শনিবার, এপ্রিল ২০

দাদাসাহেব ফালকে নয়, ভারতের প্রথম চলচ্চিত্রকার বাঙালি হীরালাল সেন

দাদাসাহেব ফালকের ১০ বছর আগেই কলকাতায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছিলেন বাঙালি হীরালাল সেন। ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সেই কিংবদন্তি চরিত্রকে নিয়ে লিখলেন অভিজিৎ বেরা।

‘আসুন! দেখুন ! যাহা কেহ কল্পনাও করিতে পারেন নাই, তাহাই সম্ভব হইয়াছে। ছবির মানুষ জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া-চলিয়া বেড়াইতেছে। পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বায়োস্কোপ দেখুন।’ সে দিন ক্লাসিক থিয়েটারে কী ভিড় কী ভিড়। সত্যিই তো! আবদুল্লা মর্জিনারা পর্দা জুড়ে জ্যান্ত মানুষের মতোই হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে, গানের তালে নাচছে। এ তো ম্যাজিক। এ শহর দেখেছে ‘আলিবাবা’র দুরন্ত মঞ্চাভিনয়। দেখেছে মঞ্চে জীবন্ত ঘোড়া। কিন্তু তা বলে এ কী করে সম্ভব। পর্দার ছবিরা হাসছে, কাঁদছে, মারপিট করছে!

অভিজিৎ বেরা

তৈরি হল ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র। ‘আলিবাবা’। ১৯০৩ সালের কথা। এক বাঙালি চলচ্চিত্রকার তখন খ্যাতির চূড়ায়। হবে না-ই বা কেন? এই দূরদর্শিতা তো ভারতের কেউই আগে দেখাতে পারেননি।

কয়েক বছর আগে স্টার থিয়েটারে স্টিভেন্স নামে এক  ইংরেজ সাহেব প্রত্যেক নাটকের শেষে কিছু চলমান ছবি দেখাতেন– কেউ কারখানার গেট থেকে বেরোচ্ছে, ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে, সমুদ্রে লোকজন স্নান করছে ইত্যাদি। এক দিন সেই শো দেখে বাইশ তেইশ বছরের এক শখের ছোকরা ফটোগ্রাফার সেই দলে গিয়ে ভিড়ল। গিয়ে সে খালি গল্প গুজব করে। স্টিভেন্সের সঙ্গে মজা মস্করা। অবশ্য আসল মতলব ছিল  অন্য। চলমান ছবি দেখানোর কলা কৌশল রপ্ত করা। দিন যায়। স্টিভেন্সের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ে, কিন্তু যন্ত্র চালানোর কৌশল আর শেখা যায় না। কিন্তু যুবকটিও নাছোড়। মাটি কামড়ে পড়ে থাকে সে। ধীরে ধীরে সব রপ্ত হয় । কিন্তু যন্ত্র ছাড়া তিনি শো করবেন কি করে?

ভাগ্য বোধ হয় সাহসিদের সঙ্গ দেয়। একটা কল শোয়ে স্টিভেন্সকে যেতে হল এলাহাবাদে। বড় টাকার দাঁও। যেতেই হবে। আর গিয়েই পড়লেন একটা দুর্ঘটনায়। ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ভগ্ন মনোরথে স্টিভেন্সকে ফিরে যেতে হল লন্ডনে, নিজের দেশে। অগত্যা কলকাতায় শো চালানোর ভার এসে পড়ল যুবকটির হাতে। কিন্তু সে শো তো স্টার থিয়েটারের সঙ্গে নানান শর্তে গাঁট বাঁধা। তাতে নিজে কিছু করে দেখানোর সুযোগ কই?

