রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

ব্লগ : ঝড়কে পেলেম সাথী

অংশুমান কর

আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। সকাল থেকে স্কুলে-কলেজে, পাড়ার ক্লাবে নিশ্চয়ই বেজে চলেছে রবীন্দ্রনাথের কত রকমের গান। তাঁর একটি রচনাকেই তো আমরা জাতীয় সঙ্গীত হিসেবেও মেনে নিয়েছি। স্বাধীনতা তিনি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁকে ছাড়া আমাদের স্বাধীনতার কোনও অবয়ব আমরা কল্পনা করতে পারি কই! আমেরিকার স্বাধীনতার সঙ্গে এইরকম কোনও সম্পর্কসূত্রে তিনি বাঁধা নন, কিন্তু এই বছর আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের ঠিক একদিন আগে, আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে আমার, কেন কে জানে, রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথাই মনে পড়ছিল। প্রায় চল্লিশ মাইল দীর্ঘ কায়ুগা লেকের পাড়ে স্টুয়ার্ট পার্কে দাঁড়িয়ে আমি আর পিয়ালী ফায়ারওয়ার্কস দেখছিলাম। রাত পোহালেই স্বাধীনতা দিবস। তাই বাজি পোড়ানো হবে। খবর পেয়ে আমরা পৌঁছে গেছি স্টুয়ার্ট পার্কে, ওখান থেকে চমৎকার দেখা যায় বাজি পোড়ানোর দৃশ্য।  জুলাই মানে আমেরিকার সামার। দিনের বেলা চাঁদি ফাটানো রোদ্দুর, কিন্তু সন্ধে নামলে কোথাও কোথাও তিরতিরে নদীর মতো একটা রোগা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। ঠিক যেন আমাদের দেশের শীত চলে যাওয়ার সময়ের বসন্তবাতাস। সেদিনও সন্ধে হতেই যখন ওই রকম একটা বাতাস বইছিল, আকাশ বর্নিল হয়ে উঠছিল নানা রকমের বাজির আত্মদহনে, যখন সে দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন ঠিক আমার পাশে দাঁড়ানো প্রৌঢ়, যখন দু’ফুট দূরে দাঁড়ানো শিশু মায়ের হাত ধরে চিরকালের বিস্ময় নিয়ে ক্ষণকাল মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল আনন্দময় আকাশের দিকে, যখন একটু দূরে ম্যাপল গাছের নীচে যুবকের পুরু ওষ্ঠের ভেতর দলিত-মথিত হতে থাকা যুবতির পাপড়িতে প্রখর গ্রীষ্মেও প্রাণ ফিরে পাচ্ছিল বসন্ত, তখন অদ্ভুত ভাবে আমারও কিন্তু কানের ভেতর কে যেন গুনগুন করছিল রবীন্দ্রনাথের একটি বসন্তের গানেরই পঙ্‌ক্তি, ‘তোমার ঝাউয়ের দোলে, মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান’। ভাবছিলাম, এই আনন্দযজ্ঞে সকলে পেয়েছে তো নিমন্ত্রণ?  কারও কারও কাছে বসন্ত হয়ে ওঠেনি তো ‘রোদনভরা’? নেই তো এমন কোনও মানুষ যাকে স্বাধীনতা দিবস মনে করিয়ে দিচ্ছে এ উৎসবে তুমি ব্রাত্য কারণ তুমি এ দেশের কেউ নও?

