বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

সনিয়াজির উদ্বিগ্ন ফোনের কথা নিজেই জানিয়েছিলেন অটলজি

প্রণব মুখোপাধ্যায়

১৩ ডিসেম্বর, ২০০১। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম কালো দিন। সন্ত্রাসবাদীরা হামলা করেছে পার্লামেন্টে। সোনিয়া গান্ধী সেই সময় সংসদ ভবনে ছিলেন না। খবরটা পাওয়া মাত্রই তিনি ফোন করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর বাসভবনে। প্রধানমন্ত্রী কেমন আছে সে কথা জানতে।

অটলজি পরে সোনিয়া গান্ধীর সেই টেলিফোন করা নিয়ে বলেছিলেন, এমন সংকটের পরিস্থিতিতে  প্রধানমন্ত্রী কেমন আছেন জানতে যদি বিরোধী দলনেত্রী ফোন করেন, তাহলে বুঝতে হবে যে দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত আছে।

রাজনৈতিক পরিসরে বিরোধী দলনেত্রীর এত বড় প্রশংসাই প্রমাণ করে কতটা উদার ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী।

বিরোধীদের সঙ্গে সব সময়েই সহযোগিতা করতেন অটলজি। ১৯৯৫ সাল। প্রধানমন্ত্রী তখন পি ভি নরসিংহ রাও। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে সেই সময় আমি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) গোড়াপত্তনের জন্য একটা চুক্তি সই করেছি। ওই

চুক্তি সই করার ফলে আমাদের দেশ ডব্লিউটিও -র প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মর্যাদা পেয়েছিল।

সেই চুক্তির অন্যতম একটা শর্ত ছিল, দেশের পেটেন্ট আইনের সংস্কার করা। কিন্তু বিজেপি এবং বামপন্থী দলগুলোর তীব্র বিরোধিতায় সেই বিল রাজ্যসভায় পাশ করা গেল না। অর্ডিন্যান্সের পরিবর্তে দু’বার আমরা বিল আনার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দু’বারই রাজ্যসভায় বিলটা পাশ করাতে ব্যর্থ হই।

এর ফলে ডব্লিউটিওতে আমাদের নামে অভিযোগও হল যে চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারত বিলটা পাশ করাতে পারেনি।

কিছুদিনের মধ্যেই সরকার বদলে গেল। প্রধানমন্ত্রী হলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। মুরাসোলি মারান বাণিজ্য মন্ত্রী। ২০০২-০৩ সালে শ্রী মারান আবার সেই বিল পাশ করাতে উদ্যোগী হলেন।

লোকসভায় বিল পাশ হয়ে গেল। রাজ্যসভায় বিল পাশ করানোর জন্য সেই সময়ে রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মনমোহন সিং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন বাজপেয়ীজি। মনমোহন সিংহ আমার সঙ্গে আলোচনা করলেন। তারপর বাজপেয়ীজির সঙ্গে ছোট্ট একটি বৈঠক করি আমরা। বাজপেয়ীজি তখন আমাকে মজা করে বলেন, প্রণবদা এই বিলটা তো আপনারই সন্তান। আপনি কেন সমর্থন করবেন না?

এর পরেই সনিয়াজির সঙ্গে বিলটা নিয়ে কথা বলি আমরা। উনি আমাদের বলেন, সংসদের দুই কক্ষের সমস্ত সদস্যের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের বোঝাতে কেন আমাদের এই বিলটা সমর্থন করা উচিত।

আমি সে সময় তাঁদের বলি যে পুরনো বিল আর এই নতুন বিলের মধ্যে তফাৎ মাত্র দুটো। এক আমার বিলটার তারিখ ছিল ১৯৯৫ সালের। আর এই বিলটার তারিখ ২০০৩ সালের। আর আগের বিলে নাম লেখাছিল আমার। এই বিলে সেই জায়গায় নাম লেখা হয়েছে মুরাসোলি মারানের। আর কোনও তফাৎ নেই।

বিল পাশ হওয়ার পর আমাকে ডেকে পাঠিয়ে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন বাজপেয়ীজি।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে ভারত রত্ন সম্মানে ভূষিত করছেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়

ছ’দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর। ১৯৫৭ সালে প্রথম বার লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে সংসদে প্রবেশ করেন তিনি। ২০০৯ সাল অবধি সংসদে তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গণতন্ত্রে অটুট আস্থা ছিল তাঁর। বিরোধী দলে তিনি ছিলেন এক মহীরুহ। আবার সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়েও ছিলেন প্রবল আত্মবিশ্বাসী।

সবার মত নিয়ে চলতে পারার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। দেশের প্রথম পূর্ণ মেয়াদের জোট সরকার তাঁরই নেতৃত্বে গঠিত হয়। একজন দক্ষ সাংসদ এবং প্রশাসক হিসেবে, জোট সরকারের অসংখ্য সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কাশ্মীরের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করা, এমনকি পোখরানে দ্বিতীয় বার পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো উল্লেখযোগ্য সব কাজ করতে পেরেছিলেন তিনি।

বাজপেয়ীজি ছিলেন এক অসামান্য সাংসদ, বাগ্মী, কবি, দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং একজন রাষ্ট্রনায়ক। হিন্দি ভাষার ওপর তাঁর অসাধারণ দখল এবং অনন্য রসবোধ দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করতে পারতেন তিনি। বিরোধিতা নয়, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার শিক্ষা তাঁর থেকে পেয়েছি আমরা সবাই। পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের কাছে এই জন্য শিক্ষণীয় তিনি।

নেতা হিসেবে অসাধারণ সব গুনের অধিকারী ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। মেনে চলতেন নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য।

তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই দেশের ইতিহাসের একটি অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। ভারতবর্ষ হারাল তাঁর এক উজ্জ্বল সন্তানকে।

শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুতে আমি মর্মাহত। তাঁর মৃত্যুতে দেশ আরও যেন রিক্ত হয়ে গেল!

লেখক ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি 

Shares

Leave A Reply