রবিবার, মার্চ ২৪

অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির সব বিতর্কের মূলে বাঙালি বিদ্বেষ

সুজন ভট্টাচার্য

৩০ জুলাই, অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হলো। তথ্য অনুযায়ী ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষের নাম এই খসড়ায় জায়গা পায়নি। আর সেই সূত্র ধরেই শুরু হয়ে গেল নানান বিতর্ক। সাধারণভাবে মনে হতেই পারে, সরকারিভাবে যেহেতু কোনও বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তাহলে এত বিতর্কের কারণ কী? কারণ অবশ্যই আছে। সাধারণ মানুষের তো নানান আশঙ্কা বা অভিযোগ থাকেই। আগের অভিজ্ঞতা থেকেও তারা আগাম অনুমান করে বসছেন। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও স্ব-স্ব মডেল অনুযায়ী বাজার গরম করতে শুরু করে দিয়েছেন। এক পক্ষের বক্তব্য, এদের সিংহভাগই বাঙালি, যাদের বিরুদ্ধে অসমিয়া রাজনীতিকরা বহুদিন ধরেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর অভিযোগ তুলছেন। তাই অসমের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি আসলে বাঙালি বিতাড়নেরই প্রক্রিয়া। সঙ্গে সঙ্গেই অন্য পক্ষ বলে উঠলেন, বাঙালি নয়, অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ঘাড় ধরে বের করে দেওয়াটাই হলো লক্ষ্য। পাশাপাশি এটাও বলা হচ্ছে, টার্গেট হলো বাংলাদেশি মুসলিমরা, হিন্দুদের কোনও ভয় নেই। তারা যদি নাগরিকত্ব নাও পান, সরকারি ভাবেই শরণার্থী হিসাবেই তারা সমস্ত সুযোগসুবিধা পাবেন। ওদিকে অসমের রাজ্য সরকারেরই কয়েকজন প্রতিনিধি বলে বসেছেন, এই চল্লিশ লক্ষের মধ্যে পঁচিশ-তিরিশ লক্ষ হলেন হিন্দু। তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়ালো?

সরকারিভাবে বলা হয়েছে, যাদের নাম নেই, এরপরেও তাদের আরও আবেদনের সুযোগ থাকছে। ডিসেম্বরে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এদের কোনও সমস্যা নেই। এরপরেও ট্রাইবুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে যাবার সুযোগ থাকছে। অতএব ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। ৩১ জুলাই সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও ঠিক এইকথাই বলেছেন।

কথাগুলো শুনতে খুবই ভালো, কিন্তু যাবতীয় সমস্যা তো আসলে প্রয়োগের ক্ষেত্রে। একজন শিক্ষিত মানুষের না হয় এই সব নামধাম শোনা আছে। একজন নিরক্ষর কৃষক কিংবা শ্রমিক? তিনি যাবেন হাই কোর্টে? সেখানে মামলা করার খরচ জোগাবে কে? আর নিজের কাজ ফেলে হাই কোর্টের অলিন্দে ঘুরে বেড়ালে তার পেট চলবে? সবথেকে বড় কথা, প্রশাসনিক আশ্বাস যতই দেওয়া হোক, চূড়ান্ত খসড়া বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু উৎসাহীরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। গর্জন শোনা যাচ্ছে, এইবার ধরে ধরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। যাঁরা বলছেন, তাঁরা কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা। ফলে মানুষের ভয় পাওয়ার বাস্তব কারণও রয়েছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছে গেল যে সুপ্রিম কোর্টকেই ফের বলতে হলো ডিসেম্বরে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নাম না থাকা একজনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। ওদিকে অসমের উদ্দীপনা পৌঁছে গেল মেঘালয়ে। সেখানে খাসি যুবকেরা রাস্তায় ব্যারিকেড বসিয়ে বাঙালি দেখলেই পরিচয়পত্র দেখানোর দাবি শুরু করে দিল। বরাক উপত্যকা থেকে ভারতের অন্যত্র যেতে হলে মেঘালয়ে ঢুকতেই হয়। বোঝা যাচ্ছে তাহলে পরিস্থিতিটা?

