শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

ব্লগ: গোমড়াথেরিয়াম/ হাসি কান্না – মার্কিন দেশে আইটি বাবল বার্স্টের গল্প

সন্দীপ বিশ্বাস 

তখন বিংশ শতাব্দী শেষ হব হব করছে। নিউ জার্সিতে ইটনটাউন বলে একটা জায়গায় থাকি আমরা। সে বড় সুখের সময়। মার্কিনদেশে তখন সবাই খুব ফুর্তিতে আছে। ডাও আর ন্যাসড্যাক (ওদেশের স্টক মার্কেটের সূচক, যেমন আমাদের সেনসেক্স) আকাশচুম্বী। এমনিতেই চাকরির কোনও অভাব নেই, তার ওপর আসন্ন দু’হাজার সালের চিন্তায় প্রচুর বিনিয়োগ হচ্ছে। মূলত (দক্ষিণ) ভারত থেকে কোটি কোটি ছেলে-মেয়ে শুধুমাত্র “কম্পিউটার করি” বলে হাজির হচ্ছে শ্যামচাচার দেশে, আর দিব্যি জাঁকিয়ে বসেছে। আমাদের পরিচিতের সংখ্যা তখন এতই বেশি যে সবাইকে ঠিকমতো সময় দেওয়াই মুশকিল। উইকএন্ডে কারও না কারও বাড়ি পার্টি তো আছেই, সময়ের অভাবে অনেকসময় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই তা শুরু হয়ে যেত। সেখানে ছেলেদের আলোচনার বিষয় স্টক-মার্কেট, গাড়ি আর বাড়ি। মেয়েদের যথারীতি শপিং আর সোনা। কমন টপিক ভেকেশান। কমন ফ্যান্টাসি – ইন্ডিয়া ফেরা। যার বাড়িতে পার্টি সেই মহিলা রান্না-বান্নার ধারও ধারতো না… খাবার-দাবার সবই দোকান থেকে আনানো – যে দোকানের যেটা সেরা সেইটাই। আমাদের বাড়ি থেকে দশ মিনিট দূরে আটলান্টিক তটরেখা। বিশেষত গরমকালে বন্ধুদের আসা ভীষণ বেড়ে যেত। বিকেল নাগাদ একটা ফোন – “বাড়িতে আছিস ? আসছি। বিচে যাব।” তারপর সবাই মিলে বিয়ার-টিয়ার নিয়ে রাত অবধি বিচে লাট খাওয়া।

চাকরি করতাম এটি অ্যান্ড টি-তে। বিশাল কোম্পানির বিশাল ব্যাপার। আমার জন্য বরাদ্দ যা কাজ তা শেষ করতে দিনে দু’তিন ঘন্টার বেশি সময় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রত্যেকেরই একই অবস্থা, কারণ কর্মচারীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই বেশি। বাকি সময় চা-কফি-আড্ডা। দীর্ঘমেয়াদী লাঞ্চ। বেশ একটা আমাদের সরকারি অফিসের মতো পরিবেশ। কখনো বোর হয়ে যদি ভাবলাম যে বরাদ্দ কাজের বাইরে আর-একটু কিছু করি তো আমার পাশের ছেলেটা হয়তো চিন্তিত হয়ে পড়লো – তার তাহলে সময় কাটে কি করে ? হয়তো একটা বড় মিটিং ডাকা হয়েছে – তার অ্যাজেন্ডা ঠিক করার জন্য আগে একটা ছোট মিটিং হতেও দেখেছি। একটাই অসুবিধা ছিল – অফিস ছিল বাড়ি থেকে চল্লিশ মাইল দূরে, যাতায়াতে বেশ খানিকটা সময় চলে যেত। তাই যখন সুযোগ এলো বাড়ির একদম কাছে একটা স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার তখন কোনওরকম দ্বিধা করি নি মোটেই।