#

এমন বেয়াড়া ভাবনা কেন? বলছি। আমি নিজে পন্ডিত নই বলে, পন্ডিতদের আমি চিরকাল ভয় পাই। কিন্তু  মাঝে মাঝে আমাকেও অন্নসংস্থানের কারণেই পন্ডিত সাজার খেলায় সঙ সাজতে হয়। তো সেরকম সঙ সাজতে সাজতেই আমি তো কবেই জেনে গিয়েছি যে, আমেরিকায়, বিশেষ করে ৯/১১র পর থেকে, অনুপ্রবেশকারী আর শরণার্থীদের কী অবস্থা। ইথাকার স্টুয়ার্ট পার্কে দাঁড়িয়ে ৩ জুলাই আমার তাই তাদের কথা মনে পড়ছিল। ওখানেও তো আমাদের দেশে নাগরিকপঞ্জি নির্মাণের ঢঙেই সেই কবে চালু করা হয়েছে ‘স্পেশ্যাল রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’। শুরু হয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ‘দেশে’ ফেরানোর প্রক্রিয়া, যা গতি পেয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। দিন কয়েক পরেই ওয়াশিংটন ডিসিতে, হোয়াইট হাউস থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমি অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গটি তুলেছিলাম দিব্যেন্দু পাল সকাশে। ওয়াশিংটনে আমি আস্তানা গেড়েছিলাম দিব্যেন্দুদা-মিতা বউদির প্রাসাদোপম বাড়িতে।  ছোট থেকে বাম রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার কারণেই, সম্ভবত, ডিসি যাওয়ার পথেই দূর থেকে দেখব ‘পেন্টাগন’ শুনে আমি নিজের অজান্তেই গুনগুন করে উঠেছিলাম, ‘আজ যত যুদ্ধবাজ, দেয় হানা হামলাবাজ,’ আর তক্ষুনি স্টিয়ারিং ছেড়ে গলা মিলিয়ে ছিলেন দিব্যেন্দুদা, ‘জোট বাঁধো, তৈরি হও, যুদ্ধ নয় তোলো আওয়াজ’। আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে আমি ওঁর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতেই পারি। আমি  জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা, এই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে যে বাঙালিরা এখানের বৈধ নাগরিক, তাঁরা কী ভাবছেন? দিব্যেন্দুদা বলেছিলেন, বাঙালিরা দ্বিধাবিভক্ত। অনেকেই কিন্তু মনে করেন যে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো উচিত। তাদের দায় নেবে কেন আমেরিকা?

#

রজতের কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, একদম ঠিক বলেছেন দিব্যেন্দুদা।  রজতের সঙ্গে আমার দেখা হল নিউ জার্সিতে, নাটককার সুদীপ্ত ভৌমিকের ‘নাগরিক’ নাটকের পাতায়। রক্তমাংসের চরিত্র সে নয়, নাটকের চরিত্র, তবে এমনভাবেই তাকে নির্মাণ করেছেন সুদীপ্তদা যে, মনে হয় সে যেন আমার সামনে বসে কথা বলে চলেছে। সুদীপ্তদা আর ওঁর স্ত্রী গুণী সঙ্গীতশিল্পী মিতালি বউদি আমাদের অনেকদিনের পুরনো বন্ধু।  সুদীপ্তদার বেশ কিছু নাটক আমার পড়া। ও দেশে বসে নিয়মিত বাংলা আর ইংরেজিতে নাটক যে লেখেন তাই নয়, সেই নাটকগুলির বেশ উঁচু মানের প্রোডাকশনও করে চলেন নিয়মিত। দুপুরে শপিং করতে যাব, তার আগে ফাঁকা একটা সকাল পেয়ে ভেবেছিলাম, ‘কৃত্তিবাস’-এর জন্য কবিতা বাছব। সুদীপ্তদা হাতে ওঁর লেখা নতুন নাটকের স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, কবিতা বাছতে বাছতে বোর হয়ে গেলে, পোড়ো।  ভেবেছিলাম, কবিতা বাছা শেষ হলেই পড়া শুরু করব; কিন্তু কী মনে করে কে জানে, খান কয়েক কবিতা পড়েই, একটু উল্টে-পাল্টে দেখব বলে, হাতে তুলে নিয়েছিলাম ‘নাগরিক’, আর নামাতে পারিনি, এমনই ছিল সেই নাটকের টান।  স্বাধীনতা, দেশভাগ, ৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ছুঁয়ে এ নাটক শেষ হয় আজকের আমেরিকায় যেখানে নানা পথ ঘুরে একজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশী ব্লগার মুকুল, যার বিরুদ্ধে আবার রয়েছে অন্য এক মুকুলকে খুন করার অভিযোগ, যে ভয় পাচ্ছে যে, ‘দেশ’-এ ফিরে গেলে সে হয়তো আর বেঁচেই থাকবে না! এই মুকুলকে আশ্রয় দিতে চায় দীর্ঘদিন আমেরিকাবাসী সঞ্চিতা, যে সদ্য অ্যাপ্লাই করেছে সিটিজেনশিপের জন্য। তার সঙ্গেই সঙ্ঘাত বাধে তার স্বামীর বন্ধু রজতের, যার মনে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য কণামাত্র সহানুভূতি নেই।