মানুষ আশঙ্কা করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই। আর অভিজ্ঞতার পৌনঃপুনিকতায় সেই আশঙ্কার মেঘ আরো গাঢ় হয়। অসমের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে। অসমের বাঙালিবিদ্বেষ একটা ঘোষিত বিষয়। অসমিয়া রাজনীতিকদের অধিকাংশের (যার মধ্যে বিভিন্ন সর্বভারতীয় দলের অসম শাখার নেতারাও আছেন) রাজনৈতিক পুঁজিই হলো বাঙালিবিদ্বেষ। যিনি যত বেশি সেই তাস খেলতে পারবেন, অসমে তার জনপ্রিয়তা তত বেশি। আর এর প্রয়োগ যে এই সেদিন শুরু হলো, এমনটা ভাবারও কোনও কারণ নেই। স্বাধীনতারও আগে থেকেই এর জন্ম। এই বাঙালিবিদ্বেষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিশ্চয়ই আছে। এখানে তার বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। শুধু এটুকু মাথায় রাখলেই হবে যে অসমে বাঙালিদের বসবাসের ঘোষিত ইতিহাস অন্তত পক্ষে দুই শতাব্দীর। আর অঘোষিত ইতিহাস সম্ভবত সতেরশো বছরের। সেই পুরনো ঘি শুঁকে এখন আর লাভ হয়তো নেই। কিন্তু অসম যতটুকু অসমিয়াদের, তার থেকে বাঙালিদের কম নয়, এই সত্যটাও মুছে যায় না।

অসমিয়া বনাম বাঙালি

১৮২৬ সালে অসম বার্মার হাত থেকে ব্রিটিশদের অধিকারে আসে। প্রথম থেকেই অসমকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মধ্যেই রাখা হয়। এই সময় থেকেই অসমে বাঙালিদের অভিবাসন শুরু হয়। মূলত প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়েই বাঙালিদের অসমে আগমন। এর পাশাপাশি স্কুল কলেজের শিক্ষক-অধ্যাপক, চা বাগানের কর্মী এবং চিকিৎসক হিসাবেও তারা অসমে চলে আসেন। এরা ছিলেন মূলত শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু। ১৮৩৬ সালে বাংলাকে অসমের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ঘোষণা করা হয়। আর তখনই শুরু হলো বাঙালিবিদ্বেষের বীজ বপন। প্রাথমিকভাবে তার প্রকাশ ছিল অসমিয়াকে সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ঘোষণা করার দাবির মধ্যে। তাও সেই দাবি কোনও অসমিয়া প্রথম উচ্চারণ করেননি। ন্যাথান ব্রাউন নামক একজন আমেরিকান বিশপ ধর্মপ্রচারের সুবিধা হবে বলে এই দাবি তোলেন। অচিরেই অসমের শিক্ষিত সমাজ এই দাবির পিছনে এককাট্টা হতে থাকেন। ১৮৭৪ সালে অসমকে একটি চিফ কমিশনারিয়েট হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ই অসমিয়াকেও বাংলার সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। এই সময়ে কিন্তু অসমিয়া শিক্ষিত সমাজের সামনে সবথেকে বড় শত্রু হয়ে ওঠেন বাঙালি শিক্ষিত হিন্দুরাই। কারণ তাঁরাই ছিলেন সরকারি চাকরি ও শিক্ষকতার কাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের সঙ্গে লড়াই করেই শিক্ষিত অসমিয়াদের জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করতে হতো। এই পর্যায়ে বাঙালি মুসলিমদের প্রতি অসমিয়াদের কোনও বিদ্বেষের প্রমাণ পাওয়া যায় না। অসমিয়ারা মূলত আপার অসমেই থাকতেন। রাজস্বের প্রয়োজনে আবার বাঙালি কৃষকদের সরকারিভাবেই উৎসাহ দেওয়া হয় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও বরাক উপত্যকার জঙ্গল হাসিল করে কৃষিকাজ শুরু করায়। যেহেতু এদের নিয়ে শিক্ষিত অসমিয়াদের জীবিকাসংক্রান্ত কোনও আশঙ্কা ছিল না, তাই বাঙালি মুসলিম কৃষকদের নিয়ে তারা মাথাও ঘামাননি।

