শনিবার, অক্টোবর ১৯

‘মোমো’ কি আদৌ আছে?

রোহন ইসলাম

ল্যাপটপে চাইল্ড পর্ন দেখতে দেখতে হস্তমৈথুনে মগ্ন ছিল এক কিশোর। তারই অজান্তে ওয়েবক্যামে সেই দৃশ্য বন্দি করে রাখে অচেনা হ্যাকারেরা। আর তারপরে শুরু হয় খেলা। ফোনে আসা নির্দেশ (টাস্ক) পালন না করলে পরিবার এবং বাইরের দুনিয়ার কাছে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের এই ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি পায় সেই কিশোর। প্রবল চাপে গেমের অপরপ্রান্তে থাকা হ্যাকারদের হুমকিতে পরপর নানা টাস্ক করতে বাধ্য হয় ওই কিশোর। শেষ টাস্কে অপর এক ব্যক্তির (ওই কিশোরেরই মতো এই খেলায় জড়িয়ে পড়া) বিরুদ্ধে কিশোরের মারণ-ডুয়েলের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় খেলা।

চেনা লাগছে? খবরে, সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটস্‌অ্যাপে ছড়িয়ে পড়া ‘ব্লু হোয়েল’ বা ‘মোমো সুইসাইড’-এর মতো শোনাচ্ছে না? ঘটনার গতিপ্রকৃতি প্রায় এক হলেও না, কিশোরটির মারণ খেলার শিকার হওয়ার এই ঘটনাটি বাস্তব নয়। গল্পটি নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় ‘ব্ল্যাক মিরর্‌’ শোয়ের এপিসোড ‘শাট আপ অ্যান্ড ডান্স’-এর। যেখানে দেখানো হয়, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে কীভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আজ দুনিয়া জুড়ে নিরাপত্তার অজুহাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ‘মাস সার্ভেলান্স’ সক্রিয়। তার উপর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের অপব্যবহার নিয়ে আমজনতা তেমন সচেতন নয়। এই পরিস্থিতিতে ‘শাট আপ ডান্স’ আমাদের অনেক কিছু শেখায়। ২০১৬ সালে তৈরি ওই এপিসোড প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে এবং তারও আগে ২০০১ সালে জাপানের চলচ্চিত্র ‘সুইসাইড ক্লাব’ মাস-সুইসাইডের যে মনোবৈজ্ঞানিক প্রেক্ষিতের যে প্রশ্নটি তুলেছিল, বাস্তবে এমনটা কিছু ঘটা যে অসম্ভব নয়, তা নিয়ে বহু বিশেষজ্ঞই একমত। সাম্প্রতিক ‘ব্লু হোয়েল’ ‘মোমো সুইসাইড’ গেম সেই সম্ভাব্যতার আতঙ্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের নানা দেশের পুলিশই (ভারতেও) সতর্ক থাকার জন্য বাবা-মায়েদের ছেলেমেয়ের উপর নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। পুলিশকে এমন বিষয় নিয়ে সক্রিয় দেখলে সাধারণ মানুষের চেতনায় এই ধরনের খেলার ‘অস্তিত্ব’ যেন আরও দৃঢ় হয়ে যায়! কিন্তু বড় প্রশ্নটা হল যে, সাম্প্রতিক এই ‘ব্লু হোয়েল’ বা ‘মোমো সুইসাইড’-এর মতো নানা মারণ-খেলার কথা উঠে আসছে, বাস্তবে তার সত্যতা কতটুকু? আমাদের কিশোর-যুবরা কি সত্যিই এমন কোনও মারণ খেলায় মেতে উঠছে? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে আর কিছু?