নতুন মিলেনিয়াম সবে পড়েছে, আর সাল দু’হাজারের জুজুর ভয় কাটিয়ে সবাই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ঈটনটাউনেই একটা রাস্তা ছিল, সেখানে দু’পাশে ছিল নানারকম গুদামঘর যাতে মুরগি থেকে শুরু করে বিভিন্ন হাবিজাবি জিনিস রাখা থাকত। চোখের সামনে সেগুলো পাল্টে গেলো রাতারাতি, আর তাদের জায়গা নিলো একের পর এক হাই-টেক টেলিকম-সংক্রান্ত স্টার্ট-আপ কোম্পানি। সবগুলোরই নেপথ্য গল্প প্রায় একইরকম – এক বা দু’জনের মাথায় কোনও আইডিয়া এসেছে, চাকরি-বাকরি ছেড়ে নিজের বাড়ির বেসমেন্টে সেই নিয়ে বেশ কিছুদিন কাজ করার পর এখন কোম্পানি খুলেছে। ট্যাকিয়ন নেটওয়ার্কসে যখন যোগ দিই তখন কর্মীসংখ্যা মাত্র জনা-কুড়ি। বিশদ আলোচনার অবকাশ নেই, অতি সংক্ষেপে বলি… আমরা লড়ছিলাম একটা ছোট বাক্সের মতো দেখতে প্রডাক্ট বানানোর জন্য যেটা টেলিকমের নানারকম সমস্যার সমাধান খুব সহজেই করতে পারে। ছোট জায়গায় কাজের চাপ বেশি, কারণ সবাইকেই সবকিছু দেখতে হয়। তবুও খুব আনন্দে ছিলাম দুটো কারণে – কাজটা খুব মনের মতো ছিল, আর লাঞ্চ খেতে বাড়ি আসতাম এতই কাছে অফিস। তখন স্টার্ট-আপে চাকরি করা বেশ একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাছাড়া আমাদের কোম্পানির একটু নামও হয়ে গেছে – দেখতে দেখতে কর্মীসংখ্যা একশো পেরিয়ে গেল। স্থান সংকুলান আর হয় না, তাই কাছেই একটা অত্যন্ত ঝাঁ-চকচকে বাড়িতে অফিস স্থানান্তরিত হলো। সেখানে প্রায় পাঁচতারা ব্যবস্থা – প্যান্ট্রিতে অঢেল খাওয়া-দাওয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, তাছাড়া জিম, এবং টিটি ইত্যাদি খেলার ঢালাও আয়োজন। একটি দক্ষিণ ভারতীয় সহকর্মী ছিল – ব্যাচেলর – সে থাকা-খাওয়া সবই সারতো অফিসে। বাড়ি-টাড়ি কিচ্ছু ভাড়া নেয়নি (অফিসের মধ্যে শোওয়ার ব্যবস্থাও ছিল), আর খাওয়া তো মুফতে – অর্থাৎ সারা মাসে তার কোনও খরচ ছিল না বললেই চলে ! গাড়ি একটা ছিল, তার মধ্যেই জামা-কাপড় মায় আন্ডি পর্যন্ত ঝুলতো তার ! হাড়-কেপ্পন কতরকমের যে হয় !

দেখতে দেখতে এক সাল পড়লো। প্রডাক্ট প্রায় তৈরী, এখন শুধু খদ্দের জোগাড়ের অপেক্ষা। আমাদের নাম-ডাক খুব ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ এরকম জিনিস আগে কেউ আর বানায়নি। অফিসের পার্কিং লটের একপাশে হেলিপ্যাড – সেখানে মাঝে মাঝেই নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো জায়গা থেকে লোকজন আসে কভার করতে। আমরা সবাই প্রচুর স্টক পেয়েছি, কোম্পানি পাবলিক হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা … তারপর আর আমাদের পায় কে ? বোধহয় ফেব্রুয়ারি নাগাদ চারিদিকে শোরগোল – একটা বিরাট বড় টেলিকম কোম্পানি আমাদের কিনতে চেয়ে বিশাল অফার দিয়েছে। চেনা-জানারা ফোন করতে শুরু করলো – “মিলিয়নিয়ার হয়ে গেলে তো” ? মনের আনন্দ মনেই চেপে বিনয়ের অবতার হয়ে আছি যথাসাধ্য। কিন্তু কিছুই হল না – আমাদের সিইও ঐ দামে রাজী হলো না, তাই শেষ পর্যন্ত কেঁচে গেলো ডিলটা। ক্ৰমশ খবর আসতে লাগল যে টাকা প্রায় শেষ, খুব শিগগিরই বিক্রিবাটা কিছু না হলে কোম্পানি চালানো মুশকিল হয়ে যাবে। জুন মাসের এক সকালে অফিসে গিয়ে জানা গেলো যে অদ্যই শেষ রজনী, আজই অফিশিয়ালি জানা যাবে যে কাল থেকে আর আসতে হবে না। টেনশন কাটাতে আমরা কয়েকজন ভারতীয় পার্কিং লটে রোদের মধ্যে ক্রিকেট খেললাম খানিকক্ষণ। কাজকর্মের কোনও প্রশ্নই নেই, শুধু দল বেঁধে আলোচনা আর গুলতানি। সবাই চিন্তিত, শুধু এক সাহেব কলিগ বললো যে তার জন্য নাকি ভালোই হয়েছে, কারণ সে এখন আবার তার “রেসিং কেরিয়ারে” মনোনিবেশ করতে পারবে। কী রেসিং করতো সে বলেছিল কিন্তু মনে নেই আর। দুপুর নাগাদ দুঃসংবাদটা এলো, এবং প্রায় দেড়শো জন বেকার হয়ে বাড়ি ফিরলাম।

