শনিবার, এপ্রিল ২০

গৌর কারকের ‘পত্তনিকথা’ – গাছের জন্য, বন জঙ্গলের জন্য হাহাকার

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

পত্তনিকথা ।। গৌর কারক ।। একুশশতক ।।  ২০১৬ ।। ১০০/-

কিছুদিন ধরে মানুষ বুঝেছে বৃক্ষরোপণের অপরিহার্যতা। কারণ সভ্যতার নামে, উন্নয়নের স্বার্থে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। এখনো চলছে। এরকম একটা সময়ে গৌর কারক লিখলেন ‘পত্তনিকথা’। গাছের জন্য, বাগানের জন্য, বনজঙ্গলের জন্য হাহাকার বিষয় হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসে। বাঁকুড়ার সোনামুখীতে এক সময় গভীর জঙ্গল ছিল। আজও আছে সোনামুখীর জঙ্গল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জঙ্গলও পাতলা হয়ে গেছে। শহর লাগোয়া যে সব বড় বড় বাগান ছিল তাও আজ ইতিহাস। এরকম একটি বাগানের ‘রাখা’ মহাদেবকে কেন্দ্র করে বিন্যস্ত হয়েছে আলোচ্য উপন্যাস। বাবুদের বাগানের দেখভাল করা, পাহারার দায়িত্বে থাকা লোককে রাখা বলা হয়। গাছ ও ফল চুরির হাত থেকে রক্ষা করে। গাছের ফল অর্ধেক মালিকের। আর অর্ধেক রাখার। তাদের জীবন ও জীবিকা সম্পূর্ণতই বাগান-নির্ভর। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় গাছ-নির্ভর। গাছের সঙ্গে অন্তরের যোগ রাখাদের। যেমন এই উপন্যাসের মহাদেবের।

সারা বছর দিন কাটে বাগানের নির্জনতায় ডুবে থেকে। বাজার-হাট, লোকালয় ভালো লাগে না তার। যদিও বাগানকেও সেই অর্থে নির্জন বলা যায় না। বাগানে প্রতিনিয়ত শব্দ ঘুরে বেড়ায়। নানা সময়ে নানা রকম শব্দে গমগম করে বাগান। শব্দহীন সময় থাকে না। কখনও পাখিদের ডাক। কুহু-কুহু। বউ-কথা-কও। ঘুঘুর-চু। গরুদের হাম্বা। ছাগলের ব্যাঁ। এতো গেলো দিনের বেলা। রাতের বেলাও নিশ্চুপ থাকে না বাগান। রাতচরা পাখিদের চ্যাঁ-চ্যাঁ বা ডানার শব্দ। ঝিঁঝিঁ পোকাদের ঝিঁঝিঁ রব। শেয়ালের ডাকে প্রহর ঘোষণা। জীবজন্তুদের হাঁকডাক।

এসব থেকে দূরে এখন মহাদেব। তার কান্না পায়। নিজেকে ঘৃহবন্দী করে রাখে। দোতলায় শুয়ে দিন কাটে। এক মাসে তার বয়স বেড়ে গেছে। বাগানের মালিক অজয়বাবু বাগানের গাছ কেটে দিয়েছেন। প্লট করে জমি বিক্রি করছেন। সেখানে নতুন বসতি গড়ছে। নতুন নাম হয়েছে অজয়নগর।

ঘর-সংসার তাকে কোনও দিন টানেনি। খাবার সময় শুধু ঘরে এসে খেয়ে যেতো। বৈশাখ-জৈষ্ঠি মাসে ঘরে খেতেও আসত না। গাছে গাছে ফল ঝুলে থাকত। একটু এদিক ওদিক হলেই এ-গাছের ডাঁসা কাঁঠালটা বা ও-গাছের আমটা লোকে পেড়ে নিয়ে চলে যেত। সে সময় দিনরাত বাগানে পাহারা দিত। ছেলে কার্তিক বা তার মা খাবার পৌঁছে দিত বাগানে।

“আটফুট, দশফুট বেড় দেওয়া গাছগুলো অসহায়ভাবে করাতের কাছে হার মেনে, বাতাসে শেষ শব্দ তুলে স্থান নিচ্ছে চারা হয়ে জন্মে বড়ো হওয়া সেই মাটির কোলে।” তারপর কুড়ুল দিয়ে ঝুপ-ঝাপ শব্দ করে কাটা হচ্ছে ডাল পাতা। তারপর ঝরঝর শব্দে ডাল থেকে কাটা হচ্ছে পাতা। গুঁড়ি, কাটা ডাল ট্রাকে চেপে চলে যাচ্ছে কাঠকলে। তিনরকম শব্দ মিলেমিশে অদ্ভুত একটা শব্দ তৈরি করছে। সে শব্দে গাছেদের কান্না, দীর্ঘশ্বাস, হা-হুতাশ সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। মহাদেব ঘরে বসেও শুনে বুঝতে পারে সব।