গত বছর শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি ইউরোপিয় ইংরেজি ওয়েবসাইট প্রথম একটি বিশেষ গেমের খবর ছাপে। যার খপ্পরে পড়ে নাকি রাশিয়ায় একশোরও বেশি বালক-বালিকার মৃত্যু হয়েছে। ‘ব্লু হোয়েল’ (তিমিদের স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেওয়ার অনুষঙ্গকে মাথায় রেখে) নামে সেই গেম খেলতে রাজি হলে ৫০ দিনের মধ্যে ইউজারকে অপরপ্রান্ত থেকে আসা নানা নির্দেশ (নিজের শরীরে আঘাত থেকে গান শোনা ইত্যাদি) পালন করে যেতে হয়। পঞ্চাশতম দিনে গেমের শেষ টাস্ক, অর্থাৎ আত্মহত্যা করলে ইউজার বিজয়ী হয়। এই খেলা শেষ অবধি না খেললে ইউজারের কোনও সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য দুনিয়ার সামনে প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। মোটের উপর এই হল গিয়ে ‘ব্লু হোয়েল’ খেলার ছক। ‘শাট আপ অ্যান্ড ডান্স’-এর সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। যদিও ‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া এই খবর কতটা সত্য, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত যখন তোলপাড় হচ্ছিল, তখন এ নিয়ে প্রথম সংশয় প্রকাশ করছিল নানা ‘অনলাইন ফ্যাক্ট চেকার’ ওয়েবসাইট। তাদেরই অন্যতম ‘স্নোপস্‌’-এর দাবি ছিল, রাশিয়ায় ‘ব্লু হোয়েল’ নামক সুইসাইড গেমের খবরটি আদতে একটি ভুল অনুবাদের ফল!

রাশিয়ার ‘নোভায়া গেজেটা’ ছ’মাসে দেশে শিশুকিশোরদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে একটি লেখা ছেপেছিল। যেখানে তারা দাবি করেছিল, ২০১৫ নভেম্বর থেকে ২০১৬ এপ্রিল অবধি মৃত মোট ১৩০ জন শিশুকিশোরের মধ্যে প্রায় সকলেই রাশিয়ার জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ভিকে-র একটি অনলাইন গেমিং কমিউনিটির সদস্য ছিল। ‘নোভায়া’র দাবি ছিল, কমপক্ষে ৮০টি ঘটনার সঙ্গে ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের যোগসূত্র রয়েছে। প্রায় একই সুরে খবর করে রাশিয়ার জনপ্রিয় টেলিভিশন নেটওয়র্ক ‘রাশিয়া টুডে’। দেখতে দেখতে এই খবরটি লুফে নেয় পশ্চিমি মিডিয়া। ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের খবর প্রায় ‘সত্য’ ঘটনার আকারে ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বেই। যদিও পরবর্তী বহু তদন্তেই ধরা পড়েছে, কোনও আত্মহত্যার সঙ্গেই এই অনলাইন কমিউনিটিগুলির যোগ নেই। মিডিয়ায় তোলপাড় হতেই রাশিয়ার অন্তর্জাল ভরে ওঠে এমন সব প্রোফাইলে— যাদের কেউ দাবি করে তারা ওই গেম খেলছে বা খেলতে ইচ্ছুক, কেউ কেউ আবার নিজের শরীরে নানা কাটাছেঁড়া করে সকলের মনোযোগ টানার খেলায় মেতে ওঠে।

