুরি অবস্থা জারি না করেও তাই সারা দেশে এক জরুরি অবস্থাই চলছে। নরেন্দ্র মোদী নামক লোকটি যখন বুঝতে পারে, দেশের মানুষের কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে তার অন্তঃসারশূন্য ফাঁপা বক্তব্যগুলি, তত সে আরও হিংস্র হয়ে নিজের ফ্যাসিস্ট সত্ত্বা প্রকাশ করে এইভাবে। একজন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক কষা হচ্ছে, এই আতঙ্কে,ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি সাধারণ নিরপরাধী বিদ্বজ্জনদের ভুয়ো অভিযোগে গ্রেফতার করতে পারেন, তাহলে ভারতের সাধারণ নাগরিকদেরও অধিকার আছে, তাদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, তাদের হাতে-ভাতে- মানে সবরকম ভাবে হত্যার ছক কষছে মোদী সরকার, সে জন্য তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানাবার। আর কে না জানে, সেই সব হত্যার ছক দিনের আলোর মতো পরিষ্কার থাকলেও, এ দেশে এ অভিযোগ কেউ নেবেই না।

এই ধরনের ফ্যাসিস্ট সরকার যে দেশে থাকে, সেখানে আবার লোকে গর্ব করে বলে, আমরা গণতান্ত্রিক দেশে থাকি। আর কত সহ্য করলে তবে মানুষ বুঝবে ফ্যাসিবাদ কাকে বলে! এর পর কথা বলার অপরাধে আমাকে আপনাকে আপনার প্রিয়জনকে না বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে না যায়। সহ্য করতে পারবেন তো! বড্ড বেশি সহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন যে!

হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More