রাতে ঘুম থাকে না। চুরি করার সময় রাতে। ফল না থাকলেও রাতে না ঘুমনোর অভ্যেস রপ্ত হয়ে গেছে মহাদেবের। ভোরবেলা উঠে চলে যায় বাগানে। কদিনের মধ্যে ন্যাড়া হয়ে গেছে পুরো বাগান। কোথাও গাছের চিহ্ন নেই। যেদিকে চোখ যায় শুধু ফাঁকা আর ফাঁকা। পঁচিশ-ত্রিশ বিঘের বাগানে শদেড়েক গাছের মধ্যে ওইদিকে শুধুমাত্র বেলগাছটি একা দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে একা দাঁড়িয়ে আছে মহাদেব। বুকটা হুহু করে ওঠে। মাথা থেকে পা ঘামে ভিজে যায় সে। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় দীর্ণ হয়ে ওঠে।

গাছ বিক্রির কিছু টাকা পেয়েছে সে মালিকের কাছে। সেই টাকায় ছেলে একটা কুয়ো তৈরি করেছে। মহাদেব মাঝে মাঝে সেই কুয়োতলায় এসে বসে। তাকে বসতে দেখে পাখিরা উড়ে আসে ওর মাথার কাছে। ঘিরে ধরে ওকে। কিচিরমিচির কিচিরমিচির শব্দ করে অভিযোগ জানাতে থাকে। অনেকদিন পর মহাদেব ওর চেনা পাখিগুলোকে দেখে খুশি হয়। ওদের দিকে তাকায় আগেকার দৃষ্টিতে। পাখিরাও বোঝে সেই দৃষ্টি। কেউ ডানা মেলে মাথার উপর হাওয়া করে। কেউ এসে বসে পায়ের কাছে। যেমন বসত বাগানে। ওরাও কথা বলে। মহাদেব বুঝতে পারে তাদের কথা। কোনও উত্তর দিতে পারে না।

মহাদেবের আজন্মলালিত গাছপালা দেখার চোখ, মানুষজন দেখতে ভালোবাসে না। আবার বাগানপাড়ার টানটাও ফেলতে পারে না। অজয়নগরে চলে যায় সে। সেখানকার সভাপতি মহাদেব। অজয়বাবুই তাকে সভাপতি করেছে। অজয়বাবু ভোটে দাঁড়িয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছেন।

সদ্য বেড়া দেওয়া জায়গাটা দেখে মনে পড়ে সেখানাকার জামগাছটার কথা। বাগানের একটি জামগাছের প্রতি বড় মায়া ছিল মহাদেবের। মহাদেবের মতো তার বাবাও জাম খেতে বড় ভালোবাসত। তার বাবা কোনও দিন মাটিতে পড়ে থাকা জাম কুড়িয়ে খায়নি। একদিন মহাদেব ও তার বাবার খুব খিদে পেয়েছিল। বাপ-বেটায় গাছের ডালে বসে জাম খাচ্ছে। বাবা আছে নীচের একটা মোটা ডালে। মহাদেব উঠেছে আরও উপরের দিকের ডালে। এমন সময় হঠাৎ মড়মড় চড়াং শব্দ। মহাদেব তাকিয়ে দেখে মোটা ডালটা ভেঙে পড়ে যাচ্ছে নীচে। ডালের উপর বাবা। মাটির কাছাকাছি আসতেই ডালটা হঠাৎ পালটি খেয়ে যায়। ওর বাবা নীচে। মারা যায় বাবা।

সেই জায়গা কিনে ঘর করছে একজন শিক্ষক সমীর ঘোষ। সমীরের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে যায় মহাদেবের। প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ি তৈরি দেখে। গৃহপ্রবেশেও উপস্থিত থাকে। এক-দুদিন ছাড়া ছাড়া সন্ধেবেলা মাষ্টারের বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দেয়। এরই মধ্যে অদ্ভুত অসুখ হয় সমীরের। বোবা হয়ে ঘরে বসে থাকে। অনেক বড় বড় ডাক্তারও তার অসুখ সারাতে পারে না। মহাদেব দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণে দেখে শীত পেরিয়ে চৈত্র মাস এলে বোবা হতে থাকে সমীর। বিশ-ত্রিশটি থেকে পাঁচ-সাতটি, দু-তিনটি কথা থেকে একেবারে চুপ। সারাদিন মুখ থেকে কোনও কথা বের করে না। চা, জল, ভাত, মুড়ি সামনে নামিয়ে দিলে কোনোদিন খায়, কোনোদিন খাইয়ে দিতে হয়।

