সোমবার, এপ্রিল ২২

সন্ধিকালের আধারে পরিবর্তনের আখ্যান

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

‘সাহেবকুঠি’, গৌতম দাস, গাঙচিল, ১৭৫ টাকা

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলার আকাশে বাতাসে মুখর হয়ে আছে ‘পরিবর্তন’ শব্দটি। সেই মুখরতার মধ্যেই বাঙালি পাঠকের হাতে এল আর এক পরিবর্তনের আখ্যান, গৌতম দাসের ‘সাহেবকুঠি’। এই উপন্যাসের পরতে পরতে পরিবর্তনেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু উল্লেখ করা প্রয়োজন গৌতম এই উপন্যাস লিখেছেন কুড়ি বছর আগে। তারও প্রায় কুড়ি বছর আগের কাহিনি নিয়ে। কুড়ি বছর বাক্স বন্দী থাকার পরে এই সবে গ্রন্থিত হয়েছে। এখান থেকেই বোঝা যায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সঙ্গে এই কাহিনির অমিল।

সত্তরের দশক। মফস্‌সল শহরে তখন সদ্য টিভি এসেছে। সংকীর্তন, কথকতা, পালাগান, রামযাত্রার চল অল্প-বিস্তর রয়েছে তখনও। কোথাও কীর্তন গান হলে ভিড় করে মানুষ। এই উপন্যাসে গৌরের ঠাকুমা যোগমায়ার বড় সাধ ছিল তাঁর বাড়িতে পালাকীর্তন হোক। মায়ের এই ইচ্ছে পুরণ করেছিলেন কালাচাঁদ। বাংলার লুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে যেন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। আর তার পরেই তিনি মারা গেলেন। তাঁর কাছে কত মানুষ আসত ব্যাথা ঝাড়াতে। কোনও ওষুধপত্র নয়, মন্ত্রপূত ফুঁতে ভালো হয়ে যেত কত মানুষের ব্যথা-কষ্ট। যোগমায়া তাঁর এই শিক্ষা কাউকে দিয়ে যেতে পারেননি। কেউই তাঁর কাছে শিখতে চায়নি ঝাড়ফুঁকের অপার অমোঘ মাহাত্ম্য। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাচীন প্রথারও বিলুপ্তি ঘটল। অবসান হল একটি যুগের। এই পুরনো মানুষটি চলে গেলেন। আর তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল রামযাত্রা, কীর্তন, কথকতা…। দ্রুত তার জায়গা দখল করে নিল কথাবলা বাক্স। ঘরে ঘরে তার রমরমা। ছাদের মাথায় অ্যান্টেনা। শুধু মানুষের জীবনচর্যার বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, মানুষের মনোজগতের মধ্যেও আমূল পরিবর্তন ঘটল এই সময়ে। সেই পরিবর্তনকেই ধরতে চেয়েছেন লেখক। শুধু ধরতে চাননি, সার্থকভাবে ধরেছেনও পরিবর্তিত যাপন। এখানেই উপন্যাসটির স্বাতন্ত্র্য।

বিশ শতকের সত্তরের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবে এসেছে নকশাল আন্দোলনের কথাও। অঙ্গনাথ জেল থেকে ফিরে দেখেছেন কয়েক বছরে তার চেনা শহরটা কত অচেনা হয়ে গেছে। নিজের প্রয়োজনেই মানুষ পালটে ফেলেছে কতকিছুই। রাস্তার নাম, পাড়ার নাম। কেউ চাপিয়ে দেয়নি। তিনি এতদিনে যেন অনুভব করলেন নকশাল আন্দোলন যতটা পরিকল্পিতভাবে হয়েছিল, ততটা জনমানসের ইচ্ছেয় নয়। তিনি অনুভব করেন সফল বা ব্যর্থ কোনও সমাজ বিপ্লবের সঙ্গে বাঙালি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারবে না। বিভ্রান্ত অঙ্গনাথ তাই নতুন করে ইতিহাস পড়ার কথা ভাবেন। নতুন ইতিহাস তুলে ধরতে চান নতুন প্রজন্মের কাছে।

