ব্লগ : যা কিছু হারায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    “একটি শিমুল আর আকাশ যেখানে মুখোমুখি চায় পরস্পরে”

    ‘এমন কে আছে, যার কখনও কিছু হারায়নি/এমন কে আছে যার কিছু হারাবার দুঃখ নেই’—লিখেছিলেন সুনীলদা। বড় সত্যি কথা। কত কিছুই তো হারিয়ে ফেলে মানুষ—বয়স, বন্ধু, কলম, বই, ছাতা, সময়—তালিকার শেষ নেই। এদের মধ্যে বয়স আর সময়—এই দুটি জিনিস মানুষ বোকার মতো লোহার সিন্দুকে লুকিয়ে রাখতে চায়। জেনেও মানতে চায় না যে, হা রে রে রে করে এসে কাল আর ব্যস্ততা তাদের লুঠ করে নেবেই। অতি-সতর্ক মানুষেরাও এই দুটি জিনিসকে চিরকাল সঙ্গে রাখতে পারেন না। আর যাঁরা তেমন সতর্ক নন, শুধু ‘বয়স’ আর ‘সময়’ নয়, তাঁরা হারিয়ে ফেলেন আরও অনেক কিছু। আমাদের বাড়িতে যেমন প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু আমরা হারিয়ে ফেলি। টোস্টার কেনার রসিদ, মেডিক্লেম এর সার্টিফিকেট, আধার কার্ড, সকাল এগারোটা পনেরোর ক্লাসে নিয়ে যাওয়ার বই, কলম, চিরুনি। খুঁজতে সময় যায় অর্ধেক বেলা। হারিয়ে ফেলে বোঝা যায় জিনিসের মর্ম। হারিয়ে ফেলা কিছু জিনিস খুঁজে পাই, কিছু আবার পাইও না। যেমন নতুন কেনা টোস্টারের রসিদটি আর খুঁজে পাইনি। ভাবতে ভালো লাগে যে, সে হয়তো আমাদের ময়লা কাগজ ফেলার ঝুড়ি থেকে তারাবাগের ডাস্টবিন হয়ে বেশ কয়েক জায়গা ঘুরে রিসাইকেলড হয়ে এখন ধোপদুরস্ত বেশে কোনও তরুণ কবির কবিতা লেখার খাতার তেত্রিশ নম্বর পাতা হয়ে বসে আছে। তবে সব হারিয়ে যাওয়া জিনিসের এমন কপাল হয় না। সবচেয়ে পোড়াকপালে হল টিপ। স্নানঘরে নারী তাকে নির্ঘাত হারিয়ে ফেলে আর সে রয়েই যায় স্নানঘরের আয়নার ডান কোণে। পরিত্যক্তা। সে হল গিয়ে চিরকালের সীতা।

