শনিবার, অক্টোবর ১৯

ফ্যাসিস্তরা দরজায়; আমরা তাদের চিনতে পারছি না

দেবেশ রায়

ই লেখাটি আমি লিখতে চাইছিলাম না। কিন্তু ভারভারা রাও-এর গ্রেফতারের পর এটা না লেখা অপরাধ হবে।

ভারভারা রাওকে ফ্যাসিস্ত কেন্দ্রীয় সরকার গ্রেফতারের সাহস পেল। কিন্তু ফ্যাসিস্তবিরোধী শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্গ হতে পারে যে পশ্চিমবাংলা, সেই রাজ্য, এই ফ্যাসিস্তদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ অতি দ্রুত তৈরি করে তুলতে পারছে না। ফ্যাসিস্তরা আমাদের ভয় পাচ্ছে না কেন? উল্টে ওরাই আমাদেরই ভয় দেখাচ্ছে।

ভারভারা রাও তো শুধুমাত্র একজন তেলেগু কবি নন, তিনি ভারতের কবি। সেই কারণে বাংলারও কবি।

প্রায় বছর দেড়েক আগে বলেছিলাম, নরেন্দ্র মোদীর সরকার ফ্যাসিস্ত সরকার, ষোলো আনার ওপর বত্রিশ আনা ফ্যাসিস্ত। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ইউরোপের গণতান্ত্রিক ও কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ভুলের ইতিহাস, ইতালিতে মুসোলিনির ক্ষমতা দখল, হিটলারের নাৎসিবাদ আমার নিজস্ব অধ্যয়ন ও চর্চার আন্তরিক বিষয়। ইউরোপ তার জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলোকপর্বের দীপ্তি সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদকে চিনতে পারেনি। একজন বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক ট্রেভর রেপর বলেছিলেন – ফ্যাসিবাদকে চেনার কোনও স্পষ্ট পরিচয়চিহ্ন ছিল না, কী করে চেনা যাবে?

কথাটা পুরোপুরি ভুল ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে একবার ফ্যাসিবাদের অভিজ্ঞতার পর তার পরিচয়চিহ্ন দেখে এখনও বোঝা যাবে না? সাউথ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী সরকার কত দীর্ঘ সময় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালিয়ে গিয়েছে, পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির পরোক্ষ সমর্থনে। ততদিনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির জানা হয়ে গেছে, ফ্যাসিবাদ মুনাফাও দিতে পারে।

দেড় বছর আগেই এই সার কথা বুঝেছিলাম – ফ্যাসিবাদ কাউকে দম ফেলার সময় দেয় না। তাই কিছু বন্ধুর সমর্থনে একটা মাসিক কাগজ বের করেছিলাম, ‘সেতুবন্ধন’। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক ও বাস্তব লড়াইয়ের জন্য।

ফ্যাসিবাদকে ফ্যাসিবাদ বলে চিনে ফেলার অনেক বাধা। কত সময় নষ্ট হল বিজেপির ধর্মান্ধতাকে অসহিষ্ণুতা ভাবতে। কত সময় নষ্ট হল এক প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির আরএসএসের সদর দফতরে গিয়ে স্বদেশপ্রেমিক খুঁজতে।

আমার কিন্তু প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল ফ্যাসিবাদ বিরোধী জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপরিহার্য। তাঁর সমতুল্য জননেত্রী বা জননেতা ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে নেই। রাজ্যের মানুষের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রায় অপ্রতিহত। বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক সংহতি ও সংগতিতে কোনও অস্পষ্টতা নেই। কিন্ত তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাঁরই দল।