স্বাধীনতার আগে থেকেই অসমের রাজনীতিকরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এবং প্রায়শই সেই বিদ্বেষ দাঙ্গার পর্যায়ে চলে যায়। মাথায় রাখতে হবে ১৯১১ সালে অসমের শতকরা ২১.৬৯ শতাংশ ছিলেন অসমিয়াভাষী, হিন্দিভাষী ছিলেন ৬.১১ শতাংশ আর বাংলাভাষী ছিলেন ৪৫.৬৭ শতাংশ (সূত্রঃ Chubbra K. M. L, Assam Challenge)। আবার ১৯৩১ সালেই এই হার বদলে গিয়ে হলো অসমিয়াভাষী ৩১.৪২ শতাংশ , হিন্দিভাষী ৭.৬২ শতাংশ , বাংলাভাষী ২৬.৭৯ শতাংশ , অন্যান্য ৩৪.১৭ শতাংশ । অর্থাৎ স্বাধীনতার আগের শেষ সেনসাসেও অসমে অসমিয়াভাষীরা ছিলেন জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও কম। সম্ভবত এই জায়গা থেকেই অসমের বাঙালিবিদ্বেষ মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার আগেই ১৯৪৬ সালে অসমের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ প্রকাশ্যেই বলেছিলেন বাঙালি অধ্যুষিত সিলেট পূর্ব পাকিস্তানেই চলে গেলে তিনি খুশি হবেন। ভারতবিভাজন যখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন উভয়পক্ষের রাজনীতিকরাই লড়ে যাচ্ছেন কী ভাবে তাদের অধীন ভূমিখণ্ডের বহর বাড়ানো যায়। সেই সময়ে অসমের প্রধানমন্ত্রীর এই বয়ান খুব আশ্চর্যজনক। আসলে সিলেট ছিল বাঙালি-অধ্যুষিত জেলা। অনেকে বলতে চান, মুসলিমপ্রধান হবার জন্যই বরদলৈ এই কথা  বলেছিলেন। মুশকিল হলো,  ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই সিলেটে যে গণভোট হয়, সেখানে অসম সরকার সুর্মা উপত্যকার চা বাগানের বাঙালি কর্মীদের ভোটের অধিকার দিলেন না। এরা প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু। এর ফলে সিলেটের গণভোটের ফল যাতে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে থাকে, সেই বন্দোবস্ত করে দেওয়া হলো। তার মানে বরদলৈ  বাঙালিবিদ্বেষের জন্যই এই কথা বলেছিলেন। ১৯৪৮ সালেই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘটানো হলো প্রথম বঙ্গাল খেদা আন্দোলন ও বাঙালিবিরোধী দাঙ্গা।

১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সদস্যরা অসমে এলেন। উপলক্ষ্য গোয়ালপাড়া জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে কিনা, সেই বিচার। আবার শুরু হয়ে গেল বাঙালিবিরোধী দাঙ্গা। প্রচুর বাঙালি এমনকি মেঘালয়েও পালিয়ে গেলেন। শুধু গোয়ালপাড়া জেলাতেই আড়াইশোর মতো বাংলা মাধ্যম স্কুলকে রাতারাতি অসমিয়া মাধ্যমে রূপান্তরিত করা হলো। আবার ১৯৬০। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘটানো হলো বাঙালিবিরোধী দাঙ্গা। গুয়াহাটির জেলাশাসক এবং পুলিশের ডিআইজি বাঙালি হওয়ার কারণে প্রকাশ্যে ছুরিকাহত হলেন। গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিব্রুগড় মেডিকেল কলেজ ও অসম মেডিকেল কলেজ থেকে সমস্ত বাঙালি ছাত্র বহিষ্কৃত হলেন। ৫ লক্ষের উপর বাঙালি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলেন পশ্চিমবঙ্গে। এদের মধ্যে রবি বসুর মতো অসমিয়া ভাষায় শিশু ও কিশোর সাহিত্যের সূচনাকারীও ছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালে আবার দাঙ্গার ফলে আবার ১৪,০০০ বাঙালি পালিয়ে আসতে বাধ্য হলেন পশ্চিমবঙ্গে। কেউ কেউ ত্রিপুরা ও মেঘালয়েও আশ্রয় নিলেন। ১৯৭৯-৮০তে আবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় একই কাণ্ড ঘটানো হলো। এর পাশাপাশি মেঘালয়ে যেসব বাঙালি আস্তানা গেড়েছিলেন, তাদের উপরও আক্রমণ করা হলো। ২৫০০০ বাঙালিকে বাধ্য করা হলো মেঘালয় ও অসম থেকে পালিয়ে আসতে।