    #

    আমাদের বাড়িতে আমরা সকলে মিলে নানা জিনিস হারাই বটে তবে বাইরে গেলে মূলত আমিই জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলি। জীবনে প্রথম প্লেনে চড়ে আমি গিয়ে নেমেছিলাম হিথরো এয়ারপোর্টে। প্লেনে ব্যাগ হারানোর নানা গল্প শুনে শুনে দুরুদুরু বক্ষে প্লেনে যখন প্রথম চেপে ছিলাম তখন অন্য অনেক ভয়ের সঙ্গে এই ভয়টাও ছিল বুঝি হারিয়ে যাবে আমারও ব্যাগ। যাওয়ার সময় হারালো না, কিন্তু আসার সময় চেকড-ইন ব্যাগ হারালো। সাতদিন পরে ফেরত পেয়েছিলাম সেই ব্যাগ—তখন অবশ্য বেশ অনেকখানি ছিঁড়ে গিয়েছে নতুন কেনা সেই ব্যাগের রেক্সিন। তবে ব্যাগ হারিয়ে অক্ষত অবস্থায় সেই ব্যাগ ফেরত পেয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায়। যাচ্ছিলাম মেলবোর্ন থেকে ক্যানবেরা। চল্লিশ মিনিটের ফ্লাইট। ছোট্ট এয়ারক্রাফট। মাত্র কুড়ি জনের বসার ব্যবস্থা। চেক ইনের সময় ক্রুরা আমার ঢাউস ব্যাগটি তো পাঠালই প্লেনের পেটের ভেতরে, এমনকী হ্যান্ডব্যাগটিও নিয়ে ওঠা যাবে না প্লেনে জানিয়ে দিল সে কথা। হাতে ধরিয়ে দিল ছোট্ট প্লাস্টিকের একটা ব্যাগ। নির্দেশ দিল জরুরি জিনিসপত্র তাতে ভরে নিতে। ততদিনে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে ঘুরে কিছু দুষ্প্রাপ্য বইয়ের জেরক্স করা হয়ে গিয়েছিল আমার। আমি তড়িঘড়ি করে সেই পাতাগুলি ভরে নিলাম ওই ছোট্ট প্লাস্টিকের ব্যাগে। আর নিলাম কিছুদিন আগেই খুব শখ করে কেনা হ্যান্ডিক্যাম। প্লেনে উঠে মনে পড়ল যে, পাছে পকেটমার হয় সেই অদ্ভুত আর অনর্থক ভয়ে আমি হ্যান্ডব্যাগেই রেখেছিলাম বেশ কিছু ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ষাট হাজার টাকা। তাড়াহুড়োয় দুষ্প্রাপ্য বইয়ের জেরক্স নিয়েছি, কিন্তু ভুলেছি ডলার! প্লেন নামল ক্যানবেরায়। কনভেয়ার বেল্টে একে একে আসতে থাকল সবার ব্যাগ। আমার ঢাউস ব্যাগটি ঠিকই এল, কিন্তু চেকড-ইন হয়ে যাওয়া ছোট হ্যান্ডব্যাগটি এল না। আমাকে রিসিভ করতে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়া কাউন্সিলের সেই সময়ের সেক্রেটারি ক্যারল নিজে। তিনিই কথাবার্তা শুরু করলেন কোয়ান্টাস এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড স্টাফদের সঙ্গে। কিন্তু ঘন্টা দুই এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেও কিছুতেই ব্যাগ পেলাম না। উলটে দেখলাম গ্রাউন্ড স্টাফদের একজন বেশ নির্বিকার মুখে জানিয়ে দিল ওই সময়েই মেলবোর্ন থেকে একটা প্লেন ছেড়েছে আমস্টারডামের উদ্দেশ্যে। আমার ব্যাগ সেখানে চলে গিয়ে থাকতে পারে। শুনে তো পিলে চমকে উঠেছিল আমার! ক্যারলের তৎপরতাতেই অবশ্য সেই ব্যাগ আমাকে কোয়ান্টাস পৌঁছে দিয়েছিল ক্যানবেরায় আমার ইউনিভার্সিটি অ্যাপার্টমেন্টে রাত দু’টোয়। ব্যাগ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আমি প্রথমে একটা বড় চেন আর তারপর একটা ছোট চেনে খুলে ফেলেছিলাম। দেখেছিলাম, যেমনটি ছিল, ব্যাগের এক কোণে ঠিক তেমনটিই শুয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ান ডলার। বুঝেছিলাম যে, ফুলের মতোই অর্থেরও কোনও দুর্ভাবনা নেই; সে নির্বিকার।