এক দিন একটা রেস্তোরাঁয় এক মার্কিন ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল। ভদ্রলোক একটা প্রজেক্টর বিক্রির জন্য কলকাতায় এসেছেন। বড় ব্যবসায়ী। সেই সঙ্গে  শিল্পের বড় সমঝদার। তখন কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। এমন অনেকেই সে সময় কলকাতায় আসতেন। কিন্তু ঠিকঠাক দাম দিলেই শুধু হবে না। এই মার্কিন ভদ্রলোকের আরও একটা শর্ত আছে। খাঁটি শিল্প বোদ্ধা ছাড়া তিনি  কাউকেই সেটি বেচবেন না। যুবক হীরালাল প্রায় লুফে নিলেন প্রস্তাবটি। বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে কিনে নিলেন প্রজেক্টরটি।

কেনা তো হল। কিন্তু বিদ্যুৎ ছাড়া প্রজেক্টর চলবে কী করে? সে সময়ের কলকাতায় তো আর ঢালাও বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু হীরালাল নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা হল। গ্যাসের আলো দিয়ে ময়দানে শামিয়ানা খাটিয়ে শুরু হল শো। হীরালাল সেন আর মতিলাল সেনের শো। লোকেরা আদর করে নাম দিল ‘সেন ব্রাদারস’। রাজধানী জুড়ে সে এক হৈ হৈ কাণ্ড। অচিরেই নাম ছড়াল মুখে মুখে। রাজধানী ছাড়িয়ে ডাক আসতে লাগল দেশের অন্যান্য শহর থেকেও। নিখিল ভারত শিল্প প্রদর্শনীতে ছবি দেখিয়ে ভারত বিখ্যাত হয়ে গেল তাঁদের কোম্পানি। প্রচুর টাকা রোজগার করলেন সেন ভাইয়েরা। বন্ধুদের ধার শোধ করেও হাতে রইল অঢেল।

কিন্তু  তাতেও হীরালালের মন ভরে না। সেই একই জিনিস কাঁহাতক আর দেখানো যায়। নতুন কিছু করতে মন চায় তাঁর। সেই সময় এক ফরাসি সংস্থা কলকাতায় এল কিছু চলমান ছবি তোলার কাজে। নতুন জায়গা। তারা সাহায্য চাইল হীরালালের। হীরালাল বিনা কথায় ভিড়ে গেলেন সেই দলে। ঘুরতে ঘুরতে শিখে নিলেন চলমান ছবি তৈরির কৌশল। ভীষণ মজা পেলেন। যে কোনও মহৎ শিল্প তো প্রকৃত শিল্পীর অপেক্ষাতেই থাকে। কোম্পানিটি যাওয়ার আগে কিছু ক্যামেরা অল্প দামে উপহার দিয়ে গেল হীরালালকে। শুরু হল নতুন ইতিহাস তৈরির প্রক্রিয়া।

স্টার থিয়েটারে বায়োস্কোপ দেখানোর সুবাদে অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীদের চিনতেন হীরালাল। সে সময়ের অমরেন্দ্র দত্ত ছিলেন নট্ট জগতের সম্রাট। তাঁর “আলিবাবা” নাটকে তখন বুঁদ হয়ে আছে কলকাতার দর্শক। দিনের পর দিন শো হাউসফুল হচ্ছে। হীরালাল অমরেন্দ্রর শরণাপন্ন হলেন। প্রকৃত শিল্পীই তো খুঁজে বার করে নেন প্রকৃত শিল্পীকে। ঠিক হল ‘আলিবাবা’ চলচ্চিত্রায়িত হবে। আবদুল্লা-মর্জিনার একটি নাচের দৃশ্য  সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রায়িত হয়। পরে ধীরে ধীরে বাকি অংশগুলিও চিত্রায়িত হয়। এই ভাবে তৈরি হয় ভারতের প্রথম কাহিনিচিত্র।

কিন্তু ইতিহাস বরাবর সাহসিদের সঙ্গ দেয় না। হীরালালকেও দেয়নি। তিনি যখন খ্যাতির মধ্য গগনে, একে একে বানিয়ে ফেলেছেন বিখ্যাত নাটকগুলির চলচ্চিত্র… ভ্রমর, আলিবাবা, সীতারাম ইত্যাদি, সেই সময় এক পারিবারিক দুর্ঘটনায় তাঁর ফিল্ম কোম্পানি রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি বেচে দিতে হয়। প্রায় কপর্দকহীন হীরালালকে বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করে দিন গুজরান করতে হত। বেচে দিতে হয়েছিল প্রায় সব কিছুই। শুধু রয়ে গেছিল তাঁর বানানো ছবির কিছু প্রিন্ট, স্ক্রিপ্ট, ফিল্ম সংক্রান্ত নথিপত্র ইত্যাদি।

কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন আর পিছু ছাড়ে না। শেষের দিকে ধরা পড়ল ক্যানসার। ধরা পড়লেই বা কী? হাতে তো কোনও কাজ নেই। তীব্র অর্থাভাব। সে সময় ক্যানসার ছিল দুরারোগ্য। ন্যূনতম চিকিৎসার সুযোগটুকুও পাননি ভারতীয় চলচ্চিত্রের  সোনালি রাজপুত্র। সহায়সম্বলহীন ভাবেই দিন কাটছিল তাঁর। প্রায় অর্ধাহারে, অনাহারে ।

এক দিন একটা সংবাদে অত্যন্ত বিচলিত ভাবে  তিনি বাড়ি থেকে বেরোলেন। গিয়ে দেখলেন উত্তর কলকাতার যে ঘরে তাঁর কাজের সব নথিপত্র  রাখা ছিল, দাউদাউ করে জ্বলছে। ঘরের সব কিছু জ্বলে গেছে। জ্বলে গেছে তাঁর বানানো ছবির  প্রিন্ট, নথিপত্র, হ্যান্ডবিল… সমস্ত। এর থেকে নিষ্ঠুর পরিহাস আর কী হতে পারে ভাগ্যের?

তবু ইতিহাসের পাতা থেকে হীরালাল সেনের নাম মুছে দেওয়া যায়নি। হয়ত তাঁর বানানো ছবির কোনও প্রিন্ট আমরা পাই না, কিন্তু সেই সব তথ্যের  সপক্ষে  যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়— সেই সময়ে প্রকাশিত কিছু সংবাদে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনে, উদ্ধার হওয়া  কিছু হলুদ হ্যান্ডবিলে।

এই ঘটনার মাত্র দু’দিন পরে ভগ্ন মনোরথে নিদারুন দুর্দশার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স তখন মাত্র ৫১। সে কি ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি স্বেচ্ছা ? বলেনি ইতিহাস।

ইতিহাস যা বলেছে, তা হল ভারতীয় চলচ্চিত্রের পিতা বলে স্বীকৃত দাদাসাহেব ফালকের বানানো  “রাজা হরিশচন্দ্র”-র অন্তত দশ বছর আগে হীরালাল সেন  “আলিবাবা ও চল্লিশ চোর” বানিয়েছিলেন। তার পরেও  ভারত সরকার দেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে ফালকেকে স্বীকৃতি দিয়েছে যা সম্পূর্ণ ভুল। আর বাঙালি তো বিস্মৃত জাতি। তারাও মনে রাখেনি হীরালাল সেনকে। শুধু তাঁর জন্মভূমি ঢাকা শহর তাঁকে ভোলেনি, সেখানে একটি  চমৎকার রাস্তার নাম হীরালাল সেন সরণী।

কোন দেশেই বা কবে, মা তার সন্তানকে ভুলেছে ? আর বাংলায় এমন হিরে তো ক্ষণজন্মা!

অভিজিৎ বেরা পেশায় প্রশাসনিক আধিকারিক। তাঁর প্রকাশিত কবিতার বই – ‘নিহত অন্ত্যেষ্টি’ (কৃত্তিবাস, ২০১২), ‘কার্নিভালের পাখিগুলি’ (আনন্দ, ২০১৬) এবং ‘গডজিলার নিজস্ব ইতিহাস’ (আনন্দ, ২০১৭)। পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার (২০১৭) ও বনলতা পুরস্কার (২০১৮)। তুর্কি ও ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়েছে তাঁর কবিতা।মুম্বাইতে কালা ঘোড়া আর্ট ফেস্টিভ্যালে (২০১৫) আমন্ত্রিত। স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র “পাইপ ড্রিমজ” (২০১৪) দেশে বিদেশে প্রদর্শিত হয়েছে।

Shares

Leave A Reply