মমতা বন্দোপাধ্যায়ের রাজনীতি আর আমার রাজনীতির মধ্যে গ্রহান্তরের ব্যবধান। কিন্তু রাজনীতি যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের যুদ্ধ হয়ে হয়ে উঠছে তখন তাঁর রাজনীতির ফ্যাসিবাদ বিরোধী চরিত্র আমাদেরই চিনে নিতে হবে। সকালের কাগজে দেখি সিরিয়াল প্রযোজনা নিয়ে যে অচলতা তৈরি হয়েছিল কয়েকদিন ধরে, শেষ পর্যন্ত সেটা মিটল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যস্থতায়। আবার সেই সংখ্যারই প্রথম পাতার খবর সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রকগুলির সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে ২৩ আগস্ট, বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী এই দফতরগুলোর কাজ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তিনি কোনও অস্পষ্টতা সাধারণত রাখেন না – দোষ উল্লেখ করে দোষীদের নাম ধরেই কথা বলেন।

এই পদ্ধতিটা প্রশাসনে সম্পূর্ণ নতুন। যেন, মন্ত্রিসভার বৈঠক নিয়ে আম-দরবার। জেলায় জেলায় তাঁর প্রশাসনিক বৈঠকেও এই খোলা হাওয়া বয়। জনসাধারণের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হয় – শেষ পর্যন্ত তো ‘দিদি’ আছেন। কিন্তু ‘দিদি’র এই আম-দরবার শুধুই প্রশাসনিক। দলীয় নয়। ফলে, তাঁর দলের কর্মীরাই তাঁর ওপর জনসাধারণের এই এমন আস্থার হাওয়াকে বারবার বিষিয়ে দিতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করে তাঁর দল গড়বেন বা চালাবেন, সেটা একান্তই তাঁর ব্যাপার। কিন্তু একদিকে কলেজে ভর্তির জন্য অবিশ্বাস্য তোলাবাজি, অন্যদিকে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও কোনও বিষয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তিই হচ্ছে না – এই অসমতা নিশ্চয় কোনও সরকার দূর করতে পারেন না। এটা একটা সামাজিক প্রবণতার ফলেই ঘটে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলেন, তাতে এমন ভুল হতে পারে যেন সমাধান তিনি জানেন, শুধু ‘অনুপ্রেরণা’র অভাব।

এমন পরাশ্রয়িতা, কোনও দল বা প্রশাসনের পক্ষে বিপজ্জনক। টিভিতে ছবি ও রিপোর্ট বেরোবার আগে মেডিক্যাল কলেজের কোনও কর্তৃপক্ষের কেউ ছাত্রাবাসের নরকতুল্য অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলবেন না আর ছেলেমেয়েরা সকলের চোখের সামনে না খেয়ে থাকবে তেরো-চোদ্দদিন? ভাগ্যিস! শোচনীয়তর কিছু ঘটে যায়নি। সিনেমা-সিরিয়ালের প্রযোজকরা অভিনেতাদের টাকা দেবেন না কিন্তু শ্যুটিং করতে চাইবেন যতদিন না ‘দিদি’ কোনও সমাধান দেন।

ব্যক্তি ও দায়িত্বশীল পদাধিকারীদের দলে ও প্রশাসনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুদ্যোগ, নিরুৎসাহ, নিরাবেগ ও দায়িত্বহীনতা আসে আত্মরক্ষাসর্বস্ব অনিশ্চয়তাবোধ থেকে। ‘দিদি’ কী চাইছেন – সেটা আন্দাজ করতে না পেরে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ও মন্ত্রী, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুরাহা করতে পারেন না। বিষয়টি মন্ত্রিসভার বিষয় হয়ে ওঠে। তার মানে এতদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে যে ‘দিদি’ কী চাইছেন জানতে পারলেই মেয়র ও মন্ত্রী তাঁর ত্রিভুজ কাহিনীর অবসান ঘটাতে পারেন। অথচ এমন ব্যক্তিত্বহীন, রাজনৈতিক কর্তব্যের অগ্রপশ্চাৎ বোধহীন নেতা বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে মমতা ও তৃণমূলের অগ্রনী সেনাপতি।