এমনকী, রিনা পালেনকোভা নামে একটি টিনেজ মেয়ে ভিকে-তে নিজের ছবি পোস্ট করার ঠিক পরেই আত্মহত্যা করলে ঘটনাটির সঙ্গে ‘ব্লু হোয়েল’কে জুড়ে দেওয়া হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় রিনার ছবি এবং তাকে নিয়ে বানানো নানা সাইকিডেলিক শক্‌ ভিডিওয়। ভিকে-তেই তৈরি হয় ‘সি অফ হোয়েলস্‌’-এর মতো গ্রুপ। এই সব ‘ডেথ গ্রুপ’ নতুন এই ‘ট্রেন্ড’কে কাজে লাগিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠে। রাশিয়ার দুই অনলাইন খবরের সংস্থা ‘লেনটা’ ও ‘সেন্ট পিটার্সবার্গ’-এর দাবি, প্রথম দিকে আত্মহত্যাকে প্ররোচনা দেওয়ার কোনও উদ্দেশ্যই ছিল না এই সমস্ত গ্রুপের। কিন্তু ধীরে ধীরে ‘আত্মহত্যা’র ধারণাকে ভেঙে খেয়েই টিনেজারদের মধ্যে এরা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী, বিভিন্ন কন্টেন্ট ছড়িয়ে সদস্যদের মধ্যে পরোক্ষে আত্মহত্যার প্রবণতাকে ‘প্রোমোট’ও করে (প্রায় একই রকম কাজ করার অপরাধে ভিকে ‘এফ৫৭’ নামে অপর একটি গ্রুপকে ২০১৪ সালেই সাসপেন্ড করেছিল।) পরবর্তী ছ’মাসে রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তানে বহু আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টাকে ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের সঙ্গে জুড়ে দেয় মিডিয়া। আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘ব্লু হোয়েল’-এর ‘সত্যতা’ বাড়িয়ে দেয় একটি পুরনো খবরকে (২০১৬) মিডিয়া ২০১৭ সালের ঘটনা বলে তুলে ধরায়। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে ধৃত এফ৫৭ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ বুদেইকিনকে ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের নির্মাতা বলে দাবি করে পশ্চিমি মিডিয়া। যদিও রাশিয়ায় কোনও ঘটনাতেই ‘ব্লু হোয়েল’ নামক তথাকথিত মারণ গেমের সংযোগের কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলেনি। তবু মিডিয়া প্রচারিত এই সমস্ত খবর সাধারণ নাগরিকদের মনে এমন মারণ-গেমের অস্তিত্বটাকেই সুনিশ্চিত করে দেয়।

‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে লেখাটির সূত্রে দেশের অন্দরেই প্রবল আলোচনার মুখে পড়ে ‘নোভায়া’। ‘মেদুজা’ বলে একটি সংবাদসংস্থা লিখল, মৃতদের মধ্যে অনেকেই একটি সোশ্যাল মিডিয়ার (ভিকে) গ্রুপের সদস্য। তাই একটি অনলাইন গেম টিনেজারদের আত্মহত্যায় বাধ্য করছে। ‘নোভায়া’র এমন যুক্তি নির্মাণ অতি সরলীকরণের ফল। মৃতদের একাংশ ওই গ্রুপের সদস্য, কারণ নানা মানসিক যন্ত্রণায় বিদ্ধ টিনেজারেরা ভিড় করেছে ওই গ্রুপে। তার মানে এই নয় যে, ওই গ্রুপ বা সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়া কোনও মারণ খেলা তাদের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছে। তাদের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার কারণের সঙ্গে এমন কিছুর যোগের কোনও প্রমাণ এখনও অবধি মেলেনি। ঘটনা হল, রাশিয়ায় যুবদের মধ্যে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার হার অত্যন্ত বেশি। রাশিয়ার শিক্ষা মন্ত্রকের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী বয়ঃসন্ধিকালে থাকা ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৬২ শতাংশের আত্মহত্যার কারণ পারিবারিক সমস্যা, সাধারণ মানসিক চাপ, শিক্ষক-বন্ধুদের সঙ্গে মতান্তর এবং বড়দের হাতে নির্যাতিত হওয়ার আতঙ্কে। এই তথ্য রাশিয়ায় তথাকথিত ‘ব্লু হোয়েল’ গেম খেলে শতাধিক টিনেজারের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার খবরটির সত্যতা সম্পর্কে সংশয় আরও বাড়িয়ে দেয়। যদিও তথ্য ঠিক করে যাচাই না করে সংবাদের অনলাইন ‘কপি-পেস্ট’-এর এই যুগে কোনটা রটনা বা ফেক আর কোনটাই বা সঠিক, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বিচার করা মুশকিল হয়ে পড়ে। মানুষ তখন ‘সেনসেশন’ ছড়াতে ওস্তাদ ট্যাবলয়েডগুলি গোগ্রাসে গিলে ‘আর্বান লেজেন্ড’ ছড়ানোর অন্যতম টুল হয়ে পড়ে।