পরদিন থেকে অফিস-কাছারির ঝামেলা আর নেই। আমার মা তখন ওদেশে বেড়াতে গেছেন – সব শুনে-টুনে তাঁর চোখ তো গোল গোল হয়ে উঠেছে। কাল অবধি অফিস গেলি, আজ থেকে আর যাস না – এই ব্যাপারটা হজম হয় না তাঁর কিছুতেই। আমার মেয়ে সবে স্কুল যাওয়া শুরু করেছে, তখন তার সামার ভেকেশান … তাকে বোঝানো হলো যে বাবারও এখন সামার ভেকেশান চলছে। এদিকে চিন্তায় আমার স্ত্রী আর আমার ঘুম নষ্ট। তাও আমাদের একটা সুবিধা ছিল – গ্রীন কার্ড হয়ে গেছে ততদিনে, তাই ভিসা নিয়ে চিন্তা নেই। সহকর্মীদের মধ্যে অনেক দেশী মানুষ ছিল যারা তখনও এইচ ওয়ান বি ভিসায়। যারা জানেন না তাদের জ্ঞাতার্থে বলি – এই ভিসাটি কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, কোম্পানি নেই মানে তোমার ভিসাও নেই – অর্থাৎ তুমি বেআইনিভাবে ওদেশে আছো। আমাদের বাড়ির আশেপাশে এরকম অনেকেই থাকতো, তাদেরই একজন – একটু শুঁটকোমতো এক মারাঠি ছেলে – একদিন বিচে গিয়ে দেখি বেগে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দেখা হতেই গোপন কথা বলার ভঙ্গিতে জানালো – “আমার কিন্তু ভিসা নেই – কাউক্কে বোলো না” ! পরে বুঝলাম যে এই কথা সে সবাইকেই বলছে, এবং সকলকেই বলে দিচ্ছে কাউকে না বলতে! দোষ দিই না ছেলেটিকে – ওই পরিস্থিতিতে একটু পেগলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় কিছুই ! আমাদের প্রডাক্টের যে সফটওয়ার লেখা হয়েছিল তার প্রচুর সিডি কী করে জানি আমার কাছে থেকে গিয়েছিলো – আমার শিশুকন্যাকে সেগুলো দিয়ে দিলাম। সে খেলাধুলো করতো চকচকে জিনিসগুলো নিয়ে, কখনো রং-চং দিয়ে আঁকিবুকি কাটতো সেগুলোর ওপর… আর আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবতাম যে কত সফটওয়ার এঞ্জিনিয়ারের কতদিনের কত চিন্তা আর পরিশ্রমের ফসল এইগুলো – আজ তাদের কী দশা ! স্টকের কাগজগুলোও ধরে জঞ্জালে ফেলে দেওয়া হলো একদিন !