১৯৮৩ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আবার শুরু হলো বঙ্গাল খেদা আক্রমণ। আগের ঘটনাগুলোর সাথে এবারের পার্থক্য হলো, স্রেফ এই দাবিকে সামনে রেখেই একটা প্রকাশ্য রাজনৈতিক আন্দোলনও শুরু হলো। ১৮ ফেব্রুয়ারি নওগাঁ জেলার ১৪টি গ্রামে মাত্র ৬ ঘণ্টার অপারেশনে খুন করা হলো বাঙালিদের। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২১৯১, আর বেসরকারি মতে ১০,০০০-এর বেশি। ঘটনার পর্যালোচনা করে হর্ষ মান্দার লিখেছিলেন, নিহত বাঙালি মুসলমানদের সকলেরই পূর্বপুরুষ ব্রিটিশ আমলেই ঐ অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। নেল্লি গণহত্যা স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষের সবথেকে বড় গণহত্যা। অথচ ১৯৮৪ সালে তেওয়ারি কমিশন তার ৬০০ পাতার রিপোর্ট অসম সরকারের হাতে তুলে দিলেও অদ্যাবধি সেটি প্রকাশ করা হয়নি। একজনেরও বিচার হয়নি। ভারতে গণহত্যার ঘটনা অনেকই আছে। কখনো সাম্প্রদায়িক, কখনো জাতপাতের কারণে। কিন্তু নেল্লির মতো অন্তত লোকদেখানো বিচারও হয়নি, এমন একটা উদাহরণও নেই। তাহলে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেওয়া যায়, নেল্লির গণহত্যা একদমই সরকারি মদতে ঘটানো গণহত্যা, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের অসমছাড়া করা।

এই পরিপ্রেক্ষিতি মাথায় রেখেই অসমের বর্তমান পরিস্থিতিকে যদি আমরা বিচার না করি, তাহলে মহা ভুল করব। কেউ কেউ এমনটা বলেন যে মূলত বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণেই অসমে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে। অসমিয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে যাবার ভয় পাচ্ছেন। তাই অস্তিত্বরক্ষার তাগিদেই তারা এমনটা করে থাকেন। এমনও যুক্তি দেওয়া হয় যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কারণেই ভারতীয় বাঙালিরাও বিদ্বেষের শিকার হয়ে যাচ্ছেন। তাহলে আসুন,  জনসংখ্যার বিস্ফোরণের প্রকৃত চেহারাটা দেখা যাক। ২০১১ সালের সেনসাস রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র ভারত ও কয়েকটি রাজ্যের গোটা দশকে জনসংখ্যাবৃদ্ধির হারের তুলনা করলে দেখা যাবে, গোটা দেশে এই হার ছিল ১৭.০৬ শতাংশ । সেখানে অসমে এই হার ১৭.০৭, পশ্চিমবঙ্গে ১৩.৮৪ এবং গুজরাটে ১৯.২৮। তার মানে ২০০২-২০১১ সময়ে অসমের জনসংখ্যাবৃদ্ধির হার গোটা দেশের হারের থেকে সামান্য বেশি। পশ্চিমবঙ্গের হার জাতীয় হারের তুলনায় অনেকটাই কম। আবার গুজরাটের বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের থেকে অনেকটাই বেশি। গুজরাটে কি তাহলে অনুপ্রবেশের সমস্যা আছে? কারণ অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মানেই যখন অনুপ্রবেশ,তাহলে সেটা তো গুজরাটের ক্ষেত্রেই সত্য। না, এখানেই শেষ নয়, আরেকটু এগোনো যাক। ২০০১ সালের বৃদ্ধির হারের তুলনায় এই হারের বৃদ্ধিটা দেখা যাকঃ

তার মানে গোটা দেশ বা পশ্চিমবঙ্গের মতই অসমেও মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে। তাহলে আশঙ্কার কারণটা কোথায়? আশঙ্কার কারণটা এইবারে বলা হলো যে অসমিয়াভাষীর শতাংশ কমে যাচ্ছে, বাড়ছে বাংলাভাষীর শতাংশ। ২০১১ সালের সেনসাস রিপোর্টেরই Paper 1 of 2018, Language (Table C-16)এর Statement 5 অনুযায়ী গোটা দেশে অসমিয়াভাষীর শতাংশের পরিবর্তনটাকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই স্টেটমেন্ট অনুযায়ী ১৯৭১ সালে অসমিয়াভাষীরা ছিলেন সারা দেশের জনসংখ্যার ১.৬৩ শতাংশ , ১৯৯১ সালে ১.৫৬ শতাংশ , ২০০১ সালে ১.২৮ শতাংশ  এবং ২০১১ সালে ১.২৬ শতাংশ ।