ক’দিন ধরে এ রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া ‘মোমো সুইসাইড’-এর আতঙ্কও এই গোটা গল্পেরই একটা অংশ। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘মোমো সুইসাইড’-এর সঙ্গে। কোনও রকম তথ্য প্রমাণ ছাড়াই রাজ্যের প্রথম সারির কয়েকটি দৈনিক সরাসরি আত্মহত্যাগুলিকে এই খেলার শিকার বলেও ঘোষণা করেছে। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। ‘ব্লু হোয়েল’ পর্বের মতোই বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘মোমো সুইসাইড’-এর মেসেজ পাওয়ার ‘খবর’ আসছে। ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি মৃত্যুকেও হয়তো এই নতুন গেমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আদৌ সেই মৃত্যুগুলির নেপথ্যে এমন কোনও খেলার ভূমিকা আছে কিনা বা আদৌ ‘মোমো সুইসাইড’এর অস্তিত্ব আছে কিনা, তা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হবে না মূলধারার মিডিয়া। বরং ‘ব্লু হোয়েল’-এর মতোই আরও একটি ‘আর্বান লেজেন্ড’ সাধারণ মানুষের মনে ছড়িয়ে দিয়ে পাঠক ‘ভিউ’ বাড়ানোর খেলাতেই তারা মগ্ন থাকবে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটস্‌অ্যাপের মাধ্যমে ভাইরাল হবে ‘মোমো-আতঙ্ক’।

সকলেই ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছেন, আর্জেন্তিনার এক ১২ বছরের বালিকা তার আত্মহত্যার দৃশ্যটি রেকর্ড করে। গোটা ঘটনায় অভিযোগের তির এক কিশোরের দিকে। যার সঙ্গে মেয়েটি হোয়াটস্‌অ্যাপে চ্যাট করত বলে দাবি করা হয়েছে। কিশোরের ডিপি-তে ছিল মোমো বলে চিহ্নিত সেই কুখ্যাত ডিপি (যা আদতে এক জাপানি শিল্পীর ভাস্কর্যের ছবি থেকে ক্রপ করা)। পুলিশের দাবি, মেয়েটির ফোন হ্যাক করে ভিডিওটি জোগাড় করার চেষ্টা হয়েছিল। অভিযুক্তের উদ্দেশ্য ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় সেটি আপলোড করা। প্রথম দিকে স্প্যানিশ মিডিয়ার মধ্যে সীমিত থাকলেও ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলি এই ঘটনার কথা ছাপতেই প্রায় বিশ্বেই হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে নতুন ‘মোমো সুইসাইড’ গেমের কথা। ঠিক যে ভাবে ছড়িয়েছিল ‘ব্লু হোয়েল’! বিভিন্ন ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করে ‘মোমো-বার্তা’ পাঠানোর এই ছক তাই পুরনো নয়। আমরা কি আরও একটি ‘আর্বান লেজেন্ড’ নিয়ে মাতামাতির দিকে এগোচ্ছি?