#

সুদীপ্তদার ‘নাগরিক’ পড়তে পড়তে ভাবছিলাম যে, রজত তো সত্যিই একা নয়। রজতের মতো মানুষ তো এই পৃথিবীতে নেহাত কম নয় যাঁরা ভাবেন বৈধ ভিসা ছাড়া সীমানা অতিক্রম করে অন্যের দেশে প্রবেশ করা যায় না। ভাবেন যে,  অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা একটি দেশের সমৃদ্ধি আর সুরক্ষার শত্রু। এসব কথায় যুক্তির ওজন আছে বই কি! সেরিব্রাল এক্সসারসাইজ আছে, হৃদয়ের সংবেদ নেই। ওঁদের এই প্রশ্ন করা যায় না যে, তথাকথিত ‘নিজের দেশ’-এ ফিরলে যদি অনুপ্রবেশকারীর প্রাণসংশয় থাকে, তাহলেও কি তাকে ‘ডিপোর্ট’ করতে হবে? এই প্রশ্ন করা যায় না যে, তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে আসামে থাকার পরে যদি কিছু কাগজপত্র জমা করতে না পেরে হঠাৎ কেউ জানতে পারে যে, সে ‘বিদেশী’, সেই  লোকটি তখন কী করবে? প্রশ্ন করা যায় না যে, কিছু মানুষের দায় যদি কোনও রাষ্ট্রই না নিতে চায়, তাহলে সেই মানুষগুলো যাবে কোথায়? তাদের ঘর থাকবে না?

#

দুঃখের এটাই যে, আজ আমাদের দেশে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের দিনটিতে যদি কেউ এই প্রশ্নগুলো তোলেন, তাহলে মুহূর্তেই তাঁর গায়ে ‘দেশদ্রোহীর’ তকমা এঁটে দেওয়া হবে।  যেমন এই লেখাটি পড়তে পড়তেও অনেকেরই ভ্রূ কুঞ্চিত হবে, তাঁরা আমারও ‘দেশপ্রেম’কে প্রশ্ন করবেন। তাঁদের কী করে বোঝাই যে, বেশ কয়েকবছর আগে জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রার শেষে দেশে ফেরার সময় যখন হিথরো বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ার কাউন্টারের সামনের নাইলনের ব্যারিকেড ঘেরা ছোট্ট একফালি জমিতে গিয়ে পৌঁছনো মাত্রই একজন ভারতীয় ক্রু আমাকে বলেছিলেন, ‘ওয়েলকাম ব্যাক’—হৃদয় আমার কেমন নেচে উঠেছিল ময়ূরের মতো! কী করে বোঝাই যে, আমেরিকায় থাকতে থাকতেই যখন যতখানি বাঙালি ততখানিই অসমিয়া শুভদার পোস্ট থেকে  জানতে পেরেছিলাম যে, সোনা পেয়েছে হিমা দাস, যখন আমেরিকায় বসেই দেখছিলাম যে, সূর্যের দিকে আমেরিকা রকেট পাঠানোর কত আগেই এক এক স্টেপে এক একটা দেশকে পেছনে ফেলে  আরেক সূর্যের দিকে রকেটের মতো ছুটে চলেছিল আমাদের মেয়েটা, তখন গর্বে আমার কেমন ফুলে ফুলে উঠছিল বুক, এক ছুট্টে সুদীপ্তদাকে সে খবর দেব বলে কেমন সিঁড়ি টপকাতে গিয়ে আমি প্রায় গড়িয়েই পড়ছিলাম নীচে! মূল্য নেই, আপনি যদি ‘বেয়াড়া’ প্রশ্ন করেন তাহলে এই আবেগের কোনও মূল্য নেই। সুরে সুর না মেলাতে পারলেই আজ আপনি ‘দেশদ্রোহী’।

#

স্বাধীনতার দিনে এইসব ভাবি, আর মন খারাপ হয়। মনে পড়ে, খুব বেশি করে রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে যেতে একলা পথে’ গানটির কথা মনে পড়ে। এ গান আগে যতবার শুনেছি আমি যেন দেখতে পেয়েছি রবীন্দ্রনাথকে। ওই তো ঝড় উঠেছে আর শান্তিনিকেতনের রাঙামাটি ভেঙে ভেঙে আসছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রলয় তাঁর কেশে-বেশে করছে মাতামাতি। কিন্তু তিনি থামছেন না। ঝড় ভেঙে তিনি এগিয়ে আসছেন দৃপ্ত পায়ে। আজ যখন গানটা শুনি দেখতে পাই ওই একই দৃশ্য; শুধু মনে হয়, না, হেঁটে যিনি আসছেন, তিনি কোনও মানুষ নন, তিনিই ভারতবর্ষ। তার বেশ বিস্রস্ত, কর্ন্দপকান্তি শরীরে ধুলোর আঁচড়, সংকট আজ তার সঙ্গী।  কিন্তু, তিনি তো থামেননি। তিনি হাঁটছেন। বড় বড় পায়ে হেঁটে তিনি ঠিক এই ঝঞ্জা পেরিয়ে যাবেন।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।    

Leave A Reply