একটি বিশেষ সন্ধিকালের আধারে উপন্যাসটির কাহিনি বিন্যস্ত হয়েছে। সাহেবরা তখন চলে গেছে দেশ ছেড়ে। কিন্তু সাহেবিয়ানা যায়নি। বিশেষ করে গঙ্গা তীরবর্তী চটকলগুলির কোনও কোনটিতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত উচ্চপদে আসীন ছিলেন সাহেবরাই। এমনই একজন সাহেব টমাস স্ত্রীর উপর রাগ করে অনেকগুলো বছর থেকে গিয়ে ছিলেন এখানে। তাঁর বাড়িটার নামেই উপন্যাসের নামকরণ। চটকলের সাহেবরা চলে যাওয়ার পরও সাহেবের পদটি থেকে গেছে একইভাবে। কোনও বাঙালি এখন সেই পদে অধিষ্ঠিত। যেমন এই উপন্যাসের গৌর। ইংরেজি জানা বড়বাবু কালাচাঁদের ছেলে গৌর কৈশোরেই চটকলের সাহেব হয়ে গিয়েছিল। তার দৃষ্টিকোণ থেকেই এগিয়েছে উপন্যাসের কাহিনি। চন্দননগর ভদ্রেশ্বরের পটভূমিতে লেখা এই কাহিনিতে চটকল কর্মীদের দারিদ্র্য-পীড়িত দৈনন্দিনতার চিত্র ধরা আছে। সেই মানুষদের স্বপ্নের কথাও। মাঝে মাঝে কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেত মিল। দরিদ্র মানুষদের জীবনে হাহাকার দেখা দিত। কেউ কেউ এই শহর ছেড়ে পালাত গ্রামে, অন্য কোনও ধান্ধায়। উপন্যাসে শেঠ এই প্রসঙ্গে বলেছে—“শরৎ চাটুজ্জের সেই গফুরের গল্পের মতো হয়ে গেল। একশো বছর আগে নিঃস্ব হয়ে গফুর শহরে এসেছিল চটকলে কাজ করতে। একশো বছর পরে দেশটা আবার উল্টো সোজা হয়ে গেল।” একশো বছর আগে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে আসত চটকলে চাকরি করতে। আর এখন বাঁচার তাগিদেই চটকলের চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। সেই সময় থেকেই শুরু হয়ে গেছিল চটকলগুলির দুরবস্থা!

এরই মধ্যে তারা স্বপ্ন দেখত। বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন নয়, একটু ভালোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কালাচাঁদ তো এমনই স্বপ্ন দেখতেন। একদিন তিনি তাঁর স্ত্রীকে গাড়ি করে নিয়ে যাবেন গড়ের মাঠে হাওয়া খাওয়াতে। আর এই স্বপ্নকে সার্থক করবার জন্য তিনি লটারির টিকিট কাটতেন। দিনের পর দিন এই সাহেবি মানুষটি লটারি কাটতেন। সেই লটারি কোনোদিনও লাগেনি। দরিদ্র মানুষেরাই লটারির টিকিট কাটে বেশি করে। তাকে আশ্রয় করেই নিজেদের স্বপ্নকে সার্থক করতে চায়। তবে আর্থিক সঙ্গতি তাঁর হয়েছিল গৌর মিলের সাহেব হওয়ার পর। ততদিনে তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন।

কালাচাঁদের মধ্যে সাহেবপ্রীতি তীব্র হয়ে আছে। ইংরেজিতে কথা বলেন তিনি। সাহেবি কায়দাকে নকল করতে চান তাঁর জীবনযাপনে। রিটায়ার্ড করবার পর গৌর একটা সাদা হ্যাট কিনে দিয়েছিল তাঁকে। সেই হ্যাট পরে নিজেকে সাহেব মনে করতেন। তাঁর প্রিয় সাহেব টমাসের ভগ্ন পরিত্যক্ত কুঠির কাছে ঘুরে বেড়াতেন। অদ্ভুত এক সাহেবি মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন তিনি। ইংরেজরা চলে যাওয়ার তিন দশক পরেও কলোনিয়াল হ্যাঙ্গওভার কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কালাচাঁদ এখানে সমগ্র বাঙালি মানসের প্রতিরূপ। ভবিষ্যতেও যে বাঙালিরা সাহেবদের ব্যর্থ অনুকরণেই মেতে থাকবে তারই সূত্র তুলে ধরেছেন লেখক এই আখ্যানে।

কালাচাঁদের পরিবারকে ঘিরে আখ্যানে এসেছে আরও কত কত মানুষের কথা। তাদের সফলতা অসফলতার কথা। বিশেষ করে চটকলে কাজ করা মানুষদের কথা। চটকলের ভিতরের নানান খুঁটিনাটি, ব্যবস্থা পত্র, বিভিন্ন পদের কর্মচারীদের রকমফের বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। বস্তুত সত্তরের বছরগুলিতে গঙ্গতীরের চটকলগুলির ডকুমেন্টেশন এই উপন্যাস। উষী নাপতানি, করবী, অঙ্গনাথ, জ্যোৎস্না, মুরারি ইত্যাদি চরিত্রদের আমরা সহজে ভুলতে পারি না। আর এই চরিত্রদের ভিতর দিয়েই সমাজ-সংস্কার-প্রথা-ঐতিহ্য…সমগ্র সমাজ মানসের পরিবর্তনকে লেখক তাঁর মায়াবী কলমে তুলে ধরেছেন অসামান্য দক্ষতায়। আর এই সবকিছুর মধ্যেও উজ্জ্বল ও উদগ্র হয়ে আছে সাহেবকুঠি। এই সাহেবকুঠি তার প্রাচীন ঐতিহ্য ও বৈভব নিয়ে একটা ঔপনিবেশিক আবহকে জাগিয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে পরিবর্তনের এই আন্তরিক আখ্যান বড় মায়াময় হয়ে উঠেছে।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Shares

Leave A Reply