পাগলের মতো চাকরি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু কোথায় চাকরি ? চারিদিকে তখন হাহাকার, বিশেষত টেলিকম সেক্টরে। আজ লুসেন্ট থেকে দশ হাজার ছাঁটাই হলো, তো কাল অমুক কোম্পানি উঠে গেলো। ঈটনটাউনের সেই রাস্তা, যেখানে রাতারাতি সব স্টার্ট-আপ কোম্পানি গজিয়ে উঠেছিল, সেখানে আবার ফিরে এসেছে সেই মুরগির গুদাম ইত্যাদি। ম্যানহাটানে একটা জব ফেয়ারে গিয়েছি – বিশাল ভিড়, বেশ কিছু চেনা লোকের সাথেও দেখা হয়েছে। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ – হঠাৎ চোখ পড়লো লাইনের একদম পেছনদিকে। দেখি … এটিঅ্যান্ডটি-তে অনেক ওপরতলার একজন ছিল – ডেভিড – দশাসই চেহারার সাহেব … সেও আমারই মতো দাঁড়িয়ে আছে চাকুরিপ্রার্থী হয়ে – একই লাইনে! নিউ জার্সিতে পেট্রোল পাম্পে তেল ভরার লোক থাকত (বেশির ভাগ স্টেটেই থাকে না) – একদিন দেখি চেনা পেট্রোল পাম্পে একজন নতুন দেশী লোক কাজ করছে… চেহারা দেখে কেমন সন্দেহ হলো… জিজ্ঞেস করে জানলাম যে সে সম্প্রতি লুসেন্ট থেকে ছাঁটাই হয়েছে। আর এক বাঙালি ভদ্রলোককে জানতাম – ছাঁটাইয়ের খবর শুনে তার ওইখানেই একটা স্ট্রোক হয়ে যায়, তখন কোম্পানি তাকে আরো কিছুদিনের জন্য চাকরিতে রেখে দেয়। আর একজন – ওয়ালমার্টে চেক-আউট কাউন্টারে চাকরি নিল – জিনিসপত্র স্ক্যান করে ঘন্টায় বোধহয় আট ডলার কামানোর জন্য (যা তার পূর্বতন মাইনের তুলনায় নিতান্তই নস্যি) ! আমাদের পার্টি-টার্টি প্রায় বন্ধ। নেহাৎ হলেও তার চেহারাই পাল্টে গেছে। গৃহকর্ত্রী কোমর বেঁধে রান্না করছে, বাড়ির লোকটি সাহায্যে ব্যস্ত। মেনুও বেশ করুণ! আলোচনার বিষয়বস্তু  চাকরি-বাকরি, অথবা নানাজনের নানারকম ভয়াবহ সব গল্প। কে অনেকদিন চাকরি নেই বলে দেশে ফিরে গেল … গাড়ির লোন শোধ হয় নি, তাই সেই গাড়ি এয়ারপোর্টের লং টার্ম পার্কিং লটে রেখে ইন্ডিয়া হাওয়া! কে বা যাওয়ার সময় ক্রেডিট কার্ডের প্রচুর ধারের এক পয়সাও শোধ করে যায় নি, উপরন্তু ক্যাশ অ্যাডভান্স বাবদ যতখানি সম্ভব টাকা তুলে নিয়ে গেছে। আর “ইন্ডিয়া ফেরা” তখন আর ফ্যান্টাসি নয়, আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ! তারপর ৯/১১, এবং মুখ থুবড়ে পড়ার যেটুকু বাকি ছিলো তা সম্পূর্ণ হলো। ভাগ্যক্রমে বস্টন এলাকায় একটা চাকরি পেয়ে গেছি ইতিমধ্যে – নতুন অফিস জয়েন করার মিনিট পনেরোর মধ্যে ভয়ংকর দুর্ঘটনাটা ঘটে যায়! সে আর এক অদ্ভুত গল্প – অন্য কোনও সময় বলা যাবে।

২০০৩ সাল নাগাদ কোনও কাজে বস্টন থেকে নিউ জার্সি গিয়েছি। এটিঅ্যান্ডটি-র যে অফিসে চাকরি করতাম তার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একবার ভিতরে ঢুকে দেখি। বিশাল পার্কিং লট সম্পূর্ণ ফাঁকা, সর্বত্র আগাছা জন্মে কংক্রিট প্রায় ঢেকে ফেলেছে। বিশাল বাড়িটাতে একটাও লোক নেই – হানাবাড়ির চেহারা নিয়েছে সেটা। চুপ করে গাড়িতে বসে রইলাম খানিকক্ষণ… এই বাড়িতে প্রায় তিন বছর সপ্তাহে পাঁচদিন করে এসেছি, অন্য হাজারদশেক লোকের মতো – কত কথা কত ঘটনা মনে পড়ে গেলো। ভাবলাম, কোথায় এখন তারা ? ডলার মিলিয়নিয়ার হওয়া আমার হয়নি, আর কোনওদিন তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারবো না। শুধু চিরকাল মনে থেকে যাবে যে আমেরিকার সোনার দিন আমি দেখেছি, যেরকম সময় তার পরে আর আসেনি আজ পর্যন্ত। এবং … হাসির পরে কান্নাও !

লেখক ব্যাঙ্গালুরু নিবাসীপেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।

Leave A Reply