    #

    যে হ্যান্ডিক্যামটির জন্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম ডলার, সেই হ্যান্ডিক্যামটিও আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। গিয়েছিলাম শিমলা-কুলু-মানালি। সঙ্গী আমার অনেকদিনের বন্ধু সপ্তর্ষি প্রকাশনের সৌরভ-স্বাতী আর ওদের ইষ্টিকুটুম পাখির মতো মেয়ে মামাই। মানালিতে আমরা থাকতাম ঠিক বিপাশা নদীর ওপরে একটি হোটেলে, শহর থেকে একটু দূরে। রোজ রাতে সারাদিনের ভ্রমণের শেষে শহরের একটি বাঙালি হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে ফিরতাম বিপাশার পাড়ে। তো সেদিনও খাওয়া-দাওয়া শেষে একটা অটোয় উঠে বসেছি আমরা। পেছনের সিটে আমি, স্বাতী, সোমা, মামাই। সামনের সিটে সৌরভ আর তিন্নি, ড্রাইভারের সঙ্গে। অন্যদিন বাংলা কবিতা নিয়ে আমাদের কোনও কথাই হত না, কিন্তু সেদিন অটোয় উঠেই সৌরভ পড়ল বাংলা কবিতা নিয়ে। ব্যস, এমনই মশগুল হলাম বাংলা কবিতার রাজনীতির কাদা ঘাঁটতে যে, নামার সময় ভুলে এলাম একটি ব্যাগ, যেটি আমিই রেখেছিলাম অটোর পেছনে, কিছু ফলমূলের সঙ্গেই যে ব্যাগের ভেতরে ছিল সেই হ্যান্ডিক্যাম আর কিছু দিন আগেই কেনা আর একটি ডিজিট্যাল ক্যামেরা। পরের দিন খুব ভোরেই আমরা মানালি ছেড়ে চলে যাব। হোটেলে ফিরে অনেক রাতে ব্যাগ গোছাতে গিয়ে মনে পড়ল ক্যামেরাদ্বয়ের কথা। সঙ্গে সঙ্গে হোটেল থেকে বেরিয়ে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে রাস্তা থেকে একটা গাড়ি চড়া ভাড়ায় পাকড়াও করে আমি আর সৌরভ গিয়ে পৌঁছলাম অটো স্ট্যান্ডে। অল্প খুঁজতেই পাওয়া গেল আমাদের অটোটা। পাওয়া গেল পেছনের সিটে পড়ে থাকা ব্যাগ, দুটি ক্যামেরা, ফলমূল। পূর্ণচন্দ্র সেদিন ছিল আকাশে। জ্যোৎস্নার ভেতরে মৃদু হাসতে হাসতে আমার হাতে ব্যাগটি তুলে দিয়েছিলেন যিনি অটোর সেই ড্রাইভারকে আমার মনে হয়েছিল এক দেবদূত, ফেরেস্তা।

    #

    ব্যাগ আমি এতবার হারিয়েছি যে, এখন রাতের ট্রেনে গেলে সবসময় চেন দিয়ে বেঁধে রাখি ব্যাগ। প্লেনে গেলে বাধ্য না হলে সব জিনিস হ্যান্ডব্যাগেই ভরে নিই। আমার খালি ভয় করে, এই বুঝি হারিয়ে গেল আমার ব্যাগ! তবে আমি এমন একজন মানুষকে চিনি যিনি কায়মনবাক্যে চান যে, প্লেন-যাত্রায় তাঁর ব্যাগ যেন হারায়। আসলে, একবার ব্যাগ হারিয়ে ব্রিটিশ এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে মোটা টাকার ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন আমাদের এক সহকর্মী, তারপর থেকেই দেখতাম ওই মানুষটিও চাইতেন তাঁর ব্যাগও যেন হারায়। কিন্তু যে কয়েকবার আমি তাঁর সহযাত্রী হয়েছি প্লেন-এ, তাঁর ব্যাগ হারায়নি। কনভেয়ার বেল্ট দিয়ে তাঁর ব্যাগটিকে আসতে দেখলে তিনি যারপরনাই চটে যেতেন। বলতেন, ‘দেখেছ, আহাম্মক মোটা ব্যাগটা ঠিক হেলেদুলে হাজির হচ্ছে!’

