শনিবার, অক্টোবর ১৯

অটলজির ঠিক সামনে এসে হকারটি চেঁচাচ্ছে, ‘অটলবিহারী গ্রেফতার, অটলবিহারী গ্রেফতার’

শমীক ভট্টাচার্য

‘না জানে ক্যায়সে, আয়সে য্যায়সে হো গয়া!’ লোকসভা নির্বাচনে হেরে গিয়েছে দল। প্রেস কনফারেন্স করছেন অটলজি। আমি আমার এক বন্ধুকে নিয়ে সেই প্রেস কনফারেন্সে ঢুকে গিয়েছি পাস জোগাড় করে। যে দলটাকে তখন অনেকেই কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে ধরে নিয়েছে, সেই দলই বিপর্যস্ত লোকসভা নির্বাচনে! আর সেই পরিস্থিতিতে অটলজির অদ্ভুত এই শব্দবন্ধ আমার চিরকাল মনে থাকবে।

উনি ছিলেন অসামান্য বাগ্মী। তেমনই ছিল রসবোধ। রাজ্য বিজেপির প্রথম ব্রিগেড চলছে। বক্তৃতা দিচ্ছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। আমি তখন শুধুই একজন স্বেচ্ছাসেবক। ব্রিগেডের মাঠের একটা জায়গা খালি ছিল। অটলজি বক্তৃতা করতে করতে হিন্দিতে বললেন, “আজ অবধি পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা বা বিধানসভায় একটাও পদ্ম ফোটেনি। কিন্তু এই ‘বিশাল জনমেদিনী’ এটারই প্রমাণ দিচ্ছে যে ‘মনকমল’ ফুটেছে। শুধু সামান্য যেটুকু জায়গা খালি, তা আসলে আমাদের ঝাণ্ডার হরিয়ালি”। আসলে বিজেপির পতাকায় যে সবুজ রঙ আছে তারই কথা ওভাবে উল্লেখ করেছিলেন উনি।

আরেকবার অটলজি কলকাতায় এসেছেন। তপন শিকদার সেই সময় খুব অসুস্থ। তাঁকে দেখতে যাওয়া হচ্ছে।  আমাদের এক প্রয়াত কার্যকর্তা ছিলে হরিকৃষ্ণ ট্যান্ডন। তাঁর গাড়ির সামনের সিটে অটলজি বসে। আমরা তিনজন গাড়ির পেছনে বসে আছি।

শ্যাম পার্কের আছে দেখা গেল একজন হকার একটা সান্ধ্য দৈনিক বিক্রি করছে। সে চিৎকার করছে, ‘বিরাট খবর! বিরাট খবর! কলকাতায় অটলবিহারী বাজপেয়ী গ্রেফতার!’

আমাদের গাড়িটা জ্যামে আটকে গিয়েছে। সেই ছেলেটা একদম অটলজির সামনে এসেই সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, ‘অটলবিহারী গ্রেফতার! অটলবিহারী গ্রেফতার!’

অটলজি মুখ ঘুরিয়ে ট্যান্ডনজিকে হিন্দিতে বললেন, ‘আরে ট্যান্ডন, এত সুন্দর বলছে, নিয়ে নাও।’

ট্যান্ডনজি দুটো কাগজ কিনলেন। অটলজি এবার রেগে গেলেন। বললেন, “তুমি এত গরিব হয়ে গিয়েছ যে মোটে দুটো কাগজ কিনলে? সব নিয়ে নাও।”

ট্যান্ডনজির কাছে যা টাকা ছিল তা দিয়ে বেশ কিছু কাগজ কেনা হল।

তপন বাবুর বাড়িতে গিয়েই অটলজির মুখে সেই একই কথা। ‘আরে আপনি কাদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন? মোটে দুটো কাগজ কিনেছে! এই জন্যই তো কলকাতায় আমাদের মোটে দু’জন কাউন্সিলার। তাও বড়বাজারে।’

এমনই ছিল অটলজির রসবোধ।

হয়তো অটলবিহারী বাজপেয়ীর থেকে বেশি সফল প্রধানমন্ত্রী কেউ হতে পারেন। কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে কারোর নেই।

তিনি শুধু পার্টির মুখ ছিলেন না।  দল আর তিনি ছিলেন সমার্থক। তাঁর এই অসামান্য ব্যক্তিত্বই আসমুদ্র হিমাচল মানুষকে বিজেপি প্রেমী করে তুলেছে।

লালকৃষ্ণ আডবাণী এবং অটলজি অটুট জুটির কারণেই সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি থেকে আজকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো জায়গায় এসেছে বিজেপি।

প্রশাসক হিসাবেও তাঁর অবদান ভোলার নয়। ভারতীয় সমাজজীবনে একটা গতি এনেছিলেন তিনি –তাঁর প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা এবং স্বর্ণ চতুর্ভুজ সড়ক যোজনার মধ্যে দিয়ে। প্রকৃতই গ্রামীণ স্তরে রাজনৈতিক প্রশাসনিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার সফল বিকেন্দ্রীকরণ করার চেষ্টায় তিনি বরাবর সচেষ্ট ছিলেন।

জোট রাজনীতির সারমর্ম বুঝতে পারতেন বাজপেয়ী। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে জোট রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা এবং জোট সরকার পরিচালনা করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন।

মার্জিত ব্যবহার, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি প্রবল আস্থা, অসামান্য শব্দ চয়ন, রাজনীতির ভাষায় ব্যক্তিগত অসূয়াবিহীন রাজনৈতিক আক্রমণ – এর জন্য ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন বাজপেয়ী।

গণতন্ত্রের এবং লোকসভার মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি তাঁর রাজনীতিকে এমন জায়গায় উত্তরণ করেছিলেন যেখানে কোনও দলীয় রাজনীতি বেড়াজাল বা রঙ তাঁর সত্তাকে সংকীর্ণ করতে পারেনি।

ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের প্রয়ানের সঙ্গে সঙ্গে একটা যুগের অবসান হল।

লেখক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির নেতা

Leave A Reply