শনিবার, মার্চ ২৩

হিংসার নির্বাচন, নির্বাচনের হিংসা

শামিম আহমেদ

পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনের মূল ভিত্তি। পাঁচজন মিলে ১৮৭০ সালে যে ব্যবস্থার সূত্রপাত, তা ১৯৫৭ সালে আইনসম্মতভাবে বিধিবদ্ধ হয়। আধুনিক পঞ্চায়েতি রাজ শাসনব্যবস্থা মহাত্মা গান্ধীর মস্তিষ্কপ্রসূত। তিনি চেয়েছিলেন, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠুক এই পঞ্চায়েতের উপর ভিত্তি করে। অহিংসার পূজারী মহাত্মা গান্ধীর স্বপ্ন কতদূর সফল হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দেখলে খানিকটা মালুম হয়।

নির্বাচনে হিংসা বাংলার এক প্রাচীন ‘ঐতিহ্য’। ভারতের কোনও প্রান্তে নির্বাচন নিয়ে এমন হানাহানি হয় না। গত পঞ্চায়েত ভোটে প্রায় ৩৪ শতাংশ জায়গায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক পক্ষ জয়ী হয়েছে কিন্তু সেখানেও হিংসার বলি ১৪। অভিযোগ–তৃণমূল কংগ্রেস বাকি রাজনৈতিক দলগুলিকে মনোনয়ন পেশ করতে দেয়নি, মনোয়ন কেন্দ্রের চার পাশে তারা সশস্ত্র বাহিনী রেখেছিল, যাতে সিপিএম, বিজেপি বা কংগ্রেস কেউ মনোনয়ন দাখিল করতে না পারে। এই অভিযোগ নিয়ে বিরোধী তিন দল আদালতে যায়। সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা আসনগুলির ফল ঘোষণা করতে পারবে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। এই আসনগুলির ফল ঘোষণার উপর এত দিন স্থগিতাদেশ ছিল।

কিন্তু সমস্যা হল, আদালত বৈধতা দিয়েছে মানেই এই একতরফা, বিনা লড়াইয়ে জয় কি নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ? এমন প্রশ্ন উঠছে। যাঁরা বা যে সব দল তুলছেন, তাঁদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দল কিন্তু রাজনৈতিক হিংসাকে তাদের রাজত্বে ‘বৈধতা’ দিয়ে এসেছিল। বলা যায়, হিংসা দিয়েই সেই ভোট-পর্ব শুরু ও শেষ হত। এমন কোনও নির্বাচন ছিল না যে ওই দল বুথ দখল করেনি, রক্ত ঝরায়নি। গ্রামে-পাড়ায় তীব্র মেরুকরণ ঘটিয়ে সম্বৎসর ‘দাঙ্গা’-র জমি প্রস্তুত রেখেছিল। দাঙ্গা সব সময় দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে হবে, এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ও হিংসার বীজ একদা বপন করেছিল যে পূর্বসূরি শাসক, আজ সে সবের ফসল উঠছে। বামপন্থী দলের যে ‘চেতনা’ বিস্তারের দায়িত্ব ছিল, তা তারা যে এক ফোঁটাও করেনি, তাদের চলে যাওয়ার পর তা ভীষণ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার মানে এই নয় যে, বর্তমান শাসক দল এই নিরিখে ন্যায্য কাজ করছে। সেই পুরনো লোকজনেরাই আজ নতুন দলে। আর বিজেপির কথা যত কম বলা যায়, তত ভাল। ক্ষমতা দখলের জন্য হিংসা, ক্ষমতায় থাকার জন্য হিংসাই তাদের মূল অস্ত্র। কিন্তু এই হিংসা রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে ততক্ষণ ‘ভাল’ যতক্ষণ সেই হানাহানির রাশ তাদের হাতে থাকে। রাশ আলগা কিংবা হাতছাড়া হয়ে গেলে তা আত্মঘাতী হয়ে পড়ে।

তবে উদ্বেগজনক চিত্রটি অন্য জায়গায়। তা সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হয়তো নয় কিন্তু তার ওজনও নেহাত কম নয়। কেন্দ্রীয় এক প্রতিবেদন বলছে, পশ্চিমবঙ্গে জাতি হিংসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ২৭টি জাতি হিংসা ঘটেছে, ২০১৭ সালে তা হয়েছে ৫৮টি। এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছে ২০১০ সাল থেকে, সে বছর সরকারি মতে ২১টি জাতি হিংসার ঘটনা ঘটেছিল। তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম এবং কংগ্রেসকে মনে রাখতে হবে, সার্বিকভাবে হিংসায় লাগাম না টানলে এই জাতিহিংসাকে আটকানো যাবে না এবং তাতে বিজেপিরই আখেরে লাভ হবে। একটা কথা বলা খুব জরুরি, তৃণমূল কংগ্রেস যে ৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে, নির্বাচন হলে তা কতখানি কমতো? আত্মবিশ্বাস রাখাটাও গণতন্ত্রের পক্ষে মঙ্গল। সমস্ত অ-বিজেপি দল মিলে কি ফ্যাসিবাদীদের জন্য বিরাট ময়দান খুলে দিচ্ছি না! বলছি না, এসো, বাংলার এই ফাঁকা মাঠ তোমাদের হিংসার জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করে দিচ্ছি?   

গ্রামের দিকে এমন চিত্রও দেখা গিয়েছে যে মনোনয়ন কেন্দ্রের কাছে পান সিগারেটের দোকানে দিনের বেলায় বরযাত্রী পান কিনতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খেয়েছেন। খোঁড়াতে খোঁড়াতে সেই লোক যখন নিজের গ্রামে ফিরে এসেছেন, তখন রসিকতা চালু হল, বরযাত্রীদের কনেপক্ষের লোকেরা পিটিয়েছে। এমন দিনও দূরে নয়, যে হারে হিংসাকে আমরা ‘প্রোমোট’ করছি।

শামিম আহমেদ দর্শনের অধ্যাপক। উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

ফাইল চিত্র 

Shares

Leave A Reply