সিপিআই(এম)-এর কোনও সাংসদ যদি এই কারনেই পার্টি থেকে বহিস্কৃত হয়ে থাকে, তাঁকেও তৃণমূলে এক রকমের জায়গা দেওয়া হয়।

অথচ মমতা তো এটা তাঁর ব্যবহারে প্রমাণ করেছেন পারিবারিকতা রাজনীতির ভিত্তিও হতে পারে।

এই একমাত্রিক নির্ভরতাবোধ প্রশাসনকে পঙ্গু করে দেয়। পার্টিকেও। আত্মবিশ্বাসহীন আনুগত্যবোধ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই। তাঁর নেতৃত্বের। সব দায় তাঁর। বামফ্রন্টে শেষ দিকে যেমন সব দায় ছিল লোকালের।

যুব তৃণমূলের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের তরুণদের বিজেপি-বিরোধী সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে বিজেপিকে শাসিয়ে বললে – ‘বাংলায় বিজেপিকে ঢুকতে দেব না। আমরা বাঘের বাচ্চারা তাঁদের আটকাব।‘ শেষ বাক্যটা কোনও কাগজ থেকেই খুব পরিষ্কার হল না তিনি নিজেকেই বাঘের বাচ্চা বলেছেন কী না।

এদিকে এই বাঘের বাচ্চারা পঞ্চায়েত দখলের জন্য বিজেপির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। বিক্ষুব্ধ তৃণমূল একটা শক্তি হয়ে উঠছে। তারা গাছেরও খাচ্ছে, তলারও কুড়োচ্ছে আর সব সময়েই ‘দিদি’ মন্ত্র জপ করছে। সংখ্যা ও গুরুত্বের দিক থেকে তেমন কিছু হয়তো নয়। কিন্তু পঞ্চায়েত – বাংলায় এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কায়েম হয়ে যাছে যেন তৃণমূলকে হারানো যায়, বিজেপির এই দাবি অসার নয়। এই সারবত্তা প্রমাণ করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে বিজেপি – এমন সন্দেহ খুব যুক্তি সংগত।

এই দল নিয়ে মমতা তাঁর বিজেপি বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবেন?

অন্যদিকে প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছেন – মমতাকে মুচলেকা দিতে হবে যে কোনও পরিস্থিতিতেই তিনি বিজেপির সঙ্গে আপোস করবেন না।

কিন্তু এই বিবৃতিটা দেওয়ার প্রাথমিক দায় তো আসলে কংগ্রেস ও বামফ্রন্টেরই। বিজেপি বিরোধী ফ্রন্টকে অভেদ্য করতে তাঁরা তৃণমূলের সঙ্গে থাকবেন ও পঞ্চায়েত-রাজনীতিকে প্রধান বিষয় হতে দেবেন না। মমতা ও তৃণমূলকে বিজেপি বিরোধী অবস্থানে অনড় রাখাই তো এই সময়ের রাজনীতির দায় ও দায়িত্ব।

এখানকার কংগ্রেস ও বামপন্থীরা যে ভুল করছেন ঠিক সেই রকম ভুল করেছিল জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ও কমিউনিস্টরা। তারা যদি আত্মরক্ষার জন্যও ফ্রন্ট তৈরি করত ও ভোটে একজন নাৎসি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফ্রন্টের একজন প্রার্থীর দিত, তাহলে হিটলারের পরাজয় ছিল অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য।

আমরা কি শুনতে পাচ্ছি না – ভারভারা রাও এর দরজায় ফ্যাসিস্তদের কড়া নাড়া বা মহারাষ্ট্রের দলিতবিরোধী সংঘর্ষের অপরাধী হিসেবে নয় জন দলিতকেই নজরবন্দি করা? ফ্যাসিবাদ আরও কত স্পষ্ট প্রমাণ দেবে যে তারা ফ্যাসিস্ত?

দেবেশ রায় বাংলা ভাষার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক। তিনি ১৯৯০ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। বহুদিন বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।    

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

Comments are closed.