    #

    তবে ব্যাগের চেয়েও আমি বেশি যা হারাই তা হল পথ। ক্লাস ইলেভেন-এ ভর্তি হয়েছি ক্রিশ্চান কলেজে। ঝাঁটিপাহাড়ি স্কুলের এক মাস্টারমশাইয়ের কাছে অঙ্কের টিউশন নেব ঠিক হল। এক দাদা আমাকে একদিন নিয়ে গিয়ে স্যারের বাড়ি দেখিয়ে দিল। যে দিন টিউশন শুরু হবে সেদিন আমি যাব একা। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে দু’ঘন্টা ধরে এ-গলি সে-গলি ঘুরে যখন গিয়ে পৌঁছলাম স্যারের বাড়ি তখন টিউশন শেষ হব হব! অবশ্য শুধু ছেলেবেলায় নয়, পরিণত বয়সেও আমি পথ হারিয়েছি বেশ কয়েকবার। সোমাকে নিয়ে গিয়েছি মেয়ের স্কুলে। ফেরার পথে স্কুটার নিয়ে ঢুকে পড়লাম এমন এক রাস্তায় যে শহর ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছিলাম আরও অনেক দূরে। সোমাই সম্বিত ফেরায়। ততক্ষণে অবশ্য সারি সারি ছবির মতো দূরে সরে যেতে শুরু করেছে চেনা পথঘাট। তবে, এ তো বাহ্য। পথ হারাবার শ্রেষ্ঠ ঘটনাটি ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়ায়। তখন অবশ্য আমি একা ছিলাম না। আমার সঙ্গী ছিলেন আমার মাস্টারমশাই ও সহকর্মী দেবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আছি পার্থে। কার্টিন ইউনিভার্সিটির ফেলো হয়ে। সেই সবে গিয়ে পৌঁছেছি অস্ট্রেলিয়ায়। আমাদের দু’জনকে প্রথম ক’দিন নিজের গাড়িতে দিনের শুরুতে ইউনিভার্সিটি নিয়ে যাচ্ছিলেন আর দিনের শেষে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে পৌছে দিচ্ছিলেন অধ্যাপক রিচার্ড নাইল। একদিন আমরা ঠিক করলাম বাসে করে নিজেরাই ফিরব। জেনে নিলাম স্টপের নাম। কিন্তু যথারীতি গল্প করতে করতে কখন সেই স্টপ পেরিয়ে গেলাম। সম্বিত যখন ফিরে এল তখন অনেক দূরে চলে গিয়েছি। হুটোপাটি করে নেমে পড়লাম বাস থেকে। তখন সন্ধে হয়ে গেছে। যেখানে নেমেছি, সেই জায়গার নাম জানি না। কাউকে যে জিজ্ঞেস করব তারও উপায় নেই। জনমনিষ্যি নেই চারপাশে। সারাদিনের কাজের ধকলে দুজনেই খুব ক্লান্ত। তাও হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি তো হাঁটছিই। অনেক পরে জানতে পারলাম সোয়ান নদীর যে পাড়ে আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট, চলে এসেছি একেবারে তার উলটো পাড়ে।

    #

    সেই রাতেও কিন্তু পথ খুঁজে খুঁজে ঠিকই ফিরে এসেছিলাম বাসায়। আসলে পথ হারিয়ে ফেলা মানুষও কোনও না কোনও ভাবে ঠিক ঘরে ফেরে। আর এখন তো গুগল ম্যাপের কারণে পথ হারিয়ে ফেলাই বেশ কঠিন। অবশ্য গুগল ম্যাপকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। মধ্যবিত্ত মানুষ আসলে ঠিকঠাক পথ হারাতে জানেও না। এই যেমন অন্য অনেকের মতোই আমারও তো কতবার ইচ্ছে হয়েছে ট্রেন থেকে অচেনা ছোট্ট স্টেশনে নেমে পথ হারিয়ে ফেলার। সেই সেখানে পৌঁছে যাওয়ার ‘একটি শিমুল গাছ নিয়ে আকাশের বেলা যেথা কাটে’। কিন্তু আজও তা হল কই! অবশ্য মাঝে মাঝে ভাবি, না-হয়ে ভালই হয়েছে। প্রান্তরের শিমুল গাছ হওয়ার ক্ষমতা মধ্যবিত্ত মানুষের নেই। সে হল বাড়ির পাশের ডোবার ধারের তালগাছ। তার প্রিয় পৃথিবীর কোণ। মনে মনে হারিয়ে যাওয়াতেই তার আনন্দ।

    জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।    

    The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More