ঘটনা হল, ‘ব্লু হোয়েল’ই বলুন বা ‘মোমো সুইসাইড’, কোনওটিই এখনও প্রমাণিত নয়। সত্যের চেয়ে রটনার ভারই বেশি। সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটস্‌অ্যাপের যুগে যে রটনা বাস্তবের চেহারা নিতে দু’ সেকেন্ডও নেয় না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, কোনও কিছু যাচাই না করেই মূলধারার মিডিয়ার একাংশ এই রটনার অংশ হয়ে উঠছে। অনলাইন মারণ গেম নিয়ে দুনিয়া তোলপাড় হওয়ার এই পর্বে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। এক, একদল মানুষ জেনেবুঝেই এই ‘আর্বান লেজেন্ড’কে পোক্ত করছেন। আপন স্বার্থে সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রুপ খুলে বা ভুয়ো প্রোফাইল খুলে লোকেদের মেসেজ করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। আবার অনেকেই এর সুযোগে ভাইরাসের লিঙ্ক পাঠিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন এবং করতে পারেন। তিন, কেউ কেউ ‘আক্রান্ত’ হওয়ার দাবি জানিয়ে মিডিয়া এবং বাইরের জগতের কাছে ‘অ্যাটেনশন’ আদায় করে নিচ্ছেন। মনোবিদেরা সেই কবেই দেখিয়েছে, ‘আক্রান্ত’ হওয়া, হতে চাওয়া বা ভান করার মধ্যেও কী নিদারুণ ‘তৃপ্তি’ রয়েছে। আর সংবাদে তা প্রচার হলে তৃপ্তির মাত্রা কয়েক গুন বেড়ে যায় বইকি! এর বাইরে, এই সব মারণ খেলার অস্তিত্বের কল্পনা নাবালকদের থেকে আমাদের বড়দের আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে আমরা কেবল একটি ‘প্রশ্নহীন’ খেলাকে জুড়ে দিচ্ছি। মৃত্যুর এক সহজ ব্যাখ্যায় নিজেদের সমস্যাগুলিকে চেপে রাখছি। সমাজকে আমরা বুঝিয়ে দিচ্ছি, পরিবারের কোনও অশান্তির কারণে নয়, বাবা-মায়ের টানাপড়েনের মাঝে পড়ে নয়, বড়দের চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশার ভারে নয়, বয়ঃসন্ধির কোনও জটিল অঙ্কে নয়— ছেলেমেয়েগুলো আত্মঘাতী এই সব অনলাইন গেমের নেশায় পড়ে। উল্টে, এই ধরনের মারণ গেমের অস্তিত্বের আইডিয়াকে আমরা যত বেশি প্রশ্রয় দেব, তত বেশি করে ‘মেন্টাল হেলথ্‌’-এর আইডিয়াকে দুর্বল করব। এবং এই সমস্যায় ভোগা টিনেজারদের  লড়ার ক্ষমতা কমিয়ে ফেলব।

ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর ‘স্লেন্ডারম্যান’-এর এই নয়া দুনিয়ায় আমরা প্রত্যেকেই নজরদারির মুখে। কখনও সরকারি। কখনও বেসরকারি। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রায় কোনও মাথাব্যথা না থাকাটা, সেই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েও দেয়। এই অনলাইন নজরদারি এবং তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অপরের দ্বারা আমাদের নিয়ন্ত্রিত হওয়ার আতঙ্কও বাড়িয়ে দেয়। স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে কাউকে দিয়ে কোনও কাজ করানোর সম্ভাবনাটাও অমূলক বা অবাস্তবের নয়। তাই ‘শাট আপ ডান্স’-এর কিশোরের মতো কোনও অভিজ্ঞতা আর কারও হয়নি বা হবেও না— এমন দাবি কারও পক্ষেই নিশ্চিত ভাবে করা সম্ভব নয়। তাই ‘ব্লু হোয়েল’ বা ‘মোমো সুইসাইড’ গেম তৈরি কোনও দিনই সম্ভব নয়, এমনটাও এখনই বলা উচিত হবে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এখনই এই সব গেমের অস্তিত্ব আছে। রাশিয়া হোক বা ভারত, কোথাও-ই মৃতেরা এই গেমেরই শিকার— এমনটা নিশ্চিত করে বলার সপক্ষে কোনও প্রমাণ মেলেনি। টিনেজ সুইসাইডে তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই কাল্পনিক ওই সব খেলাকে জুড়ে দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি তাদের মধ্যে ‘মেন্টাল হেলথ্‌’ নিয়ে প্রশ্ন করা। বাবা-মা এবং সন্তানের মধ্যে তার সচেতনতা গড়ে তোলা। এই সব গেমের আতঙ্ক তৈরি করার চেয়ে ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে মেশাটা বেশি জরুরি। উপকরণ ছিল, থাকবে। আগে অসুখটাকে সারান।

 (ফলতা সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক)

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

দ্য ওয়ালের ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Comments are closed.