ভাবতে ভাবতে মহাদেবের মনে হয় সমীরের অসুখের সঙ্গে জামের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বহু খোঁজ খবর করে জাম গাছের সন্ধান পায়। পরখ করে দেখে সে। জাম গাছে, জামে রং আসে। জাম পাকে। একটি দুটি করে জাম কমতে থাকে গাছে। একটি দুটি করে কথা ফুটতে থাকে মাস্টারের মুখে। জাম শেষ। মাস্টারের বোবা অবস্থা শেষ। মহাদেব খুব ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়েছে ঘটনা দুটো। রোগটা ধরতে পেরে খুশি হয় সে। গাছ রোগ গাছেই সারবে।

সময়ের তালে তাল মিলিয়ে সমীরের রোগ ধরে। রোগ ছাড়ে। কোনও ওষুধে কাজ হয়নি। মহাদেব সমীরের বাড়িতে গিয়ে বলে তার অনুভবের কথা। এখানে একটা বড় গোলাপজামের গাছ ছিল। সেই জামগাছে ব্রহ্মদৈত্যি বাস করত। এখন জামের সময় ঠাকুর গাছ না পেয়ে মাস্টারের শরীরে ভর করছে। মহাদেবের পরামর্শে মাস্টারের ঘরে জাম গাছ প্রতিষ্ঠা হয়। মহাদেব দাঁড়িয়ে থেকে সব ব্যবস্থা করে। নিজে সে উপবাসও করে।

কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো চলছে। সঙ্গে মেয়েদের উলুধ্বনি। শাঁখ বাজানোর শব্দ। পুজোর শব্দগুলো শুনতে শুনতে মহাদেবের কানে ভাসে অনেকদিন আগে শোনা তিনটে শব্দ। “করাতের ঘস্‌র-ঘস্‌র। কুড়ুলের ঝুপঝাপ। আর কাটারি দিয়ে ডালপালা কাটার শব্দ ঝরঝর। সেই শব্দ তিনটের সঙ্গে, পুজোর তিনটে শব্দের কত অমিল। অথচ সবগুলোই শব্দ। কোনোটি পতন করার। কোনোটি পত্তন করার।” যজ্ঞির শেষের দিকে ব্রাহ্মণ সবটুকু ঘি একসঙ্গে ঢেলে দেন আগুনে। দাউদাউ জ্বলে উঠে আকাশ ছুঁতে চায়। মহাদেব দেখে—“আগুনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জামগাছটাও বেড়ে উঠেছে তরতর করে। গাছটাকে বড়ো হতে দেখে পাখ-পাখালিরা আবার ফিরে আসে। ফিরে আসে বৈহ্মদত্যিও। আর সমীর ছাদে উঠে মহাদেবকে বলে, জ্যাঠাবাবু, কোন থবার জামগুলো আগে পাকবে বলুন তো!”

বাংলা গল্প উপন্যাসে ‘রাখা’—এরকম পেশার চরিত্র ইতিপূর্বে আমাদের চোখে পড়েনি। সেদিক থেকে গৌর কারকের এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের চরিত্রের সীমানাকে কিছুটা ব্যাপ্ত করেছে। কিছুদিনের মধ্যে এই পেশাটিরও আস্তিত্ব থাকবে না। ‘পত্তনিকথা’র মতো কিছু লেখায় বেঁচে থাকবে তারা। গাছেদের যে সবকিছুই তাদের খুব চেনা। গাছেদের সঙ্গে তাদের আশ্চর্য এক মানবিক সম্পর্ক। পরিবেশবাদীদের বৃক্ষপ্রীতির সঙ্গে রাখাদের গাছের প্রতি ভালোবাসাকে মেলানো যায় না। এই উপন্যাসে লেখক মানুষের সঙ্গে গাছের সম্পর্কের প্রতিটি স্তরকে উন্মোচিত করেছেন। সুখ-দুঃখ-ভালোবাসার অন্য একটি সুর, অন্য একটি স্বর ধ্বনিত এখানে। মানুষের সঙ্গে মনুষ্যেতর প্রাণী নয়, মানুষের সঙ্গে গাছের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উপস্থাপিত হওয়ায় অন্য মাত্রা পেয়েছে।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Shares

Leave A Reply