এই পরিসংখ্যান দেখিয়েই আবার ২০১২ সাল থেকে অসমে আবার অনুপ্রবেশের ভূত খোঁজা শুরু হয়ে গেল। অনুপ্রবেশ তো আছেই, এটা সবাই জানেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারী মানে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা মানুষের কথাই বোঝানো হচ্ছে। এরা তো বাংলাভাষী। তাহলে নিশ্চয়ই পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অন্যান্য রাজ্যের বাংলাভাষী মানুষের সঙ্গে এইসব অনুপ্রবেশকারীদের মিলিয়ে বাংলাভাষার এই শতাংশ নিশ্চয়ই আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। একবার সেই একই স্টেটমেন্টে বাংলা ভাষার অবস্থাটা দেখা যাক। সেই হিসাবে ১৯৭১ সালে বাংলাভাষীরা গোটা দেশের জনসংখ্যার  ৮.১৭ শতাংশ, ১৯৮১ সালে ৭.৭১ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৮.৩০ শতাংশ , ২০০১ সালে ৮.১১ শতাংশ  এবং ২০১১ সালে ৮.০৩ শতাংশ । তাহলে অসমিয়াভাষীদের মতই বাংলাভাষীদেরও শতাংশ ১৯৫১-র তুলনায় কমেছে।  কী আশ্চর্য! ১৯৭১ পরবর্তী এত অনুপ্রবেশের পরেও বাংলাভাষীর শতাংশ কমে গেল! তাহলে কি ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারীরা বাংলায় কথা বলছেন না?

অর্থাৎ ২০ বছরের মধ্যে জনসংখ্যা বেড়ে গেল ২৪.৬৮ লক্ষ (৪৪.৩৮ শতাংশ)। মাথায় রাখতে হবে জনবহুল সিলেট ইতিমধ্যে পূর্ববঙ্গে চলে গেছে তার ৮ লক্ষ মূলত বাঙালি সন্তানদের নিয়ে। আর অসমিয়াভাষীদের সংখ্যা বেড়ে গেল ২৮.০৫ লক্ষ (১৬০.৫৬ শতাংশ)। এই পরিসংখ্যান যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে বলতে হবে অসমিয়াভাষী মহিলাদের গর্ভবহনকাল ১০ মাসের বদলে কয়েক সপ্তাহে পরিবর্তিত হয়েছিল। মাথায় রাখতে হবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে দলে দলে উদ্বাস্তু বাঙালি অসমে চলে এসেছিলেন। অসমের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করলে নেহরু তাকে বলেছিলেন অসমের জনবস্তির ঘনত্ব খুব কম হওয়ায় এই নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না।  শোনা যায়, স্বাধীন ভারতের প্রথম সেনসাস কমিশনারও অসমিয়াভাষীদের সংখ্যাবৃদ্ধির এই হারকে অবাস্তব বলেছিলেন। শোনা যায়, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি মুসলিমদের বাধ্য করা হয়েছিল অসমিয়াকে মাতৃভাষা বলে ঘোষণা করার। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল,তাহলে তারা নিশ্চিন্তে অসমে থাকতে পারবেন। আর এভাবেই এই প্রথম অসমিয়ারা অসমের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ অসমের উপর অসমিয়াদের একক দাবির ভিত্তিটাই ছিল এক রিগিং, যার দায় আজও বাঙালিদের বহন করতে হচ্ছে।

মুসলমান ও বাঙালি

অনেকেই বলার চেষ্টা করছেন, অসমের সাধারণ মানুষের আসল রাগ বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের উপর। যে সব হিন্দু চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের কোনও ভয় নেই। কেন্দ্রীয় সরকার তো ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী ২০১৬ সালেই পার্লামেন্টে পেশ করেছেন, যা এখন জয়েন্ট পার্লামেন্টারির কমিটির পর্যালোচনায় আছে। এই সংশোধনী অনুযায়ী, ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অমুসলিম যারাই ভারতে চলে এসেছেন, তাদেরই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। প্রথমত ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সেই দেশের নাগরিকত্ব এমন ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে দেওয়া যায় কিনা, কিংবা দিলে সেটা সংবিধানের মূল সুরের বিরোধী হয় কিনা, সেই নিয়ে বিতর্ক আছে। যদি মেনেও নিই, যে এই সংশোধনীর ফলে হিন্দুদের ভয়ের কোনও কারণ নেই, তাহলে আবার একবার অসমের দিকে ফেরা যাক। কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক অসম গণ পরিষদ জুন মাসে এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মশালমিছিল করে প্রতিবাদ জানায়। সেই মাসের জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটি অসম সফরে গেলে, অসমের রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কাছে এই বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, এর ফলে অসমকে বাংলাদেশি হিন্দুদের আড়তে পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে। এই দুটি ঘটনাই পরিষ্কার করে দেয়, অসমে যে রাজনৈতিক প্রবণতা, সেখানে মুসলিমবিদ্বেষ নয়, আসলে বাঙালিবিদ্বেষই প্রধান।

(সুজন ভট্টাচার্য মূলত গল্পকার। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘গগন ঢাকির রক্ত’ ও ‘উত্তরাধিকারী’)

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

Shares

Leave A Reply